মদ কি একবারে হারাম করা হয়েছে নাকি পর্যায়ক্রমে?
4 Answers
মদিনার মানুষের নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় ছিল মদ। মদ ছাড়া একটি দিন অতিবাহিত হবে এটি মদিনার লোকেরা মানতেই পারতো না। আর মদ এমন একটি নেশাদ্রব্য যা এর আসক্ত হলে তার থেকে ফিরে থাকা খুবই কঠিন। এহেন স্পর্শকাতর একটি নেশাদ্রব্যকে আল্লাহতা’য়ালা একবারে হারাম ঘোষণা না করে বরং তিনটি পর্যায়ে হারাম ঘোষণা করেন। যা পর্যায়ক্রমে নিম্নে আলোচনা করা হলো।
১ম পর্যায় : হিজরত করে মদীনায় পৌঁছার কিছুদিন পর রসূল (স.)সহ কতিপয় সাহাবী মদের অকল্যাণকর বিষয়গুলো অনুভব করতে থাকেন। একদা হযরত মা’আয ইবনে জাবাল এবং কিছুসংখ্যক আনসার সাহাবী রসূলে-করীম (স.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (স.) মদ ও জুয়া মানুষের বুদ্ধি-বিবেককে বিলুপ্ত করে ফেলে এবং ধনসম্পদও ধ্বংস করে দেয়। এ সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কি? এ প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহা তায়ালা সূরা বাকারার নিম্নোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ করে বলেন-
(হে নবী) তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করছে, মদও জুয়ার ব্যাপারে নির্দেশ কি? বলে দাও : ঐ দু’টির মধ্যে মানুষের বিরাট ক্ষতিকর বিষয় রয়েছে যদিও লোকদের জন্য তাতে সামান্য কিছুটা উপকারিতাও আছে, কিন্তু তাদের উপকারিতার চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশী। (সূরা বাকারা- ২১৯)
এখানে শুধুমাত্র মদকে মানুষের জন্য ক্ষতিকর বস্তু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ১ম পর্যায়ে মাদে সাময়িক কিছু লাভের কথা বলা হলেও ক্ষতির দিকটা যে তার চেয়ে অনেক বহুগুন তা স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এবং এটি যে আল্লাহর কাছে খুবই অপছন্দনীয় বস্তু তা ব্যক্ত করা হয়েছে, যেন মানুষের মন ও মস্তিস্কে মদ হারাম হবার বিষয়টি গ্রহণ করে নিতে প্রস্তুত হয়ে যায়।
২য় পর্যায় : একদিন হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) সাহাবিগণের মধ্যে হতে তাঁর কয়েকজন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করেন। আহারাদির পর যথারীতি মদ্যপানের ব্যবস্থা করা হলো এবং সবাই মদ্যপান করলেন। এমতাবস্থায় মাগরিবের নামাযের সময় হলে সবাই নামাযে দাঁড়ালেন এবং একজনকে ইমামতি করতে এগিয়ে দিলেন। নেশাগ্রস্থ অবস্থায় যখন তিনি সুরা আল-কাফিরূন ভুল পড়তে লাগলেন, তখনই নামাজে মদ্যপান থেকে পুরোপুরী বিরত রাখার জন্যে দ্বিতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হল। আল্লাহ তা’য়ালা সূরা নিসার ৪৩ নং আয়াতে বলেন, হে ঈমানদারগণ ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেয়ো না। নামায সেই সময় পড়া উচিত যখন তোমরা যা বলছো তা জানতে পারো। অনুরূপভাবে অপবিত্র অবস্থায়ও (নামাজের কাছে যেয়ো না।)
এখানে শুধু মদ পানই নয় বরং যে কোন নেশাদ্রব্য ভক্ষণ করে নামায পড়া নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হয়। কারণ এটি মানুষের মস্তিষ্ক বিকৃতি করে দেয় ও মানুষের স্বাভাবিক কর্মকান্ডে ব্যঘাত ঘটায়। যে জিনিস মানুষের মস্তিষ্কে বিকৃতি ঘটিয়ে দেয় এবং মানুষের আচরণগুলো অস্বভাবিক করে দেয় এ জাতীয় জিনিস ভক্ষণ করে আল্লাহ তায়ালার পবিত্রতম ফরজ হুকুমগুলির মত ইবাদত পালন করা খুবই বেমানান । তাই আল্লাহ তা’য়ালা, এটি খেয়ে বা নেশাগ্রস্থ অবস্থায় নামাজ পড়তে বা এর ধারের কাছে যেতেও নিষেধ করে দেন।
