ফাল মুকাছছিমা-তি আমর-।উচ্চারণ
অতঃপর একটি বড় জিনিস (বৃষ্টি) বন্টন করে। ২ তাফহীমুল কুরআন
তারপর সেই সবের, যা বস্তুরাজি বণ্টন করে মুফতী তাকী উসমানী
আর শপথ কর্মবন্টনকারী মালাইকা/ফেরেশতার।মুজিবুর রহমান
অতঃপর কর্ম বন্টনকারী ফেরেশতাগণের,মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
শপথ কর্ম বণ্টনকারী ফেরেশতাগণের- ইসলামিক ফাউন্ডেশন
অতঃপর [আল্লাহর] নির্দেশ বণ্টনকারী ফেরেশতাগণের।আল-বায়ান
আর যারা কর্ম বণ্টন করে,তাইসিরুল
তারপর বিতরণকারীদের কাজকর্মের কথা, --মাওলানা জহুরুল হক
২
الْجَارِيَاتِ يُسْرًا ও الْمُقَسِّمَاتِ أَمْرًا এর ব্যাখ্যায় মুফাস্সিরগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কেউ এ কথাটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন বা এ অর্থ গ্রহণ করা জায়েজ মনে করেছেন যে, এ দু’টি বাক্যাংশের অর্থও বাতাস। অর্থাৎ এ বাতাসই আবার মেঘমালা বহন করে নিয়ে যায় এবং ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহর নির্দেশানুসারে যেখানে যতটুকু বর্ষণের নির্দেশ দেয়া হয় ততটুকু পানি বণ্টন করে। আরেক দল الْمُقَسِّمَاتِ أَمْرًا আয়াতাংশের অর্থ করেছেন দ্রুতগতিশীল নৌকাসমূহ এবং الْجَارِيَاتِ يُسْرًا অর্থ করেছেন সেসব ফেরেশতা যারা আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে তাঁর সমস্ত সৃষ্টির জন্য বরাদ্দকৃত জিনিস তাদের মধ্যে বণ্টন করে। একটি রেওয়ায়াত অনুসারে হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এ দু’টি আয়াতাংশের এ অর্থ বর্ণনা করে বলেছেন, আমি এ অর্থ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে না শুনে থাকলে বর্ণনা করতাম না। এর ওপর ভিত্তি করে আল্লামা আলুসী এ ধারণা প্রকাশ করেন যে, এটি ছাড়া এ আয়াতাংশ দু’টির আর কোন অর্থ গ্রহণ করা জায়েয নয়। যারা অন্য কোন অর্থ গ্রহণ করেছেন তারা অনর্থক দুঃসাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু হাফেয ইবনে কাসীর বলেন, এ রেওয়ায়াতের সনদ দূর্বল এবং এর ওপর ভিত্তি করে অকাট্যভাবে বলা যায় না যে, নবী (সা.) সত্যিই এসব আয়াতাংশের এ ব্যাখ্যাই বর্ণনা করেছেন। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, সাহাবা ও তাবেয়ীদের একটি উল্লেখযোগ্য দল কর্তৃক এ দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু তাফসীরকারদের বড় দল প্রথম তাফসীরটিও বর্ণনা করেছেন। আর কথার ধারাবাহিকতার সাথে এ অর্থটিই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। শাহ রাফীউদ্দিন সাহেব, শাহ আবদুল কাদের সাহেব এবং মাওলানা মাহমুদুল হাসান সাহেবও তাদের অনুবাদে প্রথম অর্থটিই গ্রহণ করেছেন।
এখানে দু’টি বিষয় বুঝে রাখা প্রয়োজন। (এক) নিজের কোন কথা বিশ্বাস করানোর জন্য আল্লাহ তাআলার কোন কসম করার প্রয়োজন নেই। নিজের কোন কথা সম্পর্কে কসম করা হতে তিনি বেনিয়ায। কুরআন মাজীদে বিভিন্ন স্থানে যে বিভিন্ন বিষয়ে কসম করা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য কথাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত, অলঙ্কারপূর্ণ ও বলিষ্ঠ করে তোলা। অনেক সময় এ দিকটার প্রতি লক্ষ্য থাকে যে, যেই জিনিসের কসম করা হচ্ছে, তার ভেতর দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে, তা তার পরবর্তীতে যে বক্তব্য আসছে তার সত্যতার প্রমাণ বহন করে। আলোচ্য স্থলে কসমের পরে যে বক্তব্য আসছে তা হল, কিয়ামত অবশ্যই আসবে এবং পুরস্কার ও শাস্তি সম্পর্কিত ফায়সালা অবশ্যই হবে। এখানে কসম করা হয়েছে বাতাসের, যা ধুলোবালি উড়িয়ে নিয়ে যায়, মেঘের বোঝা বয়ে তা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায় এবং যখন সেই মেঘ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়, তখন তার পানি মৃত ভূমিতে জীবন সঞ্চার করে তার উৎপাদন থেকে সৃষ্টির জীবিকা বণ্টন করে এবং এভাবে তা সৃষ্টি রাজির জন্য নতুন জীবনের কারণে পরিণত হয়। তো এই বাতাসের কসম করে বান্দার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে যে, যেই আল্লাহ এই বাতাসকে এবং তার প্রভাবে বর্ষিত বৃষ্টির পানিকে নতুন জীবনের মাধ্যম বানান, নিশ্চয়ই তিনি মৃত মানুষকে পুনর্জীবন দান করতে সক্ষম। আয়াতের এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে এ হিসেবে যে, আয়াতে যে চারটি জিনিসের কসম করা হয়েছে, তার সবগুলো দ্বারাই বায়ুকে বোঝানো হয়েছে, যার সঙ্গে বায়ুর চারটি বিশেষণ উল্লেখ করা হয়েছে। (দুই) এই আয়াতসমূহের আরও একটি তাফসীর বর্ণিত আছে। তা এই যে, প্রথম বিশেষণটি অর্থাৎ ‘ধুলোবালি উড়ানো’-এর সম্পর্ক বাতাসের সঙ্গে বটে, কিন্তু বাকিগুলো বাতাসের বিশেষণ নয়; বরং দ্বিতীয়টি দ্বারা বোঝানো হয়েছে মেঘপুঞ্জকে, যা পানির ভার বহন করে। তৃতীয় বিশেষণটি জলযানের, যা পানিতে সচ্ছন্দে চলাচল করে আর চতুর্থ বিশেষণটি হল ফেরেশতাদের, যা সৃষ্টির মাঝে জীবিকা ইত্যাদি বণ্টনের দায়িত্বে নিয়োজিত। এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি একটি হাদীছে খোদ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে। তবে বর্ণনাটি সম্পর্কে আল্লামা হায়ছামী (রহ.) বলেন, এটি বর্ণনা করেছেন আবু বকর ইবনে আবী সাব্রা, যিনি একজন যয়ীফ ও পরিত্যক্ত রাবী (মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড ২৪৪২৪৫ পৃষ্ঠা, তাফসীর অধ্যায়, হাদীছ নং ১১৩৬৫)। তারপরও যেহেতু এ তাফসীরটির এক রকম সম্পর্ক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে রয়েছে, তাই বহু মুফাসসির এটাই গ্রহণ করেছেন। আর আমি যে তরজমা করেছি, তা থেকে বন্ধনীর অংশটুকু বাদ দিলে এর ভেতর ওই ব্যাখ্যারও অবকাশ থাকে। এ তাফসীর অনুযায়ী এ কসমের সাথে আখেরাতের সম্পর্ক দৃশ্যত এভাবে যে, আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রয়োজনাদি সমাধার জন্য এসব ব্যবস্থাপনা উদ্দেশ্যহীনভাবে করেননি। এসবের উদ্দেশ্য হল মানুষকে পরীক্ষা করা, তারা আল্লাহ প্রদত্ত নি‘আমতসমূহ যথাযথ পন্থায় ব্যবহার করে, না অন্যায় পন্থা অবলম্বন করে। যারা এর যথাযথ ব্যবহার করবে তাদেরকে পুরস্কৃত করা হবে আর যারা অন্যায়ভাবে ব্যবহার করবে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে। সুতরাং সৃষ্টি জগতের এসব বস্তুর দাবি হল যে, এমন একদিন অবশ্যই আসুক, যে দিন পুরস্কার ও শাস্তি দানের ফায়সালাকে কার্যকর করা হবে।
৪. অতঃপর নির্দেশ বন্টনকারী ফেরেশতাগণের—
(৪) শপথ কর্ম বণ্টনকারী ফিরিশতাদের, (1)
(1) مُقَسِّمَاتِ এ থেকে সেই ফিরিশতাদেরকে বুঝানো হয়েছে, যাঁরা কর্মসমূহ বণ্টন করে নেন। কেউ রহমতের, কেউ শাস্তির, কেউ পানির, কেউ কষ্টের (অনাবৃষ্টি ইত্যাদির), কেউ বাতাসের, কেউ মৃত্যু ও দুর্ঘটনার ফিরিশতা প্রভৃতি। কেউ কেউ উক্ত শব্দগুলো থেকে কেবল ‘হাওয়া’ উদ্দিষ্ট মনে করেছেন। আর এগুলোকে হাওয়ার বিশেষণ নির্ণয় করেছেন। কিন্তু আমরা ইমাম ইবনে কাসীর এবং ইমাম শাওকানীর তাফসীর অনুযায়ী ব্যাখ্যা করেছি। কসম খাওয়ার উদ্দেশ্য হল, যে জিনিসের জন্য কসম খাওয়া হয় তার সত্যতা বর্ণনা করা। কখনো আবার কেবল তাকীদ স্বরূপ কসম খাওয়া হয়। আবার কখনো যে জিনিসের জন্য কসম খাওয়া হয়, সেটাকে দলীল হিসাবে পেশ করা উদ্দেশ্য হয়। এখানে এই তৃতীয় কসম উদ্দেশ্য। পরে কসমের জওয়াব এটাই বর্ণনা করা হয়েছে যে, তোমাদের সাথে যে প্রতিশ্রুতি করা হচ্ছে, অবশ্যই তা সত্য এবং কিয়ামত সংঘটিত হবেই; যাতে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে। হাওয়া চলা, মেঘমালার পানি বহন করা, সামুদ্রিক জাহাজের বিচরণ এবং ফিরিশতামন্ডলীর বিভিন্ন কর্মাদি সম্পাদন করা ইত্যাদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার দলীল। কারণ, যে সত্তা এই সমস্ত কাজগুলো করেন যা বাহ্যতঃ অতি কঠিন এবং স্বাভাবিক উপায়-উপকরণের বিপরীত, সেই সত্তাই কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষকে পুনরায় জীবিত করতেও পারেন।