রমজান মাসে তারাবিহ নামাজ প্রসঙ্গে?

আমরা জানি যে, রমজান মাসে ঈশার নামাজের পর ২০ রাকায়াত তারাবিহ নামাজ পড়া হয়। আমি শুনেছি যে, নবী (সঃ) এর সময় তারাবিহ নামাজ ছিলনা। তিনি চালু করেননি। তারাবিহ নামাজ পড়তেই হবে এমন কিছুনা। তারাবিহ নামাজ চালু করেছিলেন সম্ভবত উসমান (আঃ)। এটি মুলত রমজানে মাসে আল্লাহতায়ালার বেশি ইবাদাত বন্দেগী হিসাবে পড়া হয়। না পড়লে রোজার ক্ষতি নাই। রোজার সাথে সম্পর্ক নাই।  এই কথা ঠিক কিনা জানাবেন। এবং এ সম্পর্কে যতদুর জানেন হাদিস বা মহামনবের বক্তব্যও রেফারেন্স দিয়া বিস্তারিত বলবেন?
2692 views

3 Answers

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরয ব্যতীত রমযানের তারাবীহর সালাত আদায় করার জন্যও উৎসাহিত করতেন। তিনি বলতেন যে, যখন রমযান আগমন করে জান্নাতের দরজাসমূহ খূলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় আর শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখা হয়। -সূনান নাসাঈ ২১০৮

2692 views Answered

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় তারাবীহ নামায ছিল এবং তিনি নিজেও পড়েছেন এবং তারাবীহ সম্পর্কে দৃঢ় আদেশ (ওয়াজিব) না করেই, তার প্রতি উৎসাহ দান করতেন। সাহাবায়ে কিরাম দুই বা তিন রাত্রি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইমামতিতে তারাবীহ পড়েছিলেন। উম্মাতের উপর এ সালাত ফরয হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরে জামাআতের সাথে মসজিদে তারাবীহ পড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রী আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইডে ওয়াসাল্লাম মসজিদে (তারাবীহ) নামায আদায় করেন। ঐ সময় তাঁর সাথে অন্যান্য লোকেরাও নামায আদায় করেন। পরবর্তীতে রাতে উক্ত নামায আদায় করাকালে অনেক লোকের সমাগম হয়। অতঃপর তৃতীয় রাতেও লোকেরা উক্ত নামায (তারাবীহ) আদায় করার জন্য জমায়েত হলে সেদিন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে গমন করেন নাই। অতঃপর প্রত্যুষে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলকে লক্ষ করে বলেনঃ তোমরা যা করেছ তা আমি অবলোকন করেছি। আমি একারণেই নামায জামাআতের সাথে আদায় করার জন্য আসিনাই যে, আমার ভয় হচ্ছিল তোমাদের উপর তা ফরয করা হয় কি না (তবে কষ্টকর বোঝা হয়ে দাঁড়াবে)। এটা রমযান মাসের (তারাবীহ নামায আদায়ের) ঘটনা। (সূনান আবু দাউদ হাদিস নম্বরঃ ১৩৭৩ হাদিসের মানঃ সহিহ)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামে রমযান (তারাবীহ) সম্পর্কে দৃঢ় আদেশ (ওয়াজিব) না করেই, তার প্রতি উৎসাহ দান করতেন এবং বলতেন, যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে নেকীর আশায় রমযানে কিয়াম (তারাবীহর নামায আদায়) করবে, তার অতীতের পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (রিয়াযুস স্বা-লিহীন, হাদিস নম্বরঃ ১১৯৬ হাদিসের মানঃ সহিহ) আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে রাত্রি জাগরণের জন্য অবশ্য পালনীয় নির্দেশ না দিয়ে তাদের উৎসাহিত করতেন। তিনি বলতেন, যে ব্যাক্তি ঈমান ও নিষ্ঠার সাথে রমযানে রাত্রি জাগরণ করবে তার বিগত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাত হয় আর বিষয়টি এরূপই ছিল। পরে আবূ বাকর (রাঃ) এর খিলাফত যুগে অবস্থা অনুরূপ থাকে, উমর (রাঃ) এর খিলাফতের প্রথম দিকেও অবস্থা অনুরূপ অব্যাহত ছিল। (সহীহ মুসলিম হাদিস নম্বরঃ ১৬৫৩ হাদিসের মানঃ সহিহ) এবার আসুন ইজমার দলিলেঃ ফরয সালাত যেমন মুমিন জীবনের শ্রেষ্ঠতম ইবাদত, তেমনি নফল সালাতও সর্বশ্রেষ্ঠ নফল ইবাদত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের অন্যতম উপায়। ফরযের অতিরিক্ত কর্মকে ‘‘নফল’’ বলা হয়। কিছু সময়ে কিছু পরিমাণ ‘‘নফল’’ সালাত পালন করতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উৎসাহ দিয়েছেন, বা তিনি নিজে তা পালন করেছেন। এগুলোকে ‘সুন্নাত’ও বলা হয়। যে সকল নফল সালাতের বিষয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন সেগুলোকে ‘‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ’’ বলা হয়। এ ধরনের কিছু সুন্নাত সালাত সম্পর্কে হাদীসে বেশি গুরুত্ব প্রদানের ফলে কোন ফকীহ তাকে ওয়াজিব বলেছেন। তারাবীহ এর নামায সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ আদায় না করলে অবশ্যই গুনাহ হবে। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং সাওয়াবের আশায় রমজান মাসে রাত্রি জাগরণ করে তারাবীহ নামায আদায় করবে, তার বিগত জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (সহীহ বোখারি হাদিসঃ ১৯০১, সহিহ মুসলিম হাদিসঃ ৭৫৯) অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা রমজানের রোজাকে তোমাদের জন্য ফরয করে দিয়েছেন। আর আমি তোমাদের জন্য এ মাসের তারাবীহ নামাযকে সুন্নাত করে দিলাম। যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখবে এবং তারাবীহ নামাজ আদায় করবে, সে গুনাহ থেকে সেই দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে যাবে যে দিন মা তাকে জন্ম দান করেছিলেন। (সুনানে নাসায়ীঃ ২২২২) তবে একথা ঠিক যে, তারাবীহ না পড়লে রোজার কোন ক্ষতি হবেনা। কেউ যদি তারাবীহ নামায ছেড়ে দেয়, সেক্ষেত্রে রোজার উপর এর কোন প্রভাব পরবে না। কেননা রোজা ও তারাবীহ দুইটি ভিন্ন ভিন্ন স্বতন্ত্র ইবাদত। তাই রোজাদার ব্যাক্তি যদি তারাবীহ নামাজ নাও পড়েন সেটা রোজার উপর কোন প্রভাব ফেলবে না। তবে আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ আর তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর যাতে তোমরা কৃপা লাভ করতে পার। (আন-নিসাঃ ১৩২) আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সাথে রাসূলের আনুগত্যেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এটা জানা কথা যে, রাসূলের আনুগত্য হুবহু আল্লাহর আনুগত্য বোঝায়। তারপরও এখানে রাসূলের আনুগত্যকে পৃথক করে বর্ণনা করার তাৎপর্য স্বয়ং আল্লাহ বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমাদের প্রতি করুণা করা হয়। এতে আল্লাহর করুণালাভের জন্যে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যকে যেমন অত্যাবশ্যকীয় ও অপরিহার্যকরা হয়েছে, তেমনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যকেও জরুরী ও অপরিহার্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু এ আয়াতেই নয়, বরং সমগ্র কুরআনে বার বার এর পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে এবং যেখানেই আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে, সেখানেই রাসূলের আনুগত্যকেও স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। হানাফি মাজহাব মতে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ ওয়াজিব এর মত। তাই কেউ যদি স্বেচ্ছায় তারাবীহ নামাজ না পড়ে তাহলে সে গোনাহগার হবে।

2692 views Answered

নামাজ ও রোজা ইমানের পরে ইসলামের প্রধান দুটি বিধান, যা সবার জন্য প্রযোজ্য। রোজার সঙ্গে নামাজের সম্পর্ক সুনিবিড়। প্রিয় নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করেছেন আর আমি তোমাদের জন্য তারাবিহর নামাজকে সুন্নত করেছি; যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানে দিনে রোজা পালন করবে ও রাতে তারাবিহর নামাজ আদায় করবে, সে গুনাহ থেকে এরূপ পবিত্র হবে, যেরূপ নবজাতক শিশু মাতৃগর্ভ থেকে নিষ্পাপ অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়। (নাসায়ি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৩৯)। ফরজ ইবাদত পালন করতে হয় সুন্নত পদ্ধতিতে। রমজানের চাঁদ দেখা গেলে রোজার আগেই তারাবিহর সুন্নত নামাজ আমল করতে হয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, যে ব্যক্তি ইমানের সহিত সওয়াবের উদ্দেশ্যে রমাদান মাসে রাত্রি জাগরণ করে তারাবিহর নামাজ পড়বে, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (বুখারি, খণ্ড: ১, হাদিস: ৩৬)। বিশ রাকাত তারাবিহর নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। পুরুষদের জন্য তারাবিহর নামাজ মসজিদে জামাতে আদায় করা সুন্নত। তারাবিহর নামাজে পূর্ণ কোরআন শরিফ একবার পাঠ করা সুন্নত। একে খতমে তারাবিহ বলে। পূর্ণ কোরআন না পড়ে বিভিন্ন সুরা দিয়ে তারাবিহর নামাজ আদায় করাকে সুরা তারাবিহ  বলা হয়। সুরা তারাবিহ পড়লেও বিশ রাকাত পড়া সুন্নত। একা পড়লেও বিশ রাকাতই পড়া সুন্নত। নারীদের জন্যও বিশ রাকাত তারাবিহ সুন্নত। এশার নামাজের পর থেকে ফজরের নামাজের পূর্ব পর্যন্ত তারাবিহর নামাজ পড়া যায়। শিশুরাও তারাবিহর নামাজ পড়তে পারে। হাসান (রা.) বলেন, হজরত উমর (রা.) মানুষকে একত্র করলেন হজরত উবাই ইবনে কাআব (রা.)–এর পেছনে; তখন তিনি তাদের ইমামতি করে বিশ রাকাত নামাজ পড়তেন। (আবু দাউদ, খণ্ড: ২, হাদিস: ১৪২৯)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) বিশ রাকাত তারাবিহ পড়তেন তারপর বিতর পড়তেন। (মাকতুবাতু ইবনে তাইমিয়া, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৩৯৩)। হজরত আবুজার গিফারি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলে করিম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ইমামের সঙ্গে তারাবিহর নামাজ পড়ল, ইমাম প্রস্থান করা পর্যন্ত সমাপ্ত করে গেল; তার কিয়ামে লাইল বা রাত জাগরণের সওয়াব পূর্ণরূপে লিখিত হবে। (তিরমিজি, খণ্ড: ৩, হাদিস: ৮০৬)। হজরত ইবনে রুমান (র.) বলেন, হজরত উমর (রা.)–এর খিলাফতের সময় মানুষ ২৩ রাকাত (বিতরসহ তারাবিহর নামাজ) দ্বারা রাত জাগরণ করত। (মুআত্তা মালিক, খণ্ড: ১, হাদিস: ২৮১; আবু দাউদ, খণ্ড: ১, হাদিস: ৪২৮৯)। মিরকাত গ্রন্থে মোল্লা আলী কারি (র.) বলেন, তারাবিহর নামাজ বিশ রাকাত, এ বিষয়ে সব সাহাবির ইজমা (মতৈক্য) হয়েছে। (মিরকাত শারহে মিশকাত, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১৯৪)। শাঈখ উসাইমিন (র.) বলেন: ইমামের অনুসরণ করাই সুন্নত; যদি ইমাম তারাবিহ সম্পূর্ণ করার পূর্বে মুক্তাদি চলে যায়, তখন সে কিয়ামে লাইলের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়। তিনি আরও বলেন: ইমামের বিশ রাকাত তারাবিহ সমাপ্ত হওয়ার আগেই চলে যাওয়া অনুচিত; শরিয়তের বিধানমতে, ইমামের অনুকরণই বড় ওয়াজিব, এর বিপরীত করা মন্দ কাজ। (মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ২০০-২০১)। বিশ রাকাত তারাবিহর নামাজ হাজার বছরের প্রতিষ্ঠিত অবিসংবাদিত সুন্নত। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র.) বলেন: তবে তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে, নিশ্চয় উবাই ইবনে কাআব (রা.) রমজানে রাত জাগরণে বিশ রাকাতে তারাবিহর নামাজে ইমামতি করতেন এবং তিন রাকাত বিতর নামাজ পড়তেন। তাই উলামায়ে কিরাম মনে করেন, এটাই সুন্নত; কেননা তা আনসার ও মুহাজির সব সাহাবির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত, কেউ তা অস্বীকার করেননি। অন্যান্য ইমাম বিতরসহ তারাবিহর উনচল্লিশ রাকাত পড়া পছন্দ করেন; কারণ, তা হলো মদিনার আমল। ইবনে তাইমিয়া (র.) আরও বলেন: সুতরাং বিশ রাকাত তারাবিহই উত্তম এবং এটাই অধিকাংশ মুসলমানের আমল; আর নিশ্চয় এটি দশ (সর্বনিম্ন) ও চল্লিশের (সর্বোচ্চ) মাঝামাঝি। তবে যদি কেউ চল্লিশ রাকাত বা অন্য কোনো সংখ্যা আদায় করেন, তবে তা–ও জায়েজ হবে। এ বিষয়ে অন্যান্য ইমামও আলোকপাত করেছেন। (মজমুআ ফাতাওয়া, খণ্ড: ২২, পৃষ্ঠা: ২৭২; খণ্ড: ২৩, পৃষ্ঠা: ১১২)।

2692 views Answered

Related Questions

Next steps