শবে বরাতের কথা কি কোরআন-হাদীসে সত্যিই আছে?
2 Answers
শবেবরাত শব্দটি কুরআনেও নাই হাদিসেও নাই ! সুতরাং শবেবরাত সম্পর্কে কুরআনে ও হাদিসে কোন সহিহ দলিল পাওয়া যাবে না ! অতএব শবেবরাত পালন করা স্পষ্ট বিদয়াত ! বিস্তারিত জানতেঃ শায়েখ আব্দুল্লাহ বিন বায রহঃ প্রনিত বিদয়াত হতে সাবধান বইটি পড়তে পারেন !
জি ভাই শবে বরাতের কথা হাদীসে রয়েছে। তার জন্য নিম্নের আলোচনাটি পাঠ করুন :
শবে বরাত বা লাইলাতুন নিসফি মিন শা’বানশা’বান মাস পবিত্র রমাযান মাসে প্রবেশের সেতুবন্ধ। এ মাসের পথ ধরেই রমাযানের অফুরন্ত পূণ্যাশীষ ও কল্যাণ লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সে দৃষ্টিকোণ থেকে শা’বান মাসের আলাদা একটি শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। তাছাড়া স্বতন্ত্রভাবে শা’বান মাসের ইবাদত ও মাহাত্ম্য বিষয়ে প্রচুর পরিমাণ বিশুদ্ধ বর্ণনা রয়েছে। হাদীসের গ্রন্থগুলোতে শা’বান মাস বিষয়ে আলাদা আলাদা অধ্যায় রচিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে ইবাদতে মনোযোগী হতেন। উসামা ইবনে যায়েদ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল! আপনি শা’বান মাসে যে পরিমাণ রোযা রাখেন অন্য কোনো মাসে আপনাকে সে পরিমাণ রোযা রাখতে দেখি না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটি রজব এবং শা’বানের মধ্যকার এমন একটি মাস যার মাহাত্ম্য সম্পর্কে মানুষ উদাসীন। এটি এমন একটি মাস যে মাসে মানুষের আমলের হিসাব নিকাশ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে উত্থাপন করা হয়। সুতরাং আমি চাই আমি রোযারত অবস্থায় আমার কার্যতালিকা আল্লাহ তা‘আলার নিকট উত্থাপিত হোক। (সুনানে নাসায়ী; হা.নং ২৩৫৭)
আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একমাত্র রমাযানেই পূর্ণ মাস রোযা রাখতে দেখেছি। আর তাঁকে শা’বান মাসের তুলনায় অন্য কোনো মাসে এত অধিক পরিমাণে রোযা রাখতে দেখেনি। (সহীহ বুখারী; হা.নং ১৯৬৯)
অন্য একটি বর্ণনায় আয়েশা রাযি. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শা’বান মাসের চেয়ে বেশি অন্য কোনো মাসে রোযা রাখতেন না। কারণ তিনি নিয়মিত শা’বান মাসের রোযা রাখতেন। (প্রাগুক্ত; হা.নং ১৯৭০)
এ ছিল শা’বান মাসের স্বাভাবিক শ্রেষ্ঠত্ব। এসব বর্ণনা দ্বারা প্রতীয়মান হয়, পূর্ণ শা’বান মাস জুড়েই ইবাদতের ব্যাপারে তুলনামূলক বেশি যত্মবান হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্য দিকে শা’বান মাসের বিশেষ একটি অংশের ব্যাপারে স্বতন্ত্র তাৎপর্য এবং মাহাত্ম্যের কথা হাদীসের কিতাবগুলোতে আলোচিত হয়েছে। আর সে অংশটি হলো ১৪ শা’বান দিবাগত রজনী। হাদীসের ভাষায় মহিমান্বিত এ রজনী ‘লাইলতুন নিসফি মিন শা’বান’ আর সাধারণ মানুষের পরিভাষায় লাইলাতুল বারা‘আত এবং শবে বরাত বা মুক্তির রজনী হিসেবে পরিচিত। এ রজনীটিকে ঘিরে আমাদের কিছু ভাইয়েরা বিদআত প্রতিরোধের নামে মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ের শিথিলতার আশ্রয় নেন। অথচ যতটুকু বিদআত এবং ধর্মীয় অনাচারের পর্যায়ে পড়ে ততটুকুই রোধ করা প্রয়োজন ছিল। দেহের কোনো অঙ্গে অপারেশন পর্যায়ের ইনফেকশন হলে নির্দিষ্ট অঙ্গটিকেই অপারেশন করে কেটে ফেলতে হয়। ইনফেকশনের ধুয়া তুলে যদি পূর্ণ দেহটিকেই দু টুকরো করে দেয়া হয় তবে তো তাতে আর প্রাণের স্পন্দন থাকবে না। ফরজ নামায কিংব ফরজ রোযাকে ঘিরে অনেক জায়গায় নানা রকমের কুসংস্কার প্রচলিত আছে। তাই বলে তো সংস্কারের নামে ফরজ নামায রোযাকে ছেটে ফেলে দেয়া যাবে না। দীনের কাজ করতে হলে অনেক সূক্ষ্ম বিষয় মাথায় রাখতে হয়। সামনে রাখতে হয় নববী কর্মপন্থা। অতি আবেগ যে কোনো সময় ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। মাহাত্ম্যপূর্ণ এ রজনী সম্পর্কে কয়েকটি বর্ণনা এবং সালাফের কিছ উক্তি রয়েছে। প্রাসঙ্গিক আলোচনাসহ কয়েকটি বর্ণনা ও আসলাফের কিছু উক্তি এখানে তুলে ধরছি।
(১) মু‘আজ ইবনে জাবাল রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলা অর্ধ শা’বানের রজনীতে সৃষ্টিজগতের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং শেরেকে আচ্ছন্ন ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।
(সুনানে ইবনে মাজাহ; হা.নং ১৩৯০, সহীহ ইবনে হিব্বান; হা.নং ৫৬৬৫, [শাইখ শু‘আইব আরনাউত এর মন্তব্য, হাদীসটির ইসনাদ সহীহ])
উপরোক্ত নির্ভরযোগ্য উদ্ধৃতির আলোকে হাদীসটির শাস্ত্রীয় আলোচনায় না গিয়েও এ কথা বলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে, হাদীসটি আমলযোগ্য। আমাদের কিছু ভাইয়েরা শাইখ ইবনে বায রহ. এর একটি আলোচনার আলোকে অর্ধ শা’বানের রজনীর মাহাত্ম্যকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন। কিন্তু ইবনে বায রহ. তাঁর ফাতাওয়াসমগ্রে (মাজমূউ ফাতাওয়া ইবনে বায ১/১৮৬, ১/২৩৫ আততাহযীর মিনাল বিদা’ অধ্যায়) যে আলোচনাটি করেছেন তাতে ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এবং ইবনে রজব হাম্বলী রহ. এর উদ্ধৃতি টেনেছেন। কিন্তু তাঁদের নিজস্ব অভিমতকে তিনি গ্রহণ করেন নি। তাছাড়া ইবনে বায রহ. বহু জাল হাদীসের মুন্ডুপাত করেছেন। কিন্তু উপরোক্ত হাদীসটি তাঁর সে আলোচনায় উল্লেখ করেননি। আর কিছু না হোক উপরোক্ত হাদীসটি সামনে থাকলে মহিমান্বিত এ রজনীকে এভাবে তার অপাঙক্তেয় ঘোষণা করার কথা নয়। জানি না, সংশ্লিষ্ট আলোচনাটি করার সময় ইবনে বায রহ. এর ‘যেহেনে’ উক্ত হাদীসটি ছিল কি না। হয়তো বা তিনি মাত্রাজ্ঞানহীন লোকদের সীমাতিরিক্ত বাড়াবাড়ির প্রতিকারকল্পে এমন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তবে এটা তো ইলমে শরীয়তের একটি স্বীকৃত নীতি যে, প্রান্তিকতা বা বাড়াবাড়ির প্রতিকারে বিধিত বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করে করা যাবে না; বরং বিধানিক বিষয়ের যথাযথ উপস্থাপনের মাধ্যমেই বাড়াবাড়ির প্রতিকার করতে হবে। এবার আমরা বিশেষ ঘরানার সম্মানিত ভাইদের জ্ঞাতার্থে এ বিষয়ে তাদের কয়েকজন আদর্শ পুরুষসহ কয়েকজন মহামনীষীর মন্তব্য তুলে ধরছি।
১। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, অর্ধ শা’বান রজনীর শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে একাধিক মারফু হাদীস ও আসার বর্ণিত হয়েছে। এসব বর্ণনার আলোকে প্রতীয়মান হয়, পনের শা’বানের রজনীটি একটি মহিমান্বিত রজনী। সালাফের কেউ কেউ এ রাতে নফল নামাযের ব্যাপারে যতœবান হতেন। আর শা’বানের রোযার ব্যাপারে তো অসংখ্য হাদীসই বর্ণিত হয়েছে। সালাফ এবং খালাফের মধ্য হতে কেউ কেউ এ রাতের শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করেন। তবে হাম্বলী এবং অহাম্বলী মাসলাকের অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম এ রাতের শ্রেষ্ঠত্বের কথা স্বীকার করেন। ইমাম আহমদ রহ. এর ভাষ্যও এ মতের প্রমাণ বহন করে। কারণ এ সম্বন্ধে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আর এগুলোর সমর্থনে সালাফের আসারও বিদ্যমান রয়েছে। এ রাতের ফযীলত সম্পর্কিত কতক বর্ণনা মুসনাদ ও সুনান শিরোনামে সংকলিত হাদীস গ্রন্থেও বর্ণিত হয়েছে। তবে শা’বানের পনের তারিখের দিনে স্বতন্ত্রভাবে রোযা রাখার ব্যাপারে যতœবান হওয়া মাকরূহ। (ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর অভিমত এটিই। তাঁর মতে পনের তারিখের সাথে দু এক দিন মিলিয়ে রোযা রাখা উত্তম)। আর এ রাতে বিশেষ খাবারের ব্যাবস্থা করা, সাজ-সজ্জার ব্যাপারে যতœবান হওয়া বিদআত; এর কোনো ভিত্তি নেই। তেমনিভাবে এ রাতে ‘সালাতে আলফিয়া’ নামক বানোয়াট নামাযের জন্য মসজিদে সমবেত হওয়াও বিদআত। কারণ নির্দিষ্ট সময়, সংখ্যা এবং কিরাতযোগে এ জাতীয় নফল নামাযের জন্য সমবেত হওয়া শরীয়তসম্মত নয়। (ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম ১৭/১৭ [শামেলা সংস্করণ])
২। বর্তমান সময়ের আলোচিত ব্যক্তিত্ব শাইখ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহ. উপরোল্লিখিত হাদীসটির সমর্থনে আটটি হাদীস উপস্থাপন করে বলেন, এসব সূত্রের সামগ্রিক বিবেচনায় হাদীসটি নিঃসন্দেহে সহীহ।...সুতরাং শাইখ কাসেমী রহ. তাঁর ইসলাহুল মাসাজিদ গ্রন্থে (১৭০) জারহ তা’দীলের ইমামদের উদ্ধৃতির আলোকে ‘অর্ধ শা’বানের রাতের শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে কোনো সহীহ হাদীস নেই’ বলে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে যদি কেউ এ জাতীয় ঢালাও উক্তি করে থাকেন তবে সেটা তার দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রদান এবং সূত্র অনুসন্ধানে কষ্ট স্বীকার করতে না পারার পরিণতি। (সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ ১/১২৪)
৩। ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রহ. এ রাতের ফযীলত সংক্রান্ত দীর্ঘ আলোচনার পর বলেন, একজন মুমিনের জন্য বাঞ্ছনীয় হলো, এ রাতে যিকির ও দুআ-প্রার্থনার জন্য সম্পূর্ণরূপে অবসর হয়ে যাওয়া। সে নিজের পাপ মার্জনা এবং বিপদ-আপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য দু‘আ-প্রার্থনায় রত হবে। খাঁটি মনে তাওবা করবে। কারণ যে ব্যক্তি এ রাতে তাওবা করে তার তাওবা আল্লাহ তা‘আলা কবুল করেন। তবে এক্ষেত্রে মুমিনের জন্য আবশ্যক হলো, দু‘আ কবুল হওয়া ও মাগফিরাত লাভের ক্ষেত্রে যেসব পাপাচার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সেসব থেকে বিরত থাকা। (লাতায়িফুল মা‘আরিফ ফীমা লিমাওয়াসিমিল আমি মিনাল ওয়াযায়িফ ১৯২)
৪। সুনানে তিরমীযীর গাইরে মুকাল্লিদ ভাষ্যকার আল্লামা আব্দুর রহমান মুবারকপুরী রহ. এ রাতের ফযীলত সংক্রান্ত বিভিন্ন হাদীস উল্লেখ করার পর বলেন, এসমস্ত হাদীস ঐসমস্ত ব্যক্তিদের বিপক্ষে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পরিগণিত যারা ধারণা করে, অর্ধ শা’বানের রাতের ফযীলতের ব্যাপারে কোনো কিছুই প্রমাণিত নয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী ৩/৩৬৭)
৫। মিশকাতুল মাসাবীহ এর সমকালীন ব্যাখ্যাতা আবুল হাসান উবাইদুল্লাহ মুবারকপুরী বলেন, ...এসমস্ত হাদীস অর্ধ শা’বান রজনীর মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব এবং মহিমার ব্যাপারে স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। এ রাতটি আর পাঁচটা রাতের মত নয়। সুতরাং এ ব্যাপারে উদাসীন হওয়া উচিৎ নয়। বরং শ্রেয় হল, ইবাদত, দু‘আ এবং যিকির-ফিকিরে রত থেকে এ রাতের অফুরন্ত কল্যাণ অর্জন করা। (মির‘আতুল মাফাতীহ শরহু মিশকাতিল মাসাবীহ ৭/৫৮)
৬। শাইখ ইবনুল হাজ্জ রহ. বলেন, ‘এ রাত যদিও শবে কদরের মত নয়; কিন্তু এর অনেক ফযীলত ও বরকত রয়েছে। আমাদের পূর্বসূরী পূণ্যাত্মারা এই রাতের যথেষ্ট মর্যাদা দিতেন এবং এর যথাযথ হক আদায় করতেন। কিন্তু আজ সাধারণ লোকেরা বিষয়টিকে সম্পূর্ণ উল্টো করে ফেলেছে। তারা রসম-রেওয়াজ ও কুসংস্কারের পেছনে পড়ে (মনের অজান্তেই) এর খায়ের বরকত ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একে তো ওরা এ রাতে আলোকসজ্জার নিকৃষ্টতম রসম যা অগ্নিপূজকদের প্রতীক, তা করছে; অপরদিকে মসজিদসমূহে সমবেত হয়ে শোরগোল করে পবিত্র পরিবেশকে নষ্ট করছে। তাছাড়া মহিলাদের কবরস্তানে যাওয়া, তা-ও আবার বেপর্দা অবস্থায়, পাশাপাশি পুরুষদেরও কবর যিয়ারতের উদ্দেশে ওখানে ভিড় সৃষ্টি করাÑ এসব কিছুই নব আবিষ্কৃত বিদআত এবং নববী সুন্নত ও সালাফে সালেহীনের পথ ও পদ্ধতির পরিপন্থী।’ (আলমাদখাল ১/২৯৯-৩১৩, আলকাউসার, সেপ্টেম্বর ’০৬)
৭। প্রসিদ্ধ হাদীস শাস্ত্রবিদ ইমাম ইবনুস সালাহ রহ. বলেন, অর্ধ শা’বান রজনীর অসীম ফযীলত ও মহত্ত্ব রয়েছে। এ রাতে ইবাদতে রত হওয়া মুস্তাহাব। তবে সেটা ব্যক্তি পর্যায়ে; সমবেত রূপ দিয়ে নয়। (আল-আসারুল মারফূ‘আহ ফিল আখবারিল মাউযু‘আহ ১/৭১)
৮। ইন্টারনেটভিত্তিক ৫৬ হাজার ফতওয়া সম্বলিত আরবী ফতওয়াসমগ্র ‘ফাতাওয়া আশশাবাকাতিল ইসলামিয়া’তেও (২/২৫৬৩) এ রাতের মহত্ত্ব সম্বন্ধে ইতিবাচক আলোচনা করা হয়েছে।
অর্ধ শা’বান রজনীর সপক্ষে এত সূত্র ও ভিত্তি থাকার পরও কোন বিবেকে শুধু ইবনে বায রহ. এর একটি বিচ্ছিন্ন মতের আলোকে এ রাতের মহত্ত্বকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার স্পর্ধা দেখানোর সুযোগ থাকতে পারে?
(২) আলা ইবনুল হারিস রহ. সূত্রে বর্ণিত, আয়েশা রাযি. বলেন, একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে দাঁড়ালেন। কিন্তু সেজদাকে এতটা দীর্ঘায়িত করলেন, আমার ধারণা হলো তাঁর ইন্তেকাল হয়ে গেছে। এ অবস্থা দেখে আমি উঠে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৃদ্ধাঙ্গুলী নাড়া দিলাম। তখন আঙ্গুল নড়ে উঠল। ফলে আমি যথাস্থানে ফিরে এলাম। যখন তিনি সেজদা থেকে মাথা উঠালেন এবং যথা নিয়মে নামায শেষ করলেন তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, আয়েশা! তুমি কি ধারণা করেছো, আল্লাহর নবী তোমার অধিকার ক্ষুণ্ন করবেন? তখন আমি বললাম, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তবে আপনার দীর্ঘ সেজদার কারণে আমি মনে করেছিলাম, আপনার ইন্তেকাল হয়ে গেছে। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা হলো, অর্ধ শা’বানের রজনী। আল্লাহ তা‘আলা অর্ধ শা’বানের রজনীতে তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোনিবেশ করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদেরকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দেন। আবু বকর বাইহাকী রহ. বলেন, এটি উত্তম পর্যায়ের মুরসাল হাদীস। সম্ভবত আলা ইবনুল হারিস মাকহুল থেকে হাদীসটি শ্রবণ করেছেন। (আলজামি’ লিশুআবিল ঈমান হাদীস ৩/৩৮২/৩৮৩৫)
এ হাদীসের আলোকে প্রমাণিত হয়, এ রাতে দীর্ঘ সেজদা সম্বলিত দীর্ঘ নামায আদায় করা শরীয়তের কাঙ্ক্ষিত বিষয়। তবে সাধারণ নিয়মে দু রাকাত, চার রাকাত করে যত রাকাত সম্ভব আদায় করবে। সাথে কুরআন তিলাওয়াত, দুআ-দুরূদ এবং যিকির ইস্তেগফারে মনোযোগী হবে। তবে সবিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন রাত জাগা ক্লান্তির কারণে ফজরের নামাযের অত্যাবশ্যক ইবাদত ছুটে না যায়। আর এসব আমল একান্ত ঘরোয়া পরিবেশেই করা শ্রেয়। তবে যদি কোনোরূপ আহ্বান-ঘোষণা ব্যতিরেকে কিছু লোক মসজিদে এসে যায় এবং ব্যক্তিগতভাবে নিজ নিজ আমলে মগ্ন থাকে তবে এতেও কোনো ক্ষতি নেই। তবে এক্ষেত্রে লক্ষণীয় হলো, আমার ইবাদতের কারণে যেন অন্যের আমলে কোনোরূপ ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়।
এ মাসের পনের তারিখে রোযা রাখার আমলও করা যেতে পারে। এ দিনের রোযার ব্যাপারে সুনানে ইবনে মাজাহতে (হাদীস নং ১৩৮৮) একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটিকে উলামায়ে মুহাদ্দিসীন সূত্রগত দিক থেকে যয়ীফ বলে অভিহিত করেছেন। তবে এ মাসে অধিক পরিমাণ রোযা রাখার বিষয়টি অসংখ্য সহীহ হাদীসে আলোচিত হয়েছে। উপরন্তু শা’বান মাসের ১৫ তারিখ হলো ‘আইয়ামে বীয’ তথা চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখের অন্তর্ভুক্ত। আর আইয়ামে বীযে রোযা রাখার ব্যাপারটি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি মাসের আইয়ামে বীযে রোযা রাখতেন। মিলহান কাইসী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তের চৌদ্দ এবং পনের তারিখে বীযের রোযা রাখার নির্দেশ দিতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪৪৯) আবু হুরায়রা রাযি. বলেন, আমার খলীল (ঘনিষ্ঠ বন্ধু) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে প্রতি মাসে রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯৮১)
ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন, শা’বান মাসের পনের তারিখে রোযা রাখা নিষিদ্ধ নয়। কারণ পনের তারিখ তো আইয়ামে বীযের অন্তর্ভুক্ত। আর প্রতিমাসে আইয়ামে বীযে রোযা রাখা মুস্তাহাব। (লাতায়িফুল মা‘আরিফ ১৮৯)
তবে শুধু ১৫ শা’বানের কারণে এ রোযাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সুন্নত মনে করা অনেক উলামায়ে কেরাম সঠিক মনে করেন না। আর সে কারণেই অধিকাংশ ফুকাহায়ে কেরাম মুস্তাহাব রোযার তালিকায় শা’বানের ১৫ তারিখের রোযাকে স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করেন নি। সুতরাং এসকল বিষয়কে সামনে রেখে যদি কেউ এ দিন রোযা রাখে তবে ইনশাআল্লাহ সে সওয়াব লাভ করবে।
সারকথা, রজব এবং শা’বান দুটি মহিমান্বিত মাস। এ দু’মাসে অধিক পরিমাণে ইবাদত-বন্দেগীতে মনোযোগী হওয়া শরীয়তের কাক্সিক্ষত বিষয়। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে এ দুটি মাসের স্বাভাবিক মর্যাদা ও গুরুত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখে সব ধরনের প্রথাগত রীতি-নীতি পরিহার করে প্রভূত কল্যাণ অর্জনের তাওফীক দান করুন এবং সর্বপ্রকার অকল্যাণ-অনাচার থেকে নিরাপদ থেকে বিশুদ্ধ ধর্মীয় জীবন যাপন করার তাওফীক দান করুন; আমীন!
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy