1 Answers
তথ্য-প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমরা বিশ্বকে হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছি। আমরা অনেকেই বিশ্বগ্রাম কথাটির সঙ্গে পরিচিত। একটি গ্রামে যেমন সবাই একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, তেমনি তথ্য-প্রযুক্তি বিশ্বের সব মানুষকে সংযুক্ত করে রেখেছে। তারা প্রতিনিয়ত একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আমাদের সার্বিক জীবনব্যবস্থায় নানামুখী প্রভাব ফেলছে। এর ইতিচাক ও নেতিবাচক দুই ধরনের প্রভাবই রয়েছে। আমরা মূলত সেই বিষয়গুলোই তুলে ধরেছি-
স্যাটেলাইট টেলিভিশন
আমাদের দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিপ্লব শুরু হয়েছে মূলত স্যাটেলাইট টেলিভিশনকে কেন্দ্র করে। স্যাটেলাইট টেলিভিশনের বদৌলতে আমরা গ্রামের মাঝেও শহুরে জীবনের ছোঁয়া পেয়েছি। গ্রামের মানুষ তাদের অশিক্ষা, কুসস্কার, ধর্মান্ধতা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে অনেকখানিই। আর সেখানে ক্রমশ স্থান করে নিচ্ছে পরিশীলিত জীবনবোধ, উন্নত চিন্তা-চেতনা, রুচিবোধ প্রভৃতি। গ্রামের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিরও অনেক বিস্তৃতি ঘটেছে। মানুষের মাঝে সাংস্কৃতিক সাম্য (যেমন- পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন, ঈদ, পূজা) গড়ে উঠেছে। বিশ্বভ্রাতৃত্ব সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে এই স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো। স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত নাটক, সিনেমা দেখে আমরা গতিশীল জীবনযাত্রার চর্চায় অভ্যস্ত হচ্ছি। ফলে মানুষ উৎপাদনমুখী হয়ে উঠছে। এটি আমাদের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এনেছে। আগে আমরা যেমন মাছে-ভাতে বাঙালি এই চর্চার মাঝে অনেকখানি সীমাবদ্ধ ছিলাম এখন সেখানে চা, নাস্তাসহ অন্যান্য বিষয়ও খাদ্য তালিকায় যুক্ত হয়েছে। চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত নাটক, সিনেমা, সিরিয়ালে দেখা জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস আমাদের সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছে। ফলে সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছে। ফলে সাংস্কৃতিক বিনিময় আগের চেয়ে আরও উন্নত হয়েছে। এছাড়া চ্যানেলগুলোতে নানা সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন/শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান যেমন- মিনা কার্টুন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, ধূমপান বর্জন এগুলোও আমাদের জীবনবোধকে উন্নত করেছে।
স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো যে শুধু ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে তা নয়; এর অনেক নেতিবাচক দিক ও রয়েছে। স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর প্রভাবে আমরা আমাদের মূল্যবোধকে অনেকখানি হারিয়ে ফেলেছি। আমরা অধিক মাত্রায় ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী হয়ে পড়ছি। ফলে সামাজিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া এর কিছু স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও রয়েছে। অধিক সময় টিভি দেখা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে ঝুঁকির মাঝে ফেলে দেয়।
মোবাইল ফোন
বর্তমানে আমাদের সার্বিক জীবনযাত্রা মোবাইলকেন্দ্রিক আবর্তিত হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে মোবাইল ফোন। মোবাইল এখন আমাদের মানসিক প্রশান্তির অপর এক নাম। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব সেবাই মোবাইলকে ঘিরে গড়ে উঠছে। সরকার, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় তাদের সব নাগরিকসেবার তথ্য এখন মোবাইলে দিচ্ছে। এছাড়া বিকাশ, মোবিক্যাশ, মানিট্রান্সফার, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফি জমা, পরীক্ষার ফলাফল আমরা মোবাইলের মাধ্যমেই করছি।
তবে মোবাইল যোগাযোগ যে শুধু ইতিবাচক হিসেবে কাজ করছে তা নয়; এর অনেক নেতিবাচক দিকও রয়েছে। মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ব্যক্তি প্রতারণা, অসামাজিক কাজ, সন্ত্রাসীমূলক কাজ এগুলো আজকাল মোবাইল ব্যবহার করে করা হচ্ছে। এছাড়া তরুণ প্রজন্ম অনেকসময় মোবাইলকে অপ্রয়োজনীয় ও দীর্ঘ আলাপচারিতায় ব্যবহার করে। ফলে তা তাদের জ্ঞান অর্জন ও সুস্থ মানসিকতার চর্চায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এছাড়া শিশুরাও আজকাল অধিকমাত্রায় মোবাইলে ঝুঁকে পড়ছে। এখন যেন মোবাইল ফোনই শিশুদের খেলনার স্থান দখল করে ফেলেছে। শিশুদের সামাজিকীকরণে এটি একটি বড় সমস্যা হয়ে দঁাঁড়াছে।
