২০১০ সালে রক্ত পরীক্ষা করে জন্ডিস ধরা পরে তারপর বিভিন্ন ঔষধ খাই।তারপর আর কখনো রক্ত পরীক্ষা করে জন্ডিস ধরা পরে না।আমার ঘনঘন পাতলা পায়খানা হয়।রাত তিনটার পর থেকে শরীর গরম থাকে মনে হয় জ্বর আসে আর সেটা সকাল ৭টা বাজার আগেই এমনিতেই সেরে যায় এটা প্রতিদিনই হয়।ঘুম ঠিকমতো হয় না ঘুম ধরতে ১-১.৫ ঘন্টা সময় লাগে শুয়ে থাকার পর।রাতে কয়েকবার জাগো পাই।যখন ঘুম ভেঙ্গে যায় তখন সহজে ঘুম ধরে না।যখন ঘুম ধরে না তখন প্রচন্ড মাথা ব‍্যাথা করে।আমি যখন ভাত খাই বেশিরভাগ সময় গলা পোড়ে।প্রায়ই পেট মোচড় দিয়ে বা কামড়ে ধরে দিনে দু তিনবার বা তারও বেশি বার নরম-পিচ্ছিল আমযুক্ত মল হয়।কখনো আবার কয়েক দিন পায়খানা হয়ই না কোষ্ঠ‍কাঠিন‍্য হয়ে যায়।প্রায়ই পেটে শব্দ হয়,বদহজম হয়,কিছু খেলে অস্বস্তি লাগে।খাবার পরই প্রচণ্ড মলের বেগ হয়,পেট কামড়ায়।সকালে খালি পেটে হাটলে পেট কামড়ায়।পায়খানার সময় মাঝে মধ‍্যে জ্বালাপোড়া করে।আমি সবসময় চিন্তায় থাকি।দিনদিন আমি শুধু শুকিয়েই যাচ্ছি।পায়খানা ক্লিয়ার ভাবে হয় না পায়খানার ভাব থেকে যায়।৮-৯ বার ডাক্তার দেখিয়াছি,অনেক রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়েছি কিন্তু কোন সমস‍্যা ধরা পড়ে না।এদিকে আমার ভালও লাগে না।ডাক্তার বলল তোমার আইবিএস হয়েছে অথার্ৎ আমাশয় হয়েছে।আমার ঘনঘন চুলকানি হয় হয়।মাঝেমধ্যে সারাশরীরে মরা চামড়া দেখা যায়।আমার মুখ সারাবছর খসখসে থাকে।সারাবছর সারামুখ তৈলাক্ত থাকে।সারাবছর সারামুখে ছোট ছোট ও কিছু বড় বড় ব্রর্ণ ওঠে।আমার খিদে আছে প্রচুর কিন্তু মুখে রুচি নাই।কোন কিছু খেতে ভাল লাগে না যাই খাই সবই মিষ্টি লাগে।এরকম ৬-৭ মাস হলো।
3836 views

1 Answers


দীর্ঘমেয়াদী আমাশয়ের সমস্যার মধ্যে একটি হলো ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম তথা আইবিএস। পৃথিবীর মানুষ পরিপাকতন্ত্রের যে সমস্যাটির জন্য সবচেয়ে বেশী কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকে এবং যে সমস্যাটির জন্য জীবনযাপনের মানে ঘাটতি হয় তা হলো আইবিএস। রিসার্চ অনুযায়ী একটি দেশের লোকসংখ্যার ২০ শতাংশ আইবিএসের লক্ষণ বহন করে এবং ১০ শতাংশ ডাক্তারের কাছে চিকিত্সার জন্য আসে। পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের প্রায় দুই থেকে তিনগুণ এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়। যারা আইবিএস নামক দীর্ঘমেয়াদী আমাশয় সমস্যায় ভুগে তাদের একটি অংশের উক্ত রোগের সাথে থাকে বদহজম, দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি, মাসিকের সময় ব্যথা এবং পুরো শরীর ব্যথাসহ এই জাতীয় সমস্যা।

