আমি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ৪র্থ বর্ষের ছাত্র। একটা মেয়ের সাথে আমার রিলেশন প্রায় সারে ৪ বছর। মেয়ের ফ্যামিলি থেকে আগে না মানলেও এখন মেনে নিয়েছে। সমস্যাটা হচ্ছে ওর সাথে মিসতে আমার পাপবোধ হচ্ছে, আবার বিয়ে ও করতে পারছি না, কারন আমি এখনো ছাত্র। এমতবস্তায় আমারা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমরা কাজি অফিসে গিয়ে লুকিয়ে বিয়ে করব। কিন্তু এ বিষয়ে নেট ঘেটে যতটুকু যেনেছি যে মেয়ের অবিভাবক এর সম্মতি ছাড়া বিয়ে হবে না। এখন কথা হচ্ছে মেয়ের বাবা আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিয়েছেন, এবং ভবিষ্যতে তিনি আমার সাথেই তার মেয়ের বিয়ে দিবেন, এমতবস্তায় আমাদের লুকিয়ে বিয়ে করা কি যায়েজ হবে?
2650 views

1 Answers

যদি দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক সমঝদার সাক্ষ্যির সামনে প্রাপ্ত বয়স্ক পাত্র ও পাত্রি যদি প্রস্তাব দেয় এবং অপরপক্ষ তা গ্রহণ করে নেয়, তাহলে ইসলামী শরীয়া মুতাবিক বিবাহ শুদ্ধ হয়ে যায়। এতে অভিভাবকের সম্মতি থাকুক বা না থাকুক। অভিভাবক জানুক বা না জানুক। সুতরাং আপনারা উভয়ে যদি প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক সাক্ষ্যির উপস্থিতিতে বিয়ের প্রস্তাব ও প্রস্তাব গ্রহণ সম্পন্ন করে থাকেন, তাহলে আপনাদের বিয়ে ইসলামী শরীয়া মুতাবিক শুদ্ধ হয়ে গেছে। যদিও আপনাদের পরিবার কিছুই জানে না। কিংবা যদি তারা অনুমতি নাও দিয়ে থাকে। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, মেয়ে তার ব্যক্তিগত বিষয়ে অভিভাবকের চেয়ে অধিক হকদার। {মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং-৮৮৮, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪২১, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৮৮৮, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-২০৯৮, সুনানে দারেমী, হাদীস নং-২২৩৪, সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-১১০৮, সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং-৩২৬০, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৪০৮৪, সুনানে দারাকুতনী, হাদীস নং-৩৫৭৬} হযরত সালামা বিনতে আব্দুর রহমান রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক মেয়ে রাসূল সাঃ এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা! কতইনা উত্তম পিতা! আমার চাচাত ভাই আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল আর তিনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। আর এমন এক ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চাইছেন যাকে আমি অপছন্দ করি। এ ব্যাপারে রাসূল সাঃ তার পিতাকে জিজ্ঞাসা করলে পিতা বলে, মেয়েটি সত্যই বলেছে। আমি তাকে এমন পাত্রের সাথে বিয়ে দিচ্ছি যার পরিবার ভাল নয়। তখন রাসূল সাঃ মেয়েটিকে বললেন, “এ বিয়ে হবে না, তুমি যাও, যাকে ইচ্ছে বিয়ে করে নাও”। {সুনানে সাঈদ বিন মানসূর, হাদীস নং-৫৬৮, মুসন্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং-১০৩০৪, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-১৫৯৫৩, দিরায়া ফী তাখরীজি আহাদিসীল হিদায়া, হাদীস নং-৫৪১} 2469 – হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। কুমারী মেয়ে রাসূল সাঃ এর কাছে এসে বলল, আমার পিতা আমার অপছন্দ সত্বেও বিয়ে দিয়েছে, তখন রাসূল সাঃ সে মেয়েকে অধিকার দিলেন, যাকে ইচ্ছে বিয়ে করতে পারে বা এ বিয়ে রাখতেও পারে। {মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৪৬৯, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৮৭৫, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-২০৯৬, সুনানুল কুবরা নাসায়ী, হাদীস নং-৫৩৬৬, সুনানে দারা কুতনী, হাদীস নং-৩৫৬৬} হযরত বুরাইদা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক মহিলা নবীজী সাঃ এর কাছে এসে বলল, আমার পিতা আমাকে তার ভাতিজার কাছে বিয়ে দিয়েছে, যাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। রাবী বলেন, তখন রাসূল সাঃ বিষয়টি মেয়ের ইখতিয়ারের উপর ন্যস্ত করেন, অর্থাৎ ইচ্ছে করলে বিয়ে রাখতেও পারবে, ইচ্ছে করলে ভেঙ্গেও দিতে পারবে। তখন মহিলাটি বললেন, আমার পিতা যা করেছেন, তা আমি মেনে নিলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল, মেয়েরা যেন জেনে নেয় যে, বিয়ের ব্যাপারে পিতাদের চূড়ান্ত মতের অধিকার নেই {সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৮৭৪, মুসনাদে ইসহাক বিন রাহুয়াহ, হাদীস নং-১৩৫৯, সুনানে দারা কুতনী, হাদীস নং-৩৫৫৫} উল্লেখিত হাদীস ছাড়াও আরো এমন অনেক হাদীস রয়েছে, যা স্পষ্ট ভাষায় প্রমাণ করে যে, বিয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবক নয়, প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এক্ষেত্রে পিতা বা অভিভাবকের হস্তক্ষেপের অধিকার নেই। সুতরাং প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলা অভিভাবক ছাড়া বিয়ে করে নিলে তা সম্পন্ন হয়ে যাবে। বিপরীতমুখী হাদীসের জবাব কি? যে সকল হাদীস দ্বারা একথা বুঝা যায় যে, অভিভাবক ছাড়া বিয়ে সম্পন্ন হয় না, সেগুলোর অনেকগুলো জবাব মুহাদ্দিসীনে কেরাম ও ফুক্বাহায়ে কেরাম দিয়েছেন। প্রশ্নে উল্লেখিত হাদীসটি আমরা দেখে নেই, তাহলে উত্তর দিতে সুবিধা হবে , হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যে মহিলাকে তার অভিভাবক বিয়ে দেয়নি, তার বিয়ে বাতিল, তার বিয়ে বাতিল, তার বিয়ে বাতিল। এরপর স্বামী যদি তার তার সাথে মিলামিশা করে তবে সে মহরের অধিকারী হবে স্বামী তার সাথে [হালাল পদ্ধতিতে] মেলামেশা করার কারণে। আর যদি তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, তবে যার অভিভাবক নেই, বাদশাই তার অভিভাবক বলে বিবেচিত হবে। {সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-১৮৭৯, সুনানে তিরামিজী, হাদীস নং-১১০২, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৮৭৯} হাদীসটির বিষয়ে মন্তব্য ইমাম বুখারী রহঃ বলেন, হাদীসটি মুনকার। {আলইলালুল কাবীর-২৫৭} ইমাম তিরমিজী রহঃ বলেন, হাসান। {সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-১১০২} ইমাম তাহাবী রহঃ বলেন, হাদীসটি ফাসিদ। {শরহু মাআনিল আসার-৩/৭} ইবনে কাত্তান রহঃ বলেন, হাদীসটি হাসান। {আলওয়াহমু ওয়ালইহামু-৪/৫৭৭} জবাব নং ১ আমরা শক্তিশালিত্বের দিক থেকে আমাদের বর্ণিত হাদীসকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। হযরত আয়শা সিদ্দিকা রাঃ থেকে বর্ণিত হাদীসটির বিষয়ে ইমাম বুখারী রহঃ থেকে মুনকার হওয়ার এবং ইমাম তাহাবী রহঃ থেকে ফাসিদ হওয়ার কালাম রয়েছে। তাই আমরা এর উপর আমল করি না। পক্ষান্তরে আমাদের উপরে বর্ণিত সহীহ মুসলিম ও মুয়াত্তা মালিকের বর্ণনাটি সহীহ। জবাব নং ২. যেমন প্রশ্নে উল্লেখিত অভিভাবক ছাড়া মহিলা কর্তৃক বিয়ে সম্পন্ন না হওয়ার হাদীসটি হযরত আয়শা সিদ্দিকা রাঃ এর। অথচ খোদ আয়শা রাঃ তার ভাই আব্দুর রহমানের মেয়ে হাফসাকে তার অভিভাবক আব্দুর রহমানকে ছাড়াই নিজে বিয়ে দিয়েছিলেন মুনজির বিন যুবায়েরের সাথে। {মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং-২০৪০, তাহাবী শরীফ, হাদীস নং-৪২৫৫, সুনানুস সাগীর লিলবায়হাকী, হাদীস নং-২৩৭৪, মারেফাতুস সুনান ওয়াল আসার, হাদীস নং-১৩৫২২, সুনানে কুবরা লিলবায়হাকী, হাদীস নং-১৩৬৫৩, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-১৫৯৫৫} সুতরাং বুঝা গেল যে, উক্ত হাদীস দ্বারা খোদ বর্ণনাকারী হযরত আয়শা রাঃ নিজেই বিবাহ শুদ্ধ হয় না একথা বুঝান নি। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, বিয়ে অসম্পূর্ণ হয় অভিভাবক ছাড়া। এছাড়া হাদিসটিকে যদি সহিহ হিসেবেও ধরে নেয়া হয় ওয়ালি পিতামিতা ছাড়া অন্য কেউ হতে পারবে না একথা বলার সুযোগ নেই। অর্থাৎ ওয়ালি ছাড়া বিয়ে হবে না সত্য কিন্তু ওয়ালি পিতামাতা হতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তাহলে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি কেউ যদি ভালবেসে ফেলে এবং বাবা মা যদি মেনে না নেয় তাহলে অন্য কাউকে অভিভাবক বানিয়ে বিয়ে করা সম্পূর্ণ জায়েজ। ইসলামে বিয়ে সঠিক হবার শর্ত হল ছেলে মেয়ের ইচ্ছা থাকতে হবে ও বিয়ের সাক্ষী থাকতে হবে। বিয়েতে পিতা মাতার অনুমতি আছে কিনা এটা দেখার বিষয় না। এই হাদীসটার ব্যাখ্যা হল বিয়েতে পিতা মাতার অনুমতি থাকা ভাল। কিন্তু বিয়েতে পিতা মাতার অনুমতি না থাকলেও বিয়ে হয়ে যাবে। কারণ বিয়ে সঠিক হবার ক্ষেত্রে ছেলে মেয়ের নিজ ইচ্ছা ও সাক্ষী লাগে। আর অনেকেরই তো পিতা মাতা বেঁচে নাই তাই বলে কি তারা আর কোনদিন বিয়ে করতে পারবে না। হযরত আয়েশা তার ভাতিজী কে তার ভাইয়ের অনুমতি ছাড়াই বিয়ে দিয়েছেন। শুধুমাত্র একটা হাদীসের উপর ভিত্তি করে ইসলামের কোন বিধিবিধান রচিত হয় না। বিবাহ সংক্রান্ত অন্যান্য হাদীসে পিতা মাতার অনুমতি থাকার কথা বলা নাই। অর্থ্যাৎ বিয়েতে পিতা মাতার অনুমতি থাকলে ভাল, উনাদের অনুমতি না থাকলেও বিয়ে হয়ে যাবে। সূরা নিসার ১৯ নম্বর আয়াতে মেয়েদের জোরপূর্বক উত্তরাধিকার গ্রহণ অবৈধ ঘোষনা করা হয়েছে। তো ঐ আয়াত দ্বারাই তো বুঝা যায় বিয়ে তালাকের ব্যাপারে মেয়েদের মতামতই হল চূড়ান্ত।

2650 views

Related Questions