৩য় পর্যায় : একদা হযরত আতবান ইবনে মালেক কয়েকজন সাহাবীকে নিমন্ত্রণ করেন, যাদের মধ্যে সা’দ ইবনে আবী অক্কাসও উপস্থিত ছিলেন। খাওয়া-দাওয়ার পর মদ্যপান করার প্রতিযোগিতা এবং নিজেদের বংশ ও পূর্ব-পুরুষদের অহংকারমূলক বর্ণনা আরম্ভ হয়। সা’দ ইবনে আবী অক্কাস একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন যাতে আনসারদের দোষারোপ করে নিজেদের প্রশংসাকীর্তন করা হয়। ফলে একজন আনসার যুবক মদ্যপ অবস্থায় রাগাম্বিত হয়ে উটের গন্ডদেশের একটি হাড় সা’দ এর মাথায় ছুঁড়ে মারেন। এতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। পরে সা’দ রসূল (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে উক্ত আনসার যুবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এমতাবস্থায় হুযূর (সা.) দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! শরাব সম্পর্কে আমাদের একটি পরিষ্কার বর্ণনা ও বিধান দান করুন’ তখনই সূরা মায়েদার উদ্ধৃত মদ ও মদ্যপানের বিধান সম্পর্কিত বিস্তারিত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এখানে আল্লাহ তায়ালা মদ ও জুয়া এবং এই পর্যায়ের সমস্ত বস্তুকে চিরতরে হারাম ঘোষণা করে দেন। আর তৃতীয় নির্দেশটি আসার আগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এক ভাষণে লোকদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, মহান আল্লাহ মদ অত্যন্ত অপছন্দ করেন। তাই মদ চিরতরে হারাম হয়ে যাবার নির্দেশ জারি হওয়া মোটেই বিচিত্র নয়। কাজেই যাদের কাছে মদ আছে তাদের তা বিক্রি করে দেয়া উচিত। এর কিছুদিন পরেই পূর্বের ঘটনাটি ঘটে যার পরিপেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়।
৯০) হে ঈমানদারগণ ! এ মদ, জুয়া, মূর্তি পূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শরসমূহ এ সমস্তই হচ্ছে ঘৃণ্য শয়তানী কার্যকালাপ। এগুলো থেকে দূরে থাকো, আশা করা যায় তোমরা সফলতা লাভ করবে। (সূরা মায়েদা-৯০)
এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর নবী করীম (স.) ঘোষণা করেন, এখন যাদের কাছে মদ আছে তারা তা পান করতে পারবে না এবং বিক্রিও করতে পারবে না বরং তা নষ্ট করে দিতে হবে। কাজেই তখনই মদীনার সমস্ত গলিতে মদ ঢেলে দেয়া হয়। অনেকে জিজ্ঞেস করেন হে আল্লাহর রাসূল (স.), এগুলো ফেলে না দিয়ে আমরা ইহুদীদেরকে তোহফা হিসেবে দিই না কেন? জবাবে নবী করীম (স) বলেন, “যিনি একে হারাম করেছেন তিনি একে তোহফা হিসেবে দিতেও নিষেধ করেছেন। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেন হে আল্লাহর রাসূল (স.) আমরা মদকে সিকায় পরিবর্তিত করে দিই ? তিনি এটিও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং নির্দেশ দেন, “না ওগুলোও ঢেলে দাও”। এক ব্যক্তি অত্যন্ত জোর দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের নিশ্চয়ই অনুমতি আছে? জবাব দেন: “না এটা ওষুধ নয় বরং রোগ।” আর একজন আরয করেন, “হে আল্লাহর রসূল! আমরা এমন এক এলাকার অধিবাসী যেখানে শীত অত্যন্ত বেশী এবং আমাদের পরিশ্রমও অনেক বেশী করতে হয়। তাই আমরা মদের সাহায্যে ক্লান্তি ও শীতের মোকাবিলা করি। তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমরা যা পান করো তা কি নেশা সৃষ্টি করে? লোকটি জবাব দেন হ্যাঁ। তখন তিনি বলেন, তাহলে তা থেকে দূরে থাকো। লোকটি তবুও বলেন, কিন্তু এটা তো আমাদের এলাকার লোকেরা মানবে না। তখন রাসূল (স.) জবাব দেন, “তারা না মানলে তাদের সাথে যুদ্ধ করো।”
মদ একবারে হারাম করা হয়নি যা পর্যায়ক্রমে হারাম করা হয়েছে। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তুমি বলে দাও, এ দুটির মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্যে উপকারিতাও রয়েছে। তবে এ দুটির পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বেশি। (সূরা বাকারাঃ ২১৯) এই আয়াতে মদ হারাম করা হয়নি। আয়াতটিতে বলা হয়েছে যে, মদ ও জুয়াতে যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে কিছু উপকারিতা পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু দু’টির মাধ্যমেই অনেক বড় বড় পাপের পথ উন্মুক্ত হয়; যা এর উপকারিতার তুলনায় অনেক বড় ও ক্ষতিকর। যেমন, মদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় দোষ হচ্ছে এই যে, এতে মানুষের সবচাইতে বড় গুণ, বুদ্ধি- বিবেচনা বিলুপ্ত হয়ে যায়। কারণ, বুদ্ধি এমন একটি গুণ যা মানুষের মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। পক্ষান্তরে যখন তা থাকে না, তখন প্রতিটি মন্দ কাজের পথই সুগম হয়ে যায়।এ আয়াতে পরিষ্কার ভাষায় মদকে হারাম করা হয়নি, কিন্তু এর অনিষ্ট ও অকল্যাণের দিকগুলোকে তুলে ধরে বলা হয়েছে যে, মদ্যপানের দরুন মানুষ অনেক মন্দ কাজে লিপ্ত হয়ে যেতে পারে। এরপর মদের ব্যাপারে পরবর্তী আয়াতটি নাযিল হওয়ার ঘটনা নিম্নরূপঃএকদিন হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) সাহাবিগণের মধ্যে হতে তার কয়েকজন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করেন। আহারাদির পর যথারীতি মদ্যপানের ব্যবস্থা করা হলো এবং সবাই মদ্যপান করলেন। এমতাবস্থায় মাগরিবের নামাযের সময় হলে সবাই নামাযে দাঁড়ালেন এবং একজনকে ইমামতি করতে এগিয়ে দিলেন। নেশাগ্রস্থ অবস্থায় যখন তিনি সুরা আল-কাফিরূন ভুল পড়তে লাগলেন, তখনই মদ্যপান থেকে পুরোপুরি বিরত রাখার জন্যে দ্বিতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হল। (তিরমিযী হাদিস নাম্বারঃ ৩০২৬) এরপর এরশাদ হলঃ হে ঈমানদারগণ! নেশাগ্রস্থ অবস্থায় তোমরা নামাযের কাছেও যেওনা। (সূরা নিসাঃ ৪৩) এই আয়াতের মাধ্যমে নামাযের সময় মদ্যপানকে হারাম করা হয়েছে। তবে অন্যান্য সময় তা পান করার অনুমতি তখনও পর্যন্ত বহাল রয়ে ছিল। এরপর আল্লাহ পাক সম্পূর্ণরূপে সূরা মায়েদার আয়াতে ৩য় বারে হারাম ঘোষণা করলেন। আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি এবং তীর নিক্ষেপ এ সবগুলো নিকৃষ্ট বস্তু, শয়তানের কার্য। কাজেই তোমরা এ সবগুলোকে বর্জন করো। যাতে তোমরা সফল হতে পারো। শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও তিক্ততা ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখতে চায়। তবুও কি তোমরা তা থেকে বিরত থাকবে না। (সূরা মায়েদাঃ ৯০-৯১) এ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে মদকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
মদ কে একেবারে হারাম ঘোষণা করা হয়নি।
পর্যায় ক্রমে তৃতীয়বারে মদ কে সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করা হয়।
প্রথম পর্যায়--- সূরা বাকারা। আয়াত নং 219
يَسْأَلُونَكَ عَنِ ٱلْخَمْرِ وَٱلْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَآ إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَٰفِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَآ أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا وَيَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنفِقُونَ قُلِ ٱلْعَفْوَ كَذٰلِكَ يُبيِّنُ ٱللَّهُ لَكُمُ ٱلأيَٰتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ
দ্বিতীয় পর্যায়-- সুরা নিসা আয়াত নং 43
يَا أَيُّهَا ٱلَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَقْرَبُواْ ٱلصَّلَٰوةَ وَأَنْتُمْ سُكَٰرَىٰ حَتَّىٰ تَعْلَمُواْ مَا تَقُولُونَ وَلاَ جُنُباً إِلاَّ عَابِرِي سَبِيلٍ حَتَّىٰ تَغْتَسِلُواْ وَإِنْ كُنْتُمْ مَّرْضَىٰ أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ أَوْ جَآءَ أَحَدٌ مِّنْكُمْ مِّن ٱلْغَآئِطِ أَوْ لَٰمَسْتُمُ ٱلنِّسَآءَ فَلَمْ تَجِدُواْ مَآءً فَتَيَمَّمُواْ صَعِيداً طَيِّباً فَٱمْسَحُواْ بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَفُوّاً غَفُوراً
তৃতীয় পর্যায়-- সূরা মায়েদা আয়াত নং 90
يَٰأَيُّهَا ٱلَّذِينَ آمَنُواْ إِنَّمَا ٱلْخَمْرُ وَٱلْمَيْسِرُ وَٱلأَنصَابُ وَٱلأَزْلاَمُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ ٱلشَّيْطَانِ فَٱجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy