2 Answers

দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রয়োজন ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। গণসচেতনতা গড়ে তোলার কার্যকর হাতিয়ার হলো গণমাধ্যম। এই গণমাধ্যমে দুর্নীতি সম্পর্কে তথ্য প্রচার করে গণসচেতনতা গড়ে তোলা যায়। সমাজের সর্বস্তরে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে দুর্নীতি দূর করা সম্ভব। উপার্জন, ব্যয়, সম্পদের হিসাব প্রদান ইত্যাদির মাধ্যমেও অনেক দুর্নীতিবাজদের মুখোশ উন্মোচন করা যায়। ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচি প্রভৃতির মাধ্যমেও দুর্নীতি দূর করা যায়। এছাড়া সমাজে প্রয়োজন পারিবারিক মূল্যবোধ জাগ্রতকরণ ও মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ, যা দুর্নীতি নির্মুলের কার্যকর পদক্ষেপ। 

3000 views

দুর্নীতি দমনে ইসলামের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে অসংখ্য প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। এসব সৃষ্টির মধ্যে মানুষ হলো সেরা সৃষ্টি। এদের আল্লাহ তাআলা উচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন করেছেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি মানবজাতিকে পরিচ্ছন্ন, পবিত্র, পাপমুক্ত ও নিষ্কলুষ হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, সে পবিত্র ও পাপমুক্ত অবস্থায় আসে। পরবর্তী সময় পৃথিবীর পরিবেশ, পারিপার্শ্বিকতা, মন্দ সংস্রব, বৈরী প্রভাব ইত্যাদির ফলে ধীরে ধীরে পবিত্র গোলাপ ফুলটি নষ্ট হতে থাকে। একসময় তার সুঘ্রাণ বিদূরিত হয়ে যায়। একটি সত্য কথা সবাইকে স্বীকার করতে হবে যে মানুষ ছাড়া অন্য কোনো সৃষ্টি দুর্নীতি, অপরাধ, অন্যায়, অবিচার, জুলম, নির্যাতন ইত্যাদি করে না। অথচ মানুষকেই সবচেয়ে বেশি বিবেক-বুদ্ধি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, বিশ্বাস, দক্ষতা, ন্যায়-অন্যায় চেনার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।

দুর্নীতির সংজ্ঞা : দুর্নীতি হলো কুনীতি, কুরীতি, ন্যায় ও ধর্মবিরুদ্ধ আচরণ। পরিভাষায় দুর্নীতি বলা হয়—অবৈধ পন্থার ব্যবহার, অবৈধ পদ্ধতি বা কৌশল অবলম্বন করে বিশেষ স্বার্থ উদ্ধার অথবা অন্যের অধিকার হরণ কিংবা কোনো নাগরিক বা রাষ্ট্রের প্রতি অবিচার করা এবং স্বেচ্ছাচারিতার পরিচয় দিয়ে নাগরিক অথবা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করা। কেউ কেউ বলেন, দুর্নীতি হলো অসততা, অবৈধ আচরণ, বিশেষ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বে আসীন ব্যক্তিদের আইনবহির্ভূত আচরণ, ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ইত্যাদি।

সাধারণত ঘুষ, বল প্রয়োগ, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, প্রভাব খাটিয়ে এবং ব্যক্তিবিশেষকে সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা অর্জনের নাম দুর্নীতি।

ইসলামের দৃষ্টিতে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সুদ, ঘুষ, জুয়া তথা যেকোনো হারাম পন্থা অবলম্বন, ক্ষমতা ও পেশিশক্তির  অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা, প্রতারণা, আইনের অসৎ ব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিল এবং দেশ, জাতি ও সাধারণ নাগরিকের অধিকার ও স্বার্থ হরণ করার নাম দুর্নীতি।

দুর্নীতি কিভাবে বিস্তৃত হয় : দুর্নীতি নানাভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। যেমন—প্রভুত্বের মনোভাব, পশুস্বভাব, হিংস্রতা, অহংকার, প্রশংসা ও গৌরবের মোহ, সত্যের বিরোধিতা ও চিরস্থায়িত্বের বাসনা ইত্যাদি। এগুলো মানুষের চরিত্রবিধ্বংসী স্বভাব। এগুলোই দুর্নীতির জন্ম দেয়। যদি বিকৃত স্বভাব ও কুরুচিপূর্ণ মনোভাব এবং আধুনিক ও প্রগতিবাদী সাজার অভিপ্রায়, উচ্ছৃঙ্খল আচার-আচরণ, অশালীন কথাবার্তা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে চালু হয়, তবে সে সমাজ নৈতিকতাবিবর্জিত হতে বাধ্য। সেখানে শ্রদ্ধাবোধ, লজ্জা-শরম, স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসার পরিবর্তে বেয়াদবি, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা ব্যাপক হারে চালু হয়।

দুর্নীতি দমনে ইসলাম : ইসলাম দুর্নীতিকে আদৌ পছন্দ করে না। তাই দুর্নীতি দমনে ইসলাম নানাবিধ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ইসলাম সর্বপ্রকার দুর্নীতির অপকারিতা ও কুফল বর্ণনা করেছে। অতঃপর তা থেকে বাঁচার জোর তাগিদ প্রদান করেছে এবং শাস্তির বিধান নিশ্চিত করেছে।

শাস্তির বিধান : দুর্নীতি ও অপরাধ দমনে ইসলাম শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। যেমন—সন্ত্রাস ও ডাকাতির শাস্তি প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদগুলো বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হলো তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।’ (সুরা : আল মায়েদা, আয়াত : ৩৩)

আল্লাহর ভয় ও আখিরাতের শাস্তি সম্পর্কে সচেতন করা : আল্লাহর ভয় ও আখিরাতের শাস্তি সম্পর্কে সচেতন করার দ্বারা অপরাধ দমন করা যায়। তাকে অবহিত করতে হবে যে এই জগৎই শেষ কথা নয়। এখানে মানুষের চর্মচোখকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও আখিরাতে আল্লাহর দরবারে সব কর্মকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে। সেখানে কোনো বিষয়ে অন্যায়, দুর্নীতি, অসদাচরণ ব্যক্তি বা জাতির হক আত্মসাৎ প্রমাণিত হলে তার যথাযথ জবাবদিহি করতে হবে এবং পরিণামে জাহান্নামের বীভৎস আজাবের সম্মুখীন হতে হবে। যা থেকে বাঁচার কোনো উপায় থাকবে না। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি বলে দিন, আমার পালনকর্তা শুধু অশ্লীল বিষয়গুলো হারাম করেছেন, যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং তিনি হারাম করেছেন গোনাহ, অন্যায়-অত্যাচার আর আল্লাহর সঙ্গে এমন বস্তু অংশীদার করা,  তিনি যার কোনো সনদ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা, যা তোমরা জানো না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩৩)

হালাল-হারাম সম্পর্কে অবগত করা : দুর্নীতি দমন বা সর্বপ্রকার অপরাধ দমনের মূলনীতি হিসেবে ইসলাম হালাল-হারাম তথা পবিত্র-অপবিত্রর পার্থক্য সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছে। বৈধ ও অবৈধের প্রভেদ পরিষ্কার করেছে। যা স্রষ্টার দৃষ্টিতে পবিত্র, তা হালাল ও বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আর যা অপবিত্র, তা হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে হালালের কল্যাণ ও উপকারিতা এবং হারামের অপকারিতা ও ক্ষতি স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর বাণী : ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না। শুধু তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। আর তোমরা নিজেদের কাউকে হত্যা কোরো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

পার্থিব শাস্তির বিধান : দুর্নীতি দমনে আল্লাহর ভয়, আখিরাতের শাস্তি সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি ইসলাম দুনিয়াবি শাস্তি প্রদানে স্বচ্ছ আইন এবং তা বিলম্বহীন ও নিরপেক্ষভাবে কার্যকর করার বিধান প্রণয়ন করেছে। ইসলাম কোনো দুর্নীতিবাজ কিংবা খুনি ও অপরাধীর শাস্তি প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ক্ষমা করার বিধান রাখেনি। যাতে অপরাধীরা এই সুযোগে বেঁচে যেতে সক্ষম না হয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমার মেয়ে ফাতেমা চুরি করলেও আমি তার হাত কেটে দেব।’

পরকালে পুরস্কারের ঘোষণা :  সততা ও হালাল জীবনযাপনের ফলে ইহকালীন ও পরকালীন পুরস্কারের ঘোষণার মাধ্যমেও ইসলাম দুর্নীতি দমনের পদক্ষেপ নিয়েছে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘হারাম সম্পদ দ্বারা যে শরীর গঠিত হয়, তা জাহান্নামে জ্বলবে।’

নাগরিক সচেতনতা : নাগরিক সচেতনতা এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমেও দুর্নীতি দমনের উদ্যোগ নিয়েছে ইসলাম। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় (পাপাচার, দুর্নীতি) হতে দেখে, সে যেন সম্ভব হলে তা হাত দ্বারা রুখে দেয়। তা সম্ভব না হলে প্রতিবাদী ভাষা দ্বারা তা প্রতিহত করে। আর তা-ও না পারলে সে যেন ওই অপকর্মকে হৃদয় দ্বারা বন্ধ করার পরিকল্পনা করে, এটি দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক।’ (মুসলিম, মিশকাত, পৃষ্ঠা ৪৩৬)

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।

সূত্র  :ইন্টারনেট :  https://www.kalerkantho.com/print-edition/islamic-life/2018/12/21/716934

 

দুর্নীতি প্রতিরোধে করণীয়

বর্তমানে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দুর্নীতি। সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কবলে আজ বিপন্ন মানবসভ্যতা। সর্বনাশা এই সামাজিক ব্যাধির মরণ ছোবলে বর্তমান সমাজ জর্জরিত। সর্বোচ্চ প্রশাসন থেকে শুরু করে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি, শিল্প-বাণিজ্যসহ সর্বত্রই চলছে দুর্নীতি। তাই বিশেষজ্ঞরা দুর্নীতিকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

আভিধানিক অর্থে দুর্নীতি হলো নীতিবিরুদ্ধ, কুনীতি, অসদাচরণ, অসৎ উপায় অবলম্বন, অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন, নীতি-বিরুদ্ধ আচরণ ইত্যাদি। আর প্রতিরোধ অর্থ হচ্ছে-নিরোধ, নিবারণ, বাধাদান, প্রতিবন্ধকতা, আটক, ব্যাঘাত। আভিধানিক অর্থে শব্দটি অত্যন্ত ছোট হলেও এর অর্থ ব্যাপক। দুর্নীতিকে নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা যায় না। বিজ্ঞজনরা দুর্নীতিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। দুর্নীতির ধরন প্রকৃতি বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময়। তাই তা নির্দিষ্টকরণ জটিল কাজ। দুর্নীতি এমন এক ধরনের অপরাধ, যার সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার, সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার যুক্ত। সাধারণ কথায় দায়িত্বে অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ উৎকোচ গ্রহণ বা মহল বিশেষের অশুভ স্বার্থ হাসিল করাকে দুর্নীতি বোঝায়।

বাংলাদেশের সমাজজীবনে অনৈক্য, হিংসা, দলাদলি, কোন্দল, স্বার্থপরতা, অবিশ্বাস এবং চরম দুর্নীতি বিরাজ করছে। দুর্নীতি আজ রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি, সামাজি, ধর্মীয় ও ব্যক্তি জীবনের সব ক্ষেত্রে বিরাজ করছে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তা থেকে বাদ যায়নি।

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ সবার কাম্য। দুর্নীতি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে এবং জনগণের সম্পদকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা জাগায়। দুর্নীতি ও বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে যারা প্রভাব বিস্তার করে তারা সেই প্রভাব স্বীকার করে না। এই দুর্নীতিপরায়ণ অবস্থা কোনো নীতিকথা ও তথাকথিত সামাজিক বয়কটে পরিবর্তন হবে না। বর্তমান যুগে অপরাধের ধারা বদলে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে ভিওআইপির সাহায্যে কতিপয় কোম্পানি যে অনাচার করে এসেছে, প্রশাসন তাদের কেশ পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারেনি। এসব দুর্নীতি ও অপরাধ কর্মের সঙ্গে সমাজের উচ্চ মহলের শিক্ষিত, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদ রয়েছে। তাদের সহায়তায় অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে বহাল তবিয়তে থাকে। দুর্নীতি দমন কমিশনের সহায়তায় দ-িতদের অর্ধেকেরও বেশি অপরাধী সামাজিক ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছে রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। দুদকের তত্ত্বাবধানে গত দেড় বছরে প্রায় ৩২৫ ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৪২৫টি মামলা হয়েছে এবং এর মধ্যে নিম্ন আদালতে ৮৯টি মামলার রায়ে সাজা দেওয়া হয়েছে ১২৪ জনকে। তন্মধ্যে দুদকের তালিকাভুক্ত মাত্র ৪০ জন। এর মধ্যে আবার ২৪ জনই পলাতক। সব মিলিয়ে ইতোমধ্যে সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ৮১ জনই পলাতক। ধনী ও প্রভাবশালীরা নিয়ম মেনে চলে না। তাই সঠিক নীতি কাজ করে না। টিআইবি রিপোর্টে বাংলাদেশ চারবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

মানুষ কেন দুর্নীতি করে তার উত্তর খুঁজতে ব্যক্তির আর্থ-সামাজিক অবস্থা, মানসিকতা, শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ব্যক্তি ও সমাজ এ দুয়ের পারস্পরিক ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার মাঝেই দুর্নীতির উদ্ভব এবং বিস্তার হয়। তাই ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে কী কী উপাদান দুর্নীতির নিয়ামক হিসেবে কাজ করে তা উদঘাটন করে সেগুলোকে দুর্নীতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। যেমন-১. ঐতিহাসিক কারণ, ২. অর্থের মূল্যস্তর বৃদ্ধি, ৩. অপর্যাপ্ত বেতন, ৪. রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ত্রুটি, ৫. অপরাধ দূরীকরণে বলিষ্ঠ পদক্ষেপের অভাব, ৬. আইন সম্পর্কে জনগণের সচেতনতার অভাব, ৭. অর্থের মাপকাঠিতে সামাজিক মর্যাদা নিরূপণ প্রবণতা, ৮. ব্যক্তিগত লোভ-লালসা ও ৯. ধর্মীয় শিক্ষার অভাব।

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে কেউ কেউ ধর্মীয় শিক্ষা ও জনগণের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। বস্তুত দুর্নীতির প্রতিকার, প্রতিরোধ ও সংশোধনের জন্য কার্যকর সামাজিক নীতি-কর্মসূচি গ্রহণ, আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং জনমত গড়ে তুলতে হবে। আর এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো বিবেচনায় আনা যেতে পারে- যেমন : দুর্নীতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা তথা শিক্ষা কৌশল, বিভিন্ন প্রদর্শনমূলক অনুষ্ঠানমালা, সাহিত্য ও বিচিত্রানুষ্ঠান, স্লোগান, পথযাত্রা, রেডিও-টিভি, ছায়াছবি, দুর্নীতিবিরোধী পোস্টার এবং পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। নি¤েœ দুর্নীতি মোকাবেলায় আরো কিছু পদক্ষেপ সম্পের্কে তুলে ধরা হলো- ১. দুর্নীতিবিরোধী চিন্তাচেতনার বিকাশ ও বিস্তার ঘটানো। ২. আন্দোলন পরিচালনার জন্য সংগঠন গড়ে তোলা। ৩. নেতৃত্ব ও সংগঠনের প্রতি জনগণের সমর্থন ও আস্থা অর্জন করা। ৪. দুর্নীতি মোকাবেলায় গঠিত সংগঠনে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ৫. ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বিবেচনায় দুর্নীতি মোকাবিলায় অধিকতর ফলদায়ক উপায় ও পন্থা নির্বাচন। ৬. গৃহীত উপায় ও পন্থার প্রতি জনসর্থন যাচাই ও প্রয়োজনে সংশোধন। ৭. জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতি মোকাবিলায় কার্যকর পন্থা ও উপায় কার্যকরকরণ। ৮. মূল্যায়ন ও কার্যকারিতা স্থায়ীকরণ। ৯. ধর্মীয় বিধানাবলি প্রচার ও কার্যকর করা। ১০. দুর্নীতিবিরোধী সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনা করা। ১১. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ১২. দুর্নীতিবাজদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা। ১৩. দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালন করা। ১৪. দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ বা সামাজিকভাবে বয়কট করা। ১৫. দক্ষ তদন্তকারী এবং সরকারি আইনজীবী নিয়োগ করে দুর্নীতিবাজদের শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করা। ১৬. দুর্নীতি দমন কমিশনকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা।

 

দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধি এবং সমাজ ও সভ্যতার জন্য মারাত্মক অভিশাপ। একমাত্র দুর্নীতির কারণেই আমাদের ওপর নেমে এসেছে দরিদ্রতা এবং দেশের উন্নয়ন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই অবিলম্বে এর মূলোৎপাটন অপরিহার্য। বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিধায় দুর্নীতির কারণ এবং তা প্রতিরোধে কতিপয় নীতিমালার কথা বলা হয়েছে। এটি যত বেশি বিশ্লেষিত ও আলোচিত হবে জনগণ এ বিষয়ে তত বেশি সচেতন হবে এবং তার সুফল ভোগে সমর্থ হবে। আর আমরা পাব দুর্নীতিমুক্ত, স্বাবলম্বী, স্বনির্ভর এবং সুখী-সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ। এটাই আমাদের বিশ্বাস।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

সূত্র  :ইন্টারনেট : http://www.protidinersangbad.com/todays-newspaper/editor-choice/74779/

3000 views

Related Questions