কোরআন ও হাদিসের ও আলোকে তারাবি নামাজ কয় রাকাত পরা উত্তম? আমাদের এখানে কেউ ৮ রাকাত কেউ ২০ রাকাত পরে।জাল হাদিস কি ভাবে বুঝব? এই সমস্থ বিষয় নিয়ে খোব বিপাকে পরে গেছি।কেউ জানলে প্লিজ জানাবেন।
3034 views

2 Answers

তারাবীহ নামাজ ২০ রাকআত।

যারা বলে ৮ রাকাআত তাদের বক্তব্য সঠিক নয় । মুলত ধর্মপ্রান সাধারন মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির লক্ষে আহলে হাদীস বা লামাজহাবী সম্প্রদায় ৮ রাকাআত তারাবীহ এই মতামতের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে ।¤ সংশয় নিরসনের জন্য ৮ রাকআত বা এসংক্রান্ত বুখারীও মুসলিম শরীফে বর্নিত হাদীস ও তার সঠিক মর্ম নিম্নে তুলে ধরা হল।¤প্রথম হাদীসঃ-আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি আম্মাজান আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন , রমজানে রাসুল (সাঃ) এর নামাজ কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বললেন , রাসুল (সাঃ) রমজানে ও অন্যান্য মাসে বিতির সহ এগার রাকআতের বশী পড়তেন না।(বুখরী শরীফ হাঃ নং ১১৪৭)¤দ্বিতীয় হাদীসঃ-ইয়াহইয়া ইবনে আবু সালামা (রঃ) বলেন আমি রাসুল (সঃ) এর রাত্রী কালীন নামাজ সম্পর্কে আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম । উত্তরে তিনি বললেন, রাসুল(সঃ) রাত্রে তের রাকআত নামাজ আদায় করতেন । প্রথমে আট রাকাত পড়তেন , এর পর বিতির পড়তেন, তার পর দুই রাকত নামাজ বসে আদায় করতেন ।( মুসলিম শরীফ- হাঃ নং ১৭২৪)এজাতীয় হাদীস দ্বারা লা মাজহাবী সম্প্রদায়- তারাবীহ ৮ রাকাত এর উপর দলীলপেশ করে থাকে।উপরোক্ত হাদীস সমূহের উত্তরঃ-¤প্রথম উত্তর: আয়েশা (রাঃ) থেকে উপরোক্ত হাদীস দুটি যেমনি ভাবে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে ঠিক তেমনি মুসলিম শরীফেই আয়েশা (রাঃ) থেকে দশ রাকাতের হাদীস ও বর্ণিত আছে। যেমন:হাদীসঃ-কাসেম ইবনে মুহাম্মদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন , আমি আয়েশা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি যে, রাসুল (সাঃ) রাত্রিতে দশ রাকাত নামাজ, এক রাকাত বিতির,ও ফজরের দুই রাকাত সুন্নত সহ মোট ১৩ রাকাত পড়তেন।( মুসলিম শরীফ- হাঃ নং ১৭২৭)এমন কি আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হদীস গুলোর প্রতি লক্ষ করলে বোঝা যায় রাসুল (সাঃ) রাত্রীকালীন নামাজ- কোন রাত্রীতে ১১ রাকাত ,কখনো১৩ রাকাত কখনো ৯ রাকাত, আবার কখনো ৭ রাকাত ও, আদায় করতেন । সুতরাং আয়েশা (রাঃ) এর হাদীস দ্বারা কোন সংখ্যা নির্দিষ্ট করা সম্পুর্ন অযৌক্তিক।¤দ্বিতীয় উত্তরঃ-প্রকৃত পক্ষে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীস গুলো তাহাজ্জুদ সম্পর্কিত , তারাবীহ সম্পর্কিত নয় । একারনেই হাদীস গ্রন্থাকারগনএজাতীয় হাদীসকে তাহাজ্জুদের অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন , তারাবীর অধ্যায়ে উল্লেখ করেননি।¤তৃতীয় উত্তরঃ-আহলে হাদীসগন তারাবী ৮ রাকাত হওয়ার স্বপক্ষে যে হাদীসগুলো পেশ করে থাকেন, সেঅনুযায়ী তারা নিজেরাই আমল করেন না। কেননা হাদীসে রমজান ও অন্যান্য মাসের কথাও উল্লেখ রয়েছে , অথচ তারা তাদের হাদীস অনুযায়ী অন্যান্য মাসে তারাবীহ পড়েনা।বিশ রাকাত তারাবীর দলীল সমুহ:১ নং হাদীসঃ-সায়ের ইবনে ইয়াজিদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন সাহাবা গন উমর (রাঃ) এর খেলাফত কালে রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়তেন ।(বাইহাকী শরীফ-খঃ ২/৪৯৬ হাঃ নং ৪৬১৭)২ নং হাদীসঃ-ইয়াজিদ ইবনে রুমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ- হযরত উমর (রাঃ) এর যুগে সাহাবারা বিতির সহ তেইশ রাকাত তারাবীহ পড়তেন । (মুয়াত্তা মালেক খঃ ১পৃঃ ১১৫)৩ নং হাদীসঃ-আতা ইবনে আবী রাবাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন আমি সাহাবাদেরকে বিতির সহ তেইশ রাকাত তারাবী পড়তে দেখেছি মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা – ৫/২২৪)(উল্লেখিত সবগুলো হাদীস সহীহ)এছাড়াও অসংখ্য হাদীস দ্বারা একথা সুস্পষ্ট রুপে প্রমানিত হয় যে, তারাবীহ নামাজ ২০ রাকাত যার উপর খোলাফয়ে রাশেদীন ,সমস্ত সাহাবা , তাবেই, তাবে তাবেই, সালফে সালেহীন গন, ঐক্যমতে আমল করেছেন। এবং চার মাজহাবের ইমাম গনও এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষন করেছেন ।সুতরাং যারা ৮ রাকাত তারাবীর কথা বলেন ,তারা মুলতসরলমনা মুসলমানদের অন্তরে বিভ্রান্তির বিষ ঢেলে ইসলামকে বিতর্কিত করতে চান।আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুক।

3034 views

তারাবী ২০ রাকাত। এটাই সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। চার মাযহাবের ইমামগণ এ বিষয়ে একমত। সাহাবা-যুগ থেকে আজ পর্যন্ত হারামাইন শরীফাইনে এভাবেই তারাবী পড়া হয়েছে। বিশ রাকাতের কম কখনো পড়া হয় নি। বর্তমানে যারা তারাবীর নামায আট রাকাত বলে দাবি করে তারা কিছু ‘মুনকার’ রেওয়ায়েত দ্বারা দলিল দিয়ে থাকে, কিংবা তাহাজ্জুদের হাদীসকে তারাবীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে থাকে।

‘২০ রাকাত তারাবীর কোনও দলিল নেই।’–উক্ত বক্তার এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে অজ্ঞতাপ্রসূত কিংবা উদ্দেশ্য-প্রণোদিত। কেননা তারাবী ২০ রাকাত–এমর্মে বহু দলিল রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এখানে আমরা সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে এমন কিছু দলিল উল্লেখ করছি–

১. ইমাম বুখারীসহ সিহাহ সিত্তার সকল গ্রন্থকারের উস্তাদের ২৬ খন্ডে রচিত কিতাব ‘মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ’( ২/১৬৪)-তে সহিহ সনদে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ﺃَﻥَّ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻛَﺎﻥَ ﻳُﺼَﻠِّﻲ ﻓِﻲ ﺭَﻣَﻀَﺎﻥَ ﻋِﺸْﺮِﻳﻦَ ﺭَﻛْﻌَﺔً ﻭَﺍﻟْﻮِﺗْﺮَ  রাসূল রমযান মাসে বিশ রাকাআত তারাবী ও বিতির আদায় করতেন।

হাদিসটি এই হাদিসগ্রন্থগুলোতেও বর্ণিত হয়েছে– সুনানুল কোবরা লিল-বায়হাকী: ২/৬৯৮, আল-মুনতাখিব: ৬৫৩, আল-মু’জামুল কাবীর: ১১/৩৯৩, আল-মু’জামুল আওসাত: ১/২৪৩।

২. ইয়াজিদ বিন রূমান বলেন, كان الناس يقومون في زمان عمر بن الخطاب في رمضان بثلاث وعشرين ركعة লোকেরা (সাহাবী ও তাবেয়িগণ) ওমর রাযি. এর শাসনামলে বিশ রাকাত তারাবী এবং তিন রাকাত বিতির রমযান মাসে আদায় করতো। (মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার, হাদীস নং-১৪৪৩, মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং-৩৮০, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-৪৩৯৪)

৩. সায়েব বিন ইয়াজিদ বলেন, كـانوا يقـومـون عهد عمر بن الخطاب رضى الله عنه فى شهر رمضان بعشرين ركعة وكانوا يقومون بالمأتين وكانو يتوكؤن على عصيتهم فى عهد عثمان من شدة القيام  ওমর রাযি. এর শাসনামলে লোকেরা (সাহাবী ও তাবেয়িগণ) বিশ রাকাত তারাবী পড়তেন। আর উসমান রাযি. এর শাসনামলে লম্বা কেরাতের কারণে লাঠির উপর ভর দিতেন। (বায়হাকী-৪/২৯৬)

৪. আবু আব্দুর রহমান সুলামী বলেন, عن على قال دعى القراء فى رمضان فامر منهم رجلا يصلى بالناس عشرين ركعة قالوكان على يوتر بهم আলী রাযি. রমযান মাসে কারীদের ডাকতেন। তারপর তাদের মাঝে একজনকে বিশ রাকাত তারাবী পড়াতে হুকুম দিতেন। আর বিতিরের জামাত আলী রাযি. নিজেই পড়াতেন। (বায়হাকী-৪/৪৯৬)

প্রশ্নকারী দীনি ভাই, লক্ষণীয় বিষয় হল, ওমর রাযি. উসমান রাযি. ও আলী রাযি. এর শাসনামলে যে বিশ রাকাত তারাবী হত; সেখানে মুসল্লি কারা ছিলেন? নিশ্চয় মুহাজির, আনসার ও বদরী সাহাবাসহ বিপুল সংখ্যক সাহাবী এবং তাবিঈ তখন মুসল্লী ছিলেন। কেননা, দারুল খিলাফায় মসজিদে নববীতে বিপুল সংখ্যক সাহাবীর উপস্থিতিতে এটি হয়েছে। তখন কেউ কোনো দিন আপত্তি করেছেন বলে একটা দুর্বল বর্ণনাও কেউ দেখাতে পারবে না! উপরন্তু রাসুলুল্লাহ বলেছেন, عليكم بسنتى وسنة الخلفـاءالمهـدين الراشـديـن عضوا عليها بالنواجذ ‘তোমরা আমার সুন্নতকে এবং সৎপথ প্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতকে মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধর। তার উপর তোমরা অটুট থাক। (সুনানে আবু দাউদ ৪৬০৭, সুনানে তিরমিযি ২৬৭৬)

অতএব প্রশ্নকারী ভাই, আপনি তারাবীর নামাজ ২০ রাকাত হওয়ার ব্যাপারে বিভ্রান্ত হবেন না। কারণ মুসলিম উম্মাহ প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারাবীর নামাজ ২০ রাকাত পালন করেছেন। ১২৮৪ হিজরীর ইংরেজ আমলের আগে পৃথিবীর কোন মসজিদে রমযানের পুরো মাস মসজিদে আট রাকাত তারাবী জামাতের সাথে পড়ার কোন নজীর নেই। একটি মসজিদের নাম এজাতীয় বক্তারা বা কোন কথিত আহলে হাদীস দেখাতে পারবে না। না মসজিদে নববীতে কোনদিন আট রাকাত তারাবী পড়া হয়েছে। না বাইতুল্লায়। না পৃথিবীর কোন মুসলিম পল্লিতে। মূলতঃ রানী ভিক্টোরিয়ার আমলে সর্বপ্রথম এ বিদআতের সূচনা হয়।

দুই. তারাবী সুন্নতে মুআক্কাদা। কেননা, রাসূলে করীম তারাবী সম্পর্কে বলেছেন, كتب الله عليكم صيامه وسننت لكم فيه قيامه আল্লাহ তাআলা এই মাসের রোযা তোমাদের উপর ফরয করেছেন এবং এই মাসে রাত জেগে নামায পড়াকে সুন্নত করেছি। (নাসাঈ ২২১০)

এজন্য ইমাম নববী বলেন, صلاة التراويح سنة بإجماع العلماء আলেমগণের ইজমা অনুযায়ী তারাবীর সালাত পড়া সুন্নত। (আলমাজমূ ৪/৩১)

মনে রাখবেন, সুন্নতে মুআক্কাদা ওয়াজিবের মতই। অর্থাৎ ওয়াজিবের ব্যাপারে যেমন জবাবদিহী করতে হবে, তেমনি সুন্নতে মুআক্কাদার ক্ষেত্রে জবাবদিহী করতে হবে। তবে ওয়াজিব তরককারীর জন্য সুনিশ্চিত শাস্তি পেতে হবে, আর সুন্নতে মুআক্কাদা ছেড়ে দিলে কখনো মাফ পেয়েও যেতে পারে। তবে শাস্তিও পেতে পারে।

সুতরাং প্রশ্নকারী ভাই, উক্ত বক্তার কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে বরং সহিহ হাদিস এবং উলামায়ে সালাফের তরিকা মতে রমযানে তারাবীর প্রতি গুরুত্ব দিন এবং পূর্ণ বিশ রাকাআত পড়ুন।

والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী নকশবন্দী

সূত্রঃ http://quranerjyoti.com

3034 views

Related Questions