4 Answers
❖ আপনার প্রতিপালক অমুখাপেক্ষী, অত্যন্ত দয়াশীল।
আলোচ্য আয়াতে 'ওরব্বুকাল গণীউ' শব্দ দ্বারা বিশ্বপালকের অমুখাপেক্ষিতা বর্ণনা করার সাথেই জুর-রহমাতি যোগ করে বলা হয়েছে যে, তিনি করুণাময়ও বটে।
অমুখাপেক্ষিতা আল্লাহ তাআলারই বিশেষ গুণ। মানুষের মধ্যে এ গুণ নেই, কেননা, মানুষ অপরের প্রতি অমুখাপেক্ষি হয়ে গেলে সে অপরের লাভ-লোকসান ও সুখ-দুঃখের প্রতি মোটেই ভ্রুক্ষেপ করত না বরং অপরের প্রতি অত্যাচার ও উৎপীড়ন করতে উদ্যত হত।
অর্থাৎ তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, সকল মাখলুক তার মুখাপেক্ষী, তিনি দয়াময়। তার ইচ্ছায় সবকিছু হয়।
তিনি তার সৃষ্টির মুখাপেক্ষী নন। না তিনি তাদের (শক্তি বা অর্থের) মুখাপেক্ষী, আর না তাদের ইবাদতের তার প্রয়োজন। না তাদের ঈমান তার জন্য ফলপ্রসূ, আর না তাদের কুফরী তার জন্য ক্ষতিকর। তবে অমুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও তিনি তার সৃষ্টিকুলের প্রতি দয়ালু। তার অমুখাপেক্ষিতা স্বীয় সৃষ্টিকুলের প্রতি দয়া করার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না। এ হল তার বিশাল শক্তি এবং সীমাহীন কুদরতের প্রকাশ।
❖ তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে অপসারিত করবেন।
তিনি ইচ্ছা করলে দুনিয়ায় যারা রয়েছে এদেরকে ধ্বংস করে নতুন জাতি নিয়ে আসতে সক্ষম।
আল্লাহ তাআলা বলেন: “হে মানুষ! তিনি (আল্লাহ) ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে অপসারিত করে অপরকে আনতে পারেন; আল্লাহ এটা করতে সম্পূর্ণ সক্ষম।”(সূরা নিসা ৪:১৩৩)
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন: “আল্লাহ অভাবমুক্ত, তোমরাই অভাবগ্রস্ত। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে রাখ তাহলে আল্লাহ তোমাদের বদলে অন্য কাওমকে নিয়ে আসবেন। আর তারা তোমাদের মত হবে না।”(সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৩৮)।
অন্য আয়াতে এটাও বলা হয়েছে যে, যাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হবে, তারা তাদের মতো হবে না, বরং তাদের চেয়ে ভালো হবে। বলা হয়েছে, “আর যদি তোমরা বিমুখ হও, তবে তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন; তারপর তারা তোমাদের মত হবে না” [সূরা মুহাম্মাদ: ৩৮]
অন্য আয়াতে এ কাজটিকে তার জন্য অত্যন্ত সহজ বলে ঘোষণাও করেছেন। তিনি বলেন, “তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে অপসৃত করতে পারেন এবং এক নূতন সৃষ্টি নিয়ে আসতে পারেন। আর এটা আল্লাহর পক্ষে কঠিন নয়”। [সূরা ইবরাহীম: ১৯; সূরা ফাতির: ১৬]
❖ তিনি তোমাদেরকে অন্য সম্প্রদায়ের বংশ হতে সৃষ্টি করেছেন।
হে মানুষ! তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই লোকই অধিক সম্মানীয় যে লোক অধিক মুত্তাক্বী। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব খবর রাখেন। [হুজুরাত: ৪৯/১৩]
আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টি করার পর বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছেন যাতে একে অপরকে চিনতে পারে। যেমন সে অমুকের ছেলে, সে অমুক গোত্রের লোক ইত্যাদি। এ জন্য বিভিন্ন গোত্র ও জাতিতে বিভক্ত করেন যে, অমুক গোত্র অমুক গোত্র থেকে, অমুক জাতি অমুক জাতি থেকে শ্রেষ্ঠ। আর শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি একটিই, তা হলো তাকওয়া। সে কৃষ্ণাঙ্গ হোক বা শ্বেতাঙ্গ হোক, আরবি হোক আর অনারবি হোক, প্রাচুর্যশালী হোক আর নিঃস্ব হোক।
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসুল(সা)-কে সম্বোধন করে বলেছেন তোমার প্রতিপালক সমস্ত মাখলুকাত হতে সর্বদিক দিয়েই অমুখাপেক্ষী। সমস্ত ব্যাপারে সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। তাছাড়া, তিনি মহান দয়ালুও। তিনি বলেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ লোকদের প্রতি অত্যন্ত করুণাময় ও দয়ালু। (সুরা-বাকারা:১৪৩)
ইরশাদ হচ্ছে- যদি তোমরা তাঁর আদেশ নিষেধ অমান্য কর তবে তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিবেন, অতঃপর যে কওমকে চাইবেন তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন, যাতে এই অন্য কওম তাঁর বাধ্য ও অনুগত হয়ে যায়। যেমন তিনি তোমাদেরকে অন্য জাতির বংশধর হতে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ এই কাজের উপর তিনি পূর্ণ ক্ষমতাবান, তাঁর কাছে এটা খুবই সহজ। যেমন তিনি পূর্ব যুগকে ধ্বংস করে ওদের স্থলে অন্য কওমকে আনয়ন করতে সক্ষম। তিনি বলেন: হে লোকসকল, তোমরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী এবং তাঁর ফকীর। আর অমুখাপেক্ষী ও প্রশংসিত হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ধ্বংস করে অন্য মাখলুক সৃষ্টি করবেন। এটা তাঁর কাছে মোটেই কঠিন কাজ নয়। তিনি বলেন: যদি তোমরা তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তবে তোমাদের পরিবর্তে তিনি অন্য কওমকে আনয়ন করবেন, অতঃপর তারা তোমাদের মতো হবে না।
অমুখাপেক্ষীতা আল্লাহর বিশেষ গুণ। নতুবা মানুষ অপরের প্রতি অমুখাপেক্ষী হয়ে গেলে সে অপরের লাভ লোকসান ও সুখ দুঃখের প্রতি মোটেই ভ্রুক্ষেপ করত না। বরং অপরের প্রতি অত্যাচার ও উৎপীড়ন করতে উদ্যত হতো। কুরআনে বলা হয়েছে- মানুষ যখন নিজেকে অমুখাপেক্ষী দেখতে পায়, তখন অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যে মেতে উঠে। তাই আল্লাহ মানুষকে এমন প্রয়োজনাদির শিকলে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে দিয়েছেন, যেগুলো অপরের সাহায্য ছাড়া পূর্ণ করা সম্ভব নয়। বিত্তশালী ও মিল মালিক শ্রমিকদের মুখাপেক্ষী। আল্লাহ সবাইকে অভাব অনটনের এক শিকলে বেঁধে রেখেছেন। প্রত্যেকেই মুখাপেক্ষী, কারও প্রতি কারও অনুগ্রহ নাই। এরূপ না হলে কোন ধনী কোন পয়সা দিত না, আবার কোন শ্রমিক সামান্য বোঝাও বহন করত না। এটা একমাত্র আল্লাহ পাকেরই বিশেষ গুণ যে, পুরোপুরি অমুখাপেক্ষী হওয়ার সত্ত্বেও তিনি দয়ালু, করুণাময়। এ গুণটি পয়গম্বর ও ঐশীগ্রন্থ প্রেরণের মূল কারণ।
এরপর বলা হয়েছে, তাঁর রহমত যেমন ব্যাপক ও পূর্ণ, তেমনি তাঁর শক্তি সামর্থ্য প্রত্যেক বস্তু ও প্রত্যেক কাজে পরিব্যাপ্ত। তিনি ইচ্ছা করলে মুহূর্তের মধ্যে সবাইকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারেন। সমগ্র সৃষ্টি জগত নিশ্চিহ্ন করে দিলেও তাঁর কুূদরতের কারখানায় বিন্দুমাত্র পার্থক্য দেখা দিবে না। তিনি ইচ্ছা করলে, বর্তমান সৃষ্টি জগত ধ্বংস করে তদস্থলে অন্য সৃষ্টি জগত মুহূর্তে স্থাপন করতে পারেন।এর নজীর প্রতি যুগের মানুষের সামনেই রয়েছে। আজ কোটি কোটি মানুষ পৃথিবীর আনাচে-কানাচে বসবাস করছে এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন কাজ করছে। আজ থেকে একশ বছর আগের অবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, তখনো এ পৃথিবী এমন জমজমাট ছিল এবং সব কাজ কারবার চলত। কিন্তু তখন বর্তমান অধিবাসী ও কার্য পরিচালনাকারীদের কেউ ছিল না। অন্য এক জাতি ছিল, যারা আজ ভূগর্ভে চলে গেছে এবং যাদের নাম-নিশানা পর্যন্ত পাওয়া যায় না। বর্তমান দুনিয়া সে জাতির বংশধর থেকেই সজ্জিত হয়েছে।
বলা হয়েছে- "আল্লাহ ইচ্ছা করলে, তোমাদের সবাইকে নিয়ে যেতে বা উচ্ছেদ করতে পারেন।" এখানে "নিয়ে যাওয়া" অর্থ এমনভাবে ধ্বংস করে দেওয়া, যাতে নাম নিশানা পর্যন্ত অবশিষ্ট না থাকে। মূলত, এখানে ধ্বংস করা বা মেরে ফেলার কথা বলা হয়নি বরং নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে পুরোপুরি ধ্বংস বা নাম নিশানাহীন করে দেওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
মূলত, এ আয়াতে, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী হওয়া, দয়ালু ও পরম করুণাময় হওয়া এবং সর্বশক্তির অধিকারী হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
[তাফসীরে ইবনে কাসীর, মারেফুল ক্বুরআন, তাফসীরে জালালাইনের আলোকে]

আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে যে, নবী ও আসমানী কিতাবসমূহের অব্যাহত ধারা এজন্য ছিল না যে, বিশ্ব পালনকর্তা আমাদের ইবাদাত ও আনুগত্যের মুখাপেক্ষী কিংবা তাঁর কোন কাজ আমাদের আনুগত্যের উপর নির্ভরশীল নয়, তিনি সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী ও অভাবমুক্ত। তবে পরিপূর্ণ অমুখাপেক্ষী হওয়ার সাথে সাথে তিনি দয়া গুণেও গুনান্বিত। সমগ্র বিশ্বকে অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব দান করা এবং বিশ্ববাসীর বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব প্রয়োজন অযাচিতভাবে মেটানোর কারণও তাঁর এ দয়াগুণ। নতুবা মানুষ তথা গোটা সৃষ্টি নিজের প্রয়োজনাদি নিজে সমাধা করার যোগ্য হওয়া তো দূরের কথা, সে স্বীয় প্রয়োজনাদি চাওয়ার রীতি-নীতিও জানে না। বিশেষতঃ অস্তিত্বের যে নেয়ামত দান করা হয়েছে, তা যে চাওয়া ছাড়াই পাওয়া গেছে, তা দিবালোকের মত স্পষ্ট। কোন মানুষ কোথাও নিজের সৃষ্টির জন্য দো’আ করেনি এবং অস্তিত্ব লাভের পূর্বে দো'আ করা কল্পনাও করা যায় না। এমনিভাবে অন্তর এবং যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমন্বয়ে মানুষের সৃষ্টি হাত, পা, মন-মস্তিস্ক প্রভৃতি এগুলো কোন মানব চেয়েছিল কি?
মোটকথা, আলোচ্য আয়াতে (وَرَبُّكَ الْغَنِيُّ) শব্দ দ্বারা বিশ্বপালকের অমুখাপেক্ষিতা বর্ণনা করার সাথেই (ذُو الرَّحْمَةِ) যোগ করে বলা হয়েছে যে, তিনি করুণাময়ও বটে। অমুখাপেক্ষিতা আল্লাহ্ তা'আলারই বিশেষ গুণ। মানুষের মধ্যে এ গুণ নেই, কেননা, মানুষ অপরের প্রতি অমুখাপেক্ষি হয়ে গেলে সে অপরের লাভ-লোকসান ও সুখ-দুঃখের প্রতি মোটেই ভ্রুক্ষেপ করত না বরং অপরের প্রতি অত্যাচার ও উৎপীড়ন করতে উদ্যত হত। আল্লাহ তা'আলা অন্য এক আয়াতে বলেন, “মানুষ যখন নিজেকে অমুখাপেক্ষি দেখতে পায়, তখন অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যে মেতে উঠে।" [সূরা আল-আলাক; ৬-৭] তাই আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে এমন প্রয়োজনাদির শিকলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দিয়েছেন, যেগুলো অপরের সাহায্য ব্যতিরেকে পূর্ণ হতে পারে না।