1 Answers

সিফফিনের সালিসির পর আমিরুল মোমেনিন যখন দুঃখভারাক্রান্ত মনে কুফায় ফিরে যাচ্ছিলেন তখন যারা সালিস মান্য করার জন্য আমিরুল মোমেনিনের ওপর চাপ প্রয়োগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল তারা বলাবলি করতে লাগলো যে, আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাউকে সালিস মান্য করা ইমান হারানোর সামিল। আল্লাহ মাফ করুন, সালিস মান্য করে আমিরুল মোমেনিন ইমানহারা হয়ে গেছেন। ফলে “আল্লাহ ছাড়া আর কারো কোন কর্তৃত্ব নেই” – এ আয়াতের অর্থ বিকৃত করে তারা সাধারণ মুসলিমগণকে তাদের মতাবলম্বী করে হানিরা নামক স্থানে অবস্থিত আমিরুল মোমেনিনের ক্যাম্প থেকে বের করে নিয়ে যায়। আমিরুল মোমেনিন তাদের এহেন দুরভিসন্ধির কথা জানতে পেরে সা’সাআহ ইবনে সুহান আল-আবদি এবং যিয়াদ ইবনে নাদার আল-হারিাহীকে ইবনে আব্বাসের সাথে তাদের কাছে প্রেরণ করেছেন এবং পরবর্তীতে নিজেই তাদের অবস্থান স্থলে গিয়ে আলাপ-আলোচনা করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিলেন।
এসব লোক কুফায় পৌছে ছড়াতে লাগলো যে, আমিরুল মোমেনিন সালিসির চুক্তি ভঙ্গ করে সিরিয়দের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমিরুল মোমেনিন তাদের এসব প্রচারণার প্রতিবাদ করলে তারা বিদ্রোহ করলো এবং বাগদাদ থেকে বার মাইল দূরবতী নাহরাওয়ান নামক খালের নিচু এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করলো ।
অপরপক্ষে আমিরুল মোমেনিন সালিসির রোয়েদাদ শুনে সিরিয়া সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মনস্থির করলেন। তিনি খারিজিদের পত্র দিয়ে জানালেন যে, সালিসদ্বয় কুরআন ও সুন্নাহর পরিবর্তে তাদের ইচ্ছা মাফিক যে রোয়েদাদ দিয়েছে তা তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। সুতরাং শক্রকে নির্মূল করার জন্য তাকে সমর্থন করতে তিনি তাদেরকে অনুরোধ করেন। প্রত্যুত্তরে খারিজিগণ বললো, “আমাদের মতে, সালিস মান্য করে আপনি ইমানহারা হয়ে গেছেন। এখন যদি আপনি ইমান হারানোর কথা স্বীকার করে তওবা করেন তবেই আমরা চিন্তা করে দেখবো কী করা যায়।” তাদের এহেন উত্তর থেকে আমিরুল মোমেনিন বুঝতে পারলেন যে, তাদের অবাধ্যতা ও বিপথগামিতা চরমে উঠেছে। এ অবস্থায় তাদের কোন প্রকার সহায়তা গ্রহণ করা বিপদের কারণ হবে বলে তিনি বিবেচনা করলেন। ফলে তাদেরকে উপেক্ষা করে সিরিয়া অভিমুখে যাত্রার উদ্দেশ্যে তিনি নুখায়লাহ উপত্যকায় ক্যাম্প স্থাপন করলেন। সৈন্যবাহিনী সজ্জিত করার পর আমিরুল মোমেনিন জানতে পারলেন যে, তারা চায় প্রথমে নাহরাওয়ানের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার পর সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা করতে। আমিরুল মোমেনিন বললেন, “নাহরাওয়ানের লোকেরা যেভাবে আছে সেভাবেই থাক। তোমরা প্ৰথমে সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা কর এবং পরে নাহরাওয়ানের লোকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করো।” লোকেরা বলল যে, তারা আমিরুল মোমেনিনের প্রতিটি আদেশ তাদের সর্বশক্তি দিয়ে পালন করার জন্য ওয়াদাবদ্ধ; কাজেই তিনি যেদিকে বলবেন সেদিকেই তারা চলবে। এরই মধ্যে সংবাদ এলো যে, খারিজি বিদ্রোহীগণ নাহরাওয়ানের গভর্নর আবদুল্লাহ্ ইবনে খাব্বাহ ইবনে আরাত ও তার গর্ভবতী কৃতদাসীকে হত্যা করেছে এবং বনি তাঈ ও উন্মে সিনান আস-সাইদাইয়াহ গোত্রের অপর তিনজন মহিলাকে হত্যা করেছে। এ সংবাদে আমিরুল মোমেনিনের সৈন্যগণ আর সিরিয়া অভিমুখে নড়াচড়া করে নি। তিনি বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য হারিছ ইবনে মুররাহ আল-আবদিকে প্রেরণ করলেন। কিন্তু খারিজিগণ হারিছকেও হত্যা করেছে। ফলে আমিরুল মোমেনিন কাল বিলম্ব না করে সসৈন্যে নাহরাওয়ান পৌছলেন এবং তাদের কাছে বার্তা প্রেরণ করলেন যে, যারা আবদুল্লাহ ইবনে খাব্বাহ ও নির্দোষ মহিলাদের হত্যা করেছে কিসাসের জন্য তাদেরকে আমিরুল মোমেনিনের হাতে তুলে দিতে হবে। উত্তরে খারিজিগণ জানালো যে, তারা সকলেই একযোগে এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে এবং তারা মনে করে যে, আমিরুল মোমেনিনের পক্ষের সকল লোককে হত্যা করা জায়েজ। এতেও আমিরুল মোমেনিন। যুদ্ধের পদক্ষেপ না নিয়ে আবু আইউব আল-আনসারীকে শান্তির প্রস্তাব দিয়ে তাদের কাছে প্রেরণ করেছেন। আবু আইউব তাদের কাছাকাছি গিয়ে উচ্চঃস্বরে বললেন, “যে কেউ সেপক্ষ ত্যাগ করে এ পতাকা তলে আসবে এবং কুফা অথবা মাদায়েন যাবে তাকেই সাধারণ ক্ষমার অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং কোন কিছুই জিজ্ঞেস করা হবে না।” এতে ফরওয়া ইবেন নাওফাল আল-আশজাঈ বললো, “তবে কেন আর আমিরুল মোমেনিনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবো।” এ বলে সে তার পাঁচশত লোকসহ বেরিয়ে এলো। এরপর কয়েকটি দল বেরিয়ে এসেছে এবং তাদের কেউ কেউ আমিরুল মোমেনিনের দলে যোগ দিয়েছে। কিন্তু চার হাজার লোক (তাবারীর মতে দুই হাজার আট শত) বিদ্রোহী রয়ে গেল। এরা কোনমতেই বেরিয়ে আসতে রাজি হলো না। তারা প্ৰতিজ্ঞা করে বসলো, “হয় মারবো, না হয় মরবো।” আমিরুল মোমেনিন এসব বিদ্রোহীকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে বের করে আনার কথা চিন্তা করে নিজের সৈন্যদের প্রদমিত করে রাখলেন। কিন্তু খারিজিগণ ধনুকে শার যোজনা করে এবং বর্শা ও তরবারি উন্মুক্ত করে প্রস্তুত হয়ে রইলো। এ সংকট মুহুর্তেও আমিরুল মোমেনিন এ ভাষণে তাদেরকে সতর্ক করে দেন। কোন উপদেশ কার্যকর হয় নি; তারা আচমকা আমিরুল মোমেনিনের সৈন্যদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। তাদের আক্রমণ এত তীব্র ছিল যে, আমিরুল মোমেনিনের পদাতিক বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই ধকল সামলে তারা পাল্টা আক্রমণ করলে মাত্র নয় জন পলাতক ব্যতীত সকলেই নিহত হলো। এ যুদ্ধে আমিরুল মোমেনিনের আট জন সৈন্য শহিদ হয়েছে। ৩৮ হিজরি সনের ৯ সফর এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

সূত্র

2989 views

Related Questions