তাকদির বা ভাগ্য সম্পর্কে কিছু জানতে চাই?
আমরা কোন কিছু হলে বলি ভাগ্যে ছিল। কোন কাজ করে সেটাতে ক্ষতি হলে বলি আমার ভাগ্যে ছিল।
তাকদিরে বিশ্বাস করা গুরুত্বপূর্ন। আমাদের ভাগ্যে সবকিছু লেখা থাকে। সকলের ভাগ্য আগে থেকেই ঠিক করা আছে বুঝলাম।
তাহলে খারাপ কাজ যদি করি সেটা আমাদের ভাগ্যে লেখা ছিল।
তাই সেই খারাপ কাজ করার জন্য আমাদের পাপ হবে কেন? যেহেতু সেটা আমাদের ভাগ্যে লেখা আছে?
যদি সবকিছুই আমাদের ভাগ্যে লেখা থাকে তাহলে খারাপ কাজটাও লেখা আছে? ভাগ্যটা তিনি লিখেছেন?তাহলে আমাদের পাপ হবে কেন?
2 Answers
তাকদীর হচ্ছে, সর্বজ্ঞানী হিসাবে আল্লাহ তাআলার পূর্ব জ্ঞান ও হিকমতের দাবি অনুযায়ী সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য সব কিছু নির্ধারণ।
তাকদীর লিপিবদ্ধ আছে বলে মানুষ ভালো-মন্দ ইত্যাদি কাজ করছে বিষয়টি এমন নয়; বরং ভবিষ্যতে মানুষ যা করবে, আল্লাহ তাআলা তা আগে থেকেই জানেন, ফলে তিনি তা আদিতেই লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।
আল্লাহ তাআলা আদিতে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন বলে মানুষ লেখা অনুযায়ী কর্ম করছে এ কথা মোটেও ঠিক নয়। বরং আমরা কখন কী করব, কী খাব, কবে কখন পাপ করব এগুলো আল্লাহ তাআলা পূর্ব থেকেই জানেন। কারণ তিনি ইলমে গায়েবের অধিকারী। তার পূর্বজ্ঞান অনুযায়ী তা লিখে রেখেছেন।
আল্লাহ তাআলা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছু জানেন, একে বলা হয় ইলমে ইলাহি বা আল্লাহ তাআলার জ্ঞান। এই ইলমে ইলাহি বা আল্লাহ তাআলার জ্ঞান সব সময় কাযা বা সিদ্ধান্ত অর্থাৎ তাকদীর বা পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য নয়। এটা কখনো কখনো আমল বা কর্ম। অর্থাৎ মানুষের জীবনে যা কিছু সংঘটিত হয় তা দুই ভাগে বিভক্ত: আমল বা কর্ম এবং কাযা বা সিদ্ধান্ত অর্থাৎ তাকদীর বা পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য।
আসলে আমরা গোপন আর প্রকাশ্যে যাই করি না কেন আল্লাহ তাআলা সবই দেখছেন। তার কাছে আমাদের প্রতিটি কর্মের হিসেব দিতে হবে। কেননা তিনি আমাদের প্রতিটি কর্ম লিখিত অবস্থায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা রেখেছেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, যা কিছু আকাশসমূহে রয়েছে এবং যা কিছু জমিনে আছে, সব আল্লাহরই। যদি তোমরা মনের কথা প্রকাশ কর কিংবা গোপন কর, আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে তার হিসাব নেবেন। অতপর যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা তিনি শাস্তি দেবেন। আল্লাহ সর্ব শক্তিমান। (সুরা বাকারা : আয়াত ২৮৪)।
যেহেতু মানুষের সকল কর্ম আল্লাহর সৃষ্টি। কাজেই পূণ্যের সাথে সাথে পাপও আল্লাহর ইচ্ছাক্রমে হয়। তবে তা কেবলমাত্র এ অর্থে যে আল্লাহ এগুলোকে নির্ধারিত করেছেন; এ অর্থে নয় যে আল্লাহ এগুলো অনুমোদন করেন বা আদেশ দেন। পৃথিবীতে যত খারাপ কাজ বা অপরাধ সংঘটিত হয়, এগুলোর উপর আল্লাহ তাআলার কোনো সন্তুষ্টি নেই। আল্লাহ এগুলো ঘৃণা করেন, অপছন্দ করেন এবং এগুলো থেকে বিরত হবার আদেশ দেন।
পৃথিবীতে যত অপরাধ সংঘটিত হয়, এগুলোর উপর আল্লাহর সন্তুষ্টি না থাকা সত্ত্বেও কেন আল্লাহ এগুলো সংঘটিত হতে দেন এর উত্তরে বলা যেতে পারে, কুফর যদি না থাকত, তাহলে মু’মিন ও কাফির আলাদা করা যেত না বরং সবাই মু’মিন হত।
একইভাবে, পাপ যদি না থাকতো, তাহলে পূণ্য বলে কিছু থাকতো না, সৎকর্ম ও মহত্ত্বেরও কোনো মানে থাকতো না। অন্ধকার আছে বলেই আলোর গুরুত্ব আছে। পৃথিবীতে নিষ্ঠুরতা বা নৃশংসতা না থাকলে মানবতারও কোনো আলাদা অস্তিত্ব বা অর্থ থাকতো না। কাজেই পৃথিবীতে অন্যায়, পাপ ইত্যাদির অস্তিত্ত্বও আল্লাহর সৃষ্টির অসামান্য হিকমতের পরিচায়ক।
আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন, ভালো-খারাপ উভয় পথই মানুষের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে, এবং এটিই মানুষের জন্য পরীক্ষা।
কাজেই মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে তবে সে আল্লাহর নির্ধারণকৃত তাকদীরের বাইরে কোনো কাজ করে না কারণ তার কর্মের উপর আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ মানুষকে বাধ্য করেন না। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে এবং এ অনুযায়ী মানুষ কাজ করে।
সুতরাং “আল্লাহ না চাইলে তো পাপ কাজ করতাম না, তাকদীরে আছে বলেই পাপকাজ করেছি” এই জাতীয় কথা বলার কোনো মানে নেই। কারণ এরূপ কথা বলার অর্থ হচ্ছে গায়েবের জ্ঞান থাকার দাবি করা। কেননা তাকদীরে পাপ করার কথা আছে এটা তো কেউ আমাদের বলে দেয়নি। এই জ্ঞান তো আমাদের কারো নেই। কাজেই এধরনের কথা বলার অর্থ হচ্ছে, আন্দাজের অনুসরণ করা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পাপকাজে লিপ্ত হওয়া।
প্রত্যেক মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি দেওয়া হয়েছে, চাইলেই সে পাপ করতে পারে ও নেক করতে পারে তাই মানুষের বিচার করা হবে।