2 Answers
সিলেটের ইতিহাসকে কয়েকটি পর্বে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন; প্রাচীন অধিবাসী বিবরণ, ঐতিহাসিক বিবরণ, প্রাচীন রাজ্যসমূহ, আর্য যুগ, মুসলমান শাসিত আমল, মোগল আমল, ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তি, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ। সিলেট বলতে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাংশের সিলেট বিভাগ বোঝানো হয় যদিও ঐতিহাসিক সিলেট অঞ্চলের কিছু অংশ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ভারতের আসাম রাজ্যের অঙ্গীভূত হয়ে আছে। প্রাচীন অধিবাসী বিবরণ প্রাচীনকালে অস্ট্রেলীয়, দ্রাবিড় মঙ্গোলীয়সহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী সিলেট বিভাগে বসবাস করতেন। প্রমাণ হিসেবে এই অঞ্চলের বেড়ে ওঠা গৌরবময় প্রাচীন কৃষি সভ্যতাকে ধরা হয়। ঐতিহাসিক অচ্যূতচরণ চৌধুরী এই বিভাগীয় অঞ্চলের প্রাচীনত্বের স্বীকৃতি দিয়েছেন। নৃবিজ্ঞানের সূত্রে বলা হয় ভাষাগত দিক দিয়ে আদি অস্ট্রেলীয়দের কথ্য ভাষার সাথে এখানকার আঞ্চলিক ভাষারও একটা মিল রয়েছে। কুড়ি (বিশ-সংখ্যা), গন্ডা (চার-সংখ্যা), নুন (লবণ), মিঠাই (মিষ্টি) ইত্যাদি সিলেটের মানুষের মুখের ভাষা, যাহা আদি অস্ট্রেলীয়দের ভাষা হিসেবে ধরা হয়। অস্ট্রেলীয়দের পরে কৃষিনির্ভর মঙ্গোলীয়দের এই অঞ্চলে আগমন ঘটে এবং কৃষিকর্মের মাধ্যমে তারা একে অন্যের সাথে মিশে যায়। অস্ট্রেলীয়দের আগমনের কিছুকাল পরে এই অঞ্চলে মঙ্গোলীয়রা ও আলপীয়রা আসে। অতঃপর উক্ত জাতিগোষ্ঠীগুলো তন্ময়ভাবে একে অন্যের সাথে মিশে যায়। উল্লেখিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনের ভিত্তিতে মনে করা হয় আদি অস্ট্রেলীয়, দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয়দের থেকে বেড়ে উঠেছে সিলেট বিভাগের প্রাচীন জনপদ। সিলেটের জাফলং এ খাসিয়া আদিবাসী : শ্রীহট্ট বা সিলেট বিভাগে প্রাচীনকালে যেসব জাতিগোষ্ঠী বসবাস করতো, তাদের মধ্যে অনেকটি ছিল হিন্দুধর্মাবলম্বী। যারা হিন্দু নয়, তারা ভূত, বৃক্ষ বা পশুর উপাসনা করতো। আবার বিভিন্ন সময়ে কেহ কেহ হিন্দু ধর্ম বর্জন করেছে। উক্ত আদিবাসীদের মধ্যে কুকি, খাসিয়া, টিপরা, মণিপুরী ও লালুং ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠী প্রাচীন। আনুমানিক খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের পরে এদেশে আর্যজাতির আগমন ঘটে। আর্যদের পূর্বে কুকিরাই এই অঞ্চলের মালিক ছিল বলে ধারণা করা হয়। আর্যজাতি এদেরকে বিতাড়িত করেছে বলে জানা যায়। কুকিদের মধ্যে অনেকেই হিন্দু ধর্ম অবলম্বন করে হালাম বা টিপরা বলে পরিচয় দিয়া থাকে। ঐতিহাসিক বিবরণ অচ্যূতচরণ চৌধুরীসহ ইতিহাসবিদেরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ধারণা করেন; গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদের সমস্ত উত্তর-পূর্ব অঞ্চল নিয়েই গঠিত
সিলেট বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত একটি প্রাচীন জনপদ। বনজ, খনিজ ও মৎস্য সম্পদে ভরপুর এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত এ জেলা দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত। জৈন্তা পাহাড়ের অপরূপ জাফলংয়ের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য, ভোলাগঞ্জের সারি সারি পাথরের স্তূপ পর্যটকদের টেনে আনে বারবার। এ জেলার বিশাল সংখ্যক লোক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ করে দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। সিলেটের পাথর, বালুর গুণগত মান দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। জেলার প্রাকৃতিক গ্যাস সারাদেশের সিংহভাগ চাহিদা পূরণ করে থাকে। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) এর পবিত্র মাজার শরীফ এ জেলায় অবস্থিত। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ লোক মাজার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে এখানে আগমন করে। শীত মওসুমে সিলেটের হাওর-বাওড়গুলো ভরে উঠে অতিথি পাখির কলরবে।
১৭৬৭ সালে এ অঞ্চল ব্রিটিশদের করায়ত্ত্ব হওয়ার পর ১৭৭২ সালের ৩ জানুয়ারি সিলেট জেলার সৃষ্টি হয়। কালের প্রবাহে ১২টি উপজেলা নিয়ে বর্তমান সিলেট জেলা গঠিত।
সীমানা : পূর্বে ভারতের আসাম, পশ্চিমে সুনামগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে মৌলভীবাজার জেলা, উত্তরে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়।
জেলার পটভূমি : ঔপনিবেশিক আমলেই সিলেট দ্রুত বিকাশ লাভ করেছে। সিলেট পৌরসভা সৃষ্টি হয় ১৮৭৮ সালে। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন এক মারাত্মক ভূমিকম্প শহরটিকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলে। পরবর্তীতে ধ্বংসস্তূপের উপর গড়ে উঠে ইউরোপীয় ধাঁচের আরো সুন্দর ও আধুনিক শহর। ১৮৯০ এর শেষদিকে কিছু রাস্তাঘাট তৈরি করা হয়। ১৯১২-১৫ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের একটি শাখা সিলেটের সাথে সংযুক্ত হলে দেশের অন্যান্য অংশের সাথে সিলেটের বিচ্ছিন্নতার প্রকৃত অবসান ঘটে। চা শিল্পের কারণে বিশ শতকের প্রথমদিকে সিলেট শহরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৪ শতকে ইয়েমেনের সাধক পুরুষ হযরত শাহজালাল (রহ.) সিলেট জয় করেন এবং ইসলাম প্রচার শুরু করেন। নানকার বিদ্রোহ সিলেটের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
শিল্প ও বাণিজ্য : সিলেটে ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান তেমন একটা গড়ে উঠেনি। ভারী শিল্পের মধ্যে আছে ফেঞ্চুগঞ্জ প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার কারখানা লিমিটেড।
এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে বিদেশমুখিতা, সস্তা শ্রমের অভাব এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহ এর মূল কারণ। সরকারিভাবে সিলেটে দুটি বিসিক শিল্পনগরী গড়ে উঠেছে-১. খাদিম নগর ও ২. গোটটিকর।
ভাষা ও সংস্কৃতি : ভাষা নিয়তই পরিবর্তনশীল এবং ভাষার পরিবর্তন হয় এলাকাভিত্তিক ও দূরত্বের উপর নির্ভর করে। সে হিসেবে সিলেটিদের মুখের ভাষা প্রকৃত বাংলা ভাষা হতে বেশ খানিকটা দূরে। সিলেট ঐতিহাসিকভাবেই আলাদা ভাষা এবং আলাদা সংস্কৃতির ধারণ ও লালন করে আসছে। এখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বসবাস, যার ফলে ভাষার ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈচিত্র্য। পূর্বে সিলেট আসাম রাজ্যের অন্তর্গত থাকার ফলে সিলেটের ভাষা ও সংস্কৃতিতে আসামের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও সিলেটের রয়েছে এক বৈচিত্র্যময় নিজস্ব ভাষা যা নাগরী লিপি হিসেবে পরিচিত। নাগরীর অক্ষর মাত্র ৩২টি। যুক্তবর্ণ সাধারণত ব্যবহার হয় না। মাত্র আড়াই দিনে শেখা যায়। বৃহত্তর সিলেট, কাছাড়, করিমগঞ্জ, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ প্রভৃতি এলাকায় নাগরী লিপির ও সাহিত্যের প্রসার ও সমাদর ছিল।
খনিজ সম্পদ : খনিজ সম্পদে ভরপুর সিলেট জেলা। এ জেলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে মূল্যবান খনিজ সম্পদ।
প্রাকৃতিক গ্যাস : হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্র, কৈলাশটিলা গ্যাস ক্ষেত্র, সিলেট গ্যাস ক্ষেত্র, সেভরন গ্যাস ক্ষেত্র। বাংলাদেশের মোট গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ সিলেটে মজুদ আছে।
অপরিশোধিত তেল : প্রাকৃতিক গ্যাসের সাথে সাথে গ্যাস কূপ থেকে খনিজ তেল আহরণ করা হয়। তেল সম্পদের মধ্যে আছে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন।
পাথর ও চুনাপাথর : বাংলাদেশের পাথরের চাহিদার ৯০% ই আসে সিলেট থেকে। সিলেট জেলা চুনা পাথরেও বেশ সমৃদ্ধ।
দর্শনীয় স্থান : আবহমান কাল ধরে সিলেট পর্যটকদের কাছে একটি প্রিয় নাম। সিলেটের পথে প্রান্তরে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে প্রাচীন ঐতিহ্য। হযরত শাহ জালাল ও শাহপরান (রহ) এর স্মৃতিবিজড়িত এ পূণ্যভূমিতে দেশী বিদেশী ভক্তকুলের আগমন ঘটে। ধর্মীয় গুরুত্বের দিক থেকে সিলেট যে রকম অনন্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ক্ষেত্রেও তেমনি। উপমহাদেশের প্রথম চা বাগান মালনী ছাড়া পর্যটকদের কাছে আরেক বিস্ময়।
এছাড়াও সুরমা নদীর উপর কিন ব্রিজ না দেখলে সিলেট ভ্রমণ অনেকটা অপূর্ণই থেকে যায়।
সিলেটের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে আছে-১. জাফলং, ২. ভোলাগঞ্জ, ৩. লালাখাল, ৪. তামাবিল, ৫. হাকালুকি হাওড়, ৬. শ্রী চৈতন্য দেবের বাড়ি, ৭. হাছন রাজা মিউজিয়াম, ৮. এমএজি ওসমানী বিমানবন্দর, ৯. পর্যটন মোটেল, ১০. জাকারিয়া সিটি, ১১. ড্রিমল্যান্ড পার্ক, ১২. আলী আমজাদের বাড়ি, ১৩. মুনিপুরি রাজবাড়ি ১৪. মুনিপুরি মিউজিয়াম, ১৫. শাহী ঈদগাহ, ১৭. উসমানী শিশুপার্ক ইত্যাদি।
এক নজরে সিলেট জেলা :
আয়তন-৩৪৯০ কিলোমিটার, ভৌগোলিক অবস্থান-২৪৪০' থেকে ২৫১১' উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১৩৮' থেকে ৯২৩০' দ্রাঘিমাংশ, লোকসংখ্যা-২৯,৫৭০০০। (পুরুষ ১৫২২০০০, মহিলা ১৪,৩৫০০০)। উপজেলা-১২টি, থানা ১৩টি, পৌরসভা ৪টি, ইউনিয়ন-১২টি, গ্রাম ১৪টি, শিক্ষার হার ৪৫.৫৯%, সংসদীয় আসন ৬টি, প্রধান নদ-নদী-সুরমা, কুশিয়ারা, পিয়াইন, গোয়াইন, সারি। মোট আবাদি জমি-৩৫১৮০৭ হেক্টর, কৃষিজ সম্পদ-ধান, আলু।
সিলেটের ইতিহাস ব্যাপক।সংক্ষিপ্ত পরিসরে কখনো লিখে প্রকাশ করা পসিবল নয়।