لَقَدۡ خَلَقۡنَا ٱلۡإِنسَٰنَ فِي كَبَدٍ

লাকাদ খালাকনাল ইনছা-না ফী কাবাদ।উচ্চারণ

আসলে আমি মানুষকে কষ্ট ও পরিশ্রমের মধ্যে সৃষ্টি করেছি। তাফহীমুল কুরআন

আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি পরিশ্রমের ভেতর মুফতী তাকী উসমানী

অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি ক্লেশের মধ্যে।মুজিবুর রহমান

নিশ্চয় আমি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আমি তো মানুষ সৃষ্টি করেছি কষ্ট-ক্লেশের মধ্যে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

নিঃসন্দেহে আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কষ্ট- ক্লেশের মধ্যে।আল-বায়ান

আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি অত্যন্ত কষ্ট ও শ্রমের মাঝে, (দুনিয়ার প্রত্যেকটি মানুষ কোন না কোন কষ্টের মধ্যে পতিত আছে)।তাইসিরুল

আমরা নিশ্চয়ই মানুষকে সৃষ্টি করেছি শ্রমনির্ভর করে।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

ওপরে যে কথাটির জন্য কসম খাওয়া হয়েছে এটিই সেই কথা। মানুষকে কষ্ট ও পরিশ্রমের মধ্যে সৃষ্টি করার মানে হচ্ছে এই যে, এই দুনিয়ায় আনন্দ উপভোগ করার ও আরামের শুয়ে শুয়ে সুখের বাঁশী বাজাবার জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হয়নি। বরং তার জন্য এ দুনিয়া পরিশ্রম, মেহনত ও কষ্ট করার এবং কঠিন অবস্থার মোকাবেলা করার জায়গা। এই অবস্থা অতিক্রম না করে কোন মানুষ সামনে এগিয়ে যেতে পারে না। এই মক্কা শহর সাক্ষী, আল্লাহর কোন এক বান্দা এক সময় কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন বলেই আজ এই শহরটি আবাদ হয়েছে এবং আরবের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই শহরে মুহম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবস্থা সাক্ষ্য দিচ্ছে, একটি আদর্শের খাতিরে তিনি নানা প্রকার বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন।

বন্য পশুদের পর্যন্ত এখানে নিরাপত্তা আছে কিন্তু তাঁর প্রাণের কোন নিরাপত্তা নেই। আর মায়ের গর্ভে এক বিন্দু শুক্র হিসেবে অবস্থান লাভের পর থেকে নিয়ে মৃত্যুকালে শেষ নিঃশ্বাসটি ত্যাগ করা পর্যন্ত প্রত্যেক মানুষের জীবন এই মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, তাকে প্রতি পদে পদে কষ্ট, পরিশ্রম, মেহনত, বিপদ ও কঠিন অবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হয়। যাকে তোমরা দুনিয়ায় সবচেয়ে লোভনীয় অবস্থায় দেখছো সেও যখন মায়ের পেটে অবস্থান করছিল তখন সর্বক্ষণ তার মরে যাওযার ভয় ছিল। সে মায়ের পেটেই মরে যেতে পারতো। অথবা গর্ভপাত হয়ে তার দফারফা হয়ে যেতে পারতো। প্রসবকালে তার মৃত্যু ও জীবনের মধ্যে মাত্র এক চুলের বেশী দূরত্ব ছিল না। জন্মলাভ করার পর সে এত বেশী অসহায় ছিল যে, দেখাশুনা করার কেউ না থাকলে সে একাকী পড়ে মরে যেতো। একটু হাঁটা চলার ক্ষমতা লাভ করার পর প্রতি পদে পদে আছাড় খেয়ে পড়তো। শৈশব থেকে যৌবন এবং তারপর বার্ধক্য পর্যন্ত তাকে এমন সব শারীরিক পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে যে, এর মধ্য থেকে কোন একটি পরিবর্তনও যদি ভুল পথে হতো তাহলে তার জীবন বিপন্ন হতো। সে যদি বাদশাহ বা একনায়ক হয় তাহলে কোন সময় কোথাও তার বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র না হয় এই ভয়ে সে এক মুহূর্ত নিশ্চিন্তে আরাম করতে পারে না। সে বিশ্ববিজয়ী হলেও তার সেনাপতিদের মধ্য থেকে কেউ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে বসে এই ভয়ে সে সর্বক্ষণ তটস্থ থাকে। সে নিজের যুগে কারুনের মতো ধনী হলেও কিভাবে নিজের ধন-সম্পদ আরো বাড়াবে এবং কিভাবে তা রক্ষা করবে, এই চিন্তায় সবসময় পেরেশান থাকে। মোটকথাকোন ব্যক্তিও নির্বিবাদে শান্তি, নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ততার নিয়ামত লাভ করেনি। কারণ মানুষের জন্মই হয়েছে কষ্ট, পরিশ্রম, মেহনত ও কঠিন অবস্থার মধ্যে।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

চতুর্থ আয়াতের এ কথাটি বলার জন্য আগের শপথগুলো করা হয়েছে। বোঝানো হচ্ছে যে, দুনিয়ায় মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে শ্রমনির্ভর করে। তাকে কোনও না কোনও পরিশ্রম করতেই হয়। যত বড় রাজা-বাদশাহ হোক বা হোক অজস্র সম্পদের মালিক, জীবন রক্ষার জন্য তাকে অবশ্যই এক রকমের না এক রকমের পরিশ্রম স্বীকার করতেই হবে। কেউ যদি দুনিয়ায় সম্পূর্ণ বিনা মেহনতে বেঁচে থাকতে চায়, তবে সেটা তার অসার কল্পনা। এটা কখনও সম্ভব নয়। হাঁ পরিপূর্ণ আরামের জীবন হল জান্নাতের জীবন, যা দুনিয়ায় কৃত শ্রম-সাধনার বদৌলতে লাভ হবে। আয়াতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, দুনিয়ায় কাউকে যখন কোন কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন হতে হয়, তখন সে যেন এই চরম সত্য চিন্তা করে। বিশেষত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামকে মক্কা মুকাররমায় যে দুঃখ-কষ্ট পোহাতে হচ্ছিল, তজ্জন্য এ আয়াতে তাদেরকে সান্তনাও দান করা হয়েছে। এ কথাটি বলার জন্য প্রথমে মক্কা মুকাররমার শপথ করা হয়েছে সম্ভবত এ কারণে যে, এ নগরকে আল্লাহ তাআলা যদিও দুনিয়ার সর্বাপেক্ষা বেশি সম্মানিত স্থান বানিয়েছেন, কিন্তু তার এ সম্মান ও মর্যাদা আপনা-আপনিই সৃষ্টি হয়ে যায়নি। এর জন্যও এখানে প্রচুর শ্রম ব্যয় করতে হয়েছে। তার এ মর্যাদা দ্বারা উপকৃত হওয়ার জন্য আজও মানুষকে মেহনত করতে হয়। তারপর বিশেষভাবে এ নগরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের কথা উল্লেখ করে সম্ভবত ইশারা করা হয়েছে যে, তিনি শ্রেষ্ঠতম নবী ও শ্রেষ্ঠতম নগরের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও যখন কষ্ট-ক্লেশ তাকেও স্বীকার করতে হয়েছে, তখন ষোল আনা আরামের জীবন কে আশা করতে পারে? অতঃপর হযরত আদম আলাইহিস সালাম ও তার সন্তানদের শপথ করার মধ্যে এই ইঙ্গিত রয়েছে যে, তোমরা গোটা মানবেতিহাসের প্রতি লক্ষ্য করে দেখ, সর্বত্র এই একই চিত্র দেখতে পাবে। বুঝতে পারবে, মানুষের জীবনটাই শ্রম-নির্ভর ও ক্লেশপূর্ণ।

তাফসীরে জাকারিয়া

৪. নিঃসন্দেহে আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি কষ্ট-ক্লেশের মধ্যে।(১)

(১) এখানে পূর্ববর্তী শপথসমূহের জওয়াবে বলা হয়েছে যে, (لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي كَبَدٍ) আয়াতে বর্ণিত كَبَد এর শাব্দিক অর্থ শ্রম ও কষ্ট। অর্থাৎ মানুষ সৃষ্টিগতভাবে আজীবন শ্রম ও কষ্টের মধ্যে থাকে। (ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

৪। অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি বিপদ-কষ্টের মধ্যে। (1)

(1) অর্থাৎ, মানুষের জীবন পরিশ্রম ও দুঃখ-কষ্টে পরিপূর্ণ। ইমাম ত্বাবারী এই অর্থকেই গ্রহণ করেছেন। আর এ বাক্যটি হল কসমের জবাব।