আইবিএসের কারণ ও প্রভাবক হিসেবে বিজ্ঞানীরা অনেকগুলো বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন। এগুলো দুটো ভাগে ভাগ করা যায়: মনোসামাজিক ও শারীরবৃত্তীয়। মনোসামাজিক কারণের মধ্যে আছে দুশ্চিন্তা ও হতাশা। এছাড়া হঠাত্ অধিক মানসিক চাপও আইবিএসকে প্রভাবিত করে। দেখা গেছে, আইবিএসে আক্রান্ত রোগীরা অল্প সমস্যা হলেই মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তারা পরিস্থিতি সহজে মানিয়ে নিতে পারে না। 

শারীরবৃত্তীয় সমস্যার মধ্যে রয়েছে অন্ত্রনালীর অস্বাভাবিক নাড়াচাড়া, অন্ত্রনালীর বেশী স্পর্শকাতর হয়ে পড়া, এলার্জী ও ইনফেকশন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ দুধ ও গমজাতীয় খাবার সহ্য ক্ষমতা কম অর্থাত্ এ ধরনের খাবার খাওয়া 

মাত্রই তাদের আমাশয়ের সমস্যা 

শুরু হয়ে যায়।

আইবিএস-এর রোগীদের দুই ধরনের সমস্যাই হতে পারে: পাতলা পায়খানা ও কোষ্ঠকাঠিন্য। কারও আবার দুটোর মিশ্রণ হয়। অধিকাংশ রোগীরই দেখা যায়, কিছুদিন

কোষ্ঠকাঠিন্য যাচ্ছে আবার কিছুদিন পাতলা পায়খানা তথা আমাশয় হচ্ছে। তবে কোনটা বেশী হয় তার উপর ভিত্তি করে আইবিএসকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়- কোষ্ঠকাঠিন্য প্রধান এবং আমাশয় প্রধান। তবে যে সমস্যাটি প্রায় সবার থাকে তা হলো পুনঃপুনঃ পেটে ব্যথা। সাধারণত তলপেটে কামড় দিয়ে ব্যথা হয় এবং পায়খানা হয়ে ব্যথা ভালো হয়ে যায়। পেটে বুট বুট আওয়াজ হতে থাকে। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য প্রধান, তাদের পেটে ব্যথার সাথে ছোট ছোট খণ্ডে পায়খানা হয়। আর যাদের আমাশয় প্রধান তাদের ঘন ঘন কিন্তু অল্প পায়খানা হয়। স্বস্থির ব্যাপার হলো, ঘন ঘন পায়খানা হলেও ওজন ঠিক থাকে এবং মলের সাথে শুধু আম যায়, রক্ত যায় না। 

আইবিএসের লক্ষণগুলোকে এভাবে সাজানো যায়;

১. মলত্যাগের অভ্যাস পরিবর্তন

২. পেটে কামড় দিয়ে ব্যথা

৩. পেট ফুলে যাওয়া

৪. মলের সাথে আম যাওয়া এবং

৫. মলত্যাগ করার পর ঠিক ভাবে ত্যাগ হয়নি মনে হওয়া।

এই সমস্যাগুলো ৬ মাসের বেশী থাকলে এবং মানসিক চাপের সময় এ ধরনের সমস্যা বেশী হলে ডাক্তাররা আইবিএস হয়েছে বলে সন্দেহ করেন। এছাড়াও যাদের এই সমস্যা আছে তারা পোলাও, কোর্মা, বিরিয়ানী, তেহারী ইত্যাদি তেলযুক্ত খাবার এবং দই, দুধ-চা, পায়েস, সেমাই ইত্যাদি দুধ নির্মিত খাবার খেলে সাথে সাথেই দেখা যায় তাদের পেট খারাপ হয়ে পড়ে। আমাদের লিভার সেন্টারের গবেষণা থেকে দেখা গেছে- যে সকল রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী লিভার প্রদাহ থাকে এবং ফ্যাটি লিভার থাকে তাদের অধিকাংশই কোন না কোন সময় আইবিএস-এ আক্রান্ত হয়। আবার যে সকল রোগী পায়খানার অভ্যাসের পরিবর্তন, পেট ফোলা, পেট ব্যথা বা অস্বস্তি, পেটে শব্দ, সুনির্দিষ্ট কিছু খাদ্য হজম না হওয়া জাতীয় সমস্যা নিয়ে আসে তাদের প্রথম প্রথম আইবিএস হিসেবে সন্দেহ এবং চিকিত্সা করা হলেও পরবর্তীতে এদের লিভার সিরোসিস ধরা পড়ে। 

আইবিএস-এর চিকিত্সার প্রধান অংশ হল এ বিষয়ে আশ্বস্ত হওয়া যে, এটা ক্যান্সার জাতীয় কোন সমস্যা নয়। রোগীদের একটি দল ভয় পেতে থাকে যে, তাদের ক্যান্সার হল কি না। এই উদ্ব্বেগ থেকে তাদের পেট খারাপের সমস্যা আরও বেড়ে যায়। এ কারণে রোগের মাত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরী। এছাড়া যাদের আমাশয় প্রধান আইবিএস তাদেরকে লোপেরামাইড, অ্যামিট্রিপটাইলিন ইত্যাদি ওষুধ দিয়ে চিকিত্সা করা হয়। যাদের পেটে ব্যথা ও বুট বুট আওয়াজের সমস্যা হয় তাদেরকে মেবেভেরিন, অ্যালভেরিন ইত্যাদি ওষুধ দিয়ে চিকিত্সা করা হয়। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য প্রধান আইবিএস তাদের ফাইবারযুক্ত খাবার (যেমন: শাকসবজি), ইসুপগুলের ভুসি, ল্যাকটুলোজ ইত্যাদি দিয়ে চিকিত্সা করা হয়। যে সকল রোগী উপরোক্ত উপায়ে ভালো হয় না তারা অন্যান্য উপায়ে চিকিত্সা নিতে পারেন। এগুলোকে মেডিকেলের ভাষায় বলা হয় অল্টারনেটিভ মেডিসিন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: রিলাক্সেশন থেরাপী, হিপনোথেরাপী, বায়োফিডব্যাক ইত্যাদি। উপযুক্ত চিকিত্সা নিয়ে আইবিএসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে জীবনাচারের মানে অনেক উত্তরণ ঘটে। আবার যেহেতু লিভার সিরোসিস তথা দীর্ঘ মেয়াদী লিভার প্রদাহের রোগীরা আইবিএস-এর ন্যায় সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে সেহেতু আইবিএস রোগীদের লিভারের কোন সমস্যা আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার। অতএব যারা উপরোক্ত সমস্যাগুলো নিজেদের মধ্যে আছে বলে মনে করছেন তাদের উচিত্ অভিজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে চিকিত্সা গ্রহন করা।

ইনফ্লেমেটরী বাওয়েল

ডিজিজ তথা আইবিডি

দীর্ঘমেয়াদী আমাশয়ের সমস্যার মধ্যে অন্যতম প্রধান হল, ইনফ্লেমেটরী বাওয়েল ডিজিজ তথা আইবিডি। আইবিডির মধ্যে দুটো রোগকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে: ক্রনস ডিজিজ ও আলসারেটিভ কোলাইটিস। রোগ দুটোতে খাদ্যনালীর আক্রান্ত স্থান, আক্রান্তের ধরন ও প্রকৃতি,খাদ্যনালীর বাইরে সমস্যার উপস্থিতি ও চিকিত্সার ধরনের পার্থক্য আছে। আইবিডি একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা যা বছরের পর বছর চলতে থাকে এবং হঠাত্ হঠাত্ বেড়ে যাওয়া ও কমে যাওয়ার আচরণ দেখায়। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে ক্রনস ডিজিজ-এর চেয়ে আলসারেটিভ কোলাইটিস বেশী হচ্ছে। ওষুধ খেয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখলে আইবিডির রোগীদের আয়ু সাধারণ মানুষের গড় আয়ুর সমানই হয়। লক্ষণীয়, স্বল্পমেয়াদী ব্যাকটেরিয়া জনিত আমাশয়েও রক্ত যায়, কিন্তু এর সাথে আলসারেটিভ কোলাইটিসের পার্থক্য হল যে

পরেরটি দীর্ঘমেয়াদী। অধিকাংশ রোগীর ওজন ঠিক থাকে। কারও কারও জ্বর, শরীর ম্যাজ ম্যাজ করা ও পেটে অশ্বস্তি লাগার সমস্যা হতে পারে। ক্রনস ডিজিজের মূল সমস্যা হলো আমাশয়, পেটে ব্যথা এবং ওজন কমে যাওয়া। খাওয়ার সাথে ওজন কমে যাওয়ায় রোগী খেতে

পারে না। ফলে ধীরে ধীরে ওজন কমে যেতে থাকে এবং ভিটামিনের অভাব থেকে রক্তশূন্যতা, রক্তে তারল্য বৃদ্ধি, স্নায়ুতে সমস্যা ইত্যাদি হতে পারে। কারও কারও পায়খানার সাথে বমি ও মুখে ঘা হতে পারে। 

আলসারেটিভ কোলাইটিস ও ক্রনস ডিজিজ উভয় রোগেই অন্ত্রনালীর বাইরে বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন: কনজাঙ্কটিভাইটিস, আইরাইটিস ইত্যাদি চোখের সমস্যা, ফ্যাটিলিভার, পিত্তথলীর পাথর ও প্রদাহ, গিড়ায় ব্যথা, চর্মরোগ ইত্যাদি। সুতরাং দীর্ঘমেয়াদী আমাশয়ের, পাশাপাশি এ জাতীয় সমস্যাগুলো থাকলে চিকিত্সকরা আইবিডির ব্যাপারে সন্দেহ করেন। 

আইবিডি রোগ নির্ণয় করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে। এর মধ্যে আছে: অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পায়খানার পরীক্ষা ও কালচার স্টাডি, এন্ডোস্কপি, কলোনস্কপি, ব্যারিয়াম এনেমা।

আইবিডি রোগটি যেমন দীর্ঘমেয়াদী এর চিকিত্সাও দীর্ঘমেয়াদী। আইবিডির চিকিত্সায় দীর্ঘদিন স্টেরওয়েড, স্যালাজিন, মিথোট্রিক্সেট, সাইক্লোস্পরিন, এন্টাই টিএনএফ ইত্যাদি শক্তিশালী ওষুধ ব্যবহার করতে হয়। এ জন্য এ রোগের চিকিত্সা নিয়মিত চিকিত্সকের সান্নিধ্যে থেকে করতে হয়। তদুপরী যাদের ৮ বছরের বেশী সময় ধরে আইবিডি রোগ থাকে তাদের অন্ত্রে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এ কারণে এ রোগের ব্যাপারে অবহেলা করার ন্যূনতম সুযোগ নেই। 

পরিশেষে

আমরা এই প্রবন্ধটির মধ্য দিয়ে মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কমন একটি সমস্যা সম্পর্কে জানতে পারলাম। যেহেতু আমাশয় স্বল্পমেয়াদী থেকে দীর্ঘমেয়াদী যে কোন রকম হতে পারে এবং এদের চিকিত্সার ধরনও ভিন্ন, সেহেতু আমাদের উচিত্ এ রোগগুলোর ব্যাপারে নিজেরা সচেতন থাকা এবং আমাদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজনদের সচেতন করে চিকিত্সা গ্রহণে উত্সাহিত করা। পাশাপাশি, যাদের দীর্ঘদিন অথবা ঘন ঘন পেটের অসুখের সমস্যা হয় তাদের লিভারের কোন সমস্যা আছে কিনা তা নির্ণয় করে নেয়া দরকার। কেননা, যদি লিভারে প্রদাহ থাকে এবং তা প্রাথমিক পর্যায়েই নির্ণয় করা যায় তাহলে নিয়মিত চিকিত্সা গ্রহণ করে লিভার সিরোসিস নামক জটিল সমস্যাও প্রতিরোধ করা যেতে পারে।

সূত্রঃ

http://archive.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDRfMTlfMTRfNF80N18xXzEyNDE1Mg==

3836 views

Related Questions