1 Answers
মূর্তি এবং ভাস্কর্যকে হয়তো যে কারনে আলাদা চোখে দেখা হয় তার মুল কারণ হলোঃ
যে সকল আকৃতি পূজা অর্চনার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয় সেগুলো হচ্ছে মূর্তি। আর যা পূজার জন্য নয়, অর্থাৎ যে আকৃতি বা ছবি খোদাই করে তৈরি করা হয় তা-ই ভাস্কর্য।
মূর্তির সামনে হিন্দু সম্প্রদায় প্রভূর দূত হিসেবে অর্চনা করে, মাথা ঝুকায়, খাবার দেয়, ফুল দেয়, চরণসেবা করে ও প্রার্থনা করে। আর ভাস্কর্যের সামনে মুসলিম বা অন্যান্য মহামানব ব্যক্তিরা মাথা ঝুকায়, চরণসেবা করে, পুষ্পবর্ষণ করে কিন্তু এটা পূজার জন্য নয়।
যাই হোক মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে বিধানগত কোনো পার্থক্য নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে মূর্তি ও ভাস্কর্য দুটোই পরিত্যাজ্য।
ভাস্কর্য, মূতি ও প্রতিকৃতিকে বোঝানোর জন্য আরবি ভাষায় প্রধানত পৃথক পৃথক চারটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে-ঃ
১।. ছানাম: কাঠ, মাটি, স্বর্ণ, রৌপ্য, ব্রোঞ্জ প্রভৃতি দ্বারা বানানো কোন কিছুর প্রতিকৃতি বা মূর্তি যা পুজা করা হয়, তাকে ছানাম বলে।
আল কুরআনে কয়েকটি জায়গায় ছানাম শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমনঃ- মহান আল্লাহ ইব্রাহীম আলায়হিস সালামের দু‘আর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘যখন ইব্রাহীম বললেনঃ হে পালনকর্তা, এ শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তান সন্ততিকে মূর্তি (ছানাম) পূজা থেকে দূরে রাখুন। (সূরা ইব্রাহীম: ৩৫)।
এসব আয়াতে মূলত মূর্তি ও প্রতিমাকে ছানাম বলা হয়েছে তারা পূজা করত। আসলে যা মানুষ বা পশুর আকৃতির অনুকরনে নয় তবে তা মানুষেরই তৈরী এমন প্রতিকৃতি ও মূর্তিকেই ছানাম বলা হয়।
২. তিমছাল: মানুষ অথবা পশুর আকৃতির অনুকরণে যা কিছু তৈরী করা হয় তাকে তিমছাল বলে। বাংলায় বলে আবক্ষ মূর্তি।
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে তিমছাল শব্দটিও ব্যবহৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, “যখন তিনি তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে বললেনঃ এই মূর্তিগুলো (তিমছাল) কী, যাদের তোমরা পূজারী হয়ে বসে আছ। (সূরা আম্বিয়া: ৫২)।
মূলত এখানেও তিমছাল দ্বারা পূজার দেবদেবীকেই বুঝানো হয়েছে। তবে ছানাম ও তিমছালের মধ্যে মূল পার্থক্য হচ্ছে, ছানাম কোন কিছুর আকৃতির অনুকরণে তৈরী হয় না আর তিমছাল কোন কিছুর অনুকরণে তৈরী হয়।
আমাদের দেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মানুষ বা পশুর আকৃতির অনুকরণে যে সব প্রতিমা ও দেবদেবী তৈরী করে পূজা করে সেগুলো তিমছাল আর জাহিলী যুগে লাত নামক যে দেবতাকে তারা পূজা করত, তা ছিল মূলত একটি পাথরখন্ড মাত্র যা কোন প্রাণীর আকৃতিতে তৈরী ছিল না, সেটি ছিল ছানামের অন্তর্ভূক্ত।
৩।. ওয়াছান: কোন কিছুর চেহারা থাকুক বা না থাকুক সকল ইবাদতকৃত জিনিষকে ওয়াছান বলা হয়। বাংলা বলে প্রতিমা।
যেমন মানুষের প্রতিকৃতি, পশুর মূর্তি, কবর, গাছ, পাথর প্রভৃতি। এই আলোকে ছানাম ও তিমছালও ওয়াছানের অন্তর্ভূক্ত।
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে ওয়াছান শব্দটিও ব্যবহৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা তো আল্লাহকে বাদ দিয়ে কেবল প্রতিমারই (ওয়াছান)পূজা এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ। (সূরা আনকাবুত:১৭)”।
এখানে ছানাম ও ওয়াছানের মধ্যে মূল পার্থক্য হচ্ছে যে ওয়াছান মানুষের তৈরী হয় না, আর ছানাম মানুষের তৈরী। সুতরাং যে গাছ, চন্দ্র, সূর্য প্রভৃতিকে কাফির মুশরিকরা পূজা করে, এগুলো ওয়াছান। আর মানুষের বানানো যে প্রতিমাকে তারা পূজা করে সেটি হচ্ছে ছানাম।
৪।. নাহাত: খোদাইকৃত চিত্র শিল্পকে আরবিতে নাহাত বলা হয়। যাকে বাংলায় ভাস্কর্য ও ইংরেজীতে একে Sculpture বলা যায়।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, সে বললঃ তোমরা স্বহস্ত নির্মিত পাথরের পূজা কর কেন? (সূরা সাফফাত:৯৫)।
আমাদের দেশে ভাস্কর্যের নামে মানুষের আকৃতিতে বা পশুর অকৃতিতে যে সব মূর্তি বানানো হয় এগুলো তিমছাল আর কোন প্রাণীর আকৃতির সাথে মিল না রেখে এমনিতেই যা তৈরী করা হয়েছে সেগুলো ছানাম।
যা হোক এই ছানাম, তিমছাল, নাহাত ও ওয়াছান সবগুলোই ইসলামে ঘৃণিত। আমাদের ভাস্কর্যের বিষয়টিকে সাধারণ ভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটা ইসলামের গোড়ার সাথে সম্পৃক্ত।
দুই কারণে একজন মুসলিম কাফের হয়ে যায়, মুসলিম পরিচয় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
১।. কুফর; কুফর মানে আল্লাহ, নবি, কোরআন, পরকাল ইত্যাদিকে অস্বীকার করা।
২।. শিরক। শিরক মানে আল্লাহর সমকক্ষ কাউকে বানানো। আল্লাহ ছাড়া কারো অর্চনা করা, কারো সামনে মাথা ঝুকানো।
ভাস্কর্যের সামনে ভক্তি প্রদর্শন ও মাথা ঝুকানো স্পষ্ট শিরক। এটাকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। আর ভাস্কর্য হলে এসব শিরক হবে না যে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই; কারণ ভাস্কর্য বানানো হয়ই স্মরণের নামে এসব শিরক করার জন্যই।
তাছাড়া ভাস্কর্য স্থাপনই শরিয়তে গর্হিত কাজ। পৃথিবীর কোনো ফতোয়া বিভাগ সাম্প্রতিক সিস্টেমে ভাস্কর্য স্থাপন বৈধ ঘোষণা করবে না। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসে ভাস্কর্য ও মূর্তি নির্মাতাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করে বলেছেন, প্রাণীর আকৃতি নার্মাতাদের উপর আল্লাহ তাআলা লা'নত করুক।
শেষকথা,কারো স্মরণার্থে কোনো প্রাণীর আকৃতি ব্যতীত অন্যভাবে কোনো উপায়ে ভাস্কর্য বা স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা যেতে পারে। তবে এ শর্তে যে, সেখানে কোনো ফুল দিয়ে বা নীরবে দাঁড়িয়ে সেটাকে কোনো প্রকার সম্মান প্রদর্শন করা যাবে না। কেননা এটি সম্মান প্রদর্শনের ইসলামী পদ্ধতি নয়। বরং এ জাতীয় সম্মান প্রদর্শনকে ইসলাম বাড়াবাড়ি বলে মনে করে এবং এটাকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা বস্তুর পূজা হিসেবে গণ্য করে।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনীত ধর্মে পুস্পস্তবক অর্পণের কোন বিধান নেই। মৃত ব্যক্তি বা কোন জড় বস্তুকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা মূলত খ্রিষ্টান জাতির সংস্কৃতি। হিন্দু ধর্মেও মূর্তিকে পুস্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
মূলত পুস্পস্তবক অর্পণ মূর্তিপূজার অংশ। এটি একটি ইবাদত যা মূর্তিকে দেয়া হয়। কাজেই মুসলিমদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের কোন সুযোগ নেই। ©