গিরগিটি সমর্পকে কিছু জানতে চাই?
2 Answers
বাগানের গিরগিটি ( বৈজ্ঞানিক নাম : Clotes
Versicolor) যা ‘রক্তচোষা’ নামে অতি পরিচিত
একপ্রকার নিরীহ সরীসৃপ। প্রতিনিয়ত
বন-বাগান ও
ঝোপঝাড় ধ্বংস হওয়ার কারণে দিনে দিনে এই
সরীসৃপগুলো হুমকির সম্মুখীন হয়ে পরছে।
আকার
এই বাগানের গিরগিটি বা রক্তচোষা গড়ে ৪৪
সেন্টিমিটার লম্বা হয়। লেজটিই প্রায় ৩২
সেন্টিমিটার। আর দেহ মাত্র ১২ সেন্টিমিটার।
দেহের
ওপরের অংশ বাদামি থেকে ধূসর। তবে এই রং
প্রয়োজনের সময় পরিবর্তন করতে পারে,
যেমন—হালকা
জলপাই বাদামি, জলপাই-ধূসর বা হলদে।
পিঠের ওপর ও
পাশে কতগুলো ফোঁটা আর দাগ থাকে।
দেহের নিচের
অংশ ময়লা-সাদা। পিঠের ওপর শিরদাঁড়া
বরাবর কাঁটা
রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ গিরগিটির চোখের
নিচের
আঁশগুলো কালচে।
স্বভাব::
এই সরীসৃপগুলোকে শহর, গ্রাম, বন—
সবখানেই দেখা
যায়। খোলা মাঠ, ঝোপঝাড়, বনের প্রান্ত,
বাগান,
পার্ক প্রভৃতি জায়গা বেশি পছন্দ। মূলত
কীটপতঙ্গভোজী হলেও ডিম, ছোট ছোট
কাঁকড়া ও
অন্যান্য ছোট মেরুদণ্ডী প্রাণীতেও এদের
অরুচি নেই।
প্রজননকাল::
এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর প্রজননকাল। এ সময়
পুরুষগুলোর দেহে প্রজননের রং খোলে।
লাল-কালো
গলা ফুলিয়ে স্ত্রীকে আকর্ষণ করে। প্রজননের
পর
স্ত্রী নরম মাটিতে কয়েক সেন্টিমিটার লম্বা গর্ত
করে ৬-২০টি ডিম পাড়ে। সাদা, লম্বাটে ও
নরম খোসার
ডিমগুলো ছয়-সাত সপ্তাহে ফোটে। বাচ্চা ৭.৫
সেন্টিমিটার লম্বা হয়। প্রজনন-উপযোগী হতে বছর
খানেক সময় লাগে। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ
গিরগিটির
সামনের পা দুটোসহ মাথা থেকে বুক পর্যন্ত
কমলা-লাল
রং ধারণ করে। অনেক সময় দুটো পুরুষ
গিরগিটি
মারামারি করলেও মুখমণ্ডল ও মাথা
টকটকে লাল
দেখায়। সদ্য ফোটা ও অল্প বয়স্ক বাচ্চার রং হালকা
সোনালি-হলুদ থেকে বাদামি। প্রজনন-পরবর্তী
দেহের
রং কালচে বা কালচে ধূসর। এই সরীসৃপগুলো
প্রজনন
মৌসুম ছাড়াও শিকারি প্রাণী বা শত্রুর হাত থেকে
আত্মরক্ষার জন্য দেহের রং পরিবর্তন করে
হয় শত্রুকে
ভয় দেখায়, না-হয় প্রকৃতির সঙ্গে মিলে
মিশে যায়।
এরা সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী। পৃথিবীতে প্রায় একশ ষাট প্রজাতির বহুরূপী গিরগিটির দেখা মেলে। এদের বেশিরভাগ আফ্রিকা, মাদাগাসকার, স্পেন ও পর্তুগাল নিবাসী। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কাতেও বেশি দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অংশে যেমন ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা ও হাওয়াইয়ের বনভূমিতেও এরা বসবাস করে। আবার যাদের ভয়ডর একটু কম তারা শখ করে এদের ঘরে পোষা প্রাণী হিসেবেও রাখে।
কিছু অদ্ভূত শারীরিক বৈশিষ্ট্যের জন্যই বহুরূপী গিরগিটি আমাদের কাছে এত জনপ্রিয়। অন্য সব সরীসৃপের মতো এরাও বুকে ভর দিয়ে হাঁটে। এদের চারটি পায়ে পাঁচটি করে আঙুল থাকে; কিন্তু অন্যান্য সরীসৃপের মতো এদের আঙুল জোড়া লাগানো নয়। বরং এরা আঙুলের সাহায্যে মানুষের মতো যেকোনো জিনিস শক্ত করে ধরে রাখতে পারে। এদের লেজও যেকোনো জিনিস অাঁকড়ে ধরে রাখতে পারে। গাছের উপর ওঠার সময় লেজের সাহায্যে এরা গাছের ডাল ধরে রাখে। তাহলে বোঝ, লেজ ওদের জন্য কতটা দরকারি। এজন্য কোনো কারণে লেজ কেটে গেলেও টিকটিকির মতো আবার এদের লেজ গজাতে শুরু করে। বহুরূপী গিরগিটির চোখ অন্য সরীসৃপের চোখের চেয়ে আলাদা। প্রত্যেক চোখে একটি শক্ত ঢাকনা থাকে, যার মধ্যে শুধু একটি ছোট্ট গোল খোলা জায়গা থাকে, যাতে চোখের মণিটি অবস্থান করে। এরা চোখের সাহায্যে শরীরের দুই পাশে অবস্থিত দুটি আলাদা জিনিস একইসঙ্গে দেখতে পারে। এদের শরীরের চারপাশে এরা ৩৬০ ডিগ্রি পরিমাপে সবকিছু দেখতে পায়।
গিরগিটি তাদের খাবারের তালিকায় পোকামাকড়কে প্রাধান্য দেয়। তবে কিছুু বড় গিরগিটি ছোট ইঁদুর, পাখি এবং টিকটিকিকেও রেহাই দেয় না। এরা খুব তাড়াতাড়ি চলাচল করতে পারে না, তাই খাবার সংগ্রহের জন্য এরা জিহ্বার উপর বেশি নির্ভরশীল। এরা জিহ্বাকে মুখ থেকে অনেক দূরে লম্বা করতে পারে। জিহ্বার সামনের অংশ বেশ আঠালো। ফলে কোনো খাদ্যদ্রব্য জিহ্বার সংস্পর্শে চট করে আটকা পড়ে যায়। তারপর ঘপাৎ করে মুখে পুরেই এরা পেটে চালান করে দেয়।
বহুরূপী গিরগিটি নিজেদের গায়ের রং পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু তারা তাদের শরীরের রং যে বাইরের প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বদলায়, তা নয়। এমনকি তারা ইচ্ছা মতো যেকোনো রংও ধারণ করতে পারে না। প্রত্যেকেই কিছু নির্দিষ্ট রং ধারণ করার সীমাবদ্ধতা আছে। প্রধানত গিরগিটির মনের অবস্থার ভিত্তিতে তাদের গায়ের রং বদলায়। যেমন_ ভয় অথবা রাগ। নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করতে এটি খুব জরুরি।
বেশিরভাগ বহুরূপী গিরগিটি ডিম পাড়ে। প্রজাতি অনুসারে ডিমের সংখ্যা নির্ভর করে। ছোট প্রজাতির গিরগিটি ২ থেকে ৪টি এবং বড় প্রজাতিরা ৮০ থেকে ১০০টি ডিম পাড়তে পারে। যখন ডিম পাড়ার সময় হয় মহিলা গিরগিটিরা গাছ থেকে নিচে নেমে আসে ও মাটিতে ১০-৩০ সেন্টিমিটারের গর্ত করে। তারা গর্তে ডিম পাড়ে এবং ডিমগুলোকে মাটি চাপা দিয়ে চলে যায়। ডিম থেকে বাচ্চা বের হতে সময় লাগে ৪ থেকে ১২ মাস। পারশন্স ক্যামেলিয়ন নামক বহুরূপী গিরগিটি প্রজাতির ডিম ফুটতে সময় লাগে ২৪ মাস। এত দীর্ঘ সময়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার অথবা ডিম খেকো প্রাণিদের চোখে পড়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। তাই এই প্রজাতির গিরগিটি আজ প্রায় বিলুপ্ত। মজার ব্যাপার হল, কিছু প্রজাতির বহুরূপী গিরগিটি ডিম পাড়ে না, বাচ্চা দেয়। প্রজাতি অনুসারে এরা ৮ থেকে ৩০টি বাচ্চা দিতে পারে। বাচ্চারা পৃথিবীতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই গাছে ওঠতে শুরু করে ও এরা জন্ম থেকেই শিকারে পারদর্শী হয়ে থাকে। খাবার অথবা সুরক্ষার জন্য তারা মায়ের উপর নির্ভর করে না।