2 Answers

ইসলামে উপহার বা হাদিয়া প্রদান ও গ্রহণ উভয়ই সুন্নত। কোনো প্রকার শর্ত ছাড়া এবং স্বার্থ বিবেচনা না করে, কারো প্রতি অনুরাগী হয়ে যে উপঢৌকন প্রদান করা হয়, তাই হাদিয়া।

এই হাদিয়া বা উপহার অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের সদাকাহ বা অনুদান। হাদিয়া বা উপহার দাতা ও গ্রহীতা উভয়কে সম্মানিত করে। এটি কোনো দয়া বা দাক্ষিণ্য নয়।

হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, তোমরা হাদিয়া বা উপহার দাও, তোমাদের মধ্যে প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হবে। (তিরমিজি)।

হাদিয়া বা উপহার দেওয়ার জন্য বিশেষ কোনো পর্ব বা উপলক্ষ জরুরি নয়। যখন খুশি তখন যাকে ইচ্ছা তাকে যেকোনো পরিমাণ হাদিয়া বা উপহার দেওয়া যায়। তাই কারো ধনসম্পদ বেশি থাকা সত্ত্বেও আত্মীয়-স্বজনদেরকে কমদামী উপহার দিলে তার গুনাহ হবে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা তাদের সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করে, অতঃপর খোঁটা বা তুলনা দিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে তার অনুগমন করে না। তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে তাদের বিনিময়, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। (সুরা: বাকারা, আয়াত: ২৬২)।

হাদিয়া বা উপহার হতে পারে স্মৃতিস্মারক, হতে পারে প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য বস্তু, হতে পারে জীবনচলার সহায়ক। হাদিয়া বা উপহার কী হবে তা দাতার ইচ্ছা, রুচি ও সামর্থ্যের ওপরেই নির্ভর করে। কিন্তু যাকে হাদিয়া বা উপহার দেওয়া হবে, তার প্রয়োজনীয়তা, চাহিদা ও রুচি বিবেচনা করাও বাঞ্ছনীয়। কারণ, উপহার সামগ্রীর মালিকানা ও ব্যবহারকারী তিনিই হবেন, যিনি বা যাকে কেন্দ্র করে উপহার দেওয়া হয়েছে।

এমন কিছু হাদিয়া দেওয়া যা পরিধান করা মুসলমানদের জন্য হারাম এমন অপছন্দনীয় জিনিস দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে কেউ দিলে তা গ্রহণ করতে হবে।

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর (রাঃ) মসজিদের দ্বার প্রান্তে একজোড়া রেশমী বস্ত্র (বিক্রি হতে) দেখে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এটা যদি আপনি খরিদ করে নেন এবং তা জুমআর দিনে ও প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ে পরিধান করতেন। তখন তিনি বললেন, এ তো সেই পরিধান করে, আখিরাতে যার কোন হিসসা নেই। পরে (কোন এক সময়) কিছু রেশমী জোড়া আসলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে উমর (রাঃ) কে এক জোড়া দান করলেন। তখন উমর (রাঃ) বললেন আপনি এটা আমাকে পরিধান করতে দিলেন অথচ (কয়েকদিন আগে) রেশমী কাপড় সম্পর্কে আপনি যা বলার বলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তো এটা তোমাকে নিজে পরিধান করার জন্য দেইনি। তখন উমর (রাঃ) তা মক্কায় বসবাসকারী তার এক মুশরিক ভাইকে দিয়ে দিলেন।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে মুসলিম মহিলাগণ! কোন মহিলা প্রতিবেশিনী যেন অপর মহিলা প্রতিবেশিনী (প্রদত্ত হাদিয়া) তুচ্ছ মনে না করে, এমন কি স্বল্প গোশত বিশিষ্ট বকরীর হাঁড় হলেও।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি আমাকে হালাল পশুর পায়া বা হাতা খেতে আহবান করা হয়, তবু তা আমি গ্রহণ করব আর যদি আমাকে পায়া বা হাতা হাদিয়া দেওয়া হয়, তবে আমি তা গ্রহণ করব।

(সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ৪৩/ হিবা (উপহার) প্রদান, হাদিস নম্বরঃ ২৪৩৭,২৩৯৬, ২৩৯৮ হাদিসের মানঃ সহিহ)।


1660 views

উপহার (هدية/Gift) লেনদেন করা সুন্নত। এর মাধ্যমে পারস্পারিক সুসম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসা বৃদ্ধি পায় এবং হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা বিদূরিত হয়। আর নি:সন্দেহে এগুলো একটি শান্তিময় ও সৌহার্দপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থার জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। এই ভালবাসা ও হৃদ্যতা পূর্ণ সম্পর্ক কেবল জাগতিক ক্ষেত্রেই উপকারী নয় বরং তা ঈমানের পূর্ণতা লাভ এবং আখিরাতের চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন তথা জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম একটি কারণ। তাই তো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

“সেই স্বত্বার কসম যার হাতে রয়েছে আমার প্রাণ, তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ইমানদার হতে পারবে না। আর ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ইমানদার হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা একে অপরকে না ভালবাসবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি বিষয়ের কথা বলবো যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালবাসবে? তোমরা বেশি বেশি করে সালামের প্রসার কর।" [সহিহ মুসলিম]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পারস্পারিক ভালবাসা বৃদ্ধির উপায় হিসেবে উপহার লেনদেনের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন,"তোমরা একে অন্যকে উপহার দাও তাহলে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।" [আল আদাবুল মুফরাদ, হা/৫৯৪, ইরওয়াউল গালিল ৬/৪৪-শাইখ আলবানি রহ.-হাসান] 

হাফেজ ইবনে আব্দিল বার বলেন,كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يقبل الهدية وندب أمته إليها، وفيه الأسوة الحسنة به صلى الله عليه وسلم. ومن فضل الهدية مع اتباع السنة أنها تورث المودةً وتُذهب العداوة [فتح المالك بتبويب التمهيـد على موطأ مالك 9/358-359]

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপহার গ্রহণ করতেন এবং উপহার (আদান-প্রদান) কে উম্মতের জন্য মোস্তাহাব করেছেন। এর মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। উপহারের অন্যতম একটি উপকারিতা হল, সুন্নত অনুসরণের পাশাপাশি তা ভালবাসা সৃষ্টি করে এবং শত্রুতা দূর করে।” [ফাতহুল মালিক]

সুতরাং সুন্নতের অনুসরণ এবং পারস্পারিক সুসম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসা বৃদ্ধির স্বার্থে আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জনদেরকে যথাসাধ্য ভালো ও উপকারী জিনিস উপহার দেয়া উচিৎ তবে উপহার দেয়ার কারণে যদি উপহার  দাতা ও গ্রহীতার মাঝে ফিতনা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে তাহলে উপহার দেয়া থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। যেমন: নন মাহরাম যুবক-যুবতির মাঝে উপহার লেনদেন করা হলে উভয়ের ফিতনায় পতিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং এমন আশঙ্কা থাকলে তা হতে বিরত থাকা অপরিহার্য।

সাধারণ গরিব-অসহায় মানুষের তুলনায় নিজস্ব রক্ত সম্পর্কীয় গরিব আত্মীয়দেরকে সাহায্য করার নিয়তে উপহার দিলে দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

الصَّدقةُ على المسْكينِ صدقةٌ، وعلى ذي القرابةِ اثنتان: صدقةٌ وصلةٌ"মিসকিনকে সদকা দিলে শুধু সদকার সওয়াব হয় আর নিকটাত্মীয়কে দিলে সদকা এবং আত্মীয়তার বন্ধন উভয়টির সওয়াব হয়।” [সহিহ ইবনে মাজাহ হা/১৫০৬, হাসান লি গাইরিহ]

 উপহারের দাম কম বা বেশি তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং উপহার হিসেবে এমন জিনিস দেওয়ার চেষ্টা করা উচিৎ যাতে উপহার গ্রহীতা ব্যক্তি খুশি হয়। তাছাড়া আপনারা অনেক সম্পদ থাকলেও কাউকে উপহার দেওয়া, বা না দেওয়া অথবা উপহার বেশি দেওয়া / উপহার কম বা  কমদামী হলে বা কখনোই কাউকে  উপহার না দিলে কোন গুনাহ হবে না এটি নিতান্তই আপনার ব্যক্তিগত ব্যপার। কারণ তা ওয়াজিব (আবশ্যক) নয় বরং মোস্তাহাব (উত্তম)। 

তবে আপনার ধনসম্পদ বেশি থাকলে অবশ্যই দান সদকা দিবেন, গরিব-অসহায়  মানুষের মাঝে এসব ধন সম্পদ বিলিয়ে দিলে এতে   সওয়াব পাবেন ইনশাআল্লাহ।ধন্যবাদ।

1660 views

Related Questions