রেসকোর্স ময়দানের নাম কিভাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হলো?
2 Answers
ব্রিটিশ আমল ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার ব্রিটিশ কালেক্টর মি. ডয়েস ঢাকা নগরীর উন্নয়নকল্পে কতগুলি বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং তখন থেকেই ঢাকা আবার তার পুরানো গৌরব ফিরে পেতে শুরু করে। ঐ সময় কালেক্টর ডয়েস কালী মন্দির ছাড়া অন্যান্য বেশির ভাগ পুরানো স্থাপনা সরিয়ে ফেলেন এবং জঙ্গল পরিষ্পার করে রমনাকে একটি পরিচ্ছন্ন এলাকার রূপ দেন। পুরানো হাইকোর্ট ভবনের পশ্চিমে বর্তমানে অবস্থিত মসজিদ এবং সমাধিগুলি তিনি অক্ষত রাখেন। পুরো এলাকাটি পরিষ্পার করে তিনি এর নাম দেন রমনা গ্রীন এবং এলাকাটিকে রেসকোর্স হিসেবে ব্যবহারের জন্য কাঠের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলেন। রমনা রেসকোর্সের মধ্যখানে একটি কালী মন্দির ছিল। এটি ছিল দশনামী গোত্রের হিন্দুদের কালী মন্দির। মনে করা হয় যে, নেপাল থেকে আগত দেবী কালীর একজন ভক্ত এই মন্দির নির্মাণ করেন। ঢাকা শহরের অন্যতম পুরানো এবং বনেদি এই কালী মন্দিরটি পরে ভাওয়ালের রানী বিলাসমণি দেবী সংস্কার ও উন্নয়ন করেন। নাজির হোসেন কিংবদন্তির ঢাকা গ্রন্থে লিখেছেন, "ব্রিটিশ আমলে রমনা ময়দানটি ঘোড়দৌড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। প্রতি শনিবার হতো ঘোড়দৌড়। এটা ছিল একই সঙ্গে ব্রিটিশ শাসক ও সর্বস্তরের মানুষের চিত্তবিনোদনের একটি স্থান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. শরীফ উদ্দিন আহমেদের এক বিবরণ থেকে জানা যায়, চার্লস ডজ রমনায় রেসকোর্স বা ঘোড়দৌড়ের মাঠ নির্মাণ করেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঢাকার খ্যাতনামা আলেম মুফতি দীন মহম্মদ এক মাহফিল থেকে ঘৌড়দৌড়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। এ কারণে সরকার ১৯৪৯ সালে ঘৌড়দৌড় বন্ধ করে দেয়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর নামানুসারে রমনা রেসকোর্স ময়দানের নাম পরিবর্তন করে "সোহরাওয়ার্দী উদ্যান" রাখা হয়।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি সুপরিসর নগর উদ্যান। এটি পূর্বে রমনা রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিত ছিল। এক সময় ঢাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ সৈন্যদের সামরিক ক্লাব এখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরবর্তীতে এটি রমনা রেস কোর্স এবং তারপর রমনা জিমখানা হিসাবে ডাকা হত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পর মাঠটিকে কখনও কখনও ঢাকা রেস কোর্স নামে ডাকা হত এবং প্রতি রবিবার বৈধ ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হত। একটি জাতীয় স্মৃতিচিহ্নও বটে কেননা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ভাষণ এখানেই প্রদান করেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বার পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই উদ্যানেই আত্মসমর্পণ করে মিত্রবাহিনীর কাছে। রেস কোর্স ময়দানের অদূরে অবস্থিত তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পনের স্থান হিসেবে প্রথমে নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তীতে আত্মসমর্পনের জন্য এই মাঠটি নির্বাচন করা হয়। রমনা রেসকোর্সের দক্ষিণে পুরানো হাইকোর্ট ভবন, তিন জাতীয় নেতা শেরে-বাংলা এ. কে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন এবং হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী-এর সমাধি; পশ্চিমেবাংলা একাডেমী, অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন, ছাত্র- শিক্ষক কেন্দ্র, চারুকলা ইনস্টিটিউট, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ, পাবলিক লাইবে্ররি এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর; উত্তরেবারডেম হাসপাতাল, ঢাকা ক্লাব ও ঢাকার টেনিস কমপ্লেক্স এবং পূর্বে সুপ্রীম কোর্ট ভবন, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট ও রমনা পার্ক। ১৯৭৫ সালের পর এলাকাটিকে সবুজে ঘেরা পার্কে পরিণত করা হয়। পার্কের একপাশে শিশুদের জন্য একটি বিনোদন কেন্দ্র তথা পার্ক গড়ে তোলা হয়। এখানে শিশুদের জন্য নানা ধরনের আকর্ষণীয় খেলাধুলা, খাবার রেস্তোরাঁ এবং ছোটখাটো স্মারক জিনিসপত্র ক্রয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা- সংক্রান্ত যেসব ঐতিহাসিক ঘটনা অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলিকে স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে এখানে ‘শিখা চিরন্তন’ স্থাপন করা হয়েছে এবং একইসাথে তার পাশেই যেখানে পাকিস্তানি সেনাগণ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেছিল সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে স্বাধীনতা টাওয়ার। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এখানে স্বাধীনতা স্তম্ভ ও শিখা চিরন্তন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। স্বাধীনতা স্তম্ভ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ জনতার দেয়াল নামে ২৭৩ ফুট দীর্ঘ একটি দেয়ালচিত্র। এটি ইতিহাসভিত্তিকটেরাকোটার পৃথিবীর দীর্ঘতম ম্যুরাল। এর বিষয়বস্তু ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস। এ ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খনন করা হয়েছে একটি কৃত্রিম জলাশয় বা লেক। ২০০১ খ্রিস্টাব্দেচারদলীয় জোট সরকার-এর শাসনামলে আমলে উদ্যানের ভেতর ঢাকা জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা সংবলিত একটি স্থাপনা তৈরি করা হয়। আর এইভাবে নাম পরিবতর্ন. করা হয়