রিকেট রোগ: কেন হয়, লক্ষণ ও উপসর্গ, নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়
রিকেট রোগ কি?
রিকেট হলো একটি রোগ যা ভিটামিন ডি এবং ক্যালসিয়ামের অভাবের কারণে হয়। এটি হাড়ের স্বাস্থ্যের উপর ভীষণ প্রভাব ফেলে, পাশাপাশি শিশুদের এবং বয়ঃসন্ধিদের মধ্যে বৃদ্ধি এবং বিকাশে, এমন কি বয়সকালেও মারাত্মক প্রমাণিত হয়েছে। কারণ এটি হাড়কে নরম, দুর্বল করে দেয় এবং হাড়ের বৃদ্ধি খুব বেদনাদায়ক হয় এবং এর ফলে অঙ্গবিকৃতিও হয়। এই অবস্থাকে শিশুদের মধ্যে হলে রিকেট এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হলে অষ্টিওমেলাসিয়া বলা হয়।
রিকেট রোগের লক্ষণ:
রিকেট রোগের লক্ষণগুলি নিম্নে আলোচনা করা হল:
- এই রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ সাধারণত রোগ সৃষ্টির প্রথম বা দ্বিতীয় বছরে দেখা দিয়ে থাকে।
- এই রোগের শিশুর দেহ শীর্ণ হয় এবং কঙ্কালসার চেহারা ও দেখা দিয়ে থাকে।
- এই রোগে বুক পায়রার বুকের মত সংকীর্ণ হয় । একে বলা হয় Pigeon Breast অবস্থা।
- শিশুর দাঁত উঠতে দেরি হয় মাথার তালু সহজে শক্ত হতে চায়না।
- পেটের মাংসপেশিগুলো দুর্বল হয়ে ফুলে ওঠে।
- রিকেট রোগে চুল উস্কোখুস্কো হয় শিশু দেরিতে হাটে, মাংসপেশিতে টান থাকে না।
- মাথার নরম হাড় গুলি চেপে ছেড়ে দিলে পিংপং বলের মতো মনে হয়।
- শারীরিক বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার দরুন শিশু বয়সের তুলনায় ছোট মনে হয়।
রিকেট রোগের জটিল উপসর্গ:
- মাঝে মাঝে শিশু অতিরিক্ত শীর্ণতা ও পেটের গোলমালে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়।
- দেহের বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না এবং ক্ষীণজীবী ও দুর্বল হয়।
- দেহের হাড় বাঁকা বাঁকা হবার জন্য হাত পা বাঁকা বাঁকা মতো হয়।
- বৃদ্ধি ঠিকমত না হওয়ার জন্য বেঁটে গড়ন হয়।
রিকেট রোগের প্রধান কারণগুলি কি কি?
রিকেট রোগের খুব সাধারণ কারণ হলো ভিটামিন ডি এবং ক্যালসিয়ামের অভাব। নিচে উল্লেখ করা এই ঘাটতিগুলি সবচেয়ে সাধারণ কারণ:
- পুষ্টির অভাব।
- ভিটামিন ডি এর শোষণে অক্ষমতা।
- সূর্যরশ্মিতে ত্বকের অপর্যাপ্ত প্রকাশ।
- গর্ভাবস্থা।
- অকালজাত বা সময়ের আগে জন্ম হওয়া।
- স্থূলতা।
- কিডনি এবং লিভারে রোগ।
- নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিকনভালস্যান্টস (খিঁচুনির জন্য) বা অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল (এইচআইভির জন্য) ওষুধ
- ক্যালসিয়াম এবং ফসফেট ঘাটতির কারণে খনিজকরণের ত্রুটিগুলিকে যথাক্রমে ক্যালসিপেনিক এবং ফসফোপেনিক রিকেট হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। খনিজকরণের ত্রুটি, ভিটামিন ডি থেকে বিচ্ছিন্ন অথবা দ্বিতীয় পর্যায়ভুক্ত ঘাটতি, বৃদ্ধির প্লেটের নীচে হাড়ের কোষে অস্টিওড (অখনিজ উপাদান) সঞ্চয় করে। এই কারণে নির্দিষ্ট সময়ের পর হাড় দুর্বল হয়ে যায় এবং বেঁকে যায়।
রিকেট রোগ কিভাবে নির্ণয় করা হয়?
ভিটামিন ডি এর ঘাটতি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এর মাত্রা, ক্ষারীয় ফসফাটেজ, ফসফরাস এবং প্যারাথাইরয়েড হরমোনের মাত্রা জানার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হয়। যেখানে হাড়ের মধ্যের পরিবর্তন দেখা যায়, তার জন্য এক্স-রে পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়। হাড়ের বায়োপসি প্রয়োজন হতে পারে এবং রিকেট বা অস্টিওম্যালাসিয়া নির্ণয়ের জন্য এটি হল সবচেয়ে সঠিক পদ্ধতি।
রিকেট রোগ এর চিকিৎসা:
- শিশুর দেহে সূর্যের আলো পড়তে দিলে সুফল পাওয়া যায়।
- শিশুর দেহে রোজ কডলিভার অয়েল মালিশ করতে হবে , অথবা খাঁটি সরষের তেল মাখিয়ে রোদে রাখতে হবে কিছুক্ষণ (শীতকালে) ।
- হাড় দুর্বল হলে Splint লাগাতে হবে।
- অভাবের প্রকৃতি এবং তীব্রতা নির্ধারণ করে ভিটামিন ডি-এর যথাযথ ডোজ এবং যতক্ষণ না এক্স-রের ফলাফল স্বাভাবিক হয় ততক্ষণ ক্যালসিয়াম সম্পূরক দেওয়া হয়।
পার্থক্যমূলক রোগনির্ণয়:
রিকেট রোগগ্রস্ত শিশুদের প্রায়ই হাড় ভেঙে যায়। যেটা অনেক সময় শিশু অপব্যবহারে অভিযুক্ত হয়। এই অবস্থাটা দুর্বল পুষ্টি এবং ভিটামন ডি সম্পূরক না-থাকা, শীতে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় একমাত্র কালো চামড়াযুক্ত মায়েদের শিশুপালনে সাধারণভাবে দেখা যায়। একই পরিমাণ সূর্যালোকে হালকা চামড়ার মানুষদের থেকে অপেক্ষাকৃত কালো চামড়ার মানুষদের শরীরে কম পরিমাণ ভিটামিন ডি তৈরি হয়।
রিকেট রোগে ভিটামিনের ভূমিকা:
ভিটামিন মানব শরীরে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীরে ভিটামিনের অভাব হলে বিভিন্ন ধরনের রোগ হয়। এক ভিটামিন অন্য ভিটামিনের অভাব পূরণ করতে পারে না। ভিটামিন-ডি মানব শরীরে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আমাদের প্রায় সকলেরই অজানা যে সূর্যালোক হচ্ছে ভিটামিন ডি এর প্রধান উৎস। মায়েরা ঠিকমতো শিশুদের গায়ে সূর্যালোক পড়তে দেন না। কিন্তু এই বিষয়টি মোটেও ঠিক নয়। প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় শিশুদের গায়ে সূর্যালোকের তাপ লাগানো উচিত। যেমন শীতপ্রধান দেশে সারা বছরই সূর্যালোক তেমনভাবে পৌঁছায় না, সেই কারণে শীতপ্রধান দেশে শিশুদের সূর্যালোকের পরিবর্তে ভিটামিন ডি জাতীয় খাবার খাওয়ানো হয়। মাছের তেলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ডি থাকে। শিশুদেরকে ভিটামিন ডি এর অভাব পূরণ করার জন্য কড লিভার অয়েল খাওয়ানো হয়। ভিটামিন ডি পাওয়া যায় দুধ, মাখন, ডিম ও যকৃতে।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা:
কয়েকটি সহজ ব্যবস্থা রিকেট রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করতে পরে। আপনি অবশ্যই:
- স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করুন যাতে দুগ্ধজাত খাবার এবং ডিম অন্তর্ভুক্ত থাকে।
- বাইরে সময় কাটান, বিশেষ করে সকালের রোদে।
- ডাক্তারের সাথে পরামর্শের পর ভিটামিন ডি-এর সম্পূরক গ্রহণ করুন।
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy