3 Answers
আহলেহাদীছ-এর পরিচয় : পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের নিঃশর্ত অনুসারী ব্যক্তিকে ‘আহলেহাদীছ’ বলা হয়। যিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের সিদ্ধান্তকে শর্তহীনভাবে মেনে নিবেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের তরীকা অনুযায়ী নিজের সার্বিক জীবন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবেন, কেবলমাত্র তিনিই এ নামে অভিহিত হবেন। এটি ইসলামের আদিরূপ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, যা ছাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে এ যাবৎ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরিচালিত হয়ে আসছে। উল্লেখ্য যে, আহলেহাদীছ হওয়ার জন্য রক্ত, বর্ণ, ভাষা ও অঞ্চল শর্ত নয়। ছাহাবায়ে কেরাম হ’লেন জামা‘আতে আহলেহাদীছের প্রথম সারির সম্মানিত দল। যাঁরা এ নামে অভিহিত হ’তেন। যেমন প্রখ্যাত ছাহাবী আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) কোন মুসলিম যুবককে দেখলে খুশী হয়ে বলতেন, রাসূল (ছাঃ)-এর অছিয়ত অনুযায়ী আমি তোমাকে ‘মারহাবা’ জানাচ্ছি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে তোমাদের জন্য মজলিস প্রশস্ত করার ও তোমাদেরকে হাদীছ বুঝাবার নির্দেশ দিয়ে গেছেন। কেননা তোমরাই আমাদের পরবর্তী বংশধর ও পরবর্তী আহলুল হাদীছ’।[ খত্বীব বাগদাদী, শারফু আছহাবিল হাদীছ পৃঃ ১২; আলবানী, সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৮০ ।] ‘বড় পীর’ বলে খ্যাত শায়খ আব্দুল কাদের জীলানী (মৃঃ ৫৬১ হিঃ) ‘নাজী’ ফের্কা হিসাবে আহলেসুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বর্ণনা দেওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে বিদ‘আতীদের ক্রোধ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, বিদ‘আতীদের নিদর্শন হ’ল আহলেহাদীছদের গালি দেওয়া ও বিভিন্ন নামে তাদের সম্বোধন করা। এগুলি সুন্নাতপন্থীদের বিরুদ্ধে তাদের দলীয় বিদ্বেষ ও অন্তর্জ্বালার বহিঃপ্রকাশ ভিন্ন কিছুই নয়। কেননা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অন্য কোন নাম নেই একটি নাম ব্যতীত। সেটি হ’ল ‘আছহাবুল হাদীছ’ বা আহলেহাদীছ।[ আব্দুল কাদের জীলানী, কিতাবুল গুনিয়াহ ওরফে গুনিয়াতুত ত্বালেবীন (মিসরী ছাপা, ১৩৪৬ হিঃ), ১/৯০ পৃঃ ।] স্পেনের বিখ্যাত মনীষী হিজরী পঞ্চম শতকের ইমাম ইবনু হযম আন্দালুসী (৩৮৪-৪৫৬ হিঃ) বলেন, আহলেসুন্নাত ওয়াল জামা‘আত যাদেরকে আমরা হকপন্থী ও তাদের বিরোধীদের বাতিলপন্থী বলেছি, তারা হলেন, (ক) ছাহাবায়ে কেরাম (খ) তাদের অনুসারী শ্রেষ্ঠ তাবেঈগণ (গ) আহলেহাদীছগণ (ঘ) ফক্বীহদের মধ্যে যাঁরা তাঁদের অনুসারী হয়েছেন যুগে যুগে আজকের দিন পর্যন্ত (ঙ) এবং প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সকল ‘আম জনসাধারণ, যারা তাঁদের অনুসারী হয়েছে’।[ ইবনু হযম, কিতাবুল ফিছাল, বৈরূত: ১/৩৭১ ।] ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (৬৬১-৭২৮ হিঃ) বলেন, মুসলমানদের মধ্যে আহলেহাদীছদের অবস্থান এমন মর্যাদাপূর্ণ, যেমন সকল জাতির মধ্যে মুসলমানদের অবস্থান’।[ ইবনু তায়মিয়াহ, মিনহাজুস সুন্নাহ, বৈরূত: ২/১৭৯ ।] ভারতগুরু শাহ অলিউল্লাহ দেহলভী (১১১৪-৭৬/১৭০৩-৬২খৃঃ) বলেন, চতুর্থ শতাব্দী হিজরীর পূর্বে কোন মুসলমান নির্দিষ্টভাবে কোন একজন বিদ্বানের মাযহাবের তাক্বলীদের উপর সংঘবদ্ধ ছিল না’।[ শাহ অলিউল্লাহ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ১/১৫২-৫৩ ‘চতুর্থ শতাব্দীর পূর্বের ও পরের লোকদের অবস্থা’ অনুচ্ছেদ।] হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (৬৯১-৭৫১হিঃ) বলেন, মাযহাবী তাক্বলীদের এই বিদ‘আত আবিষ্কৃত হয়েছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ভাষায় নিন্দিত ৪র্থ শতাব্দী হিজরীতে[ ইবনুল ক্বাইয়িম, ই‘লামুল মুওয়াকক্বেঈন ২/২০৮ ।] শাহ অলিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) বলেন, আববাসীয় খলীফা হারূনুর রশীদের খেলাফতকালে (১৭০-৯৩/৭৮৬-৮০৯ খৃঃ) আবু হানীফা (রহঃ)-এর প্রধান শিষ্য আবু ইউসুফ (রহঃ) প্রধান বিচারপতি থাকার কারণে ইরাক, খোরাসান, মধ্য তুর্কিস্তান প্রভৃতি অঞ্চলে হানাফী মাযহাবের বিস্তৃতি ঘটে’।[ হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ১/১৪৬ ‘ফক্বীহদের মাযহাবী মতভেদের কারণ সমূহ’ অনুচ্ছেদ।] পরে হানাফীরা শাফেঈদের বিরুদ্ধে মোঙ্গলবীর হালাকু খাঁকে ডেকে আনলে ৬৫৬/১২৫৮ খৃষ্টাব্দে বাগদাদের আববাসীয় খেলাফত ধ্বংস হয়ে যায়। এ সময়ের কিছু পূর্বে গযনীর সুলতান মোহাম্মাদ ঘোরীর তুর্কী গোলাম কুতুবুদ্দীন আইবক ও ইখতিয়ারুদ্দীন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজীর মাধ্যমে ৬০২ হিঃ/১২০৩ খৃষ্টাব্দে দিল্লী হ’তে বাংলা পর্যন্ত সামরিক বিজয় সাধিত হয়। এঁরা ছিলেন নওমুসলিম তুর্কী হানাফী। যাতে মিশ্রণ ঘটেছিল তুর্কী, ঈরানী, আফগান, মোগল, পাঠান এবং স্থানীয় হিন্দু ও বৌদ্ধ আক্বীদা ও রীতি-নীতি সহ অসংখ্য ভারতীয় কুসংস্কার। ছাহাবা, তাবেঈন এবং আরব বণিক ও মুহাদ্দিছগণের মাধ্যমে ইতিপূর্বে প্রচারিত বিশুদ্ধ ইসলামের সাথে যার খুব সামান্যই মিল ছিল’। এ সময়কার অবস্থা বর্ণনা করে খ্যাতনামা ভারতীয় হানাফী বিদ্বান আব্দুল হাই লাক্ষ্ণৌবী (১৮৪৮-৮৬ খৃঃ) বলেন, ‘ফিক্বহ ব্যতীত লোকেরা কুরআন ও হাদীছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। ...আহলেহাদীছগণকে তারা জানত না। কেউ কেউ ‘মিশকাত’ পড়লেও তা পড়ত বরকত হাছিলের জন্য, আমল করার জন্য নয়। তাহকীকী তরীকায় নয়। বরং তাকলীদী তরীকায় ফিক্বহের জ্ঞান হাছিল করাই ছিল তাদের লক্ষ্য’।[ আহলেহাদীছ আন্দোলন, ডক্টরেট থিসিস (রাবি ১৯৯২; প্রকাশক, হা.ফা.বা. ১৯৯৬), পৃঃ ২৩০ ।] সুলায়মান নাদভী (১৮৮৪-১৯৫৩) বলেন, ‘তুর্কী বিজয়ী যারা ভারতে এসেছিলেন, দু’চারজন সেনা অফিসার ও কর্মকর্তা বাদে তাদের কেউই না ইসলামের প্রতিনিধি ছিলেন, না তাদের শাসন ইসলামী নীতির উপর পরিচালিত ছিল। এরা ছিলেন আরব বিজয়ীদের থেকে অনেক দূরে’।[ প্রাগুক্ত।] তাই বলা চলে যে, মধ্য এশিয়া থেকে উত্তর ভারত হয়ে তুর্কী-ঈরানী সাধক-দরবেশদের মাধ্যমে ও রাজশক্তির ছত্রছায়ায় পরবর্তীতে বাংলাদেশে যে ইসলাম প্রচারিত হয়, তা ইতিপূর্বে আরব বণিক ও মুহাদ্দিছ ওলামায়ে দ্বীনের মাধ্যমে বাংলাদেশে আগত প্রাথমিক যুগের মূল আরবীয় ইসলাম হ’তে বহুলাংশে পৃথক ছিল। ফলে হানাফী শাসক ও নবাগত মরমী ছূফীদের প্রভাবে বাংলাদেশের মুসলমানেরা ক্রমে হানাফী ও পীরপন্থী হয়ে পড়ে। তারা বহুবিধ কুসংস্কার এবং শিরক ও বিদ‘আতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এভাবে এদেশের মূল শরীয়তী ইসলাম পরবর্তীতে লৌকিক ইসলামে পরিণত হয়। যার ফলশ্রুতিতে ঘোড়াপীর, তেনাপীর, ঢেলাপীর প্রভৃতি অসংখ্য ভুয়া পীর বাংলার মুসলমানের পূজা পায়।[ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪০৩-০৫ ।] শাহ অলিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) বলেন, হানাফী মাযহাবের ক্বিয়াসী ফৎওয়া সমূহ এবং ফিক্বহ ও উছূলে ফিক্বহের নামে যেসব মাসআলা-মাসায়েল ও আইনসূত্র সমূহ লিখিত হয়েছে, সেগুলিকে ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর দুই শিষ্যের দিকে সম্বন্ধিত করার ব্যাপারে একটি বর্ণনাও বিশুদ্ধ নয়’।[ শাহ অলিউল্লাহ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ১/১৬০ ।] তিনি ‘আহলুল হাদীছ ও আহলুর রায়-এর পার্থক্য’ শিরোনামে তাঁর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ্র মধ্যে (১/১৪৭-৫২) আহলেহাদীছ বিদ্বানগণের দলীল গ্রহণের নীতিমালা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। তিনি মযহাবপন্থী মুক্বাল্লিদগণের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘তারা মনে করে যে, একটি মাসআলাতেও যদি তাদের অনুসরণীয় বিদ্বানের তাক্বলীদ হতে সে বেরিয়ে আসে, তাহলে হয়তবা সে মুসলিম মিল্লাত থেকেই খারিজ হয়ে যাবে। ঐ বিদ্বান যেন একজন নবী, যাকে তার কাছে প্রেরণ করা হয়েছে’।[ ঐ, তাফহীমাতে ইলাহিয়াহ ১/১৫১ ।] তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ছালাতে রাফ‘উল ইয়াদায়েন করে, ঐ ব্যক্তি আমার নিকট অধিক প্রিয় ঐ ব্যক্তির চাইতে, যে ব্যক্তি রাফ‘উল ইয়াদায়েন করে না। কেননা রাফ‘উল ইয়াদায়েনের হাদীছ সংখ্যায় অধিক এবং অধিকতর মযবুত’।[ ঐ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ২/১০ ।] হানাফী ও শাফেঈ মাযহাবের বিশ্বস্ত ফিক্বহ গ্রন্থ হেদায়া, আল-ওয়াজীয প্রভৃতির অমার্জনীয় হাদীছবিরোধিতা সম্পর্কে আব্দুল হাই লাক্ষ্ণৌবী বলেন, এগুলি মওযূ বা জাল হাদীছ দ্বারা পরিপূর্ণ।[ আব্দুল হাই লাক্ষ্ণৌবী, নাফে‘ কাবীর (জামে‘ ছগীর-এর ভূমিকা, লাক্ষ্ণৌ : ১২৯১ হিঃ), পৃঃ ১৩ ।] ইমাম ইবনু দাক্বীকুল ঈদ (মৃ: ৭০২ হিঃ) চার মাযহাবে প্রচলিত ছহীহ হাদীছ বিরোধী ফৎওয়াসমূহের একটি বিরাট সংকলন তৈরী করেছিলেন। যার ভূমিকাতে তিনি ঘোষণা করেছেন যে, এই মাসআলাগুলিকে চার ইমামের দিকে সম্বন্ধ করা ‘হারাম’।[ ছালেহ ফুল্লানী, ঈক্বাযু হিমাম পৃঃ ৯৯ ।] কারণ চার ইমামের প্রত্যেকে ‘আহলেহাদীছ’ ছিলেন এবং তারা প্রত্যেকে বলে গেছেন, যখন তোমরা ছহীহ হাদীছ পাবে, জেনে রেখ সেটাই আমাদের মাযহাব’।[ শা‘রানী, কিতাবুল মীযান (দিল্লী ছাপা, ১২৮৬ হিঃ), ১/৭৩ পৃঃ।] আহলেহাদীছগণ তাঁদের সেকথাই মেনে চলেন এবং তাদের সার্বিক জীবন পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
উৎপত্তি ও ইতিহাস :
আহলে হাদীস পরিভাষাটি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ. এর হাত ধরেই উৎপত্তি লাভ করে। এর পূর্বে হুবহু এ শব্দটির ব্যবহার তেমন পাওয়া যায় না। অবশ্য আহলে হাদীস শব্দের সমর্থক শব্দের ব্যবহার এর পূর্বে সাহাবা তাবিয়ীদের যুগেও লক্ষ্য করা যায়। নবম শতাব্দিতে খলীফা মামুনুর রশীদের খিলাফত যুগে যখন কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি কি সৃষ্টি নয়- এ দ্বন্দ্ব
মাথা চাড়া দিয়ে উঠে তখন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং তার হাদীস বিশেষজ্ঞ শিষ্যগণ এক্ষেত্রে নীরবতার পথ অবলম্বন করেন। তখন থেকেই আহলুল হাদীস শব্দটি
ব্যাপকভাবে আলোচনায় উঠে আসে। ফলে শব্দটি একটি পারিভাষিক রূপ পরিগ্রহ করে।