গ্লোকোমা রোগের চিকিৎসা আছে কী?
2 Answers
দৃষ্টিশক্তি চিরতরে নষ্ট হবার প্রধান কারন হচ্ছে গ্লোকোমা। এই রোগে একবার অন্ধ হলে মানুষ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়না।প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগ যদি সনাক্ত করা যায় এবং এর চিকিতসা করা হয় তাহলে দৃষ্টি শক্তি ধরে রাখা সম্ভব। ভয়েস অব অমেরিকার ক্যারল পিয়ারসন আরো জানাচ্ছেনঃ জেফরি মিলারের বয়স যখন ৩০ বছর তখন তাঁর গ্লোকমা রোগ হয়, তারপর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে । মিলার বললেন, আমি যে সব সময়ই দেখতে পাব সে নিশ্চয়তা নেই তবে আমি সত্যি কৃতজ্ঞ যে আমি দেখতে পাচ্ছি, এতেই আমি সন্তুষ্ট। বিশ্বসাস্থ্য সংস্থার মতে সারা বিশ্বে ৭ কোটি মানুষ গ্লোকোমা রোগে ভুগছে। গ্লোকোমা যখন হতে শুরু করে বেশির ভাগ মানুষ তা বুঝতে পারে না। চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যাওয়ার পর তা ধরতে পারেন। ভারতী এবং চীনাদের সবচেয়ে বেশি ক্যাটারেক্ট বা চোখের ছানি পড়ে। গ্লোকোমায় দৃষ্টি শক্তি হারারনোর সংখ্যা সেখানে দ্বিতীয় স্থানে। কৃষ্ণাংগ এবং ল্যাটিন আমেরিকানদের খুব সহজেই মারাত্মক ধরণের গ্লোকোমা হতে দেখা যায়। গ্লোকোমা বংশানুক্রমিক একটি রোগ যা পরিবারের কারও থাকলে এই রোগ হবার ঝুঁকি বাড়ে । জিল হার্ণডেন বললেন, “চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যাবে এই চিন্তাটাই কেমন ভয়ঙ্কর।” বয়স বাড়ার সংগে সংগে গ্লোকমা হবার ঝুঁকি বাড়ে। তবে যে কোন বয়সেই এই রোগ হতে পারে। চোখের ভেতরের চাপ বাড়ার কারনে চোখের সূক্ষ স্নায়ুগুলো নষ্ট হয়ে যায়। অস্ত্রপাচার করে অথবা ওষুধ দিয়ে এর চিকিতসা করা হয়। স্যান্ডিয়েগোর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রবার্ট ওয়াইনর্যাবের নেতৃত্বে প্রধান দুই ধরণের গ্লোকোমা ক্লোজড এংগেল এবং ওপেন এংগেল সনাক্ত করা এবং তার চিকিতসার বিষয়ে এক গবেষণা চালান হয় । এই দুই ধরনের গ্লোকমাকে বোঝানোর জন্য তিনি চোখর সংগে পানির সিঙ্কের তুলনা করেছেন। ডঃ ওয়াইনরেব বলেন, “ধরুণ আমাদের চোখে পানির কল ও নল লাগানো আছে আর নল দিয়ে পানি বেরিয়ে যাওয়ার পথটি ভেতর থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে। আর অন্যটি হচ্ছে নলের বাইরে আবরন পড়ে বন্ধ হয়ে যায়।” এই দুই অবস্থাতেই আমাদের চোখের ভেতরের তরল পদার্থ যা চোখকে সুস্থ্য এবং সতেজ রাখে সেই পদার্থ আর বার হতে পারে না, ফলে চোখের ভেতরে চাপ সৃষ্টি করে এবং অপটিক নার্ভ অর্থাত চোখের স্নায়ুগুলোকে ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়। আমরা যা দেখি তার ছবি এই নার্ভগুলোর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে। ওয়েনার্ব বলেন, গ্লোকমা সনাক্ত ক রে দ্রত চিকিৎসা করলে সাময়িক ভাল হয়ে যায়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে সারা বিশ্বের প্রায় ৭০ লাখ লোক গ্লুকোমা রোগে ভুগছেন এবং আগামী ২০২০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখে দাঁড়াবে। সম্প্রতি বাংলাদেশে একটি সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে, শতকরা অন্তত ১০ জন মানুষ এখন সামান্য হলেও এ রোগটি সম্পর্কে ধারণা রাখেন।
নীরব অন্ধত্বের কারণ গ্লুকোমা বিষয়ে সচেতন করার জন্য বিশ্ব গ্লুকোমা সমিতি প্রতিবছরই আয়োজন করে থাকে বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ ও বিশ্ব গ্লুকোমা দিবস। গত ৬ মার্চ শুরু হয়ে ১২ মার্চ পর্যন্ত পালিত হবে এই বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ। ‘বিট ইনভিজিবেল গ্লুকোমা’ বা অদৃশ্য এই গ্লুকোমা রোগকে প্রতিরোধ করুন—এই হচ্ছে এ বছরের বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহের স্লোগান বা প্রতিপাদ্য বিষয়। বিশ্ব গ্লুকোমা সমিতি প্রদত্ত এই স্লোগানে বোঝানো হয়েছে গ্লুকোমা দুরারোগ্য ব্যাধি নয়। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিতে পারলে গ্লুকোমা নিয়ে সারা জীবন ভালো থাকা যায়।
২০০৮ সাল থেকে প্রতিবছরই মার্চ মাসে এই দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০১০ সাল থেকে এক সপ্তাহব্যাপী বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে। এ বছর বিশ্বব্যাপী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটি ফ্রি গ্লুকোমা স্ক্রিনিং ক্যাম্প, লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার বিতরণ, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এ সপ্তাহটি পালন করছে। এ ছাড়া সারা দেশে বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ, চক্ষু হাসপাতাল ও ক্লিনিকে একই ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হবে। এসব কর্মসূচির একটিই উদ্দেশ্য জনসাধারণকে গ্লুকোমা সম্পর্কে সচেতন করা।
গ্লুকোমা সম্পর্কে অনেকের ভুল ধারণা, গ্লুকোমা হলেই চোখ অন্ধ হয়ে যাবে এবং এর কোনো চিকিৎসা নেই। এ ধারণায় কিছু সত্যতা থাকলেও পুরোপুরি সত্য নয়। এটা সত্যি, গ্লুকোমা চোখের একটি মারাত্মক অসুখ এবং চিকিৎসার আগ পর্যন্ত যেটুকু দৃষ্টি কমে গেছে সেটা আর ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়। তবে যেটুকু দৃষ্টি বিদ্যমান আছে সেটুকু সুচিকিৎসা দিয়ে বাঁচানো যায়। গ্লুকোমার সফল অপারেশন হলে সারা জীবনের জন্য আর ড্রপ বা ট্যাবলেট ব্যবহারের প্রয়োজন নাও হতে পারে।
আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চোখের ওষুধ ব্যবহার করলে এবং চোখের চাপ স্বাভাবিক সীমার মধ্যে রাখতে পারলে ভালো থাকার সম্ভাবনা ৮০-৯০ শতাংশ। বেশির ভাগ গ্লুকোমা রোগীই চোখের ফোঁটা ওষুধ ব্যবহার করে ভালো থাকেন। তবে কোনো রোগী একটি ওষুধে আবার কেউ কেউ তিন-চারটি গ্লুকোমার ওষুধ ব্যবহার করে চোখের চাপ স্বাভাবিক রাখেন।
গ্লুকোমার চিকিৎসার জন্য রয়েছে ফোঁটা ওষুধ, লেজার ও শল্যচিকিৎসা। বাংলাদেশে বর্তমানে সিলেকটিভ লেজার ট্রাবিকুলোপ্লাস্টি বা এসএলটি লেজারের সাহায্যে সফলভাবে প্রাথমিক গ্লুকোমার চিকিৎসা হচ্ছে। তবে কারো যদি ওষুধ দিয়ে ও লেজারের চিকিৎসায় চোখের চাপ স্বাভাবিক না থাকে, তাহলে গ্লুকোমার শল্যচিকিৎসা করার প্রয়োজন হতে পারে। শল্যচিকিৎসার ঝুঁকি কিছু বেশি হলেও অন্ধত্ববরণ করার চেয়ে অবশ্যই ভালো। এ বিষয়ে একজন চক্ষু ও গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে নেওয়াই কাম্য।
গ্লুকোমা রোগীর বছরে অন্তত একবার চোখের সব ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা ছাড়াও দৃষ্টির পরিসীমা পরীক্ষা করা উচিত। এ ছাড়া চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে আধুনিক কয়েকটি পরীক্ষা, যেমন রেটিনার রঙিন ছবি, ওসিটি মেশিনের সাহায্যে রেটিনার নার্ভ ফাইবার অ্যানালাইসিস, অপটিক ডিস্কের পরীক্ষা ইত্যাদি করানো যেতে পারে।
গ্লুকোমা চিকিৎসার জন্য প্রাথমিকভাবে রোগ নির্ণয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চোখের নার্ভের অনেক বেশি ক্ষতি হওয়ার পর রোগ নির্ণয় হয়, ততই চিকিৎসা জটিল হতে থাকে। এ জন্য চশমার পাওয়ার পরিবর্তন বা অন্য কোনো কারণে যখনই চক্ষু চিকিৎসকের কাছে যাবেন, তখনই জেনে নিন আপনার গ্লুকোমা আছে কি না বা গ্লুকোমা সন্দেহজনক কোনো উপসর্গ আপনার আছে কি না। কারো যদি চোখের চাপ বেশি থাকে কিংবা অপটিক ডিস্কের পরিবর্তন থাকে, তাহলে গ্লুকোমার বিশেষ পরীক্ষাগুলো করে নিশ্চিত হওয়া উচিত তার গ্লুকোমা হয়েছে কি না।
গ্লুকোমার রোগীরা চোখের প্রচুর ব্যথা, দৃষ্টিশক্তি একেবারেই কমে যাওয়া, চোখ লাল হওয়া—এসব উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসেন। এসব রোগীকে অতিদ্রুত চিকিৎসা করতে হবে। দু-এক ঘণ্টা দেরিতে এসব রোগীর চোখের নার্ভ অনেকটাই খারাপ হয়ে যেতে পারে। সুতরাং কারো ব্যথাযুক্ত লাল চোখ হলে যত দ্রুত সম্ভব চক্ষু চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। এ ধরনের গ্লুকোমা রোগীদের শুধু ওষুধে চোখের চাপ স্বাভাবিক হয় না। এ জন্য ওষুধ দিয়ে চোখের চাপ যতটা সম্ভব কমিয়ে শল্যচিকিৎসা করতে হবে।
ছোট শিশুদের গ্লুকোমা হতে পারে। জন্মগত গ্লুকোমা থাকলে চোখের আকৃতি বিশেষ করে কর্ণিয়া বা নেত্রস্বচ্ছের আয়তন বাড়তে পারে। চোখ দিয়ে পানি পড়তে পারে, চোখ ট্যারা হয়ে যেতে পারে। এসবের কোনো লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে চিকিৎসা করতে হবে। শিশুদের গ্লুকোমা চিকিৎসা ওষুধ দিয়ে ভালো ফলাফল পাওয়া যায় না। এ জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শল্যচিকিৎসা করতে হয় এবং ৭০-৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই এ চিকিৎসা সফল হয়।
গ্লুকোমা হলে দুশ্চিন্তা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করালে গ্লুকোমাকে সঙ্গে নিয়েই প্রায় স্বাভাবিক জীবন যাপন করা সম্ভব। আপনার দৃষ্টি যতটুকু ভালো আছে, এটা দিয়ে বাকি জীবন ভালোভাবেই বসবাস করতে পারবেন। তবে তার জন্য দরকার দৈনন্দিন জীবনের কিছু নিয়ম ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা।
গ্লুকোমা চিকিৎসায় কন্টাক্ট লেন্স
রোগটি নিয়ন্ত্রণের জন্য সারা জীবন প্রতিদিন এক বা একাধিক চোখের ড্রপ ব্যবহার করতে হয়৷ আর নিয়মিত দিনে একাধিকবার এই ড্রপ ব্যবহার অনেক সময় হয়ে ওঠে বিরক্তিকর ও যন্দ্রণাদায়ক৷
সম্প্রতি হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের একদল বিজ্ঞানী এই বিরক্তিকর ড্রপ দেওয়া থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য স্মার্ট কন্টাক্ট লেন্স আবিষ্কার করেছেন, যার ভেতর গ্লুকোমার ওষুধ লাটানোপ্রস্ট দেওয়া থাকবে৷ এই কন্টাক্ট লেন্স চোখে পরার পর তা চার সপ্তাহ পর্যন্ত নির্দিষ্ট মাত্রায় চোখের ভেতর এই ওষুধ নিঃসরণ করতে থাকবে৷
কারও যদি দৃষ্টিশক্তি সমস্যা থাকে, তবে এই একই লেন্সের মাধ্যমে তাঁর চশমা আর গ্লুকোমা চিকিৎসা একইভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব৷ চোখের ভেতর ওষুধ দেওয়ার নতুন এই কার্যকর পদ্ধতি মানুষকে প্রতিদিন বারবার চোখে ড্রপ ব্যবহারের যন্ত্রণা থেকে রেহাই দেবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা৷ লাইভসায়েন্স৷