1 Answers
আপাত দৃষ্টিতে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার মধ্যে কোন পার্থক্য সাধারনের নজরে পড়েনা। শুধু সাধারন নয় , বিজ্ঞলোকেরাও অনেক সময় বিষয় দুটোকে এক করে ফেলেন। কিন্তু মূল্যবোধ ও নৈতিকতার মাঝে স্পষ্টতই সুনির্দিষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। দুটো ভিন্ন মাত্রার জিনিস। মূল্যবোধ শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট সমাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। স্থান, কাল পাত্রভেদে এর পরিবর্তন, পরিবর্ধন, বিয়োজন, পার্থক্য বিদ্যমান। এর প্রভাব ক্ষুদ্র বলয়ে সীমাবদ্ধ। কিন্তু নৈতিকতা বিরাট বিষয়। এর প্রভাব সর্বজনীন। পৃথিবীর সর্বক্ষেত্রে, সর্বস্থানে এর প্রায়োগিক বিষয়টিতে কোন পার্থক্য করা যায় না। এতে বিয়োজন, পরিবর্তন, পরিবর্ধন গ্রহণযোগ্য নয়, সম্ভবও নয়। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। মূল্যবোধ বলতে সাধারন ভাষায় সুনির্দিষ্ট কোন সমাজে প্রচলিত অথবা সমাজ কর্তৃক চাহিত কাংখিত জীবনব্যবস্থাকে বুঝায়। এর প্রভাব শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সমাজ, নির্দিষ্ট বলয়ে বিদ্যমান। পশ্চিম ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার সমাজে যে মূল্যবোধ বিদ্যমান তা উপমহাদেশের সমাজে বেমানান। সেখানকার সমাজে লিভ টুগেদার, বিবাহ বহির্ভূত সন্তানলাভ, মদ্যপান খুবই স্বাভাবিক এবং অবশ্যই নিন্দিত নয়। কিন্তু আমাদের উপমহাদেশের সমাজে এ সমস্ত কার্যকলাপ শুধু নিন্দিতই নয় বরং যেকোন মূল্যে প্রতিরোধযোগ্য। তেমনি আরব সমাজে প্রচলিত বহুবিবাহ, অধিক সন্তানলাভ প্রভৃতি প্রথা দূরপ্রাচ্য এমনকি আমাদের উপমহাদেশের সমাজেও গ্রহণযোগ্য নয়। ভুটানে কোন পরিবারের বড় বোনকে বিয়ে করলে সে পরিবারের অন্য কন্যারাও যিনি বড় বোনকে বিয়ে করেছেন তার পাত্রী হিসেবে পরিগনিত হন। সে কারণেই ভুটানের রাজা ওয়াংচুক আপন চার বোনের স্বামী। কিন্তু মুসলিম সমাজে একই সাথে আপন দু'বোনকে বিয়ে করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মূল্যবোধ যে স্থানভেদে পরিবর্তিত হয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে মহাভারতের একটি ঘটনাকে উপস্থাপন করা যেতে পারে। হস্তিনাপুরের রাজসভায় দুর্যোধন ও তার মামা শকুনীর কাছে জুয়ার হেরে যুধিষ্ঠির ও তার চার ভাই ১৩ বৎসরের জন্য বনবাস ও এক বছরের জন্য অজ্ঞাতবাসে যেতে বাধ্য হন। বনবাস অবস্থায় অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে স্বর্গাধিপতি ইন্দ্রের কাছ থেকে যুদ্ধবিদ্যায় অধিক পারদর্শীতা অর্জন ও বর প্রাপ্তির জন্য স্বর্গে গমন করেন। স্বর্গে অবস্থানকালে উর্বশী নামক এক অপ্সরা অর্জুনকে প্রেম নিবেদন করেন। তো স্বর্গের প্রেম পৃথিবীর লায়লা-মজনুর প্রেমের মতো নিরেট আত্মিক প্রেম নয়। এটা স্রেফ যৌনতা। অর্জুন পৃথিবীর মানুষ। বিবাহ বহির্ভুত যৌনতা তার মূল্যবোধের বিরুদ্ধ কাজ। সেই বিবেচনায় সে উর্বশীর প্রেমকে অস্বীকার করেন। কিন্তু উর্বশী স্বর্গের জীবনে অভ্যস্ত। অবাধ যৌনতা কিংবা স্বর্গের বাসিন্দাদের ইচ্ছানুযায়ী যৌনসঙ্গ প্রদান করা তার মূল্যবোধ বিরুদ্ধ নয়। তাই অর্জুনের এই 'অস্বীকার' করাকে সে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। তার আবেদন অস্বীকার করার কারণে সে অর্জুনকে অভিশাপ দেয় এবং অভিশাপের কারণে অর্জুন পৃথিবীতে ফিরে আসার পর এক বছর নপুংশকের জীবনধারণে বাধ্য হন। অভিশপ্ত জীবনটা অর্জুন হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছেন তথাপি তার মূল্যবোধকে বিসর্জন দেননি। এক্ষেত্রে অর্জুন ও উর্বশী দু'জনই তাদের মূল্যবোধ বিবেচনায় সঠিক। স্বর্গের অবাধ যৌনতায় অভ্যস্ত উর্বশী অর্জুনের অক্ষমতাকে কাপুরুষতা হিসেবে দেখেছে। তাই সে তাকে অভিশাপ দিয়েছে। অন্যদিকে পৃথিবীর জীবনে অভ্যস্ত অর্জুন 'নপুংশক' জীবনকে বেছে নিয়েছেন। তবুও তার মূল্যবোধকে বিসর্জন দেননি। মূল্যবোধ সময়ের বিবর্তনেও পরিবর্তিত হতে পারে। আজ থেকে পঞ্চাশ কিংবা একশ বছর আগে সমাজে সামন্ত প্রভুদের যে প্রভাব ছিল, মোল্লাতন্ত্রের যে দৌরাত্ম ছিল, মেয়েদের বা মুক্তচিন্তাকে অবদমিত করে রাখার যে প্রয়াস ছিল তা কিন্তু এখন অনেক কমে গেছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এবং আশা রাখি আগামী পঞ্চাশ বছরে এই অবদমন করে রাখার প্রয়াসটি একেবারেই বিলুপ্ত হবে। সমাজের সকল ব্যক্তির উপরও একই মূল্যবোধ প্রযোজ্য নয়। মূল্যবোধ অবশ্যই ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান ও পারিপার্শ্বিকতার উপর নির্ভর করে এবং প্রেক্ষিত বিবেচনায় এর ধ্রুবক পরিবর্তিত হয়। ষাট বৎসরের বৃদ্ধের কাছ থেকে আপনি যে আচরণ আশা করেন তা একজন পরিপূর্ণ যুবকের কাছ থেকে আশা করা কোন অবস্থায়ই যৌক্তিক নয়। বাবার আচরণ ও পুত্রের আচরণ কখনই এক হবেনা। শিক্ষক ও ছাত্র দুজনের কাছ থেকেই একই মূল্যবোধ আশা করা বোকামি। তেমনি একজন রাষ্ট্রপধান যতটা শালীন ও সংযমী হবেন সেই একই রকমের শালীনতা ও সংযম সাধারনের কাছ থেকে আশা করার কোন মানে নেই। অপরদিকে সদা সত্য কথা বলা, অন্যের ক্ষতি না করা, সম্ভব হলে উপকার করা, বাবা- মায়ের সেবা করা, বয়স্কদের সন্মান করা, নিজের দেশ ও দেশের আইনের প্রতি অনুগত থাকা এবং সর্বোপরি প্রয়োজনে দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা নৈতিকতার অন্তর্ভুক্ত। এই নৈতিকতা সবার উপর সমানভাবে প্রযোজ্য। এর আবেদন সর্বজনীন। রাষ্ট্রপ্রধান বা সাধারনের মাঝে একে ভাগ করা যায় না। পৃথিবীর সকল স্থানেই এর প্রভাব সমান। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো রাষ্ট্রে মূল্যবোধের চেয়ে নৈতিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করার উপর সবসময় জোর দেয়। মূল্যবোধগুলো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপরই ছেড়ে দেয়া হয়। অপরদিকে নৈতিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু আমাদের দেশ এদিক থেকে ব্যতিক্রম। আমরা মূল্যবোধের আদলেই নৈতিকতাকে অর্জন করতে চাই। এতে অবশ্য দোষের কিছু ছিলনা যদি সেই মূল্যবোধ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি হতে উৎপন্ন হত। আমাদের নীতিনির্ধারকগণ নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে রাষ্ট্রে নৈতিকতাকে প্রতিষ্টিত করার জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধ ও শিক্ষাকে বেছে নিয়েছেন। সে কারণেই আমাদের শিক্ষব্যবস্থায় নৈতিকতা অর্জনের জন্য ধর্মীয় মাধ্যমকে বেছে নেয়া হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকের নৈতিক শিক্ষাগুলো ধর্মভিত্তিক। এটা শুধু ধর্মীয় শিক্ষার জন্য গঠিত মাদ্রাসাগুলোর জন্যই নয়, সাধারন শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বিজাতীয় এ মূল্যবোধ আত্মস্থ করতে গিয়ে আমরা নিজেরা এবং আমাদের সন্তানদের সত্যিকারের নৈতিকতা অর্জন থেকে বঞ্চিত করছি এবং নৈতিকতার মুলধারণা থেকে বিচ্যুত হয়েছি। এ মূল্যবোধের শিক্ষা আমাদের নৈতিকতার সর্বোচ্চ শিখর অর্থাৎ দেশপ্রেম থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। এ কারণেই শুধু মাদ্রাসায় শিক্ষায় শিক্ষিত নয়, সাধারন শিক্ষায় শিক্ষিত কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় পৃথিবীতে তার প্রিয় স্থান কি তবে নিশ্চিত উত্তর আসবে মক্কা, মদীনা। নিজের দেশের কথা হয়ত রাওয়ালপিন্ডি বা ইসলামাবাদের পরে উচ্চারণ করবে। শুধু তাই নয়, এ শিক্ষার কারণেই নিজদেশের জাতীয় সংগীত পায়ের নীচের গড়াগড়ি খেলেও তারা উৎকন্ঠিত হয়না। কিন্তু আরবীতে লিখিত কোন অশ্লীল বাক্যও যদি রাস্তায় পরে থাকতে দেখে তবে তা পরম যত্নে তুলে সযতনে তুলে চুমু খায়।। এ শিক্ষার কারণেই নিজের লালন-পালনকারী পিতামাতার চাইতেও কোন এক প্রেরিত মহাপুরুষ তাদের কাছে অতি প্রিয়, যদিও সে পুরুষকে তারা কোনদিনও দেখেনি। কোনদিন দেখার সম্ভাবনাও নেই। তবে সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ও চিন্তার বিষয় হচ্ছে ধর্মীয় মূল্যবোধের অধিকারী এ ব্যক্তিরা শুধু দেশপ্রেমে উদাসীনই নয় বরং ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করার মানসে ক্ষেত্রবিশেষে দেশকে ধ্বংস করতে উদ্যত। এ কারণেই দেশের ৬৪টি জেলায় একসাথে বোমা ফাটাতে তারা পেছপা হয়না। বিচারালয়গুলো ধ্বংস করতে এবং এর সাথে সংশ্লিষ্টদের হত্যা করতে কুন্ঠিত হয়না। অন্যদিকে আমরা যাদের মূল্যবোধ এবং সামাজিক আচরণ নিয়ে হাসি ঠাট্টা করি সেই আমেরিকার একজন খ্রীস্টান কখনই নিজের দেশের চাইতে জেরুজালেম কিংবা ভ্যাটিকানকে বড় মনে করেনা। নিজের মাতৃভাষার চাইতে হিব্রুভাষাকে বেশি মূল্য দেয়না। তেমনি করে একজন জাপানী বা ভিয়েতনামী বৌদ্ধ কখনই নিজের দেশের চাইতে লুম্বিনী বা নিজের মাতৃভাষার চাইতে পালিভাষাকে বেশি সন্মান দেয় না। প্রকৃতপক্ষেই পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে এটা বলা যায় যে ধর্মীয় শিক্ষা বা মূল্যবোধের মাধ্যমে নৈতিকতা অর্জনের আমাদের প্রচেষ্টাটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই শিক্ষা আমাদেরকে দেশপ্রেম থেকে থেকে বিচ্যুত করে বোমাবাজ বানিয়েছে। নিজের দেশ ও সংস্কৃতিকে পর করে বিজাতীয় সংস্কৃতিকে আপন করতে উৎসাহীত করেছে। কাজেই অবস্থা বিবেচনায়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মূল্যবোধ ও মূল্যবোধের আলোকে নৈতিকতা অর্জনের বিষয়টি নিয়ে পুনরায় ভাবতে হবে। আমাদের নৈতিকতাকে মূল্যবোধের উপরে স্থান দিতে হবে। নিজের ভাষা, নিজের দেশ ও দেশের স্বার্থকে স্বার্থকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় আনতে হবে। তারপরেও যদি আপনি মনে করেন আপনি নৈতিকতাকে মূল্যবোধের মোড়কে আচ্ছাদিত করেই পেতে চান তবে সে মূল্যবোধ হতে হবে একান্তভাবেই আমাদের, কোন বিজাতীয় সংস্কৃতি নয়। আমার মনে হয় এ বিষয়টি নিয়ে ভাববার মতো যথেষ্ট অবকাশ আমাদের নীতি-নির্ধারকদের থাকা উচিত। মন্ আশা করি বুজতে পেরেছেন
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy