2 Answers
ইসলাম ডেস্ক: অনেকেই তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। কিন্তু ইসলামে আল্লাহ পাক বাবা-মায়ের মর্যাদা অনেকে উপরে দিয়েছেন। যে বাবা-মায়ের কারণে একজন সন্তান পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হয়, সেই বাবা মাকে যারা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে, তারা আর যাই হোক মানুষ নয়। । পবিত্র কুরআন পাকে আল্লাহ পাক তার নিজের অধিকারের পরই পিতা-মাতার অধিকারের কথা উল্লেখ করেছেন। কুরআনে কারীমে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। (সূরা বনী ইসরাঈল:২৩) ইমাম কুরতুবী (রাহ.) বলেন, এ আয়াতে আল্লাহ পাক পিতা-মাতার সম্মান এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করাকে নিজের ইবাদতের সাথে বর্ণনা করে সন্তানের ওপর তা অপরিহার্য করেছেন। যেমন- অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক নিজের শোকরের সাথে পিতা-মাতার শোকরকে একত্রিত করে তা আদায় করা অপরিহার্য করেছেন। কুরআনে পাকে বর্ণিত হয়েছে, তোমরা আমার শুকরিয়া আদায় করো এবং পিতা-মাতারও। (সূরা লোকমান : ১৪) এতে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামে আল্লাহ পাকের ইবাদতের পর পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা যেমন অতীব জরুরি অনুরূপভাবে পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা আদায় করাও সন্তানের জন্য জরুরি। (তাফসীরে কুরতুবী: ৫/৫৭৫) এ প্রসঙ্গে হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে প্রশ্ন করলেন, আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজ কোনটি? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, সময় মতো নামায পড়া। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, এরপর কোন কাজটি সর্বাধিক প্রিয়? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, এরপর কোন কাজটি সর্বাধিক প্রিয়? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। (সহীহ বুখারী: ১/৭৬) এ হাদিস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, দ্বীনের অন্যতম স্তম্ভ নামাযের পড়া আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় কাজ হলো পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। কুরআনে কারীমে এক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি মানুষকে পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণের নির্দেশ দিয়েছি।’ (সূরা লোকমান : ১৪) উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, পিতা-মাতার আনুগত্য এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা সন্তানের ওপর অপরিহার্য। তবে সন্তানের ওপর পিতা অপো মাতার অধিকার বেশি। এ ব্যাপারে হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) বলেন, এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)! আমার সাহচর্যে সদ্ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার মাতা। সে আবার প্রশ্ন করলেন, তারপর কে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার মাতা। সে আবার প্রশ্ন করলেন, তারপর কে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার মাতা। সে আবার প্রশ্ন করলেন, তারপর কে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার পিতা। অতঃপর ধারাবাহিকভাবে নিকটাত্মীয়। (সহীহ বুখারী: ২/৮৮৩) আল্লামা ইবনে কাছীর রাহ. এ হাদিস উল্লেখ করে বলেছেন, উল্লেখ করেন, এ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সন্তানের ওপর মাতার অধিকার পিতার চেয়ে তিন গুণ বেশি। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা.) মাতার কথা তিনবার উল্লেখ করেছেন, চতুর্থবারে পিতার কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া মাতার অধিকার বেশি হওয়ার স্বতন্ত্র কয়েকটি কারণ রয়েছে। এক. গর্ভধারণের কষ্ট। দুই. প্রসবকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গর্ভ প্রসবের কষ্ট । তিন. দুগ্ধপান করানো এবং সন্তানের সেবা-যতেœ নিয়োজিত থাকার কষ্ট। এসব কারণ পিতার মধ্যে বিদ্যমান নেই। (তাফসীরে কুরতুবী -৫/৫৭৫) তাছাড়া পবিত্র কুরআনে পাকে মায়ের কষ্টের এসব কারণের কথা উল্লেখ হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন, মাতা তাকে বড় কষ্টে গর্ভ ধারণ করেছে এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছে, আর তাকে গর্ভে ধারণ করা ও দুধ ছাড়ানো ত্রিশ মাস । (সূরা লোকমান :১৪) রাসূলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন হাদিস শরীফে পিতা-মাতার আনুগত্য ও সদ্ব্যবহারের অনেক ফজিলত বর্ণনা করেছেন। যেমন- হযরত আবুদ্দারদা (রাযি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বললেন, আমার স্ত্রীকে আমার মা তালাক দেয়ার জন্য আদেশ দিচ্ছেন, তখন আবুদ্দারদা (রাযি.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বর্ণনা করতে শুনেছি, পিতা-মাতা জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা। এখন তোমাদের ইচ্ছে, এর হেফাজত করো অথবা একে বিনষ্ট করে দাও। (তিরমিযী শরীফ -২/১২) অন্য এক হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত। (তিরমিযী শরীফ-২/১২) অন্যত্রে হযরত আবু উমামা (রাযি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, সন্তানের ওপর পিতা-মাতার দায়িত্ব কী? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তারা উভয়েই তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম। (ইবনে মাজাহ, পৃ-২৬০) এ হাদিসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদের আনুগত্য ও সেবাযত্ন জান্নাতে নিয়ে যায় এবং তাদের সাথে অসৎ আচর।
পৃথিবীতে সবচেয়ে মধুর শব্দটি হচ্ছে ‘মা’। জগৎ সংসারের শত দুঃখ-কষ্টের মাঝে যে মানুষটির একটু সান্ত্বনা আর স্নেহ-ভালবাসা আমাদের সমস্ত বেদনা দূর করে দেয় সেই মানুষটিই হলো ‘মা’। মায়ের চেয়ে আপনজন পৃথিবীতে আর কেউ নেই। দুঃখে-কষ্টে, সংকটে-উত্থানে যে মানুষটি স্নেহের পরশ বিছিয়ে দেয় তিনি হচ্ছেন আমাদের সবচেয়ে আপনজন ‘মা’। প্রত্যেকটি মানুষ পৃথিবীতে আসা এবং বেড়ে উঠার পেছনে প্রধান ভূমিকা মায়ের। পৃথিবীর প্রতিটি মা যদি সহিষ্ণু, মমতাময়ী, কল্যাণকামী না হতেন তবে মানব সভ্যতার চাকা শস্নথ হয়ে যেত। জন্মের সূচনাপর্ব থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মায়ের অবদান অতুলনীয়। সন্তানের জন্ম ও বেড়ে ওঠার পেছনে মা-বাবার উভয়ের হাত রয়েছে-একথা অনস্বীকার্য। তবে এটি সর্বজনস্বীকৃত যে, এক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকাই প্রধান। মা হচ্ছেন সন্তানের সুখ-দুঃখের অনন্ত সাথী। মা সন্তানের সুখে সুখী হন, আবার সন্তানের দুঃখে দুঃখী হন। নিজের সমস্ত স্বাদ-আহলাদ, আনন্দ-বেদনা বিলিয়ে দেন সন্তানের সুখ-শান্তির জন্য। তার হ্নদয়ের প্রবহমান প্রতিটি রক্ত কণিকায় রয়েছে সন্তানের জন্য ভালবাসা। মা তার সন্তানকে তিলে তিলে গড়ে তোলেন। সন্তানকে ঘিরেই মায়ের স্বপ্নের ডাল-পালা বিস্তার করতে থাকে। পৃথিবীতে একমাত্র মায়ের ভালবাসা ও দানই নিস্বার্থ ও বিনিময়হীন। মায়ের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় আমরা দেখতে পাই বসুন্ধরার এই বিচিত্র সৌন্দর্যের সমারোহ। মায়ের কাছেই আমরা গ্রহণ করি জীবনের প্রথম পাঠ। ‘মা’ শব্দটি উচ্চারণের মধ্যদিয়েই প্রত্যেকের পরিচয় ঘটে ভাষার বিস্তৃত ভুবনের সাথে। মা আমাদেরকে শেখান মহানুভবতার শিক্ষা, সেবার আদর্শ, মহৎপ্রাণ চাহিদা। মায়ের দীক্ষায় আমরা অনুপ্রাণিত হই প্রকৃত উৎকর্ষে। সচেষ্ট হই নৈতিক দায়িত্ববোধে। মা বিধাতার শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। মায়ের তুলনা অন্য কারো সঙ্গে চলে না। মা হচ্ছেন জগতের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। পবিত্র কুরআনের সুরা বনী ইসরাইলে মাতা-পিতার প্রতি সদাচরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এভাবে-‘তোমাদের প্রভু তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন তোমরা একমাত্র তারই ইবাদত করবে এবং মাতা-পিতার প্রতি সদাচরণ করবে। তাদের একজন বা উভয়ে যদি বার্ধক্যে উপনীত হয় তবে তুমি তাদের প্রতি বিরক্ত হয়ে উফ্ শব্দটি বলো না এবং তুমি তাদেরকে পরিত্যাগ করো না। আর তুমি তাদের সঙ্গে নম্র ও বিনয়ী হয়ে কথা বলো’। ন্যায় ও সমতার ধর্ম ইসলাম মায়ের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ইসলাম মাকে উচ্চাসনে স্থান দিয়েছে। ইসলামের ঘোষণা হচ্ছে ‘মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত’। মায়ের সেবা শুশ্রূষার দ্বারা জান্নাতের হকদার হওয়া যায়। বাবার তুলনায় ইসলাম মায়ের অধিকার অধিক ঘোষণা করেছে। যেমন মা-বাবা একইসঙ্গে সন্তানের কাছে পানি চাইল। এক্ষেত্রে শরীয়তের নির্দেশ হচ্ছে আগে মায়ের হাতে পানি তুলে দাও। অতঃপর বাবাকে পানি পান করাও। কারণ, সন্তানের প্রতি মায়ের যে ত্যাগ ও তিতিক্ষা তা দুনিয়ার আর কারো সঙ্গে তুলনা করা চলে না। এক সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাঃ কে জিজ্ঞেস করলেন-আমার সুন্দর ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে? আল্লাহর রাসূল সাঃ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করলেন, তোমার মা। সাহাবী আবার জিজ্ঞেস করলেন, আমার মায়ের পরে আমি কার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করব? আল্লাহর নবী তাগিদ দেয়ার জন্য বললেন, তোমার মায়ের পরেও তোমার মায়ের অধিকার পালন করতে হবে। তার সঙ্গে সুন্দর আচরণ তোমাকে করতে হবে। এভাবে তিনবার আল্লাহর রাসূল সাঃ মায়ের সঙ্গে সদাচরণ করার কথা বলেছেন। চতুর্থবার বলেছেন, অতঃপর তুমি তোমার বাবার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করবে। মুসলিম শরীফের বর্ণনায় আছে, একজন সাহাবী এসে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে চাই। আল্লাহর নবী তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, তোমার মা কি জীবিত আছেন? লোকটি বলল-হ্যাঁ, আমার মা জীবিত আছেন। তখন তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দিলেন, তোমার এখনই জিহাদ করার জন্য ময়দানে যাওয়ার দরকার নেই। তুমি তোমার মার সেবা করার মাধ্যমে জিহাদ কর। এর দ্বারা একথা প্রতীয়মান হয় যে, মায়ের সেবা করা জিহাদের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আল্লাহর রাসূল সাঃ বলেছেন, আল্লাহ ব্যতীত যদি কাউকে সেজদা করার নির্দেশ হত, তবে সন্তানকে নির্দেশ দেয়া হত তার মাকে সেজদা করার জন্য। আপনি যত বড় শিক্ষিতই হোন, যত প্রতিভাধরই হোন, আপনার মা অশিক্ষিতা হলেও মায়ের পায়ের নিচেই আপনার জান্নাত। আমাদের প্রিয় নবী (সাঃ) পরিণত বয়সে মায়ের সান্নিধ্য পাননি। এজন্য তিনি আফসোস করতেন। মায়ের সেবা করতে না পারার খেদ তার অন্তরে সর্বদা পীড়া দিত। এজন্য তিনি দুধমাতা হালিমা সাদিয়া (রাঃ) কে নিজের গায়ের চাদর বিছিয়ে দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করেছেন। মায়ের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সদাচরণ করে তার কিছুটা পূরণ করার চেষ্টা করেছেন। রাসূল (সাঃ) নির্দেশ করেছেন কেউ যদি তার মায়ের সেবাযত্ন করা থেকে বঞ্চিত হয় তবে সে যেন খালা অথবা মায়ের নিকটতম আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করে তা কিছুটা পুষিয়ে নেয়। সন্তানের ওপর মায়ের যে হক তা কখনো আদায় হওয়ার মতো নয়। মায়ের বুকের এক ফোঁটা দুধের মূল্য সন্তানের গায়ের চামড়া দিয়ে জুতা বানিয়ে দিলেও আদায় হবে না। সন্তানের জন্য মায়ের এক রাতের কষ্টের বিনিময় আদায় করা যাবে না কোনভাবেই। মায়ের সঙ্গে নম্র আচরণ, যথাসাধ্য সেবা শুশ্রূষা এবং কায়মনোবাক্যে তার প্রতিদানের জন্য প্রভুর দরবারে দোয়া করলে মায়ের হক যৎকিঞ্চিত আদায় হতে পারে। মা জগতের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। মা সন্তানের জন্য জান্নাতের সহজ পথ। যে সন্তান মায়ের সান্নিধ্য গ্রহণ করার পাশাপাশি মাকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে তারাই সাফল্যের সন্ধান পেয়েছে। সন্তানের কামিয়াবী নিহিত আছে মায়ের দোয়াতে। এজন্য প্রত্যেকের উচিত ‘মা’ নামক মহানিয়ামতের যথার্থ মূল্যায়ন করা। রাসূল (সাঃ) আক্ষেপ করে বলেছেন ‘যে ব্যক্তি মা-বাবাকে পেল, অথচ এদেরকে সন্তুষ্ট করে জান্নাতের মালিক হতে পারল না, সে ব্যক্তি বড়ই দুর্ভাগা!’
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy