مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمۡ وَمَا غَوَىٰ

মা-দাল্লা সা-হিবুকুম ওয়ামা-গাওয়া-।উচ্চারণ

তোমাদের বন্ধু পথভ্রষ্ট হয়নি বা বিপথগামীও হয়নি। তাফহীমুল কুরআন

(হে মক্কাবাসীগণ!) তোমাদের সঙ্গী পথ ভুলে যায়নি এবং বিপথগামীও হয়নি। মুফতী তাকী উসমানী

তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয়,মুজিবুর রহমান

তোমাদের সংগী পথভ্রষ্ট হননি এবং বিপথগামীও হননি।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট হয়নি এবং বিপথগামীও হয়নি।আল-বায়ান

তোমাদের (মাঝে ছোট থেকে বড় হয়েছে সেই) সঙ্গী গুমরাহও নয় আর ভুলপথে পরিচালিতও নয়,তাইসিরুল

তোমাদের সঙ্গী দোষ-ত্রুটি করেন না, আর তিনি বিপথেও যান না,মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

রসূলুল্লাহ্‌ ﷺ কে বুঝানো হয়েছে এবং কুরাইশদের সম্বোধন করা হয়েছে। মূল শব্দ ব্যবহার করা হয়েছেصَاحِبُكُمْ (তোমাদের বন্ধু)। আরবী ভাষায় صاحب বলতে বন্ধু, সাথী, নিকটে অবস্থানকারী এবং সাথে উঠা-বসা করে এমন লোককে বুঝায়। এখানে নবীর ﷺ নাম উল্লেখ করা বা “আমার রসূল” বলার পরিবর্তে “তোমাদের বন্ধু” বলে তাঁর কথা উল্লেখ করার মধ্যে অত্যন্ত গভীর তাৎপর্য আছে। এভাবে কুরাইশদের একথা বুঝানো হয়েছে যে, তোমাদের কাছে যে ব্যক্তির কথা বলা হচ্ছে তিনি তোমাদের এখানে বাইরে থেকে আসা কোন অপরিচিত ব্যক্তি নন যে, আগে থেকে তোমাদের সাথে তাঁর কোন জানা শোনাই নেই। তিনি তোমাদের নিজ কওমের লোক। তোমাদের মধ্যেই তিনি থাকেন এবং বসবাস করেন। তিনি কে, কি তাঁর পরিচয়, তিনি কেমন চরিত্র ও কর্মের অধিকারী মানুষ, কেমন তাঁর আচার-আচরণ, কেমন তাঁর অভ্যাস ও স্বভাব চরিত্র এবং আজ পর্যন্ত তোমাদের মাঝে তাঁর জীবন কেমন কেটেছে তা তোমাদের প্রতিটি শিশু পর্যন্ত জানে। তাঁর সম্পর্কে কেউ যদি নির্লজ্জের মত কিছু বলে তাহলে তাঁকে জানে তোমাদের মধ্যে এমন বহু মানুষ বর্তমান যারা নিজেরাই বিচার করে দেখতে পারে, একথা তাঁর ব্যাপারে প্রযোজ্য হয় কিনা।

এটিই মূল কথা যার জন্য অস্তমিত তারকা বা তারকারাজির শপথ করা হয়েছে। পথভ্রষ্ট হওয়ার অর্থ পথ না চেনার কারণে কারো ভুল পথে চলা এবং বিপথগামী হওয়ার অর্থ জেনে শুনে কারো ভুল পথ অবলম্বন করা। আল্লাহ‌র এ বাণীর তাৎপর্য হলো মুহাম্মাদ ﷺ তোমাদের একান্ত পরিচিত ব্যক্তি। তিনি পথভ্রষ্ট বা বিপথগামী হয়েছেন তাঁর বিরুদ্ধে তোমাদের এ অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে ভুল। প্রকৃতপক্ষে তিনি পথভ্রষ্ট বা বিপথগামী কিছুই হননি। একথা বলতে যে কারণে তারকারাজির অস্তমিত হওয়ার শপথ করা হয়েছে তা হলো, রাতের অন্ধকারে যখন তারকা জ্বল জ্বল করে তখন কোন ব্যক্তি তার চারপাশের বস্তুকে স্পষ্ট দেখতে পায় না এবং বিভিন্ন বস্তুকে অস্পষ্টভাবে দেখতে পেয়ে সেগুলো সম্পর্কে ভুল অনুমান করতে পারে। যেমন অন্ধকারে দূরে থেকে কোন গাছ দেখে তাকে ভূত মনে করতে পারে। রশি পড়ে থাকতে দেখে তাকে সাপ মনে করতে পারে। বালুকাস্তূপের কোন পাথর উঁচু হয়ে থাকতে দেখে কোন হিংস্র জন্তু বসে আছে বলে মনে করতে পারে। কিন্তু যে সময় তারকাসমূহ অদৃশ্য হয়ে যায় এবং সকালের আলো উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তখন প্রতিটি বস্তু তার মূল আকার-আকৃতিতে মানুষের সামনে প্রকাশ পায়। সে সময় কোন বস্তুর মূল রূপ ও আকার আকৃতির ব্যাপারে কোন সন্দেহের সৃষ্টি হয় না। তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ ﷺ এর ব্যাপারটিও তাই। তাঁর জীবন ও ব্যক্তিত্ব অন্ধকারে ঢাকা নয়, বরং আলোক উদ্ভাসিত ভোরের মত স্পষ্ট। তোমরা জানো, তোমাদের এ ‘বন্ধু” একজন অতি নম্র স্বভাব, জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। তাঁর সম্পর্কে কুরাইশদের কোন ব্যক্তির এ ভুল ধারণা কি করে হতে পারে যে, তিনি পথভ্রষ্ট হয়েছেন। তোমরা এও জান যে, তিনি অত্যন্ত সদিচ্ছা পরায়ণ এবং সত্যবাদী মানুষ। তোমাদের কেউ তাঁর সম্পর্কে কি করে এ মত পোষণ করতে পারে যে, তিনি জেনে শুনে শুধু যে নিজে বাঁকা পথ অবলম্বন করে বসে আছেন তাই নয়, অন্যদেরও সে বাঁকা পথের দিকে আহবান জানাতে উঠে পড়ে লেগেছেন।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

‘তোমাদের সঙ্গী’ বলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বোঝানো উদ্দেশ্য। তাঁর জন্য এ শব্দ ব্যবহার করে আল্লাহ তাআলা একটি সত্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বোঝানো হচ্ছে যে, তিনি বাইর থেকে এসে নবুওয়াতের দাবি করেননি; বরং শুরু থেকেই তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। তার গোটা জীবন উম্মুক্ত গ্রন্থের মত তোমাদের সামনে বিদ্যমান। তোমরা দেখেছ, জীবনে কখনও তিনি মিথ্যা বলেননি, কখনও কাউকে ধোঁকা দেননি। তোমাদের দ্বারাই তিনি সাদিক (সত্যবাদী) ও আমীন (বিশ্বস্ত) খেতাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। এ অবস্থায় এটা কি করে সম্ভব যে, জীবনের সাধারণ ক্ষেত্রসমূহে যিনি মিথ্যা থেকে এতটা দূরে থাকলেন, তিনি আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে মিথ্যা বলে দেবেন?

তাফসীরে জাকারিয়া

২. তোমাদের সঙ্গী(১) বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয়,

(১) মূল শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে صَاحِبُكُمْ বা তোমাদের বন্ধু। এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝানো হয়েছে এবং কুরাইশদের সম্বোধন করা হয়েছে। আরবী ভাষায় صَاحِب বলতে বন্ধু, সাথী, নিকটে অবস্থানকারী এবং সাথে উঠা-বসা করে এমন লোককে বুঝায়। এ স্থলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম অথবা নবী শব্দ ব্যবহার করার পরিবর্তে “তোমাদের সঙ্গী” বলে ব্যক্ত করার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইরে থেকে আগত কোন অপরিচিত ব্যক্তি নন, যার সত্যবাদিতায় তোমরা সন্দিগ্ধ হবে। বরং তিনি তোমাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। (দেখুন: কুরতুবী; আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(২) তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয়। (1)

(1) এটা হল কসমের জওয়াব। صَاحِبُكُمْ (তোমাদের সঙ্গী) বলে এখানে নবী করীম (সাঃ)-এর সত্যতাকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, নবুঅতের পূর্বে তিনি চল্লিশ বছর তোমাদের সঙ্গে এবং তোমাদের মাঝে কাটিয়েছেন। তাঁর দিবা-রাত্রির কার্যকলাপ ও আচার-আচরণ তোমাদের সামনে বিদ্যমান। তাঁর চরিত্র ও নৈতিকতা তোমাদের জানা ও চেনা। সততা ও বিশ্বস্ততা ছাড়া তোমরা তাঁর আচরণে অন্য কিছু কি দেখেছ? এখন চল্লিশ বছর পর যখন তিনি নবুঅতের দাবী করছেন, তখন একটু ভেবে দেখ যে, তিনি কি মিথ্যাবাদী হতে পারেন? অতএব, বাস্তব এটাই যে, তিনি পথভ্রষ্টও নন এবং বিপথগামীও নন। ضَلالة বলা হয়, অজ্ঞতার কারণে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়াকে। আর غَوى বলা হয়, এমন বক্রতাকে, যা জেনে-বুঝে সত্যকে বর্জন করে অবলম্বন করা হয়। মহান আল্লাহ এই উভয় ভ্রষ্টতা থেকে তাঁর নবীকে পাক-পবিত্র ঘোষণা করেছেন।