ইন্টারনেট : বিশ্ব তথ্য ভাণ্ডার
বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট পথনির্দেশকের ভূমিকা পালন করছে। কী নেই এখানে! শিক্ষা, বিনোদন, খেলাধুলাসহ এটি সব বিষয়ের এক বিরাট তথ্য ভাণ্ডার। আমাদের এখন কোনো তথ্যর জন্য আর ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে হয় না, ইন্টারনেটে সার্চ দিলেই সব পাওয়া যায়। এমনকি ইন্টারনেট আমাদের পথ চিনে সঠিক স্থানেও পৌঁছে দিচ্ছে। গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (চেঝ) ব্যবহার করে আমরা পথ চিনে যে কোনো স্থানে পৌঁছে যেতে পারি। কিন্তু ইন্টারনেট শুধু ইতিবাচক নয়, নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে আমাদের জীবনে। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, আমরা বাস্তব জগতের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় দিচ্ছি। ভার্চুয়াল জগৎ তো আসলে একটা বায়বীয় জগতের মতোই। এটি আমরা এখন বেশিরভাগ সময়েই বুঝতে চাই না। ইন্টারনেটের পর্নোসাইট ব্যবহার করে মানুষকে বিশেষ করে মেয়েদের হয়রানি করা হয় অনেক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েরা না বুঝে এসব হয়রানির শিকার হয়। এছাড়া আমরা অনেককেই ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ে অপ্রয়োজনে অনেক বেশি সময় দেই; যা আমাদের শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি বাড়ায়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির এ দ্বিমুখী প্রভাব সম্পর্কে আমরা কথা বলেছি তথ্য ও প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে। তার মতে- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অবশ্যই আমাদের জীবনে রূপান্তর ঘটিয়েছে। আর সব প্রযুক্তির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিকই রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সতর্কতা ও নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার পদক্ষেপ হিসেবে তিনি বলেন, এরই মধ্যে সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের খসড়া তৈরি করেছে। আশা করছি এটি আমাদের প্রযুক্তি ব্যবহারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির এ প্রভাব আমাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে কী প্রভাব ফেলছে সে বিষয়ে আমরা কথা বলেছি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক মনোকিচিৎসক ডা. তাজুল ইসলামে সঙ্গে। তার মতে- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই ইতিবাচক তবে এটি আমরা অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক হিসেবে ব্যবহার করে থাকি। যা আমাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা দেয়। আর আমরা এটাও জানি যে, অসুস্থতা দ্রুত সংক্রমিত হয়। তেমনি প্রযুক্তি ব্যবহারের নেতিবাচক দিকগুলোও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যৌনতা, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, ধর্মীয় উগ্রতা এসব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে। তিনি আরও বলেন, যে কোনো সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে বাস্তবতা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তি আসক্তি আমাদের এটি থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তাই নিজের অজান্তেই আমরা অনেক অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। এছাড়া অধিক প্রযুক্তি আসক্তি মেধাবিকাশ, ক্যারিয়ার গঠন এবং পরিশ্রম কম করায় শারীরিক সমস্যারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তথ্য ও প্রযুক্তির ইতিবাচক-নেতিবাচক ব্যবহার আমাদের সমাজ জীবন এবং সামাজিকীকরণে কেমন প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে আমরা কথা বলেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল ইসলামের সঙ্গে। তার মতে, প্রযুক্তি আসলে নিরপেক্ষ। প্রযুক্তির তো কোনো দোষ নেই। বিষয়টি হল এর অপব্যবহার। প্রযুক্তি আসলে কোন শ্রেণীর হাতে যাচ্ছে এটাই এখানে বিবেচ্য বিষয়। শিশুদের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রযুক্তি শিশুদের মেধাবিকাশে সহায়তা করলেও, মানসিক বিকাশে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এটি অনেক ক্ষেত্রে সমাজ জীবনে একাকিত্ব তৈরি করে ফেলছে এবং সঠিক সামাজিকীকরণে সহায়ক হচ্ছে না।
সর্বোপরি তিনি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
সূত্র: যুগান্তর
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy