1 Answers

মহান গ্রীক দার্শনিক পিথাগোরাস (খ্রী. পূ. ৫৭০-৪৯৫) সর্বপ্রথম বলেছিলেন যে পৃথিবী গোলাকার। পরবর্তীতে অ্যারিস্টোটল (খ্রী. পূ. ৩৮৬-৩২২) পিথাগোরাসের এই গোলাকার পৃথিবীর ধারনাকে সমর্থন করেছিলেন।

কিন্তু এর বিপক্ষে সমতল পৃথিবীর ধারনা যারা করতেন, তাদের মধ্যেও অনেক হোমড়া-চোমড়া ব্যাক্তিবর্গ ছিলেন। কিন্তু সেসব কথা এখন থাক। চলুন দেখে নিই গোলাকার পৃথিবীর সপক্ষে পরীক্ষালব্ধ দুয়েকটি বিষয়।

খ্রী. পূ. ২৭৫-১৯৫ সময়ে, ইরাটোসথেনিস নামে একজন জ্ঞানী লোক বাস করতেন তৎকালীন গ্রীক সাম্রাজ্যের অধীন (বর্তমান মিশর) বিখ্যাত শহর আলেক্সান্ড্রিয়াতে। তিনি ছিলেন একাধারে গণিতবিদ, কবি, ভূগোলবিদ এবং জ্যোতির্বিদ। পৃথিবী গোল নাকি সমতল এরকম বিতর্ক সেই সময়েও বিজ্ঞমহলে ছিল- এই কথা তো আগেই বলেছি, সাধারন মানুষের অবশ্য এসব নিয়ে তেমন কোন মাথাব্যাথা ছিল না।

ইরাটোসথেনিস নিজে বিশ্বাস করতেন যে পৃথিবী গোলাকার এবং এ নিয়ে তাঁর নিজের মনে কোন সংশয় ছিল না। তাই তিনি গোল-নাকি-সমতল এই বিতর্কেই গেলেন না, সরাসরি পৃথিবীর পরিধি বের করার কাজে লেগে পড়লেন, এবং পৃথিবী যে গোলাকার, সেটা ধরে নিয়েই তিনি গোলাকার বস্তুর পরিধি মাপার কৌশলকেই বেছে নিলেন।

সেই যুগের মানুষদের কাছে বছরের হিসাব মোটামুটি ভালোই জানা ছিল, মানে ৩৬৫ দিনে বছর হলে সূর্য বছরের কোন দিন ঠিক দুপুরে কোথায় অবস্থান করে তার হিসাব-নিকাশ মানুষের জানা ছিল। আর ইরাটোসথেনিস জ্ঞানী তো ছিলেন বটে, তার উপরে তিনি ছিলেন আলেক্সান্দ্রিয়ার বিখ্যাত সেই লাইব্রেরীর লাইব্রেরীয়ান। তার কাছে কি আর এসব বিষয় গোপন থাকে!

এটা তো সবাই জানে যে সূর্যটা পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলাচল করে প্রতিদিন একবার করে। আর প্রতি বছরে একবার উত্তর-দক্ষিনেও আগুপিছু করে। তাই গরমকালে আর শীতকালে তাপমাত্রার হেরফের হয়। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে বছরের একটি বিশেষ দিনে একেবারে আগের বছরের মত একই অক্ষাংশের উপরে অবস্থান করে। তাই বছরের কোন একটি নির্দিষ্ট দিনে আপনি যদি বিষুবীয় অঞ্চলে আপনার ছায়া দেখেন, হয়ত দেখবেন সেটা পায়ের নিচেই পড়ে আছে। অথচ পরের বছর সেই একই দিনে একই সময়ে আপনি যদি বিষুবরেখা থেকে বেশ উত্তরে সরে যান, তাহলে সুর্যের অবস্থান একই থাকার পরেও আপনার ছায়া হবে লম্বা। মানে, বিষুব রেখা থেকে উত্তরে সরে গেলে সূর্যকে আর মাথার উপর পাবেন না, কারণ আপনি নিজেই হেলে পড়েছেন।

ইরাটোসথেনিস ঠিক এই কৌশলটিকেই কাজে লাগিয়েছিলেন। নিখুঁত হিসাবের জন্যে একটি স্ট্যান্ডার্ড কাঠি ব্যবহার করেছিলেন। আর কাঠিটিকে ঠিক খাঁড়া করে বসানোর জন্যেও কিছু পদ্ধতি সেসময় জানা ছিল। এরপর তিনি বছরের কোন এক নির্দিষ্ট দিনে মিশরের দুইটি ভিন্ন জায়গাতে সেই কাঠি বসিয়ে ছায়ার দৈর্ঘ্য মেপে দেখলেন। তিনি তো জানতেনই যে দুরকম ফলাফল পাবেন, কিন্তু পরীক্ষা তিনি করছেন একটা নিখুঁত হিসেব করার জন্যে। পরীক্ষাগুলো তিনি করেছিলেন ছবিতে নির্দেশিত স্থানে।

দুটি দৈর্ঘ্যের পার্থক্য থেকে তিনি বুঝতে পারলেন যে তিনি কত ডিগ্রী উত্তর-দক্ষিনে সরেছেন। মনে করুন সেটা x ডিগ্রী। আর এই x ডিগ্রী ঘুরতে তাঁকে হয়ত n মাইল (সে সময় স্টেডিয়ন নামে অন্য একটি ইউনিট ব্যবহার করা হতো) উত্তরে যেতে হয়েছে।

তাহলে পৃথিবী গোল হলে ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরতে গেলেই তো পুরো পৃথিবী ঘুরে আসতে হবে। তার মানে পৃথিবীর পরিধি হবে-

360 * n / x মাইল

এতে করে তিনি প্রায় নিখুঁতভাবে (বর্তমানে হিসাবের থেকে ০.৪% বেশি) বলে দিয়েছিলেন পৃথিবীর পরিধি।

বুদ্ধি আর মনের জোর থাকলে কত সাধারণ উপকরণ দিয়ে কত অসাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যেতে পারে, এটা ছিল তার দারূন একটি দৃষ্টান্ত।

এই পরীক্ষা করার গুরূত্বপূর্ণ দিকটি হলো মানুষকে এটা জানানো যে, পৃথিবী গোলাকার তো বটেই, এমনকি আমরা তার পরিধিও জানি।

এই ঘটনার পর প্রায় আড়াই হাজার বছর কেটে যেতে বসেছে। এর মধ্যে আরো বহু পর্যবেক্ষন হয়েছে। স্যাটেলাইট থেকে ছবি তোলা হয়েছে। ভয়েজার মিশন থেকে ছবি তোলা হয়েছে। এসব বিভিন্ন সূত্র থেকে গোলাকার পৃথিবীর ধারনা সাধারণ মানুষও ঠিকই বুঝতে পেরেছে।

2697 views

Related Questions