নহে আশরাফ, যার আছে শুধু, বংশ পরিচয়, সেই আশরাফ, জীবন যাহার পুণ্য কর্মময় : ভাবসম্প্রসারণ?
“নহে আশরাফ, যার আছে শুধু, বংশ পরিচয়,
সেই আশরাফ, জীবন যাহার পুণ্য কর্মময়,” : ভাবসম্প্রসারণ
অথবা, কর্মে যাদের নাহি কলঙ্ক, জন্ম যেমন হোকপুণ্য তাদের চরণ পরশে ধন্য এ নরলোক। : ভাবসম্প্রসারণ
3 Answers
নহে আশরাফ আছে যার শুধু বংশ পরিচয় সেই আশরাফ জীবন যাহার পূণ্য কর্মময়।
 ,
মানুষের যশ, গৌরব, সম্মান, প্রতিপত্তি সবই নির্ভর করে কর্মের ওপর, জন্মের ওপর নয়। সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থায় আশরাফ ও আতরাফ-এ দুই শ্রেণির মধ্যে সামাজিক বৈষম্য থাকলেও আধুনিক সভ্যতায় তা একেবারে অর্থঃ হীন। বর্তমান সমাজব্যাবস্থায় বংশ পরিচয়ের ভূমিকা গৌণ। এখানে কর্মময় জীবনের অবদানই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। পদ্মফুলের সৌন্দর্যই বড়। পঙ্কে জন্মেছে বলে তাকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। মানুষের জন্মের ব্যাপারে নিজের কোনো হাত থাকে না। নিচু কুলে জন্মগ্রহণ করে জগতে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা নিজ মহৎ কর্মের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে চির স্মরণীয় হয়ে আছেন। আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিংকন, ফ্রান্সের নেপোলিয়ান বোনাপার্ট, ভারতের এ. পি. জে আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও নিজ কৃতকর্মের দ্বারা বিশ্বে আজও চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। অর্থঃ াৎ পৃথিবীতে কর্মের মাধ্যমেই মানুষের প্রকৃত বিচার হয়। নিচুকুলে জন্মগ্রহণ করে যে নিচু হতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। তার কৃতকর্মই তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় বিশ্বের দরবারে। মহৎ কার্যাবলির মাধ্যমে সে সবার কাছে প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়। তার মহৎ গুণাবলীর জন্যই সে প্রশংসিত হয় যুগ যুগ ধরে। তখন তার জন্ম কোথায় হলো দেখা হয় না, তার কর্মই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, বংশ গৌরব বা ধর্ম মানুষকে যথার্থ পরিচয় দিতে পারে না। তার কৃতকর্ম ভালো না হলে সকলেই তাকে ঘৃণার চোখে দেখে। পৃথিবীতে এমন অনেক উদাহরণ মেলে যারা উঁচু বংশে জন্মগ্রহণ করেও বিভিন্ন পাপকর্মের কারণে সমাজে বারবার ধিকৃত হয়েছেন। সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাই মানুষের উচিত বংশ গৌরবের বড়াই না করে আপন কর্মের মাধ্যমে নিজেকে সাফল্যের সর্বোচ্চ চূড়ায় প্রতিষ্ঠিত করা। এতেই জীবনের সার্থকতা নিহিত।
শিক্ষা: জগতে সাধু ও মহৎ ব্যক্তিবর্গ স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছে বংশ পরিচয়ের মধ্য দিয়ে নয় বরং পূণ্য-কর্ম সম্পাদনের মধ্য দিয়ে। মানুষের প্রকৃত মূল্য তার বংশ পরিচয়ের মধ্য দিয়ে নয়, মহৎ কর্মই তার একমাত্র আসল পরিচয়।
“নহে আশরাফ, যার আছে শুধু, বংশ পরিচয়, সেই আশরাফ, জীবন যাহার পুণ্য কর্মময়,”
অথবা,
কর্মে যাদের নাহি কলঙ্ক, জন্ম যেমন হোক পুণ্য তাদের চরণ পরশে ধন্য এ নরলোক।
মূলভাব : বংশে নয় কর্মেই মানুষের বড় পরিচয়।
সম্প্রসারিত-ভাব : অতীত গৌরব, বংশ মর্যাদা আর আভিজ্যাত্যের অহংকার মানুষকে বড় করে না। মানুষ তার নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। অতীতকে নিয়ে গৌরব করার প্রবণতা মানুষকে স্বাপ্নিক করে। বাস্তবকে অস্বীকার করে কল্পচারী হয় মানুষ। বংশ মর্যাদা আর আভিজাত্য মানুষের ভিতরকার মানবিক গুণাবলিকে হ্রাস করে। মনের মধ্যে উঁচু নিচু ভেদাভেদ ও শ্রেণী বৈষ্যম্য সৃষ্টি করে এবং মানুষকে মানুষ হিসাবে সম্মানিত না বা স্বীকৃতি দেয়, দরিদ্রকে ঘৃণা, নীচুকে অবহেলা করার প্রবণতা সৃষ্টি করে। কিন্তু সব মানুষই এক সৃষ্টিকর্তার হাতে গড়া। জীবনের চাহিদা, অধিকার সকলের সমান। সমাজে সাধারণ বলে, অর্থহীন বলে যে অপাংক্তেয় হয়ে রইবে -এ বিশ্বাস যার মধ্যে আছে তিনি সত্যিকার মানুষ নন। মানুষের সত্যিকার প্রতিষ্ঠা তার কর্মে। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে যারা পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলেছেন, মানব কল্যাণে যারা জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই বংশ মর্যাদায় ছোট হতে পারে কিন্তু স্বীয় কর্মই তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি মানব পূজারী, তিনি কীর্তিমান। কীর্তিমানের মৃত্যু নেই।
বংশ থেকে কর্ম বড়। কর্মে যে বড় তার বংশও তখন মানুষের নিকট বড় মনে হয়। কর্মে ছোট হলে, বড় বংশীও বড় হয় না।
“নহে আশরাফ, যার আছে শুধু, বংশ পরিচয়, সেই আশরাফ, জীবন যাহার পুণ্য কর্মময়,”
অথবা,
কর্মে যাদের নাহি কলঙ্ক, জন্ম যেমন হোক পুণ্য তাদের চরণ পরশে ধন্য এ নরলোক।
ভাব-সম্প্রসারণ : উচ্চবংশ-পরিচয়ে মানুষ কখনো মর্যাদাবান হয় না, বরং কর্মময়-জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্যে মানুষ গৌরবান্বিত হয়। কাজের মাধ্যমে মানুষ নিজের জীবনকে সফল করে তোলে, আবার কর্মের অবদানে দেশ ও জাতির উন্নতি বিধান করে চলে। আর সেই ফলপ্রসূ কর্মের জন্যেই মানুষ মানুষের স্মৃতিতে অমর হয়ে থাকে।
চলমান সমাজব্যবস্থায় ‘বংশপরিচয়’ প্রায় অচল; বর্তমান সমাজব্যবস্থায় বংশমর্যাদা মানুষকে প্রকৃত মর্যাদাবান করে গড়ে তুলতে সক্ষম নয়। কর্মময় জীবনের কাছে বংশমর্যাদার কোনো মূল্য নেই। আপন জন্মের ব্যাপারে মানুষের নিজের কোন ভূমিকা থাকে না। কিন্তু কর্মজীবনে সে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে বলে এই পৃথিবীতে কর্মের মাধ্যমেই মানুষের প্রকৃত বিচার হয়, যেখানে বংশপরিচয় একেবারেই মূল্যহীন। তাই বলা হয়, ‘কর্মই জীবন’। গোড়া সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থায় ‘আশরাফ’ ও ‘আতরাফ’-এ দু’শ্রেণির পরিচয় পাওয়া যেত এবং তাদের মধ্যে সামাজিক বৈষম্য প্রকট ছিল। কিন্তু আজকের সভ্যতায় সামাজিক সেই বিশ্বাস আর বৈষম্য মুখ থুবড়ে পড়েছে। মানুষ এখন স্বীয় মহৎকর্ম-বলে বংশগত গ্লানি দূর করতে সক্ষম। সমাজের নিচু তলায় জন্ম নিয়েও মানুষ কর্ম ও অবদানে বড় হতে পারে। মানবসমাজের ইতিহাসে এরকম সহস্র উদাহরণ মেলে। উচ্চবংশে জন্মগ্রহণকারী কোনো ব্যক্তি যদি পাপাচারে লিপ্ত হয়, অপকর্মের দোষে দুষ্ট হয়, তবে সে নিশ্চিতভাবে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হবে। মানুষ তাকে সমাজের উচ্চাসন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে নোংরা আবর্জনায়। এ ক্ষেত্রে বংশগৌরবের পরিচয় তার সম্মানকে রক্ষা করতে পারবে না। পক্ষান্তরে, কেউ যদি নিচু বংশে জন্মগ্রহণ করেও চারিত্রিক আদর্শের হিরন্ময় দীপ্তিতে হয়ে ওঠেন অনন্য, উজ্জ্বল; তবে নিঃসন্দেহে তিনি অর্জন করবেন সমাজের সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা। নীচু বংশে জন্মগ্রহণ করেও অনেক মহাপুরুষ জগতকে ধন্য করেছেন। সম্রাট নাসিরুদ্দিন প্রথম-জীবনে একজন ক্রীতদাস ছিলেন। জর্জ ওয়াশিংটন একজন সামান্য কৃষকের ঘরে জন্মগ্রহণ করে স্বীয় কর্মবলে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। নেপোলিয়ান বোনাপার্ট, শেরশাহ নিতান্তই সাধারণ ঘরের সন্তান ছিলেন। তথাপি নিজ ক্ষমতাবলে নেপোলিয়ান ফ্রান্সের অধিকর্তা হয়েছিলেন। আর শেরশাহের কথা বলাই বহুল্য। ইতিহাসের পাতায় এরূপ শতসহস্র মহাপুরুষের উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে। সুতরাং মানুষের উচিত জন্মের জন্যে যে গ্লানি, তা পরিহার করে স্বীয় কর্মবলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। মানুষের যশ, গৌরব, সম্মান, প্রতিপত্তি সবিই নির্ভর করে তার কর্মের ওপরে, জন্মের ওপরে নয়।
মানুষের প্রকৃত কৌলিন্য তার বংশমর্যাদার ওপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে তার সৎকর্মের ওপর। সাধু ও মহৎ ব্যক্তিগণ পৃথিবীতে স্মরণীয়-বরণীয় হয়েছেন বংশ-পরিচয়ে নয়, বরং পুণ্যকর্ম সম্পাদনের মধ্য দিয়ে। তাই জন্ম-পরিচয়ের ঊর্ধ্বে আপন কর্ম-পরিচয় তুলে ধরাই মানবজীবনের ব্রত হওয়া উচিত। বস্তুত প্রকৃতির রাজ্যে মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই, এখানে সবাই সমান।