2 Answers

কুরআনে কারীমের বিভিন্ন আয়াত এবং সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে একথা সুষ্পষ্ট প্রমাণিত যে, মানুষ মাটির তৈরী। নূর বা অগ্নির তৈরী নয়।

কয়েকটি আয়াতের দিকে লক্ষ্য করি।

"যখন আপনার পালনকর্তা ফেরেস্তাদের বললেন-আমি মাটির তৈরী মানুষ সৃষ্টি করব।" {সূরা সোয়াদ-৭১}

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-

-নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি পঁচা কর্দম থেকে তৈরী বিশুস্ক ঠনঠনে মাটি দ্বারা। {সূরা হিজর-২৮}

অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে-

-তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পোড়া মাটির ন্যায় শুস্ক মৃত্তিকা থেকে এবং জিনকে সৃষ্টি করেছেন অগ্নিশিখা থেকে। {সূরা আর রাহমান-১৪,১৫}

আরো ইরশাদ হয়েছে

তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা। {সূরা মুমিন-৬৭} 

2731 views
কুরআন মাজিদের বিভিন্ন আয়াত এবং সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে একথা সুষ্পষ্ট প্রমাণিত যে, আদম (আঃ) অর্থাৎ মানুষ মাটির তৈরী।

মহান আল্লাহ তায়ালা একাধিক স্থানে বিস্তারিতভাবে বলেছেন তিনি মানুষকে মাটি থেকে তৈরি করেছেন। আবার কোথায়ও বলেছেন, মানুষ সৃষ্ট ঠনঠনে মাটি থেকে, কাদামাটি থেকে, বীর্য থেকে, পানি থেকে, জমাট রক্ত থেকে, রূহ থেকে।

এগুলোর সমন্বয়ের জন্যে প্রয়োজন বিখ্যাত তাফসীরকারকগণের ব্যাখ্যার আলোকে সঠিক আলোচনা। বিস্তারিত আলোচনায় যাবার আগে প্রশ্ন করি সব মানুষ কি মাটির তৈরি?

কেউ যদি ঢালাও ভাবে বলে হ্যাঁ, সব মানুষ মাটির তৈরি। তাহলে প্রশ্ন হযরত মা হাওয়া (আঃ) কি মাটির তৈরি?

হযরত ঈসা রুহুল্লাহ (আঃ) কি মাটির তৈরি?

হযরত আদম (আঃ) এর ক্ষেত্রে যেমন সব আয়াত প্রযোজ্য নয়, তেমনি সব মানুষের ক্ষেত্রে ‘মাটির তৈরি’ কথাটিও প্রযোজ্য নয়। গৎবাঁধা ‘মানুষ মাটি থেকে সৃষ্ট’ বললে কিছু আয়াতকে অস্বীকার করা হয় আবার সব আয়াতকে শাব্দিক অর্থে হযরত আদম (আঃ) এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করা হয়, (নাউজুবিল্লাহ)।

মহান আল্লাহ তায়ালা অতি চমৎকারভাবে মানব জাতির সৃষ্টির কথা একটিমাত্র আয়াতে তুলে ধরেন এভাবেঃ

“হে লোকসকল! যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দিগ্ধ হও, তবে (ভেবে দেখ!) আমি তোমাদেরকে মৃত্তিকা থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর বীর্য থেকে, এরপর জমাট রক্ত থেকে, এরপর পূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট ও অপূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট।মাংসপিন্ড থেকে, তোমাদের কাছে ব্যক্ত করার জন্যে। আর আমি এক নির্দিষ্ট কালের জন্যে মাতৃগর্ভে যা ইচ্ছা রেখে দেই, এরপর আমি তোমাদেরকে শিশু অবস্থায় বের করি; তারপর যাতে তোমরা যৌবনে পদার্পণ কর। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে নিষ্কর্মা বয়স পর্যন্ত পৌছানো হয়, যাতে সে জানার পর জ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে সজ্ঞান না থাকে।” (সূরা হাজ্জ, আয়াতঃ ৫)।

এই আয়াতের প্রথম অংশে বলা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। এরপর আবার বলা হচ্ছে বীর্য থেকে, এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন অবস্থা পেরিয়ে পূর্ণাঙ্গ কিংবা অপূর্ণাঙ্গ শিশু হিসেবে পৃথিবীতে আনয়নের কথা। এখানে স্পষ্টতঃই বোঝা যাচ্ছে যে পরের ধাপগুলো কেবল আদমসন্তানদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত। ডিম্বাণু এবং শুক্রাণুর মিলন থেকে পুরো সময়টাকে বোঝানো হয়েছে। হযরত আদম (আঃ) কে যেমন বীর্য বা জমাট রক্ত থেকে তৈরি করা হয়নি, ঠিক তেমনি অন্য সব মানুষকে মাটি থেকে তৈরি করা হয়নি। অথচ আল্লাহ পাক কিন্তু আলোচ্য উক্ত আয়াতে পুরো মানব জাতিকে উদ্দেশ্য করে এ ঘোষণা দিচ্ছেন। প্রায় সব তাফসীরকারগণ এব্যাপারে একমত হয়েছেন। দেখুন তাফসীর-এ আল্লামা আবু লাইছ সামারকান্দী, ইবনে কাসীর, ইমাম কুরতুবী, কাঞ্জুল ঈমান (আ’লা হযরত ইমাম আহমেদ রেজা খান রাহমাতুল্লাহ আলাহুম আজমাঈন)।

সূরা নিসায় আল্লাহ পাক আরও পরিষ্কার করে ঘোষণা করছেনঃ “হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তাঁর (আদম) থেকে তার সঙ্গীনীকে (বিবি হাওয়া) সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী।” (সুরা নিসাঃ ৪:১)।

এই আয়াতের পর আর সন্দেহ রইলোনা যে আল্লাহ এক ব্যাক্তিকেই মাটি থেকে তৈরি করেছেন। আর তার থেকে তার সঙ্গিনীকে এবং তাদের দু’জন থেকে সমগ্র মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। সব মানুষ মাটির তৈরি একথা বলা বা এধরণের বিশ্বাস পোষণের দ্বারা সূরা হাজ্জের ৫ নং আয়াতের শেষের অংশকে অস্বীকার করা হয়। সমগ্র মানব জাতির মূল অর্থাৎ আদি পিতা হলেন মাটির তৈরি। সবাই মাটি থেকে সৃষ্ট নয়।

কুরআনের কোন একটি আয়াত বা কোন আয়াতের কিছু অংশকে অস্বীকার করার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা কঠোর হুশিয়ারি দিয়েছেন।

“তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস কর?” (বাকারাঃ ২:৮৫)

“এবং যাদেরকে আমি গ্রন্থ দিয়েছি, তারা আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তজ্জন্যে আনন্দিত হয় এবং কোন কোন দল এর কোন কোন বিষয় অস্বীকার করে।” (১৩: ৩৬)।

সব মানুষই মাটির তৈরি প্রমাণ করার জন্যে অনেকেই সূরা তোয়া-হা এর ৫৫ নং আয়াতটি উল্লেখ করে থাকেন। এই আয়াতে আল্লাহ পাক সমগ্র মানবজাতিকে সম্বোধন করে মানব সৃষ্টির কথা ঘোষণা করেন। দেখা যাক এর ব্যাখ্যায় মুফাসসীরগণ কী বলেন।

মহান আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন, “এ মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃজন করেছি, এতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিব এবং পুনরায় এ থেকেই আমি তোমাদেরকে উত্থিত করব।” (২০:৫৫)

এখানে মাটি থেকে সৃজন করা বলতে কি সব মানুষকে বুঝানো হয়েছে নাকি কেবল আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) কে বুঝানো হয়েছে। প্রথমেই তাফসীরে জালালাইন থেকে উদৃত করছি। বাংলা ভার্সনের ৪র্থ খণ্ডের ২৩১ নং পৃষ্ঠায় আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহঃ) লিখেন, “আমি তোমাদেরকে মৃত্তিকা দ্বারা সৃষ্টি করেছি। এখানে সব মানুষকেই সম্বোধন করা হয়েছে। অথচ এক হযরত আদম (আঃ) ছাড়া সাধারণ মানুষ মৃত্তিকা দ্বারা নয়, বীর্য দ্বারা সৃজিত হয়েছে। হযরত আদম (আঃ) এর সৃষ্টিই কেবল সরাসরি মৃত্তিকা দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে।

তবে তোমাদেরকে মৃত্তিকা দ্বারা সৃজন করেছি বলার কারণ এরূপ হতে পারে যে, মানুষের মূল এবং সবার পিতা হলেন হযরত আদম (আঃ), তার মধ্যস্থতায় সবার সৃষ্টিকে মাটির সাথে সম্বন্ধযুক্ত করে দেয়া মোটেই অযৌক্তিক নয়।”

এবার আসি তাফসীর ইবনে কাসীরে, আল্লামা ইবনে কাসীর (রহঃ) লিখেন, “মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছি। এর থেকেই তোমাদের সূচনা। কেননা, তোমাদের পিতা আদমের (আঃ) সৃষ্টি এই মাটি থেকেই।” ©
2731 views

Related Questions