1 Answers

ছোটবেলা থেকেই আমরা দেখে আসছি, একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ক্রমাগত ঘুরতে থাকলে আমাদের মাথা ঘুরতে থাকে এবং ভারসাম্যের বারোটা বেজে যায়। এমনকি বন্ধুবান্ধবের সাথে একসাথে হাত ধরে ঘুরলেও একই অবস্থা হয়। ঘোরা থামানোর পরে আমাদের মাথার চারপাশে পৃথিবীটা বনবন করে ঘুরতে থাকে আর আমরা নিজেদের সামলাতে গিয়ে বসে পড়ি। খুব বেশি দ্রুত ঘুরলে অনেক সময় সমস্যা এত বেশি হয় যে অনেকে বমি করে ফেলে। কিন্তু একবার ভাবুন তো, নাচিয়েরা কি করে এই কাজটি করে? নাচের সময়ে তো প্রায়ই তাদের ঘুরতে হয়। আমাদের দেশের সনাতনধর্মী নাচিয়ে, বিদেশি ব্যালেরিনা অথবা বরফের ওপরে স্কেটিং করা মানুষদের অহরহই এভাবে ঘুরতে দেখা যায় অথচ তাদের এরপর মাথা ঘোরে না কেন? এই অদ্ভুতুড়ে প্রশ্নের জবাবও রয়েছে। Cerebral Cortex জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় জানা যায়, নাচিয়েরা নিজেদের মস্তিষ্ককে এমনভাবেই প্রশিক্ষিত করে নেন যাতে এভাবে ঘুরলেও তাদের ভারসাম্যে সমস্যা না হয়। এই তথ্য ব্যবহার করে এমন সব রোগীকে সারানো সম্ভব হবে যাদের বেশি পরিমাণে মাথা ঘোরার সমস্যা আছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এর ডক্টর ব্যারি সিমুঙ্গাল এবং তার গবেষক দল সম্প্রতি এ বিষয়ে গবেষণার তথ্য প্রকাশ করেন। আমাদের মাথা ঘোরার এই ঘটনার জন্য দায়ী হল আমাদের অন্তঃকর্ণের গঠন। অন্তঃকর্ণে রয়েছে ভেস্টিবুলার অর্গান নামের তরলপূর্ণ কিছু অঙ্গাণু। এদের ভেতরে থাকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কিছু রোম যা আমাদের শরীরের নড়াচড়ার সাপেক্ষে আমাদের ভারসাম্য ঠিক করে। আমরা সোজা থাকলে এই তরলও স্থির থাকে এবং আমরা হেলে গেলে এটিও একদিকে গড়িয়ে যায়। আমরা যখন ক্রমাগত ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ থেমে যাই তখন আমাদের কানের ভেতরে এই অঙ্গানুর মাঝে তরল এত তাড়াতাড়ি স্থির হয় না বরং এগুলো এদিক ওদিক ছলকে যায়। ফলে আমাদের ভারসাম্য হারায় ও মাথা ঘোরে। কিছু কিছু নাচিয়ে এই মাথা ঘোরার অনুভূতি কমিয়ে আনতে “স্পটিং” নামের একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এ পদ্ধতিতে তারা ঘোরার সময়ে বারবার একই স্পট বা বিন্দুর দিকে চোখ রাখেন ফলে মাথা ঘোরা কমে আসে। কিন্তু এ ছাড়াও দেখা যায় নাচিয়েরা নিজেদের মস্তিষ্ককে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়েছেন যাতে এই অনুভূতি এড়ানো যায়। তাদের ওপর পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাদের মস্তিষ্ক এই ভেস্টিবুলার অর্গানগুলো থেকে সংকেত গ্রহণ করে অনেক কম পরিমাণে এবং তাই তাদের ভারসাম্য খুব একটা প্রভাবিত হয় না। এই পরীক্ষায় গবেষকরা ২৯ জন নারী নাচিয়ের একটি দল এবং ২০ জন নারী নৌকা বাইচ খেলোয়াড়ের একটি দল বেছে নেন। তাদেরকে একটি অন্ধকার ঘরে ঘুরতে বলা হয় এবং থেমে যাবার পর একটি হ্যান্ডেল দেওয়া হয় তাদেরকে। তাদের মাথা ঘোরার পরিমাণ কতটা তীব্র তা প্রকাশ করার জন্য একই বেগে ওই হ্যান্ডেল ঘোরানোর নির্দেশ দেওয়া হয় তাদেরকে। এই হ্যান্ডেল ঘোরানো থেকে তারা তথ্য সংগ্রহ করেন। এছাড়াও ভেস্টিবুলার অর্গান থেকে পাওয়া সংকেত তাদের চোখের নড়াচড়াকে কিভাবে প্রভাবিত করছে সেটাও তারা রেকর্ড করেন। সর্বশেষে এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের চিত্র নেওয়া হয় MRI মেশিন দ্বারা। গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, নৌকা বাইচ খেলোয়াড়দের চাইতে নাচিয়েদের দল অনেক ভালো ফলাফল দেখিয়েছে। অর্থাৎ নাচিয়েদের মাথা ঘোরার পরিমাণ অনেকটাই কম। MRI চিত্রে দেখা যায়, ভেস্টিবুলার অর্গান থেকে আসা সংকেত মস্তিষ্কের যে অঞ্চলে গ্রহণ করা হয়, নাচিয়েদের মস্তিষ্কে সে অঞ্চলটি অনেক ছোট। ভারসাম্যহীনতা ঠেকাতে তাদের মস্তিষ্ক নিজে থেকেই এভাবে নিজেকে গড়ে নিয়েছে। পেশাগত কারনেই ঘুরতে ঘুরতে ভারসাম্য হারিয়ে গেলে একজন নাচিয়ের বেশ সমস্যা হবে আর তাই বছরের পর বছর নাচের চর্চা করতে করতে তাদের মস্তিষ্কে এমন বৈশিষ্ট্য উদ্ভুত হয়। এই ঘটনা থেকে গবেষকরা আশা করছেন মাথা ঘোরার উপযুক্ত প্রতিকার আবিষ্কার করা সম্ভব হবে।

3369 views

Related Questions