5 Answers
না, শবে বরাত পালনের বা এই রাতে ইবাদতের কোনো সহিহ হাদিস নেই। সহিহ হাদিসের আলোকে শবে বরাত উপলক্ষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোনো আমল প্রমাণিত নয়। অবশ্য এ সম্পর্কে একটি জয়ীফ হাদিস আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "যখন শাবানের ১৫তম রাতের আগমন ঘটে তখন তাতে কিয়াম (ইবাদত) করো আর দিনে রোযা রাখো । নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা সূর্যাস্তের পর থেকে প্রথম আসমানে বিশেষ তাজাল্লী বর্ষন করেন, এবং ইরশাদ করেনঃ কেউ আছ কি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কারী? তাকে আমি ক্ষমা করে দিব ! কেউ আছ কি জীবিকা প্রার্থনাকারী? তাকে আমি জীবিকা দান করব ! কেউ কি আছ মুসিবতগ্রস্ত? তাকে আমি মুক্ত প্রদান করব! কেউ এমন আছ কি! কেউ এমন আছ কি! এভাবে সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ পাক তার বান্দাদেরকে ডাকতে থাকবেন..." (ইবনে মাজাহ : ১৩৮৮) এছাড়া আর কোনো সহিহ হাদিস নেই। তবে সহিহ হাদিসে পুরো শাবান মাসে বেশি বেশি ইবাদত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্টভাবে শুধু শবে বরাতের আমল প্রমাণিত নয়।
শবে বরাত সম্পর্কে সহীহ হাদিস রয়েছে। عن مالك من يخامر , عن معاذ بن جبل, عن النبى (, قال : يطلع الله الى خلقه فى ليلة النصف من شعبان, فيغفر لجميع خلقه إلا لمشرك أو مشاحن ]رواه ابن حبان وغيره, ورجاله ثقات, وإسناده متصل غلى مذهب مسلم الذى هو مذهب الحمهورفى المعنعن, ولم يحزم الذهبى بأن مكحولالم يلق مالك بن يخامر كما زعم, وإنما قاله على سبيل الحسان, راجع ,سبر أعلام النبلاء [ মুআয ইবনে জাবাল বলেন, নবী করীম স. ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে (শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। হাদীসটির সনদ সহীহ। এজন্যই ইমাম ইবনে হিব্বান একে কিতাবুস সহীহ এ বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ হাদীসটিকে পারিভাষিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাসান বলেছেন; কিন্তু হাসান হাদীস সহীহ তথা নির্ভরযোগ্য হাদীসেরই একটি প্রকার। বর্তমান সময়ের প্রসিদ্ধ শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানী (রহঃ) সিলসিলাতুল আহাদসিস্ সাহীহা ৩/১৩৫-১৩৯ এ এই হাদীসের সমর্থনে আরো আটটি হাদীস উল্লেখ করার পর লেখেনঃ وجملة القول أن الحديث بمجموع هذه الطرق صحيح بلاريب. والصحة تثبت بأقل منها عددا، مادامت سالمة من الضعف الشديد، كماهو الشأن فى هذاالحديث . এ সব রেওয়াতের মাধ্যমে সমষ্টিগত ভাবে এই হাদীসটি নিঃসন্দেহে সহীহ প্রমাণিত হয়। তারপর আলবানী (রহঃ) ওই সব লোকের বক্তব্য খন্ডন করেন যারা কোন ধরণের খোঁজখবর ছাড়াই বলে দেন যে, শবে বরাতের ব্যাপারে কোন সহীহ হাদীস নেই।
শবে বরাত সম্পর্কে অবশ্যই সহীহ হাদীস রয়েছে। সুনানে ইবনে মাজা শরীফের 99 পৃষ্ঠায় একটি অধ্যায রয়েছে ‘বাবু মাজাআ ফি লাইলাতিননিচফি মিন শা”বান’।যাতে 4টি হাদীস রয়েছে এর মধ্যে প্রথম হাদীসের (1388নং) বর্ণনাকারী 12 জন।তন্মধ্যে হযরত আবু বকর,হযরত আবু মুশা আশআরী,(রিদঃ)সহ বিশিষ্ট হাদীস বিশারদ রয়েছেন।এই হাদীসটি সম্পর্কে নাসিরুদ্দীন আল বানী (রহঃ) তার ’সিলসিলাতু আহাদীসিস সহিহাইন’ নামক কিতাবের 3য় খণ্ডের 135 পৃষ্ঠার 144 নং হাদীস হিসেবে তিনি একে স্হান দিয়েছেন এবং বলেছেন এটা একটা সহী হাদীস আর আমি এই হাদীসটি সহীহ না হওয়ার ব্যাপারে কোন মন্তব্য পাইনি।এছাড়াও ইবনে মাজা শরীপে আরো 3 টি হাদীসকে তিনি স্হান দিযেছেন।তাছাড়া সহীহ কিতাব জামে তিরমিজি শরীফের 156 পৃষ্ঠার ’বাবু মাজাআ ফি লাইলাতুন নিচফি মিন শা’বান’ নামক অধ্যাযের 739 নং হদীস যা মা আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্নিত হাদীসটিকে তিনি স্হান দিযেছেন। ইমাম বায়হাকী রহঃ তার শোয়াবুল ঈমান নামক কিতাবের 3833 নং হাদীসে শবে বরাত সম্পকে বলেছেন।সুতরাং শবে বরাত সহীহ হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত।
শবেবরাত পালন বিদআত নয়ে। কেননা এর পক্ষে কিছু হাদীস রয়েছে। তবে শবেবরাতে হালুয়া রুটি, বিশেষ পদ্ধতিতে নামাজ, সওয়াব ভেবে ঘুরতে যাওয়া ইত্যাদি নিশ্চিত বিদআত। এগুলোর কোনো দলীল নেই।
শবে বরাত নিয়ে বর্তমানে বেশ বির্তকমণ্ডিত একটি অবস্থা বিরাজমান- সেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কেউ বলতে চাচ্ছেন শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত বলতে ইসলামে (কোরআন-হাদিসে) কিছুই নেই। আবার কোনো কোনো মুসলিম পক্ষ এই বক্তব্য কোনোভাবেই মেনে নিতে নারাজ যে শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত নামে ইসলামে কিছু নেই। এর মাঝামাঝি আরো একটি দল বা গ্রুপের অবস্থান রয়েছে যারা লাইলাতুল বরাতকেন্দ্রিক বিতর্কের কারণে কিছুটা মনক্ষুন্ন। চলুন তাহলে দেখি এর সমাধান আসলে কি?
এক. শবে বরাতের ব্যপারে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান: বাস্তবতা হল, এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট কোন আলোচনা নাই। কেননা পবিত্র কোরআনের ২৫ তম পারা ও ৪৪ নং সূরা “ দুখানের ” শুরুতে যে পাঁচটি আয়াত রয়েছে সেখানে উল্লেখিত “লাইলাতুম মুবারাকাহ” (বরকতময় রাত) শব্দের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য তাফসীর হলো শবে ক্বদর; শবে বরাত নয়। তবে এ রাতের ফজিলত সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যদিও হাদিসে শবে বরাত শব্দ নাই। সেখানে আছে “লাইলাতুন নিছ্ফ মিন শাবান”(শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত)। আর “লাইলাতুন নিছ্ফ মিন শাবান”কে এই জন্য শবে বরাত বলা হয় যে, শব অর্থ হলো রাত আর বরাত অর্থ হলো নাজাত তথা মুক্তি। হাদীস দ্বারা যখন প্রমাণিত এই রাতে আল্লাহ তাআলা তার অনেক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন তাই এই রাতকে মুক্তির রাত তথা শবে বরাত বলা হয়। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহ. বলেন, “এ রাতকে লাইলাতুল বারাআত করে এ জন্যই নামকরণ করা হয়েছে যে, ট্যাক্স আদায়কারীগণ জনগণ থেকে পূর্ণ কর আদায় করে তাদেরকে “ বারাআত ” অর্থাৎ দায়মুক্ত বলে একটি দলীল হস্তান্তর করতেন, তদ্রূপ আল্লাহ তাআলাও মুমিন বান্দাদেরকে – এ রাতে জাহান্নাম সুতরাং এই রাতকে অন্য সব সাধারণ রাতের মতো মনে করা এবং এই রাতের ফজিলতের ব্যাপারে যত হাদিস এসেছে, তার সবগুলোকে মওযু বা যয়ীফ মনে করা ভুল যেমন অনুরূপ এ রাতকে শবে কদরের মত বা তার চেয়েও বেশি ফজিলতপূর্ণ মনে করাও ভিত্তিহীন ধারণা।
দুই. শবে বরাতের (পনের শাবানের রাত) ফজিলত সম্পর্কিত হাদিস:
عن مالك من يخامر , عن معاذ بن جبل, عن النبى ﷺ قال : يطلع الله الى خلقه فى ليلة النصف من شعبان, فيغفر لجميع خلقه إلا لمشرك أو مشاحن
মুআয ইবনে জাবাল রাযি. বলেন, নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে (শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)
এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, এ রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রহমত ও মাগফেরাতের দ্বারা ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত হয়। কিন্তু শিরকি কাজ-কর্মে লিপ্ত ব্যক্তি এবং অন্যের ব্যাপারে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারী মানুষ এই ব্যাপক রহমত ও সাধারণ ক্ষমা থেকেও বঞ্চিত থাকে।
তিন. হাদিসটির সনদ বিষয়ক আলোচনা: হাদিসটির সনদ সহিহ। কেননা উপরোক্ত হাদিসটি অনেক নির্ভরযোগ্য হাদিসের কিতাবেই নির্ভরযোগ্য সনদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে হিব্বান তার কিতাবুস সহিহ এ (যা সহিহ ইবনে হিব্বান নামেই সমধিক প্রসিদ্ধ, ১৩/৪৮১ এ) এই হাদিসটি উদ্ধৃত করেছেন। এটি এই কিতাবের ৫৬৬৫ নং হাদিস। যদি শবে বরাতের ফজিলতের ব্যাপারে দ্বিতীয় কোন হাদিস না থাকত, তবে এই হাদিসটিই এ রাতের ফজিলত সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এবং এ রাতে মাগফেরাতের উপযোগী নেক আমলের গুরুত্ব প্রমাণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট হত। অথচ হাদিসের কিতাবসমূহে নির্ভরযোগ্য সনদে এ বিষয়ক আরো একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। বর্তমান সময়ের প্রসিদ্ধ শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানী রহ. সিলসিলাতুল আহাদসিস্ সাহিহা ৩/১৩৫-১৩৯ এ এই হাদিসের সমর্থনে আরো আটটি হাদিস উল্লেখ করার পর লেখেন, وجملة القول أن الحديث بمجموع هذه الطرق صحيح بلاريب. والصحة تثبت بأقل منها عددا، مادامت سالمة من الضعف الشديد، كماهو الشأن فى هذاالحديث . এ সব রেওয়াতের মাধ্যমে সমষ্টিগত ভাবে এই হাদিসটি নিঃসন্দেহে সহিহ প্রমাণিত হয়। তারপর আলবানী রহ. ওই সব লোকের বক্তব্য খন্ডন করেন যারা কোন ধরণের খোঁজখবর ছাড়াই বলে দেন যে, শবে বরাতের ব্যাপারে কোন সহিহ হাদিস নেই।
চার. এ বিষয়ে আরো হাদিস: ‘হযরত আলা ইবনুল হারিস রহ. থেকে বর্ণিত, আয়েশা রাযি. বলেন, একবার ﷺ রাতে নামাযে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সেজদা করেন যে, আমার ধারণা হল তিনি হয়ত মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি উঠে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করলেন তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা অথবা বলেছেন, ও হুমাইরা, তোমার কি এই আশংকা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার দীর্ঘ সেজদা থেকে আমার আশংকা হয়েছিল, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কিনা। নবীজী জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জান এটা কোন্ রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন ইরশাদ করলেন-
পাঁচ. শবে বরাত ও সাহাবায়ে কেরাম: শবে বরাতের সাথে সংশ্লিষ্ট হাদিসসমূহের বর্ণনাকারীদের মধ্যে অনেক বড় বড় ( এক ডজনের মত ) সাহাবাও রয়েছেন। যাদের কয়েকজনের পবিত্র নাম নিম্নে প্রদত্ত হলো–
১. হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযি. ২. হযরত আলী রাযি. ৩. হযরত আয়শা রাযি. ৪. হযরত আবু হুরায়রা রাযি. ৫. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আ’মর রাযি. ৬. হযরত আবু মুসা আশআরী রাযি. ৭. হযরত আউফ ইবনু মালিক রাযি. ৮. হযরত মুআয ইবনু জাবাল রাযি. ৯. হযরত আবু ছালাবাহ আল খুসানী রাযি. ১০. কাছীর ইবনে মুররা আল হাজরমী রাযি.
ছয়. শবে বরাতের আমল: উল্লেখিত হাদিস থেকে এ রাতের কী কী আমল- তার একটা নির্দেশনা-ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাহল, ইবাদত করা। নফল নামাজের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দুই রাকআত করে যত রাকআত সম্ভব হয় পড়তে থাকা। কোরান কারীম তেলাওয়াত করা। দরূদ শরীফ পড়া। ইস্তেগফার করা। জিকির করা। দোয়া করা।
সাত. পরদিন রোজা রাখা সম্পর্কিত হাদিস: সুনানে ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছে ,
عن على بن ابى طالب رضى الله عنه قال : قال رسول الله ﷺ : إذا كانت ليلة النصف من شعبان فقوموا ليلها وصوموا نهارها, فإن الله ينزل فيهالغروب الشمس الى سماء الدنيا, فيقول : ألا من مستغفر فاغفر له على مستزرق فأرزقه, ألا مبتلى فأعافيه , ألا كذا, ألا كذا, حتى يطلع الفجر
হযরত আলী ইবনে আবু তালেব রাযি.থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, পনের শাবানের রাত (চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনের বেলা রোজা রাখ। কেননা, এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে আসেন এবং বলেন, কোন ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কোন রিযিক প্রার্থী? আমি তাকে রিযিক দেব। এভাবে সুব্হে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রয়োজনের কথা বলে তাদের ডাকতে থাকেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৩৮৪)
এই বর্ণনাটির সনদ যয়ীফ। কিন্তু মুহাদ্দিসীন কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হল, ফাযায়েলের ক্ষেত্রে যয়ীফ হাদিস গ্রহণযোগ্য। তাছাড়া শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখার কথা সহিহ হাদিসে এসেছে এবং আইয়ামে বীয অর্থাৎ প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোযা রাখার বিষয়টিও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। বলা বাহুল্য, পনের শাবানের দিনটি শাবান মাসেরই একটি দিন এবং তা আয়্যামে বীযের অন্তর্ভূক্ত। এজন্য ফিকহের একাধিক কিতাবেই এদিনে রোজাকে মুস্তাহাব বা মাসনূন লেখা হয়েছে।
আট. এ রাতের নফল আমলসমূহ সম্মিলিত নয়, ব্যক্তিগত: এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, এ রাতের নফল আমলসমূহ, বিশুদ্ধ মতানুসারে একাকীভাবে করণীয়। ফরজ নামাজ তো অবশ্যই মসজিদে আদায় করতে হবে। এরপর যা কিছু নফল পড়ার তা নিজ নিজ ঘরে একাকী পড়বে। এসব নফল আমলের জন্য দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হওয়ার কোন প্রমাণ হাদিস শরীফেও নেই আর সাহাবায়ে কেরামরে যুগেও এর রেওয়াজ ছিল না। (ইক্তিযাউস সিরাতিল মুসতাকীম: ২/৬৩১-৬৪১; মারাকিল ফালাহ ২১৯)
তবে কোন আহবান ও ঘোষণা ছাড়া এমনিই কিছু লোক যদি মসজিদে এসে যায়, তাহলে প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকবে, একে অন্যের আমলের ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হবে না।
নয়. এ রাতের আপত্তিকর কাজকর্ম: কোন কোন জায়গায় এই রেওয়াজ আছে যে, এ রাতে মাগরিব বা ইশার পর থেকেই ওয়াজ-নসীহত আরম্ভ হয়ে সারা রাত চলতে থাকে । আবার কোথাও ওয়াজের পর মিলাদ-মাহফিলের অনুষ্ঠান হয়। কোথাও তো সারা রাত খতমে-শবীনা হতে থাকে। উপরন্তু এসব কিছুই করা হয় মাইকে এবং বাইরের মাইকও ছেড়ে দেওয়া হয়। মনে রাখতে হবে, এসব কিছুই ভুল জঘন্যতর বেদআত।
অনুরূপভাবে খিচুরী বা হালুয়া-রুটির প্রথা, মসজিদ, ঘর-বাড়ি বা দোকান-পাটে আলোক-সজ্জা, পটকা ফুটানো, আতমবাজি, কবরস্থান ও মাজারসমূহে ভিড় করা, মহিলাদের ঘরের বাইরে যাওয়া, বিশেষ করে বেপর্দা হয়ে দোকানপাট, মাজার ইত্যাদি স্থানে ভিড় করা-এসবও এ রাতের আপত্তিকর কাজ। এসব কাজের কোন কোনটা তো অন্য সময়েও হারাম। আর কিছু কাজ সাধারণ অবস্থায় জায়েজ থাকলেও (যেমন : খিচুরী পাক করে গরীব-মিসকীনদের মধ্যে বন্টন করা) এগুলোকে শবে বরাতের কাজ মনে করা বা জরুরী মনে করা এবং এসবের পেছনে পড়ে এ রাতের মূল কাজ তওবা, ইস্তেগ্ফার, নফল ইবাদত ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত থাকার কোন বৈধতা থাকতে পারে কি? মূলতঃ এসব কিছুই শয়তানের ধোঁকা। মানুষকে আসল কাজ থেকে বিরত রাখার জন্যই শয়তান এসব কাজ-কর্মে মানুষকে লাগিয়ে রাখে।
দশ. একটি সতর্কবার্তা: অনেক অনির্ভরযোগ্য ওজিফার বই-পুস্তকে নামাজের যে নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন লেখা আছে অর্থাৎ এত রাকআত হতে হবে, প্রতি রাকআতে এই সূরা এতবার পড়তে হবে – এগুলো ঠিক নয়। হাদিস শরীফে এসব নেই। এগুলো মানুষের মনগড়া পন্থা। সঠিক পদ্ধতি হল, নফল নামাজের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দুই রাকআত করে যত রাকআত সম্ভব হয় পড়তে থাকা। আর ইবাদত করতে গিয়ে কিছুটা ঘুমের প্রয়োজন হলে ঘুমাবেন। এমন যেন না হয় যে, সারা রাতের দীর্ঘ ইবাদতের ক্লান্তিতে ফজরের নামায জামাআতের সাথে পড়া সম্ভব হল না। হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِي هُرَيرَةَ رضي الله عنه : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ :لَيْسَ صَلاَةٌ أَثْقَلَ عَلَى المُنَافِقِينَ مِنْ صَلاَةِ الفَجْرِ وَالعِشَاءِ، وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِيهِمَا لأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْواً
আবূ হুরাইরা রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মুনাফিকদের উপর ফজর ও এশার নামাজ অপেক্ষা অধিক ভারী নামাজ আর নেই। যদি তারা এর ফজিলত ও গুরুত্ব জানত, তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে বা পাছার ভরে অবশ্যই (মসজিদে) উপস্থিত হত। (বুখারি: ৬৫৭, ৬৪৪, ৬৫৭, ২৪২০, ৭২২৪, মুসলিম: ৬৫১)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শাবান মাসে সকল গুনাহ ও পাপরাশি থেকে পবিত্র হয়ে যথাযথভাবে রমযান মাসকে বরণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
সুত্রঃ http://quranerjyoti.com