1 Answers

কোন ধরণের মৃত্যু বা দুর্ঘটনার সংবাদ শুনে হার্ট অ্যাটাকের মতো তীব্র বুকে ব্যথার লক্ষণ দেখা যায়। তীব্র মানসিক চাপ থেকে এ ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে বলে একে ‘ব্রোকেন হার্ট (ভাঙ্গা হৃদয়!) সিনড্রোম’ বলা হয়। ১৯৯১ সালে প্রথম জাপানী চিকিৎসকরা চিকিৎসাশাস্ত্রমতে এ রোগের বর্ণনা দেন। তারা এ রোগের নাম দেন টাকোটসুবো কার্ডিওমায়োপ্যাথি। জাপানী জেলেরা অক্টোপাস শিকার করতে এক ধরণের পাত্র ব্যবহার করেন, যাকে ‘টাকোটসুবো’ বলা হয়। এ রোগে আক্রান্ত অবস্থায় রোগীদের হৃৎপিন্ডের চিত্র নিয়ে দেখা গেছে, তখন তা দেখতে অনেকটা টাকোটসুবোর মতো হয়। এ জন্যই এ নামকরণ। বর্তমানে এ রোগকে ‘স্ট্রেস কার্ডিওমায়োপ্যাথি’, ‘স্ট্রেস-ইনডিউস্ড কার্ডিওমায়োপ্যাথি’ বা ‘এপিকাল বেলুনিং সিনড্রোম’ও বলা হয়। সাধারণত ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোমে মহিলারাই বেশী ভুগে থাকেন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত রোগীদের দশজনের মধ্যে নয়জনই মহিলা। সাধারণত পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের মধ্যেই এ রোগ দেখা দেয়, যদিও কম বয়সীরাও আক্রান্ত হতে পারেন। আক্রান্তদের দশ শতাংশের ক্ষেত্রে এ রোগের আক্রমণ পুনরায় হতে পারে। ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোমে তীব্র মানসিক অথবা শারীরিক চাপ বা স্ট্রেস-এর ফলে হৃৎপিন্ডের মাংসপেশী দুর্বল হয়ে পড়ে। মানসিক চাপ যেমন, দুঃখ (প্রিয় কারো মৃত্যু), ভয়, প্রচন্ড রাগ বা বিস্ময় থেকে যেমন এ রোগ হতে পারে তেমনি শারীরিক চাপ যেমন, স্ট্রোক, খিঁচুনী, হাঁপানী, রক্তপাত প্রভৃতির কারণেও এ রোগ হতে পারে। শারীরিক বা মানসিক চাপের ফলে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় দেহের ভেতরে বিভিন্ন হরমোন ও রাসায়নিক, যেমন- অ্যাড্রেনালিন, নর-অ্যাড্রেনালিন প্রভৃতির নিঃসরণ বেড়ে যায়। এসব রাসায়নিক শরীরকে চাপ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করে। ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোমের ক্ষেত্রে চাপের প্রতিক্রিয়ায় দেহে প্রচুর পরিমাণে অ্যাড্রেনালিন উৎপন্ন হয়, এই অ্যাড্রেনালিন হৃৎপিন্ডের মাংসপেশীকে প্রভাবিত করে একে দুর্বল করে দিতে পারে। তবে মাংসপেশীর এ দুর্বলতা সাধারণত সাময়িক। স্বল্প সময়ের জন্য হৃৎপিন্ড দুর্বল হয়ে পড়ে কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কোন ক্ষতি হয় না। হার্ট অ্যাটাকের সাথে এ রোগের পার্থক্য হচ্ছে - হার্ট অ্যাটাকে হৃৎপিন্ডের মাংসপেশীতে রক্ত পরিবহন বন্ধ হয়ে স্থায়ী ক্ষতি হয়। তবে হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে যেসব লক্ষণ দেখা দেয়, ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোমেও একই ধরণের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। সাধারণত বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, রক্তচাপ কমে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। তীব্র এবং অনাকাংখিত চাপের কয়েক মিনিট থেকে ঘন্টার মধ্যেই এ সব লক্ষণ দেখা দিতে পারে। নামে ‘ব্রোকেন হার্ট’ হলেও হৃৎপিন্ড-সংশ্লিষ্ট লক্ষণ ছাড়াও এ রোগে অন্য লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে - পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, খাবারে অরুচি, অনিদ্রা, কাজে অনীহা, হতাশা, একাকীত্ববোধ, স্মৃতিকাতরতা ইত্যাদি। যেহেতু এ রোগে হৃৎপিন্ডের মাংসপেশী দুর্বল হয়, ফলে কিছু ক্ষেত্রে রোগীর জীবনের ঝুঁকি থাকে, তবে তা বিরল। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এ ধরণের রোগী দ্রুত ভালো হয়ে যায়। রোগ-লক্ষণ দেখে যেহেতু একে হার্ট অ্যাটাকের মতোই মনে হয়, তাই প্রাথমিকভাবে রোগীরা হার্ট-অ্যাটাকের চিকিৎসার মতোই চিকিৎসা পেয়ে থাকেন। পরবর্তীতে ‘হার্ট-অ্যাটাক নয়’ নিশ্চিত হওয়া গেলে দীর্ঘমেয়াদে আর হৃদরোগের ওষুধ খাওয়া লাগে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে ‘বিটা-ব্লকার’ জাতীয় ওষুধ এ রোগে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমায়। ‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’ হার্ট অ্যাটাকের মতো মৃত্যু-ঝুঁকিপূর্ণ নয়। কিন্তু বুকের তীব্র ব্যথাকে অবহেলা করা উচিত নয়। এটি হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতেও পারে। তাই বুকে ব্যথা হলে একে গুরুত্ব দিন এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

2856 views

Related Questions