1 Answers
সেলজুক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাঃ
আব্বাসী খিলাফাতের সময়ে তুর্কিদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায় এবং তারা আস্তে আস্তে গভর্নর, সেনাপতি এবং শাসকের দায়িত্ত্ব পেতে থাকে। তারা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অনুশাসনে চলে আসায় এবং খলিফার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করার কারণে সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হতে থাকে।
আব্বাসী খলিফা মুতাসীম তার সময়ে রাজ প্রাসাদের দরজা তুর্কিদের জন্য সম্পূর্ণ ভাবে উম্মুক্ত করে দেন। তাদেরকে রাষ্ট্রের শাসন কর্তা নিযুক্ত করেন। মুতাসিমের মূল রাজনীতি ছিল তার শাসনে পারস্যদের প্রভাব কমিয়ে আনা। খলিফা মামুনের সময় থেকে আব্বাসী খিলাফাতে পারস্যদের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মত।
তুর্কিদেরকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কারণে জনসাধারণ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে এক মারাত্মক ক্রোধের সৃষ্টি হয়। ফলশ্রুতিতে খলিফা মুতাসিম তার প্রতি জনগনের এই ক্রোধকে ভয় পেয়ে যান। এরপর তিনি নতুন একটি শহর (সামিরা) প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে তুর্কি সেনাবাহিনীকে সেখানে স্থানান্তর করেন। এইভাবে তিনি তাদেরকে বাগদাদ থেকে দূরে সরিয়ে নেন। ১২৫ হিজরিতে এই ঘটনা সংগঠিত হয়েছিল।
তুর্কিরা এইভাবে ইসলামের সাথে পরিচয়ের পর বিশাল এক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। সেলজুক নামক এই রাষ্ট্রটি আব্বাসী খিলাফতের অধীনে ছিল।
মুসলিম আরব অঞ্চলের পূর্ব দিকের ভূমিতে সেলজুকদের বহিঃপ্রকাশের পেছনে উপযোগী রাজনৈতিক শর্ত এবং সুযোগ সুবিধা ছিল। এই অঞ্চলে সুন্নি আব্বাসী খিলাফতের সাথে শিয়া ফাতিমী খিলাফতের দ্বন্দ্ব ছিল।
সেলজুকরা, এই বিশাল তুর্কি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করেছিল হিজরী ৫ম শতকে। এই রাষ্ট্র খোরাসান, মাওয়ারাউন নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকা, ইরাক, ছোট এশিয়া (এনাতলিয়া) এবং শাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। প্রথমে ইরানের রেই, পরবর্তীতে ইরাকের বাগদাদ এই বিশাল সেলজুক রাষ্ট্রের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। সেই সময়ে খোরাসানের মাওয়ারাউন নদীর এলাকায় (কিরমান সেলজুক), শামে (সিরিয়ান সেলজুক) এবং ছোট এশিয়াতে ( এনাতলিয়ান সেলজুক) দের মত ছোট ছোট সেলজুক রাষ্ট্র গড়ে উঠে। এই ছোট ছোট রাষ্ট্র গুলি বাগদাদের খলিফার আনুগত্য করত এবং তাদের নির্দেশ মেনে চলত। ইরান এবং ইরাকে শিয়া মাজহাবের প্রভাব ক্ষুণ্ণ করার জন্য তারা আব্বাসী সুন্নিদেরকে সাহায্য করে এবং তারা ফাতিমীদের কাছ থেকে মিশর এবং শাম কে তাদের শাসনাধীনে নিয়ে আসে। এইভাবে তারা শাম এবং মিশরের উপর তাদের একচ্ছত্র কতৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং সেখান থেকে ফাতেমী খিলাফত উচ্ছেদ করে।
সেলজুকদের নেতা তুউরুল, বুভেয়হীদের রাষ্ট্রকে হিজরি ৪৪৭ সালে উচ্ছেদ করে এই অঞ্চল থেকে ফিতনা দূরীভূত করতে সক্ষম হন। যারা মসজিদের দরজায় সাহাবীদেরকে গালী দিয়ে বিভিন্ন ধরনের লেখা টাঙাত তাদেরকে তিনি সমুলে উৎখাত করতে সক্ষম হন। এই ব্যাপারে সব চেয়ে বেশি সীমা লঙ্ঘন কারী রাফেজি শায়েখ আবু আব্দুল্লাহ আল জ্বালাবীকে তিনি হত্যা করেন।
বাগদাদের আব্বাসী খলিফার উপর এই বুভেয়হীদের প্রচণ্ড চাপ ছিল। সেলজুকগণ এই বুভেয়হী রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটিয়ে তাদেরকে বাগদাদ থেকে অপসারণ করে। সেলজুকের সুলতান তুউরুল, আব্বাসী খিলাফতের রাজধানী বাগদাদে গেলে তৎকালীন আব্বাসী খলিফা কাইম বি আমরিল্লাহ তাকে সাদর সম্ভাষণ জানান এবং তাকে সুলতান রুকুনুদ্দীন তুউরুল নামক উপাধীতে ভূষিত করেন। তাকে তার নিজের আসনের পাশে বসান এবং অনেক সম্মানে ভূষিত করেন। তার নামে মুদ্রাঙ্কিত করেন এবং বাগদাদ সহ অন্যান্য অঞ্চলের মসজিদে খুতবার সময় তার নাম উল্লেখ করা হয়। এইভাবে সেলজুকদের মান-মর্যাদা আরও অনেক বেড়ে যায়।
সেই সময়ের পর থেকে সেলজুকরা, বূভেয়হীদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠা আব্বাসী খলিফাদেরকে সব চেয়ে বড় সাহায্য করেন এবং খলিফা সহজে তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হন।
সুলতান তুউরুল, একজন ব্যক্তিত্ত্বশালী , অসাধারণ মেধাবী এবং সাহসী একজন সেনাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন দীনদার এবং আবেদ। আর এই কারনেই তিনি তার জাতীর কাছ থেকে অনেক বড় সমর্থন এবং সাহায্য পেয়েছিলেন। তিনি ‘’সুলজুকি তুর্ক’’ নামক শক্তিশালী একটি সেনাবাহিনী গঠন করেন এবং ‘’শক্তিশালী রাষ্ট্র’’ এই শ্লোগান দিয়ে এগিয়ে যান।
আব্বাসী খলিফা কাইম বি আমরিল্লাহর সাথে পরবর্তীতে সুলতান তুউরুল সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি পায় এবং এই সম্পর্কের জের ধরে খলিফা সুলতান তুউরুলের বড় ভাই চেফরি সাহেবের মেয়েকে বিয়ে করেন। হিজরি ৪৪৮ সালে (১০৫৬ খ্রিঃ) এই বিবাহ সংগঠিত হয়। পরবর্তিতে হিজরি ৪৫৪ সালে সুলতান তুউরুল খলিফার মেয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু এঁর পর সুলতান তুউরুল বেশী দ্বীন হায়াত পাননি। হিজরী ৪৫৫ সালে পবিত্র রমজান মাসের শুক্রবার রাতে ৭০ বছর বয়সে মৃত্যুবরন করেন।
সুলতান তুউরুলের মৃত্যুর পর সেলজুকগন, খোরাসান, ইরান, উত্তর – পূর্ব ইরাক অঞ্চলে তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেন।