1 Answers
মোবাইল ব্যাংকিং বলতে এমন একটি পদ্ধতিকে বুঝানো হয় যেখানে কোন একটি অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের যেকোন আর্থিক লেনদেন একটি মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা রয়েছে।
মোবাইল ব্যাংকিং চালুর চার বছরের মাথায় এটা যেমন জনপ্রিয় হয়েছে, তেমনি এই ব্যাংকিং সেবায় প্রতারণা এবং অবৈধ অর্থ পাচারেরও অভিযোগ উঠেছে৷ তবে ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোনো ব্যবস্থাকেই সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত বলা যায় না৷
বাংলাদেশে চালু হয় ২০১০ সালে৷ ২৮টি ব্যাংক অনুমোদন দেয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের৷ এর মধ্যে ১৯টি ব্যাংক মাঠ পর্যায়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করে৷ বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অনুমোদনের ভিত্তিতে সাড়ে চার লাখেরও বেশি এজেন্ট এই নগদ টাকা লেনদেনের কাজ করছেন৷ আর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এখন গড়ে প্রতিদিন ৩৩৩ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে এই মোবাইলের মাধ্যমে৷ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা বর্তমানে দুই কোটি ৩০ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১৫ ভাগ৷
মোবাইল ফোন থাকলেই যে কেউ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন আর টাকা লেনদেন করতে পারেন বাংলাদেশের যে কোনো স্থান থেকে৷ তাঁকে ব্যাংকের শাখায় যেতে হয় না৷ মোবাইল ফোনের কল রিচার্জ বা ‘ফ্লেক্সিলোড' করেন যাঁরা, তাঁরাই অ্যাকাউন্ট খুলে দেন, ব্যাংকের হয়ে তাঁরাই টাকা-পয়সা লেনদেন করেন৷
মোবাইল ফোন নম্বরটিই গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট নম্বর৷ এই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই অন্য কোনো মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে পারেন তিনি৷ নগদ টাকা তুলতে মাঝখানে থাকেন একজন এজেন্ট৷ তাঁরা মূলত ছোট ব্যবসায়ী, যাঁরা নিজের দোকান-ঘরেই লাইসেন্স নিয়ে থাকেন ব্যাংকের কাছ থেকে৷ অর্থাৎ মোবাইল ব্যাংকিং মানুষের সময় বাঁচিয়ে দিয়েছে, কমিয়েছে ভোগান্তি৷ এ কারণেই এ পদ্ধতি এত দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে৷
তবে বাংলাদেশে যাঁরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করেন, তাঁদের বেশিরভাগেরই নিজেদের কোনো অ্যাকাউন্ট নেই৷ তাঁরা এজেন্টদের মাধ্যমেই টাকা লেনদেন করেন৷ এক হিসেবে দেখা গেছে ৮০/৯০ শতাংশ টাকা লেনদেন নিজস্ব অ্যাকাউন্ট ছাড়া৷
গড় হিসেবে দেখা যায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ৬০০-৭০০ টাকা থেকে শুরু পাঁচ হাজার টাকার লেনদেনই বেশি৷ সাধারণত যাঁরা অল্প আয়ের মানুষ এবং যাঁরা ব্যাংকে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার মতো দক্ষ নন, তাঁদের একটি বড় অংশ এই ব্যাংকিং সেবার দিকে ঝুঁকছেন৷ তাছাড়া এই সেবায় যখন তখন টাকা পাঠানো এবং গ্রহণ করা যায়, যা এই সেবা জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ৷
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা লেনদেনে শতকরা দুই টাকা খরচ হয়৷ এতে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা লেনদেন করা যায়৷ তবে কেউ চাইলে একাধিক এজেন্ট বা অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আরো অনেক বেশি টাকা লেনদেন করতে পারেন৷ এছাড়া এই লেনদেনের তেমন কোনো তথ্য থাকে না৷ এজেন্টের মাধ্যমে করলে যাঁর কাছে টাকা পাঠান হয়, তাঁর মোবাইল নম্বর ছাড়া আর কোনো তথ্যই থাকে না৷ একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধতন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি৷ মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে অবৈধ কাজে টাকা ব্যবহার অনেক সহজ হয়েছে৷ কারণ কে টাকা পাঠাচ্ছেন, কার কাছে পাঠাচ্ছেন এবং কেন পাঠাচ্ছেন তা জানা সম্ভব নয়৷''
তিনি জানান, ‘‘এর বাইরে এই মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতারণার অভিযোগও আজকাল পাওয়া যাচ্ছে৷ ভুয়া মেসেজের মাধ্যমে এজেন্টরা যেমন টাকা দিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি গ্রাহকের টাকাও তুলে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে৷''
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম মোবাইল ব্যাংকিং শুরু করে ডাচ বাংলা ব্যাংক৷ ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর আবুল কাশেম মো. শিরিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘এজেন্টরা বেশ কিছু বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছে৷ যিনি টাকা পাঠাচ্ছেন এবং যিনি তা গ্রহণ করছেন, তার কোনো রেকর্ড রাখেন না তাঁরা, যা অবৈধ৷''
বাংলাদেশে ব্র্যাক ব্যাংকের ‘বিকাশ' মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সবচেয়ে আলোচিত নাম৷ এই বিকাশ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সবচেয়ে বেশি টাকা লেনদেন হয়৷ তাই বিকাশ-এর লেনদেনে প্রতারণার অভিযোগও সবচেয়ে বেশি৷ ব্র্যাক ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘‘মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশে নতুন বিপ্লবের সূচনা হয়েছে৷ এত বড় কার্যক্রমে হয়ত কিছু দুর্বলতা রয়েছে৷ তবে আশা করছি খুব শিগগিরই এ সব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে৷''
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর ড. আতিউর রহমান এই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে নানা পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন সংবাদমাধ্যমকে৷ তিনি বলেন, ‘‘মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা বাংলাদেশে বিকশিত হচ্ছে৷ একদিনে সব ঠিক হয়ে যাবে না৷ এজেন্টদের মাধ্যমে যেটা হচ্ছে, সেটাকে আমরা নিরুৎসাহিত করছি৷ আমরা ব্যাংকগুলো বলছি প্রতিনিয়ত তদারকি করতে৷''
বাংলাদেশের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রশংসা করেছেন স্বয়ং বিল গেটস৷ তিনি বলেছেন, ‘‘বাংলাদেশের ব্যাংকিংয়ে তথ্য-প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় আর্থিক সেবা এখন গরীবের কাছে পৌঁছে গেছে৷ ধনীরা ঋণ মঞ্জুর এবং ইনস্যুরেন্সসহ অন্যান্য আর্থিক সেবা ব্যাংক থেকে নিতে পারেন, কিন্তু গরীবদের সেখানে সুযোগ একেবারে কম৷ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে টাকা আদান-প্রদান আর্থিক সেবার ব্যয় কমায়৷''
বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বাংলাদেশে রীতিমত বিপ্লব হয়েছে৷ তবে এটাকে সত্যিকার অর্থেই ব্যাংকিং করে তুলতে হবে৷ নয়ত বড় রকমের ঝুঁকি আছে৷ যদি এখনই মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা না হয়, তাহলে এটা দেশের ভেতরে অবৈধ অর্থ লেনদেনের বড় মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে৷''
প্রসঙ্গত, মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেসের মধ্যে গ্রাহকদের পছন্দের সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থ স্থানান্তর (পিটুপি), নগদ জমা (ক্যাশ ইন) এবং নগদ উত্তোলন (ক্যাশ আউট)৷ একই সঙ্গে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস ব্যবহার করে বেতন-ভাতা প্রদানও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে৷
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy