প্রমান সহকারে বলবেন প্লিজ?

অজ্ঞাতবশত কেউ কুফর বা শিরক করলে সে কি কাফির বা মুশরিক হয়ে যাবে?
2944 views

1 Answers

হ্যাঁ ভাই! অজ্ঞাত বশত কেউ কুফর কিংবা শিরক করলে এবং তাতে বিশ্বাস করলে সে কাফের বা মুশরিক হয়ে যাবে। বর্তমান না জানাটা যথার্থ কারণ হিসেবে গৃহীত হবে না। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক মুসলিমের জন্য দীন বিষয়ক জ্ঞানার্জনকে আবশ্যক করে দিয়েছেন। মনের ভুলে কেউ যদি কোনো অপরাধ করে ফেলে তাহলে তার জন্য ইসলামী শরীয়াতে শিথিলতা ও মার্জনার বিষয় রয়েছে। কিন্তু কেউ যদি অজ্ঞাত বশত কুফর বা শিরক করে তাহলে তার ঈমান চলে যাবে। সে যদি তওবা না করে এ অবস্থায়ই ইন্তেকাল করে তাহলে তার জন্য শরীয়তের বিধানগত দিক থেকে কোনো মুক্তি নেই। তবে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ তাআলার একচ্ছত্র ক্ষমতা রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে মুক্তি দিয়ে দিতে পারেন। সহীহ হাদীসে এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখান ইসলামী শরীয়ার বিধানগত দিক থেকে কাফের সাব্যস্ত হয় কিন্তু আল্লাহ তাকে মুক্তি দিয়ে দিয়েছেন। এজন্য ইসলামী শরীয়ার পরিভাষায় দুটি শব্দ রয়েছে, কাযাআন এবং দিয়ানতা। কুরআন হাদীসের বিধান অনুসারে যে বিধান দেয়া হয় সেটা হলো কাযা বিধান। আর আল্লাহ এবং ব্যক্তির মধ্যকার ক্ষমা করা না করার অদৃশ্য যে বিষয়টি সেটা হলো, দিয়ানত বিধান। কুরআন হাদীসে কুফর এবং শিরকের যে শাস্তি বা ভয়াবহতার কথা এসেছে সেখানে জানা না জানার কোনো বিষয় আনা হয় নি। এবার শিরক সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা নেয়া যাক।

শিরকের পরিচয় ও প্রকারভেদ

শিরকের আভিধানিক অর্থ- অংশ। الشِّرْكُ শব্দের মাছদার বা ক্রিয়ামূল হ’ল الاِشْرَاكُ (আল-ইশরাক) অর্থ: শরীক করা। পারিভাষিক অর্থ: আল্লাহর সত্তা অথবা গুণাবলীর সাথে অন্যকে শরীক করা। শিরকের সংজ্ঞায় আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন,الشرك هو أن يتخذ من دون الله نداً يحبه كما يحب الله ‘শিরক হ’ল আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ গ্রহণ করা এবং আল্লাহর মত তাকে ভালবাসা’।[1]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) শিরকের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدّاً وَهُوَ خَلَقَكَ ‘আল্লাহর জন্য অংশীদার সাব্যস্ত করা, অথচ তিনি (আল্লাহ) তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’।[2]

তাওহীদের বিপরীত হ’ল শিরক। শিরক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ (নিসা ৪/৪৮, ১১৬)

শিরক পাঁচ প্রকার। যথা- (১) জ্ঞানগত শিরক (২) ব্যবহারগত শিরক (৩) ইবাদতে শিরক (৪) অভ্যাসগত শিরক (৫) ভালবাসায় শিরক। এগুলি হ’ল বড় শিরক বা ‘শিরকে আকবার’। এতদ্ব্যতীত ‘শিরকে আছগার’ বা ছোট শিরক হ’ল ‘রিয়া’ বা লোক দেখানো দ্বীনদারী। যা বড় শিরকের এক দর্জা নীচে এবং সবচেয়ে বড় কবীরা গোনাহ।

(১) জ্ঞানগত শিরক : এর অর্থ হ’ল আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী মনে করা, বিপদ-আপদে অন্য কোন অদৃশ্য সত্তাকে আহবান করা, অন্যের নামে যিকর করা বা ধ্যান করা ইত্যাদি।

(২) ব্যবহারগত শিরক : এর অর্থ সৃষ্টির পরিকল্পনা ও সৃষ্টি জগতের পরিচালনায় অন্য কাউকে শরীক গণ্য করা। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকেই মুসলমানের রাজনীতি, অর্থনীতি, বিচারনীতি, শিক্ষানীতি, ধর্মীয় নীতি, সমাজনীতি সবকিছু পরিচালিত হবে। এটাই হ’ল তাওহীদের মূল কথা এবং এর বিপরীতটাই হ’ল শিরক।

(৩) ইবাদতে শিরক : এর অর্থ হ’ল ইবাদত বা উপাসনার ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করা। যেমন আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে সিজদা করা, অন্যের নামে যবহ করা, মানত করা, অন্যের নিকটে প্রার্থনা করা, অন্যকে ভয় করা, আকাঙ্ক্ষা করা, যে আনুগত্য ও সম্মান আল্লাহকে দিতে হয় সেই আনুগত্য ও সম্মান অন্যের প্রতি প্রদর্শন করা, কবরপূজা করা ইত্যাদি। পৃথিবীর সবচাইতে প্রাচীনতম শিরক হ’ল মূর্তিপূজা।

(৪) অভ্যাসগত শিরক : এর অর্থ হ’ল মানুষ অভ্যাস বশতঃ অনেক সময় শিরক করে থাকে। শিরকী কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে, হালালকে হারাম করে, হারামকে হালাল করে ইত্যাদি। যেমন বিশ্বব্যাপী প্রচলিত রেওয়াজের দোহাই দিয়ে দেশে সূদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু রাখা, কারো সম্মানে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা, নিজেদের বানানো শহীদ মিনার, শিখা অনির্বাণ, শিখা চিরন্তন, স্মৃতিসৌধ, ভাষ্কর্য, টাঙ্গানো ছবি বা চিত্রে ইত্যাদিতে ফুলের মালা বা পুষ্পাঞ্জলী নিবেদন করা।

(৫) ভালবাসায় শিরক : এর অর্থ বান্দার ভালবাসাকে আল্লাহর ভালবাসার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। অর্থাৎ পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে বর্ণিত বিধানের ঊর্ধ্বে কোন মুজতাহিদ ইমাম, মুফতী, পীর-আউলিয়া বা শাসনকর্তার আদেশ-নিষেধ ও বিধান সমূহকে অধিক ভালোবাসা ও তদনুযায়ী আমল করা।

শিরকের ভয়বহতা ও পরিণতি

১. শিরক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ :

আল্লাহ শিরকের গুনাহ ক্ষমা করবেন না। তিনি বলেন, إِنَّ اللهَ لاَ يَغْفِرُ أَنْ يُّشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيْمًا. ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এ ব্যতীত অন্য সব, যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করল, বস্ত্ততঃ সে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করল’ (নিসা ৪/৪৮)

২. শিরক জাহান্নাম ওয়াজিব করে দেয় :

শিরক মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন, إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِيْنَ مِنْ أَنْصَارٍ. ‘নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই’ (মায়েদাহ ৫/৭২)

ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِىْ لاَيُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ قُلْتُ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ قَالَ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ. ‘আমার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (রাবী বলেন) আমি জিজ্ঞেস করলাম, যদি সে যেনা করে এবং চুরি করে থাকে তবুও? তিনি বললেন, যদিও সে যেনা করে এবং চুরি করে থাকে’।[3]

অন্য হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ لَقِىَ اللهَ لاَيُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ لَقِيَِهُ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ. ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে মৃত্যুবরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।[4]

৩. শিরক পূর্বের আমল সমূহ বিনষ্ট করে দেয় :

আল্লাহ তা‘আলা বান্দার সৎ কাজগুলোকে বৃদ্ধি করে দেন। কিন্তু শিরক বান্দার ভাল আমলগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। আল্লাহ বলেন, وَلَوْ أَشْرَكُوْا لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُواْ يَعْمَلُوْنَ. ‘যদি তারা শিরক করে তবে তাদের আমল সমূহ নষ্ট হয়ে যাবে’ (আন‘আম ৬/৮৮)। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, وَلَقَدْ أُوْحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ. ‘তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে যে, যদি তুমি আল্লাহর শরীক স্থির কর, তবে তোমার কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে। আর তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (যুমার ৩৯/৬৫)

৪. শিরক সবচেয়ে বড় গুনাহ :

বীরা তথা বড় গুনাহের একটি হ’ল শিরক। একবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাহাবীগণকে লক্ষ্য করে বললেন,أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ؟ قُلْنَا بَلَى يَارَسُوْلَ اللهِ. قَالَ اَلْإِشْرَاكُ بِاللهِ، وَعُقُوْقُ الْوَالِدَيْنِ. ‘আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গুনাহ সম্পর্কে সংবাদ দিব না? আমরা বললাম, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া’।[5]

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

اِجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوْبِقَاتِ قَالُوْا يَارَسُوْلَ الله وَمَا هُنَّ؟ قَالَ الشِّرْكُ بِاللهِ، وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِىْ حَرَّمَ اللهُ إِلإَّ بِالْحَقِّ وَأَكْلُ الرِّبَا وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيْمِ وَالتَّوَلِّىْ يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاَتِ الْغَافِلاَتِ وَالْمُمْنِاَتِ.

‘তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক জিনিস থেকে বেঁচে থেকো। ছাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! ঐ ধ্বংসাত্মক জিনিসগুলো কি কি? তিনি জবাবে বললেন, আল্লাহর সাথে শরীক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা যা আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন, সূদ খাওয়া, ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা, সরলা নির্দোষ সতী-সাধ্বী মুমিনা মহিলাকে অপবাদ দেওয়া’।[6] অন্য হাদীছে রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘সবচেয়ে বড় গুনাহ তিনটি (১) আল্লাহর সাথে শরীক করা (২) পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং (৩) মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া’।[7]

৫. শিরক জঘন্যতম পাপ :

যেসব কাজ করলে আল্লাহর আনুগত্যের পরিবর্তে পাপ অর্জিত হয় শিরক তার অন্যতম। শিরককে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ) জঘন্যতম পাপ বলে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহর সাথে শিরক করল সে জঘন্য পাপ করল’ (নিসা ৪/৪৮)

আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, قُلْتُ يَارَسُوْلَ اللهِ أَىُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ؟ قَالَ: أَنْ تَجْعَلَ لِلّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ. ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর নিকট জঘন্যতম পাপ কোন্টি? জবাবে তিনি বললেন, কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ বানানো (শরীক করা), অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’।[8]

অতএব খালেছ তাওহীদ বিশ্বাস ও শিরক থেকে বেঁচে থাকা ব্যতীত জান্নাত হাছিল করা সম্ভব নয়। সেকারণে আমাদেরকে আক্বীদার ক্ষেত্রে শিরক মুক্ত তাওহীদ পন্থী এবং আমলের ক্ষেত্রে বিদ‘আত মুক্ত সুন্নাতপন্থী হ’তে হবে। আল্লাহ আমাদের শিরক থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন- আমীন!


[1]. মাদারেজুস সালেকীন ১/৩৩৯; মাসিক আল-বায়ান, সংখ্যা ৬৯, নভেম্বর ১৯৯৭

[2]. বুখারী হা/৪২০৭।

[3]. ছহীহ বুখারী হা/১২৩৭ ‘জানাযা’ অধ্যায়

[4]. ছহীহ মুসলিম হা/২৬৬৩ ‘ঈমান’ অধ্যায়

[5]. বুখারী, মুসলিম, রিযাযুছ ছালেহীন হা/১৫৫০

[6]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫২; রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৬১৪

[7]. বুখারী; রিয়াযুছ ছালেহীন হা/৫০

[8]. বুখারী হা/৪২০৭

http://at-tahreek.com

2944 views Answered

Related Questions

Next steps