ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি : ভাবসম্প্রসারণ?
3 Answers
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি
মানুষ সৌন্দর্যপিয়াসী। তার এই সৌন্দর্যতৃষ্ণা জন্মগত। স্বীয় মননশীলতায় সুন্দরের আবিষ্কার করে মানুষ। জীবনধারণের জন্য প্রথম ও প্রধান জৈব উপাদান হলো খাদ্য। খাদ্যের অভাব মানুষের সুকুমারবৃত্তি চর্চার সূক্ষ্মবোধকে নষ্ট করে ফেলে। ক্ষুধার যন্ত্রণা মানুষের মননশীলতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। সভ্যতার সৃষ্টিলগ্ন থেকেই ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে চলেছে মানুষ। কখনও প্রকৃতির সাথে কখনও মানুষের সাথে। অন্নসংস্থানসহ বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো অন্যান্য প্রাথমিক চাহিদা পূরণের পর মানুষ সৌন্দর্য চর্চার অবকাশ পায়। মন তার প্রস্তুত হয় পৃথিবীর আশ্চার্য রূপ আস্বাদনের। তখন প্রকৃতির রূপ-রস তার কাছে প্রকাশিত হয় অধিকতর মনোমুগ্ধকর রূপে। তখন পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে ওঠে প্রেম আর সৌন্দর্যের আধার। পৃথিবীটাকে মনে হয় অপরূপ সুন্দরের লীলাভূমি। কিন্তু যখন শুধু বেঁচে থাকাই হয়ে ওঠে শেষকথা, শুধুমাত্র জীবনধারণের জন্য অন্ন সংগ্রহই হয়ে পড়ে একমাত্র তাড়না তখন মানুষের সৌন্দর্যবোধ হয়ে পড়ে নিষ্ক্রিয়। ক্ষুধার অসহ্য যন্ত্রণায় লোপ পায় সুন্দরকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা। তার সমস্ত চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে থাকে অন্নচিন্তায়। সে হারিয়ে ফেলে সুন্দর ও অসুন্দরের মাঝে পার্থক্য করার বিচারবোধ। অপূর্ব এই পৃথিবীটাকে তার কাছে গদ্যের মতো রসহীন কঠোর মনে হয়। চারপাশের পরিবেশ হয়ে ওঠে অসহ্য-যন্ত্রণাময়। পূর্ণিমার জলজলে চাঁদকে মনে হয়ে অভুক্তের খাদ্যদ্রব্য- বহু কাঙ্ক্ষিত এক টুকরো ঝলসানো রুটি। বর্তমানে ভোগবাদী ধনতান্ত্রিক সভ্যতা বিপুল সংখ্যক মানুষের মুখ থেকে কেড়ে নিয়েছে ক্ষুধার অন্ন। পৃথিবীর বেশি সংখ্যক মানুষের জীবন ক্ষুধার নির্মম আঘাতে দুর্বিষহ, যেখানে অতি অল্প সংখ্যক কিছু মানুষের হাতে জিম্মি হয়ে আছে এই বিপুল অংশের মানুষের খাদ্য। তাদের নিকট পূর্ণিমার চাঁদ কোনো সুন্দরের বার্তা বহন করে না।
শিক্ষা: ক্ষুধার যন্ত্রণা সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা। জীবন সংগ্রামে পর্যুদস্ত ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে পৃথিবী কাব্যের মতো কোনো স্বপ্নময় আশ্রয় নয়। বরং গদ্যের মতো রসকষহীন ও একঘেঁয়ে।
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি
মূলভাব : ক্ষুধার অনুভূতি তীব্র ও প্রচণ্ড। দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাত মানুষের দৃষ্টি ও হৃদয় থেকে রূপ-সৌন্দর্য ও প্রেমের নান্দনিক বোধগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। তাই ক্ষুধার নিবৃত্তি অত্যাবশ্যক।
সম্প্রসারিত ভাব : মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সৌন্দর্যপ্রিয়, রূপপিয়াসী, কল্পনাবিলাসী। মনকে আকর্ষণ করার মতো এমন অনেক কিছু প্রকৃতিজগতে ছড়িয়ে আছে। রুপালি নদী, বিল, নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা, সবুজ বৃক্ষলতা, নানা বর্ণের ফুল, নানা রঙের ফল, মায়াবী জ্যোৎস্না যে কারো হৃদয়কে মুগ্ধ করবেই। আবার কল্পনার জগতে বিরাজ করতে করতে মন হারিয়ে যায় সুদূরে। বাঁশির সুর মনকে উদাস করে দেয়। বৃষ্টির রিমঝিম ধ্বনি অন্তরকে টেনে নিয়ে যায় দূরে, প্রিয়জনের সান্নিধ্যে। এ সবই মন হরিণীর লীলাখেলা। এগুলো মনকে তৃপ্ত করে, হৃদয়কে শান্ত করে।
রঙ, রূপ আর কল্পনার এ খেলার বৈচিত্র্য মনকে তখন আন্দোলিত করে, যখন ক্ষুধার নিবৃত্তি ঘটে। পেট ভরা থাকলে চাঁদের হাসি আনন্দের বাঁধ ভেঙে দেয়, ফুলের সুবাস মাতোয়ারা করে হৃদয়, রঙের খেলা নানা রঙে রাঙিয়ে তোলে অন্তর। কিন্তু পেটে যদি খাবার না থাকে তাহলে পৃথিবীটাকে মনে হয় নিরস-গদ্যময়। ক্ষুধার তীব্রতায় যে কোনো গোলাকার জিনিসকে মনে হয় ঝলসানো রুটি। অর্থাৎ ক্ষুধাই সেখানে মূখ্য, অন্য সবকিছুই গৌণ, তুচ্ছ, গুরুত্বহীন। তাই ক্ষুধিতের কাছে পুর্ণিমার চাঁদ ঝলসানো রুটি হিসেবে ধরা দেয়। চাঁদের সৌন্দর্যে ক্ষুধিত কিছুমাত্র আকর্ষণ বোধ করে না। জীবনের সব ভালোলাগা, সব রূপ, সব ছন্দ হারিয়ে যায়। এ সময় জীবন হয়ে ওঠে বিবর্ণ, শুষ্ক, ধুলিধূসর। সব গান সুর তাল হারিয়ে বিরস হয়ে যায়।
সভ্যতার উৎকর্ষের এ যুগেও পৃথিবীর চল্লিশ শতাংশ মানুষ এখনও মানবেতর জীবন যাপন করে। তাদের চারপাশে কেবল অভাব-অনটন, ক্ষুধা-তৃষ্ণা সমস্যার পাহাড়। কষ্ট আর যন্ত্রণায় তাদের মন থেকে রূপ-সৌন্দর্যবোধ হারিয়ে গেছে। তাদের মুখে হাসি নেই, মনে আনন্দ-ফুর্তি নেই। ধনতান্ত্রিক সভ্যতার তৈরি করা কৃত্রিম সংকট মানুষের মুখ থেকে কেড়ে নিয়েছে ক্ষুধার অন্ন। দারিদ্র্যের দুর্বিষহ অভিশাপ ক্ষুধার্ত মানুষের উচ্ছলতায়- প্রাণস্ফূর্তি হরণ করেছে। ক্ষুধার অন্নই অর্থাৎ খাদ্যই তাদের কাছে সভ্য ও বাস্তব, অন্য সব ফিকে।
মন্তব্য : মানব জীবনের প্রথম চাহিদা ক্ষুধার নিবৃত্তি। তা দুষ্প্রাপ্য হলে কাব্যের ছন্দ, অলংকার, উপমা পানসে হয়ে যায়। পূর্ণিমার চাঁদকে মনে হয় ঝলসানো রুটি। তাই মানব জীবনে ক্ষুধা নিবৃত্তির সাধনাই হোক আমাদের প্রথম সাধনা।
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি
মূলভাব : প্রয়োজন মিটলে তবেই প্রয়োজনাতিরিক্ত। অন্ন-বস্ত্র-আশ্রয়ের ন্যূতমত চাহিদা মিটলে তবেই মানুষ ভাবরাজ্যে প্রবেশাধিকার লাভ করে। সংস্কৃতে একটি বিখ্যাত প্রবাদ আছে- ‘বুভুক্ষিতং ন প্রতিভাতি কিঞ্চিৎ’।
সম্প্রসারিত ভাব : অর্থাৎ, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে কোন সৌন্দর্যই প্রতিভাত হয় না। সৌন্দর্য হল অপ্রয়োজনের আনন্দ। ক্ষুধা জীবনমাত্রেরই কাছে প্রথম প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন যখন দুষ্প্রাপ্য, নাগালের বাইরে চলে যায় তখন কাব্যের শব্দ-ছন্দ-অলঙ্কারের বৈভব অবাস্তব, অলীক বলে মনে হয়। সৌন্দর্য বস্তুতে নেই, আছে দ্রষ্টার মনে ও বোধে। তাই ‘নিরন্ন দিন’, ‘ঘরে ঘরে বুভুক্ষা’ দেখে কবির কল্পনাশক্তি নষ্ট হয়েছে। পূর্ণিমার চাঁদের যে মোহময় রূপ চাঁদপানা হয়ে তার মনকে সুনীল আকাশে টেনে নিয়ে গেছে আজ তাকে প্রেয়সীর ঘোর নেই, একখানা গোলাকার আস্ত রুটির মত আজ তা কাম্য। জীবিকার সমস্যায় আচ্ছন্ন হাতে রুটিখানা পেলে এখন ক্ষুধার নিবৃত্তি হয়। ‘অন্ন দে মা অন্নদা’- বলে আকুল কান্নায় কেঁদেছিলেন রামপ্রসাদ। নজরুল লিখেছেন, ‘দারিদ্র্য অসহ/পুত্র হয়ে জায়া হয়ে কাঁদে অহরহ/আমার দুয়ার ধরি!’ ক্ষুধিত মানুষের অন্তরের কান্না কবিপ্রাণকে বড় বিচলিত করে। তাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা চাঁদ দেখে এখন কোন কোন কবিচিত্ত বলেন ‘আজকের চাঁদ পুড়ে হোক বাঁকা কাস্তে’ বা ‘কাস্তের ফলার মত চাঁদ।’কবির মন তো উপমা- উৎপ্রেক্ষার জন্মভূমি। ক্ষুধিত মানুষের হাহাকারে বস্তুবাদী কবি কল্পনার স্বপ্নলোক ত্যাগ করে বাস্তবের রুঢ় জগতে দৃষ্টিপাত করেন। তার তখন মনে জীবনে পদ্য নেই, আছে শুধু রুটি।
একখানা আস্ত রুটি কল্পনার মোমের ঘরে তাই আঘাত হানে। জৈব জীবনে দেহধর্ম প্রাধান্য লাভ করে মনোধর্মকে প্রভাবিত করে থাকে।
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy