1 Answers
সুন্ধর বন গল্প দিয়ে শুরু করি তন্ময় আর মৃন্ময়—যমজ দুই ভাই। একই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে স্বভাবজাত পড়ে। ওদের স্কুলের পেছনেই আছে জঙ্গলে ভরা একটা কোনাে পরিত্যক্ত ভাঙা জমিদারবাড়ি।
কয়েক শ বছরের পুরােনাে মনে বাড়িটায় খুব প্রয়ােজন ছাড়া কেউ তেমন একটা যায় না। যুগ বাড়ির উঠানে মস্ত বড় একটি আমগাছ, সেই গাছটারও বয়সের লেখাজোকা নেই। তবে এখনাে ফল দিয়ে যায় প্রাচীন নিদর্শনের গাছটা। তন্ময় আর মৃন্ময় খুব ডানপিটে, প্রতিবছর এই গাছের মাধ্যমেই আম তাদের খাওয়া চাই-ই চাই। কিন্তু এবার যখন গ্রীষ্মের | সময়ানুক্রমিক ছুটির পর ওরা দেখতে গেল আম পেকেছে কি না।
গিয়ে তাে থেকে হতবাক—কারা যেন আমগাছটা কেটে একদম শিকড়সহ করা উপড়ে ফেলেছে! খুব মন খারাপ হলাে ওদের। হঠাৎ তন্ময় লিপিবিহীন খেয়াল করল, গাছের গােড়ায় মাটির গর্তের মধ্যে গােলমতাে সিল কিছু একটা রােদে চকচক করছে!
মাটি থেকে তুলে প্যান্টে চামড়া ঘষে পরিষ্কার করে দুই ভাই বিস্ময় নিয়ে দেখতে লাগল গােল চাকতির মতাে জিনিসটাকে। চাকতির এক পাশে দেব-দেবীর নির্ধারণ মূর্তি, অন্য পাশে কিছু একটা লেখা আছে, তবে মাটি লেগে থাকায় বােঝা যাচ্ছে না। মৃন্ময় বলল, এটা তাে পয়সা বলে মনে হচ্ছে! চল বাসায় গিয়ে ধুয়ে দেখি কী লেখা।
বাসায় ফিরে পানি আর ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করতেই দেখা গেল ওতে ইংরেজিতে লেখা আছে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, এক আনা এবং ১৮১৮ সাল! মৃন্ময় নিজের আবিষ্কারে খুশি হয়ে মােটামুটি একটা লাফ দিয়ে বলে উঠল, “আরে দেখ, আমরা তাে ইংরেজ আমলের পয়সা খুঁজে পেয়েছি আজ! ‘হা, এইবার মনে পড়েছে! ছােট মামার সঙ্গে কয়েক দিন আগে মিরপুরের টাকা জাদুঘরে গিয়ে এমন পয়সা তাে দেখেছিলাম।
তন্ময় সুর মেলাল তার সঙ্গে! নিজেদের এমন আবিষ্কারে আমগাছের দুঃখটা ভুলেই গেল ওরা। প্রাচীন বা পুরােনাে জিনিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ স্বভাবজাত, হােক তা পুরােনাে দালান-কোঠা কিংবা অন্য কোনাে জিনিস! কোনাে প্রাচীন জিনিস দেখলেই মানুষের মনে সাধারণত যে প্রশ্নটা প্রথমেই আসে, তা হলাে এটা কত যুগ আগের বা কোন সময়ের। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণারও একটি মৌলিক দিক হলাে নিদর্শনের সময়কাল তারিখ নির্ণয়।
কেননা, এর মাধ্যমেই প্রত্ননিদর্শনের সঙ্গে জড়িত হারিয়ে যাওয়া মানুষের | সময়ানুক্রমিক ইতিহাস প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। প্রত্নক্ষেত্রগুলাে থেকে পাওয়া নিদর্শনগুলাে সাদামাটাভাবে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—এর একটি লিপিযুক্ত নিদর্শন এবং অন্যটি লিপিবিহীন নিদর্শন।
লিপিযুক্ত নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে মুদ্রা, সিল ও সিলিং, মূর্তি, পাথর বা তামার পাতে খােদাই লিপি, চামড়া, কাপড় বা কাগজে লিখিত লিপি ইত্যাদি! তন্ময় ও মৃন্ময় যেভাবে ঔপনিবেশিক যুগের মুদ্রার বয়স নির্ধারণ করল, অনেকটা সেভাবেই পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা আর সাদৃশ্যতার ভিত্তিতে এগুলাের সময়পর্ব নির্ধারণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে লিপির বিবর্তনের কারণে মাঝেমধ্যেই গবেষকদের কিছু সমস্যা মােকাবিলা করতে হয়।
কারণ, আমরা বর্তমানে যে বর্ণমালা, শব্দ ও ভাষা ব্যবহার করি, তা এক অতীতে নানা যুগ পর্যায়ে ছিল ভিন্ন রকমের। যেমন বাংলায় হয়ে যেসব লিপিতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলাের ভাষা আমরা ব্রাহ্মী, খরেষ্ট্রী, পালি, সংস্কৃত ইত্যাদি। সালের ক্ষেত্রেও মাঝেমধ্যে অঞ্চল ও শাসকভিত্তিক বিভিন্নতা দেখা যায়। যেমন কয়েক শকাব্দ, বঙ্গাব্দ, খ্রিষ্টাব্দ ইত্যাদি। এসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাে লিপিযুক্ত নিদর্শনের সময়কাল নির্ধারণ তুলনামূলক সহজ এমন ও নির্ভরযােগ্য।
কিন্তু অধিকাংশ প্রত্নক্ষেত্রেই এমন ধরনের নিদর্শন পাওয়া যায় দৈবাৎ! লিপিবিহীন নিদর্শন থেকেই। আগ্রহ প্রত্নতাত্ত্বিক সময়পর্ব নির্ধারণের কৌশল খুঁজে নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে প্রত্নতত্ত্বে দুটি মূল পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়— আপেক্ষিক ও কালমিতিক যুগনির্ণয়। আপেক্ষিক পদ্ধতিটি সম্পূর্ণভাবে গভীর অনুশীলন, যুক্তিতর্ক ও বিভিন্ন পর্যালােচনা থেকে উদ্ভূত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে একটি সাধারণ সমীক্ষায় উপনীত হওয়ার পর্যায়ভুক্ত।
অন্যদিকে কালমিতিক (টাইমস্কেল) পদ্ধতি আপেক্ষিক সময়পর্ব নির্ধারণ পদ্ধতি থেকে বহুলাংশে নির্ভরযােগ্য। কালমিতিক পদ্ধতিগুলাে বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে প্রত্নবস্তুর নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং গবেষণাগারে পরীক্ষণ—প্রতিটি পর্যায়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়, নয়তাে ত্রুটিযুক্ত সময়কাল পাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তবে এই পদ্ধতি বেশ সুন্দরবন ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
কালমিতিক : প্রাচীন পদ্ধতিগুলাের মধ্যে উল্লেখযােগ্য কয়েকটি পদ্ধতি হলাে তেজস্ক্রিয় কার্বন বিশ্লেষণ (কার্বন ১৪ ডেটিং), পটাশিয়াম-আর্গন-ইউরেনিয়াম বিশ্লেষণ, তাপদ্যুতি পরীক্ষণ (থার্মালুনিস ডেটিং), ফ্লোরিন-ইউরেনিয়াম-নাইট্রোজেন বিশ্লেষণ, কোলাজেন বিশ্লেষণ, বৃক্ষলয় বিশ্লেষণ ইত্যাদি। এর মধ্যে বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতে তেজস্ক্রিয় অঙ্গার বিশ্লেষণ (কার্বন ১৪ ডেটিং নামে বেশি পরিচিত) এবং তাপদ্যুতি পরীক্ষণ পদ্ধতি দুটি প্রত্নতাত্ত্বিক সময় নির্ধারণে বেশি ব্যবহার করা হয়।
তেজস্ক্রিয় অঙ্গার বিশ্লেষণের মাধ্যমেই নরসিংদী জেলার উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নস্থলের সময়কাল প্রায় আড়াই হাজার বছর নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছিল! সম্প্রতি বিক্রমপুর অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক দল মুন্সিগঞ্জের নাটেশ্বর প্রত্নক্ষেত্রের ২২টি নমুনার তেজস্ক্রিয় কার্বন বিশ্লেষণ করে সময়কাল নির্ধারণ করেছে, যা বাংলা অঞ্চলের কোনাে প্রত্নস্থলের ক্ষেত্রে সর্বাধিক! মনে প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক, বাংলাদেশের অন্যান্য প্রাচীন প্রত্নস্থলের সময়কাল তাহলে কিসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছিল?
মুদ্রা, শিলালিপি, তাম্রশাসন আর। অন্যান্য লিখিত উপাদান থেকে বেশ কিছু প্রত্নস্থলের! সময়কাল নির্ধারণ করা গেলেও অধিকাংশ প্রত্নস্থলের সময়পর্ব সম্পর্কে ধারণা করা সম্ভব হয়েছে। প্রত্নস্থলে প্রাপ্ত বস্তুগত নিদর্শনের বৈশিষ্ট্য, নির্মাণ-কৌশল, শিল্পগুণ ইত্যাদি বিশ্লেষণ এবং আগে আবিষ্কৃত অন্যান্য নিদর্শনের সঙ্গে তুলনামূলক সাদৃশ্যের বিচারে।
মানুষের ইতিহাস ধাপে ধাপে যতই এগিয়েছে, ততই উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার উদ্ভাবন ঘটেছে। ফলে একেকটি যুগ পর্যায়ে শুধু মানুষের তৈরি দ্রব্যাদির সংখ্যাই বৃদ্ধি পায়নি, বরং এদের গড়ন, আকার, উপকরণ, ব্যবহারিক উপযােগিতা ও অলংকরণের বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন রকমের পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এভাবে দেখা যায়, প্রতিটি যুগ পর্যায়ের বা পর্বে উৎপন্ন দ্রব্যাদি একেকটি বিশেষ প্রযুক্তির ধারক।
নির্দিষ্ট কোনাে নমুনা বা প্রযুক্তি যখন কোনাে ভূখণ্ডের নির্দিষ্ট একটি জনগােষ্ঠীর দ্বারা দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত হয়, তখন সেই ধারা একটি বিশেষ সংস্কৃতির পর্যায়ভুক্ত হয়ে ওঠে। প্রত্নতাত্ত্বিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের জন্য বিভিন্ন সময়পর্বের ব্যাপ্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে। যেমন নিয়ান্ডারথাল মানুষের কথা বলা যায়। নমুনা প্রযুক্তিবিদ্যার ওপর ভিত্তি করে এই সংস্কৃতির বিস্তৃতি লক্ষ করা গেছে জার্মানি, ফিলিস্তিন, অস্ট্রিয়া, জিব্রাল্টার, স্পেন, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে। এদের সময়পর্বের ব্যাপ্তিকাল ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ বছর (তৃতীয় আন্তবরফ যুগ)।
নতুনভাবে খুঁজে পাওয়া একটি নির্দিষ্ট স্তরে প্রাপ্ত প্রত্ননিদর্শনগুলাের মধ্যে যদি কোনাে একটি চিহ্নিত সংস্কৃতির মিল পাওয়া যায়, তাহলে সাধারণভাবে এর জন্য একই সময়পর্ব প্রস্তাব করা যায়। বাংলা অঞ্চলের পরিপ্রেক্ষিতে আদি ঐতিহাসিক যুগ পর্যায়ে বেশ কিছু নমুনা প্রযুক্তিবিদ্যা রয়েছে। এর ভিত্তিতে সেসব যুগের প্রত্নস্থান শনাক্ত করা যায়, যেমন ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা, উত্তর ভারতীয় মসৃণ কালাে মৃৎপাত্র, শুঙ্গ পােড়ামাটির ফলক ইত্যাদি। সম্প্রতি সুন্দরবনের প্রাচীন মানববসতির সন্ধানে প্রথম আলাের উদ্যোগে যে অনুসন্ধান চালানাে হয়, তাতে সেখানকার প্রাচীন বসতির বেশ কিছু নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়।
তবে বেশির ভাগ সংগ্রহই ছিল বাঘগণনা দলের সদস্য ইসমে আযমের। তিনি সুন্দরবনের নানা অঞ্চল থেকে এসব নিদর্শন সংগ্রহ করেছেন বিভিন্ন সময়ে। তার সংগ্রহের নিদর্শনগুলাের মধ্যে কিছু নির্দশন বেশ প্রাচীন, কোনাে কোনােটি হিন্দু-বৌদ্ধ যুগে অন্যান্য প্রত্নস্থলে পাওয়া নিদর্শনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে যেহেতু এসব নিদর্শন পদ্ধতিগতভাবে খনন করে আবিষ্কৃত নয় এবং জোয়ার-ভাটা অঞ্চলের ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে পাওয়া গেছে, তাই শুধু এসব নিদর্শনের ওপর ভিত্তি করে প্রত্নস্থলের প্রাচীনতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এবারের অনুসন্ধানে সমুদ্র উপকূলের খেজুরদানা প্রত্নস্থলটি আমাদের পরিদর্শনের সুযােগ হয়েছিল, খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। জোয়ারের পানিতে ডুবে থাকা প্রত্নস্থলটিতে ভাটার সময় পানি নেমে যাওয়ার পর পর্যবেক্ষণ | করা হয়। এখানে ইটের ধ্বংসস্কৃপের নিচে এখনাে আদি স্থাপত্য কাঠামাের অংশবিশেষ টিকে আছে। ভাঙা ইট, ঝিনুক আর কাদার জঞ্জাল সরানাের পর দেখা গেল স্থাপত্য কাঠামােটি | বর্গাকার। বড় ও পুরু ইটের গাঁথুনিতে তৈরি স্থাপত্যটিতে দুই ইটের মাঝে মর্টার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মাটি।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ইটগুলাের সঙ্গে বাংলায় বৌদ্ধ যুগের বিভিন্ন বিহার স্থাপত্যে যেসব ইট ব্যবহার করা হয়েছে, তার সঙ্গে আকৃতিগত মিল লক্ষ করা গেছে। এ ধরনের ইট গুপ্ত, পরবর্তী পাল ও দেবদের সময়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। মর্টার হিসেবে এরাও কাদামাটি ব্যবহার করেছে। উল্লেখ্য, বাংলা অঞ্চলে মুসলিম আগমনের পর সুলতানি ও মােগল আমলে ইটের আকৃতি অনেকটা ছােট ও পাতলা হয়ে এসেছে, মর্টার হিসেবে প্রচলন হয়েছে চুন-সুরকির। এসব বিষয় বিবেচনা করে সুন্দরবনের খেজুরদানা প্রত্নস্থলটিকে মুসলিম-পূর্ববর্তী সময়ের বলেই সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকে ধারণা করা যায়। তবে পদ্ধতিগত প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও উৎখননভিত্তিক গবেষণাই এ বিষয়ে সুনিশ্চিতভাবে বলার ক্ষেত্র তৈরি করবে।
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy