1 Answers
মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পরও মানুষের অস্তিত্ব থাকে এবং মৃত্যুর পর অন্য ভুবনে যাত্রা শুরু হয় আরেকটি জীবনের। তাই তারা মৃত্যুর পর আত্মীয়-স্বজনের দেহকে আগুনে পোড়াতো না বা স্বাভাবিক পদ্ধতিতে কবরস্থ করত না। বরং অবলম্বন করতো কিছু বিশেষ পদ্ধতি!
যীশু খ্রিস্টের জন্মেরও প্রায় তিন হাজার বছর আগে মিশরীয়রা ভূগর্ভস্থ কক্ষে শায়িত অবস্থায় বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করে মৃতদেহকে কবরস্থ করতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মরুভূমির বুকেই মমি তৈরির মাধ্যমে মৃতদেহকে কবরস্থ করে সংরক্ষণ করা হতো। সাধারণ মানুষের কবরের সঙ্গে বিশিষ্ট মানুষের কবরের মধ্যে পার্থক্য রাখাতেও বিশ্বাসী ছিল তারা। আর এই জন্যই বিশিষ্ট ব্যক্তি যেমন ফারাওদের কবর বা সমাধি ক্ষেত্র হিসাবে আমরা দেখতে পাই সুবিশাল পিরামিডকে।

সেই পিরামিডে কেবল ফারাওকে সমাধিস্থ করা হতো না, বরং মৃত্যুর পর নতুন জীবনে ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল সামগ্রী দিয়ে দেয়া হতো। তালিকায় থাকতো সোনা-দানা, ধন সম্পদ হতে শুরু করে সৈন্য-সামন্ত ও দাসদাসী। হ্যাঁ, জীবিত মানুষকে হত্যা করেই মৃত ফারাওয়ের সাথে দিয়ে দেয়া হতো পরপারের সঙ্গী হিসাবে। কেননা মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো যে দেহ বিনষ্ট হলে মৃত্যুর পর নতুন জীবন শুরু করা যায় না। আর দেহকে সংরক্ষণ করার জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করতো মিশরীয়রা, সেটাই হচ্ছে মমিফিকেশন।
গোড়ার দিকে মমি সংরক্ষণ পদ্ধতিতে কিছু ত্রুটি থাকার জন্য মৃতদেহ দীর্ঘদিন অবিকৃত থাকত না। আস্তে আস্তে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মমি তৈরির পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটিয়ে মৃতদেহকে দীর্ঘদিন অবিকৃত রাখার ব্যবস্থা করা হয়। মানুষের মৃত্যুর পর তার দেহ থেকে পচন ধরার সম্ভাবনা আছে এরকম কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন_ পাকস্থলি, মস্তিষ্ক, ফুসফুস ও যকৃত প্রভৃতি অংশ কেটে বাদ দেওয়া হতো প্রথমেই। কেটে নেওয়া দেহের অংশগুলোকে চারটি বিশেষ বিশেষ পাত্রে রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হত। পরে অবশ্য সেগুলোকে আবার মৃতদেহে রেখে দেওয়া হতো। কখনো আবার জারের মাঝে থাকা অবস্থাতেই সমাধিস্থ করা হতো।

অঙ্গ গুলো বের করে নেয়ার পর শুকনো লবণ মাখিয়ে মৃতদেহটিকে শুকিয়ে নেওয়া হত। পেটের কাটা অংশ সেলাই করা হত সতর্কতার সঙ্গে যাতে ভেতরে বাতাস ঢুকতে না পারে। এবার এক গামলা পাইন গাছের বর্জ্য পদার্থ(আঠা) মৃতদেহের গায়ে লেপে ভালো করে ঘষে-মেজে দেয়া হতো, তারপর লিনেন কাপড়ের চওড়া ফিতে জড়িয়ে মৃতদেহটিকে বেশ পুরু করে বেঁধে ফেলা হতো। লিনেন কাপড় ব্যবহারের কারণ হচ্ছে তা বায়ু নিরোধক। একটি ডালাযুক্ত কাঠ বা ধাতুর তৈরি বাক্সে লিনেন কাপড়ে আপাদমস্তক মোড়ানো মমিটিকে রাখা হত। ফারাওদের ক্ষেত্রে সোনার তৈরি কফিনও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। এবার শুরু হতো সমাধিস্থ করার কাজ।
সাধারণত কবরের চেয়ে এর আয়তন অনেক বেশি করা হতো, কেননা এতে অতিকায় কাঠের বাক্স সমেত মৃতদেহটিকে রাখতে হতো। তার ওপর মৃতদেহের সঙ্গে তার জীবিতকালে যেসব বস্তু প্রিয় ছিল সেই সমস্ত জিনিস কবরে দেওয়া হত। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল মৃত ব্যক্তির আত্মা পাখির আকৃতি ধারণ করে সারাদিন মনের সুখে এখানে-ওখানে উড়ে বেড়ায়। দিনের শেষে আত্মা আবার নিথর দেহে ফিরে আসে। তাই তাদের জন্য থালা, ঘটি-বাটি থেকে আসবাবপত্রাদি সবই দরকার। এরকম ধারণা থেকে জীবিত মানুষের কাছে যা কিছু অত্যাবশ্যকীয় সবই কবরের মধ্যে দিয়ে দেওয়া হত। কারো জন্য তৈরি হতো বিরাট সমাধিক্ষেত্র, কারো কবর হতো একদম সাদামাটা। এটাই যা পার্থক্য।