وَإِذۡ قَالَ مُوسَىٰ لِفَتَىٰهُ لَآ أَبۡرَحُ حَتَّىٰٓ أَبۡلُغَ مَجۡمَعَ ٱلۡبَحۡرَيۡنِ أَوۡ أَمۡضِيَ حُقُبٗا

ওয়া ইযক-লা মূছা-লিফাতা-হুলাআবরহুহাত্তাআবলুগা মাজমা‘আল বাহরইনি আও আমদিয়া হুকুবা-।উচ্চারণ

(এদেরকে সেই ঘটনাটি একটু শুনিয়ে দাও যা মূসার সাথে ঘটেছিল) যখন মূসা তার খাদেমকে বলেছিল, দুই দরিয়ার সঙ্গমস্থলে না পৌঁছা পর্যন্ত আমি সফর শেষ করবো না, অন্যথায় আমি দীর্ঘকাল ধরে চলতেই থাকবো।” ৫৭ তাফহীমুল কুরআন

এবং (সেই সময়ের বৃত্তান্ত শোন) যখন মূসা তার যুবক (শিষ্য)কে বলেছিল, আমি দুই সাগরের সঙ্গমস্থলে না পৌঁছা পর্যন্ত চলতেই থাকব অথবা আমি চলতে থাকব বছরের পর বছর। #%৩৭%#মুফতী তাকী উসমানী

স্মরণ কর সেই সময়ের কথা যখন মূসা তার সঙ্গীকে বলেছিলঃ দুই সমুদ্রের সংযোগস্থলে না পৌঁছে আমি থামবনা, আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব।মুজিবুর রহমান

যখন মূসা তাঁর যুবক (সঙ্গী) কে বললেনঃ দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে না পৌছা পর্যন্ত আমি আসব না অথবা আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

স্মরণ কর, যখন মূসা তার সঙ্গীকে বলেছিল, ‘দুই সমুদ্রের সংগমস্থলে না পৌঁছে আমি থামব না বা আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর স্মরণ কর, যখন মূসা তার সহচর যুবকটিকে বলল, আমি চলতে থাকব যতক্ষণ না দুই সমুদ্রের মিলনস্থলে উপনীত হব কিংবা দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দেব।আল-বায়ান

স্মরণ কর, যখন মূসা তার সঙ্গীকে বলেছিল, ‘দুই সমুদ্রের মিলনস্থলে পৌঁছা না পর্যন্ত আমি চলতেই থাকবো যদিও বছরের পর বছর চলতেও হয়।’তাইসিরুল

আর স্মরণ করো! মূসা তাঁর ভৃত্যকে বললেন -- "আমি থামব না যে পর্যন্ত না আমি দুই নদীর সঙ্গমস্থলে পৌঁছি, নতুবা আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব।"মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

৫৭

এ পর্যায়ে কাফের ও মু’মিন উভয় গোষ্ঠীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সম্পর্কে সজাগ করাই মূল উদ্দেশ্য। সেই সত্যটি হচ্ছে, দুনিয়ায় যা কিছু ঘটে মানুষের স্থূল দৃষ্টি তা থেকে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ফলাফল গ্রহণ করে। কারণ আল্লাহ যে উদ্দেশ্য ও কল্যাণ সামনে রেখে কাজ করেন তা তার জানা থাকে না। মানুষ প্রতিনিয়ত দেখছে, জালেমরা ষ্ফীত হচ্ছে, উন্নতি লাভ করছে, নিরপরাধরা কষ্ট ও সংকটের আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে, নাফরমানদের প্রতি অজস্রধারে অনুগ্রহ বর্ষিত হচ্ছে, আনুগত্যশীলদের ওপর বিপদের পাহাড় ভেঙ্গে পড়ছে, অসৎলোকেরা আয়েশ-আরামে দিন যাপন করছে এবং সৎলোকেদের দূরবস্থার শেষ নেই। লোকেরা নিছক এর গুঢ় রহস্য না জানার কারণে সাধারণভাবে তাদের মনে দোদুল্যমানতা এমন কি বিভ্রান্তিও দেখা দেয়। কাফের ও জালেমরা এ থেকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায় যে, এ দুনিয়াটা একটা অরাজকতার মুল্লুক। এখানে কোন রাজা নেই। আর থাকলেও তার শাসন শৃংখলা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এখানে যারা যা ইচ্ছা করতে পারে। তাকে জিজ্ঞেস বা কৈফিয়ত তলব করার কেউ নেই। এ ধরনের ঘটনাবলী দেখে মু’মিন মনমরা হয়ে পড়ে এবং অনেক সময় কঠিন পরীক্ষাকালে তার ঈমানের ভিতও নড়ে যায়। এহেন অবস্থায় মহান আল্লাহ মূসা আলাইহিস সালামকে তাঁর নিজের ইচ্ছা জগতের পর্দা উঠিয়ে এক ঝলক দেখিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে সেখানে দিনরাত কি হচ্ছে, কিভাবে হচ্ছে, কি কারণে হচ্ছে এবং ঘটনার বহিরাঙ্গন তার অভ্যন্তর থেকে কেমন ভিন্নতর হয় তা তিনি জানতে পারেন।

হযরত মূসার (আ) এ ঘটনাটা কোথায় ও কবে সংঘটিত হয়? কুরআনে একথা সুস্পষ্ট করে বলা হয়নি। হাদীসে অবশ্যি আমরা আওফীর একটি বর্ণনা পাই, যাতে তিনি

হযরত মূসা (আ) ও খিজিরের (আ) কিসসা সংক্রান্ত মানচিত্র-------------------------------------------------------

ইবনে আব্বাসের (রা.) উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, ফেরাউনের ধ্বংসের পর হযরত মূসা (আ) যখন মিসরে নিজের জাতির বসতি স্থাপন করেন তখন এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু বুখারী ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে যে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী রেওয়ায়েত উদ্ধৃত হয়েছে তা এ বর্ণনা সমর্থন করে না। তাছাড়া অন্য কোন উপায়েও একথা প্রমাণ হয় না যে, ফেরাউনের ধ্বংসের পর হযরত মূসা (আ) কখনো মিসরে গিয়েছিলেন। বরং কুরআন একথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে যে, মিসর ত্যাগ করার পর তার সমস্তটা সময় সিনাই ও তীহ অঞ্চলে কাটে। কাজেই এ রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে আমরা দু’টি কথা পরিষ্কার বুঝতে পারি। এক, হযরত মূসাকে (আ) হয়তো তাঁর নবুওয়াতের প্রাথমিক যুগে এ পর্যবেক্ষণ করানো হয়েছিল। কারণ নবুওয়াতের শুরুতেই পয়গম্বরদের জন্য এ ধরনের শিক্ষা ও অনুশীলনের দরকার হয়ে থাকে। দুই, মুসলমানরা মক্কা মু’আয্যমায় যে ধরনের অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল বনী ইসরাঈলও যখন তেমনি ধরনের অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছিল তখনই হযরত মূসার জন্য এ পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়ে থাকবে। এ দু’টি কারণে আমাদের অনুমান, (অবশ্য সঠিক কথা একমাত্র আল্লাহ জানেন) এ ঘটনার সম্পর্কে এমন এক যুগের সাথে মিসরে বনী ইসরাঈলদের ওপর ফেরাউনের জুলুমের সিলসিলা জারি ছিল এবং মক্কার কুরাইশ সরদারদের মতো ফেরাউন ও তার সভাসদরাও আযাবে বিলম্ব দেখে ধারণা করছিল যে, তাদের ওপর এমন কোন সত্তা নেই যার কাছে তাদের জবাবদিহি করতে হবে এবং মক্কার মজলুম মুসলমানদের মতো মিসরের মজলুম মুসলমানরাও অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করছিল, হে আল্লাহ! আর কত দিন এ জালেমদেরকে পুরস্কৃত এবং আমাদের ওপর বিপদের সয়লাব-স্রোত প্রবাহিত করা হবে? এমনকি হযরত মূসাও চিৎকার করে উঠেছিলেনঃ

আরবী-----------------------

“হে পরওয়ারদিগার! তুমি ফেরাউন ও তার সভাসদদেরকে দুনিয়ার জীবনে বড়ই শান-শওকত ও ধন-দৌলত দান করেছো। হে আমাদের প্রতিপালক! এটা কি এজন্য যে, তারা দুনিয়াকে তোমার পথ থেকে বিপথে পরিচালিত করবে?” (ইউনূসঃ ৮৮)

যদি আমাদের এ অনুমান সঠিক হয় তাহলে ধারণা করা যেতে পারে যে, সম্ভবত হযরত মূসার (আ) এ সফরটি ছিল সুদানের দিকে। এক্ষেত্রে দু’দরিয়ার সঙ্গমস্থল বলতে বুঝাবে বর্তমান খার্তুম শহরের নিকটবর্তী নীল নদের দই শাখা বাহরুল আব্ইয়াদ (হোয়াইট নীল) ও বাহরুল আযরাক (ব্লু নীল) সেখানে এসে মিলিত হয়েছে (দেখুন ২২১ পৃষ্ঠার চিত্র।) হযরত মূসা (আ) সারা জীবন যেসব এলাকায় কাঠিয়েছেন সেসব এলাকায় এ একটি স্থান ছাড়া আর কোথাও দু’নদীর সঙ্গমস্থল নেই।

এ ঘটনাটির ব্যাপারে বাইবেল একেবারে নীরব। তবে তালমূদে এর উল্লেখ আছে। কিন্তু সেখানে এ ঘটনাটিকে মূসার (আ) পরিবর্তে ‘রাব্বী ইয়াহুহানান বিন লাভীর’ সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছেঃ “হযরত ইলিয়াসের সাথে উল্লেখিত রাব্বীর এ ঘটনাটি ঘটে। হযরত ইলিয়াসকে (আ) দুনিয়া থেকে জীবিত অবস্থায় উঠিয়ে নেয়ার পর ফেরেশতাদের দলভুক্ত করা হয়েছে এবং তিনি দুনিয়ার ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত হয়েছেন।” (THE TALMUD SELECTIONS BY H. POLANO. PP. 313-16) সম্ভবত বনী ইসরাঈলের মিসর ত্যাগের পূর্বেকার ঘটনাবলীর ন্যায় এ ঘটনাটিও সঠিক অবস্থায় সংরক্ষিত থাকেনি এবং শত শত বছর পরে তারা ঘটনার এক জায়গার কথা নিয়ে আর এক জায়গায় জুড়ে দিয়েছে। তালমূদের এ বর্ণনায় প্রভাবিত হয়ে মুসলমানদের কেউ কেউ একথা বলে দিয়েছেন যে, কুরআনের এ স্থানে যে মূসার কথা বলা হয়েছে তিনি হযরত মূসা আলাইহিস সালাম নন বরং অন্য কোন মূসা হবেন। কিন্তু তালমূদের প্রত্যেকটি বর্ণনাকে নির্ভুল ইতিহাস গণ্য করা যেতে পারে না। আর কুরআনে কোন অজানা ও অপরিচিত মূসার উল্লেখ এভাবে করা হয়েছে, এ ধরনের কোন কথা অনুমান করার কোন যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। তাছাড়া নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহে যখন হযরত উবাই ইবেন কা’বের (রা.) এ বর্ণনা রয়েছে যে, নবী ﷺ এ ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে মূসা (আ) বলতে বনী ইসরাঈলের নবী হযরত মূসাকে (আ) নির্দেশ করেছেন। তখন কোন মুসলমানের জন্য তালামূদের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হয় না।

পশ্চিমী প্রাচ্যবিদরা তাদের স্বভাবসিদ্ধ পদ্ধতিতে কুরআন মজীদের এ কাহিনীটিরও উৎস সন্ধানে প্রবৃত্ত হবার চেষ্টা করেছেন। তারা তিনটি কাহিনীর প্রতি অংগুলি নির্দেশ করে বলেছেন যে, এসব জায়গা থেকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটি নকল করেছেন এবং তারপর দাবী করেছেন, আমাকে অহীর মাধ্যমে এ ঘটনা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে গিলগামিশের কাহিনী, দ্বিতীয়টি সুরিয়ানী সিকান্দার নামা এবং তৃতীয়টি হচ্ছে ওপরে যে ইহুদী বর্ণনাটির উল্লেখ আমরা করেছি। কিন্তু এ কুটীল স্বভাব লোকেরা জ্ঞান চর্চার নামে যেসব গবেষণা ও অনুসন্ধান চালান সেখানে পূর্বাহ্ণেই এ সিদ্ধান্ত করে নেন যে, কুরআনকে কোনক্রমেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত বলে মেনে নেয়া যাবে না। কাজেই এখন যে, কোনভাবেই এ বিষয়ের সপক্ষে প্রমাণ পেশ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা কিছু পেশ করেছেন তা অমুক অমুক জায়গা থেকে চুরি করা বিষয়বস্তু ও তথ্যাদি থেকে গৃহীত। এ ন্যক্কারজনক গবেষণা পদ্ধতিতে তারা এমন নির্লজ্জভাবে টানাহেচঁড়া করে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপায় যে, তা দেখে স্বতঃষ্ফূর্তভাবে ঘৃণায় মন রি রি করে ওঠে এবং মানুষ বলতে বাধ্য হয়ঃ যদি এর নাম হয় তাত্বিক গবেষণা তাহলে এ ধরনের তত্ব-জ্ঞান ও গবেষণার প্রতি অভিশাপ। কোন জ্ঞানান্বেষণকারী তাদের কাছে যদি কেবলমাত্র চারটি বিষয়ের জবাব চায় তাহলে তাদের বিদ্বেষমূলক মিথ্যাচারের একেবারেই হাটে হাঁড়ি ভেঙ্গে যাবেঃ

এক, আপনাদের কাছে এমন কি প্রমাণ আছে, যার ভিত্তিতে আপনারা দু’চারটে প্রাচীন গ্রন্থে কুরআনের কোন বর্ণনার সাথে কিছুটা মিলে যায় এমন ধরনের বিষয় পেয়েই দাবী করে বসেন যে, কুরআনের বর্ণনাটি অবশ্যই এ গ্রন্থগুলো থেকে নেয়া হয়েছে।

দুই, আপনারা বিভিন্ন ভাষায় যেসব গ্রন্থকে কুরআন মজীদের কাহিনী ও অন্যান্য বর্ণনার উৎস গণ্য করেছেন সেগুলোর তালিকা তৈরী করলে দস্তুরমতো একটি বড়সড় লাইব্রেরীর গ্রন্থ তালিকা তৈরী হয়ে যাবে। এ ধরনের কোন লাইব্রেরী কি সে সময় মক্কায় ছিল এবং বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদকবৃন্দ সেখানে বসে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উপাদান সরবরাহ করছিলেন? যদি এমনটি না হয়ে থাকে এবং নবুওয়াত লাভের কয়েক বছর পূর্বে নবী ﷺ আরবের বাইরে, যে দু’তিনটি সফর করেছিলেন শুধুমাত্র তারই ওপর আপনারা নির্ভর করে থাকেন তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, ঐ বাণিজ্যিক সফরগুলোর তিনি কয়টি লাইব্রেরীর বই অনুলিখন বা মুখস্ত করে এনেছিলেন? নবুওয়াতের ঘোষণার একদিন আগেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তায় এ ধরনের তথ্যের কোন চিহ্ন পাওয়া না যাওয়ার যুক্তিসঙ্গত কারণ কি?

তিন, মক্কার কাফের সম্প্রদায়, ইহুদী ও খৃস্টান সবাই অনুসন্ধান করে বেড়াচ্ছিল যে, মুহাম্মাদ ﷺ একথাগুলো কোথা থেকে আনেন। আপনারা বলতে পারেন নবীর ﷺ সমকালীনরা তাঁর এ চুরির কোন খবর পায়নি কেন? এর কারণ কি? তাদেরকে তো বারবারই এ মর্মে চ্যালেঞ্জ দেয়া হচ্ছিল যে, এ কুরআন আল্লাহ নাযিল করেছেন, অহী ছাড়া এর দ্বিতীয় কোন উৎস নেই, যদি তোমরা একে মানুষের বাণী বলো তাহলে মানুষ যে এমন বাণী তৈরী করতে পারে তা প্রমাণ করে দাও। এ চ্যালেঞ্জটি নবীর ﷺ সমকালীন ইসলামের শত্রুদের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছিল। তারা এমন একটি উৎসের প্রতিও অংগুলি নির্দেশ করতে পারেনি যা থেকে কুরআনের বিষয়বস্তু গৃহীত হয়েছে বলে কোন বিবেকবান ব্যক্তি বিশ্বাস করা তো দূরের কথা সন্দেহও করতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, সমকালীনরা এ গোয়েন্দাবৃত্তিতে ব্যর্থ হলো কেন? আর হাজার বারোশো বছর পরে আজ বিরোধী পক্ষ এতে সফল হচ্ছেন কেমন করে?

শেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে, একথার সম্ভাবনা তো অবশ্যি আছে যে, কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত এবং এ কিতাবটি বিগত ইতিহাসের এমনসব ঘটনার সঠিক খবর দিচ্ছে যা হাজার হাজার বছর ধরে শ্রুতির মাধ্যমে বিকৃত হয়ে অন্য লোকদের কাছে পৌঁছেছে এবং গল্পের রূপ নিয়েছে। কোন্ ন্যায়সঙ্গত প্রমাণের ভিত্তিতে এ সম্ভাবনাটিকে একদম উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে এবং কেন শুধুমাত্র এ একটি সম্ভাবনাকে আলোচনা ও গবেষণার ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে যে, লোকদের মধ্যে গল্প ও মৌখিক প্রবাদ আকারে যেসব কিসসা কাহিনী প্রচলিত ছিল কুরআন সেগুলো থেকেই গৃহীত হয়েছে? ধর্মীয় বিদ্বেষ ও হঠকারিতা ছাড়া এ প্রাধান্য দেবার অন্য কোন কারণ বর্ণনা করা যেতে পারে কি?

এ প্রশ্নগুলো নিয়ে যে ব্যক্তিই একটু চিন্তা-ভাবনা করবে তারই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া ছাড়া আর কোন গন্তব্য থাকতে পারে না যে, প্রাচ্যবিদরা “তত্বজ্ঞানের” নামে যা কিছু পেশ করেছেন কোন দায়িত্বশীল শিক্ষার্থী ও জ্ঞানানুশীলনকারীর কাছে তার কানাকড়িও মূল্য নেই।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

এখান থেকে ৮২ নং আয়াত পর্যন্ত হযরত খাজির আলাইহিস সালামের সাথে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের সাক্ষাতকারের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি দীর্ঘ হাদীসে এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বিবৃত করেছেন। বুখারী শরীফে কয়েকটি সনদে তা উদ্ধৃত হয়েছে। হাদীসটির সারসংক্ষেপ এস্থলে উল্লেখ করা হচ্ছে একবার কেউ হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করল, বর্তমান বিশ্বে সর্বাপেক্ষা বড় আলেম কে? যেহেতু প্রত্যেক নবী তার সমকালীন বিশ্বে দীনের সর্বাপেক্ষা বড় আলেম হয়ে থাকেন, তাই হযরত মূসা আলাইহিস সালাম জবাব দিলেন, আমিই সবচেয়ে বড় আলেম। এ জবাব আল্লাহ তাআলার পছন্দ হল না। আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে অবহিত করা হল যে, প্রশ্নের সঠিক উত্তর ছিল আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন কে সবচেয়ে বড় আলেম। এতদসঙ্গে আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা আলাইহিস সালামের সামনে জ্ঞানের এমন এক দিগন্ত উন্মোচিত করতে চাইলেন, যে সম্পর্কে এ যাবৎকাল তার কোন ধারণা ছিল না। সুতরাং তাঁকে হুকুম দেওয়া হল, তিনি যেন হযরত খাজির আলাইহিস সালামের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। পথ সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হল যে, যেখানে দু’টি সাগর মিলিত হয়েছে, সেটাই হবে তার গন্তব্যস্থল। আর সেখানে একটা জায়গা এমন আসবে, যেখানে তাঁর সঙ্গে নেওয়া মাছ হারিয়ে যাবে। মাছ হারানোর সে জায়গাতেই হযরত খাজির আলাইহিস সালামের সাক্ষাত পাওয়া যাবে। সুতরাং হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তার যুবক শিষ্য হযরত ইউশা আলাইহিস সালামকে সঙ্গে নিয়ে, যিনি পরবর্তীকালে নবী হয়েছিলেন, সফর শুরু করে দিলেন। এর পরের ঘটনা কুরআন মাজীদেই আসছে। প্রকাশ থাকে যে, হযরত মূসা আলাইহিস সালামের এ সফরকে সাধারণ কোন ভ্রমণের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। তাঁর এ সফরের ভেতর আল্লাহ তাআলার বিশেষ উদ্দেশ্য নিহিত ছিল। একটা উদ্দেশ্য তো অতি পরিষ্কার। আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা শিক্ষা দিতে চেয়েছেন, নিজেকে নিজে সকলের বড় আলেম বলা কারও পক্ষেই শোভা পায় না। ইলম বা জ্ঞান হচ্ছে কুল-কিনারাহীন এক অথৈ সাগর। এর কোন দিক সম্পর্কে কে বেশি জানে তা বলা সম্ভব নয়। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল, আল্লাহ তাআলা নিজ জ্ঞান ও হিকমত দ্বারা মহা বিশ্ব কিভাবে চালাচ্ছেন তার একটা ঝলক হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে চাক্ষুষ দেখিয়ে দেওয়া। মানুষ তার প্রাত্যহিক জীবনে দুনিয়ায় বহু ঘটনা ঘটতে দেখে। অনেক সময় এমন কাণ্ড-কারখানাও তার চোখে পড়ে যার কোন ব্যাখ্যা সে খুঁজে পায় না এবং যার উদ্দেশ্য তার বুঝে আসে না। অথচ প্রতিটি ঘটনার ভেতরই আল্লাহ তাআলার কোন না কোন হিকমত নিহিত থাকে। মানুষের দৃষ্টি যেহেতু সীমাবদ্ধ তাই সে অনেক সময় তাঁর রহস্য বুঝতে সক্ষম হয় না। কিন্তু যেই সর্বশক্তিমান মালিকের হাতে বিশ্ব জগতের বাগডোর তিনি জানেন কখন কী ঘটনা ঘটা উচিত। ঘটনাটির শেষে এ বিষয়ে আরও আলোকপাত করা হবে ইনশাআল্লাহ। (৪৬ নং টীকা দেখুন।)

তাফসীরে জাকারিয়া

৬০. আর স্মরণ করুন, যখন মূসা তার সঙ্গী যুবককে(১) বলেছিলেন, দুঃসাগরের মিলনস্থলে না পৌছে আমি থামব না অথবা আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব।(২)

(১) এ ঘটনায় মূসা’ নামে প্রসিদ্ধ নবী মূসা ইবনে ইমরান আলাইহিস সালাম-কে বোঝানো হয়েছে। فتى এর শাব্দিক অর্থ যুবক। শব্দটিকে কোন বিশেষ ব্যক্তির সাথে সম্বন্ধ করা হলে অর্থ হয় খাদেম। (ফাতহুল কাদীর) বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে যে, এই খাদেম ছিল ইউশা ইবনে নূন। (ইবন কাসীর) (مَجْمَعَ الْبَحْرَيْنِ) এর শাব্দিক অর্থ দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থল। বলাবাহুল্য, এ ধরনের স্থান দুনিয়াতে অসংখ্য আছে। এখানে কোন জায়গা বোঝানো হয়েছে, কুরআন ও হাদীসে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তাই ইঙ্গিত ও লক্ষণাদী দৃষ্টি তাফসীরবিদদের উক্তি বিভিন্নরূপ। (ফাতহুল কাদীর)

(২) হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ একদিন মূসা 'আলাইহিস সালাম বনী-ইসরাঈলের এক সভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করলঃ সব মানুষের মধ্যে অধিক জ্ঞানী কে? মূসা আলাইহিস সালাম-এর জানামতে তার চাইতে অধিক জ্ঞানী আর কেউ ছিল না। তাই বললেনঃ আমিই সবার চাইতে অধিক জ্ঞানী। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নৈকট্যশীল বান্দাদেরকে বিশেষভাবে গড়ে তোলেন। তাই এ জবাব তিনি পছন্দ করলেন না। এখানে বিষয়টি আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়াই ছিল আদব। অর্থাৎ একথা বলে দেয়া উচিত ছিল যে, আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন, কে অধিক জ্ঞানী। এ জবাবের কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে মূসা আলাইহিস সালাম-কে তিরস্কার করে ওহী নাযিল হল যে, দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে অবস্থানকারী আমার এক বান্দা আপনার চাইতে অধিক জ্ঞানী। একথা শুনে মূসা ‘আলাইহিস সালাম প্রার্থনা জানালেন যে, তিনি অধিক জ্ঞানী হলে তার কাছ থেকে জ্ঞান লাভের জন্য আমার সফর করা উচিত।

তাই বললেনঃ হে আল্লাহ! আমাকে তার ঠিকানা বলে দিন। আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ থলের মধ্যে একটি মাছ নিয়ে নিন এবং দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলের দিকে সফর করুন। যেখানে পৌঁছার পর মাছটি নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে, সেখানেই আমার এই বান্দার সাক্ষাত পাবেন। মূসা 'আলাইহিস সালাম নির্দেশমত থলের মধ্যে একটি মাছ নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেলেন। তার সাথে তার খাদেম ইউশা ইবনে নূনও ছিল। পথিমধ্যে একটি প্রস্তর খণ্ডের উপর মাথা রেখে তারা ঘুমিয়ে পড়লেন। এখানে হঠাৎ মাছটি নড়াচড়া করতে লাগল এবং থলে থেকে বের হয়ে সমুদ্রে চলে গেল। (মাছটি জীবিত হয়ে সমুদ্রে যাওয়ার সাথে সাথে আরো একটি মু'জিযা প্রকাশ পেল যে,) মাছটি সমুদ্রের যে পথ দিয়ে চলে গেল, আল্লাহ তা’আলা সে পথে পানির স্রোত বন্ধ করে দিলেন। ফলে সেখানে পানির মধ্যে একটি সুড়ঙ্গের মত হয়ে গেল। ইউশা' ইবনে নূন এই আশ্চর্যজনক ঘটনা নিরীক্ষণ করছিল।

মূসা আলাইহিস সালাম নিদ্রিত ছিলেন। যখন জাগ্রত হলেন, তখন ইউশা ইবনে নুন মাছের এই আশ্চর্যজনক ঘটনা তার কাছে বলতে ভুলে গেলেন এবং সেখান থেকে সামনে রওয়ানা হয়ে গেলেন। পূর্ণ একদিন একরাত সফর করার পর সকাল বেলায় মূসা 'আলাইহিস সালাম খাদেমকে বললেনঃ আমাদের নাশ্‌তা আন। এই সফরে যথেষ্ট ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। নাশতা চাওয়ার পর ইউশা ইবনে নুনের মাছের ঘটনা মনে পড়ে গেল। সে ভুলে যাওয়ার ওযর পেশ করে বললঃ শয়তান আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। অতঃপর বললঃ মৃত মাছটি জীবিত হয়ে আশ্চর্যজনকভাবে সমুদ্রে চলে গেছে। তখন মূসা আলাইহিস সালাম বললেনঃ সে স্থানটিই তো আমাদের লক্ষ্য ছিল। (অৰ্থাৎ মাছের জীবিত হয়ে নিরুদ্দেশ হওয়ার স্থানটিই ছিল গন্তব্যস্থল।) সে মতে তৎক্ষণাৎ তারা ফিরে চললেন এবং স্থানটি পাওয়ার জন্য পূর্বের পথ ধরেই চললেন।

প্রস্তরখণ্ডের নিকট পৌছে দেখলেন, এক ব্যক্তি আপাদমস্তক চাদরে আবৃত হয়ে শুয়ে আছে। মূসা আলাইহিস সালাম তদাবস্থায় সালাম করলে খাদির ‘আলাইহিস সালাম বললেনঃ এই (জনমানবহীন) প্রান্তরে সালাম কোথা থেকে এল? মূসা ‘আলাইহিস সালাম বললেনঃ আমি মূসা। খাদির ‘আলাইহিস সালাম প্রশ্ন করলেনঃ বনী-ইসরাঈলের মূসা? তিনি জবাব দিলেনঃ হ্যাঁ, আমিই বনী-ইসরাঈলের মূসা। আমি আপনার কাছ থেকে ঐ বিশেষ জ্ঞান অর্জন করতে এসেছি, যা আল্লাহ তা'আলা আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন। খাদির বললেনঃ যদি আপনি আমার সাথে থাকতে চান, তবে কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যে পর্যন্ত না আমি নিজে তার স্বরূপ বলে দেই।

একথা বলার পর উভয়ে সমুদ্রের তীর ধরে চলতে লাগলেন। ঘটনাক্রমে একটি নৌকা এসে গেলে তারা নৌকায় আরোহণের ব্যাপারে কথাবার্তা বললেন। মাঝিরা খাদিরকে চিনে ফেলল এবং কোন রকম পারিশ্রমিক ছাড়াই তাদেরকে নৌকায় তুলে নিল। নৌকায় চড়েই খাদির কুড়ালের সাহায্যে নৌকার একটি তক্তা তুলে ফেললেন। এতে মূসা আলাইহিস সালাম (স্থির থাকতে না পেরে) বললেনঃ তারা কোন প্রকার পারিশ্রমিক ছাড়াই আমাদেরকে নৌকায় তুলে নিয়েছে। আপনি কি এরই প্রতিদানে তাদের নৌকা ভেঙ্গে দিলেন যাতে সবাই ডুবে যায়? এতে আপনি অতি মন্দ কাজ করলেন। খাদির বললেনঃ আমি পূর্বেই বলেছিলাম, আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরতে পারবেন না। তখন মূসা আলাইহিস সালাম ওযর পেশ করে বললেনঃ আমি ওয়াদার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। আমার প্রতি রুষ্ট হবেন না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ঘটনা বর্ণনা করে বললেনঃ মূসা 'আলাইহিস সালাম-এর প্রথম আপত্তি ভুলক্রমে, দ্বিতীয় আপত্তি শর্ত হিসেবে এবং তৃতীয় আপত্তি ইচ্ছাক্রমে হয়েছিল। (ইতিমধ্যে) একটি পাখি উড়ে এসে নৌকার এক প্রান্তে বসল এবং সমুদ্র থেকে এক চঞ্চ পানি তুলে নিল। খাদির ‘আলাইহিস সালাম মূসা ‘আলাইহিস সালাম-কে বললেনঃ আমার জ্ঞান এবং আপনার জ্ঞান উভয়ের মিলে আল্লাহ তা’আলার জ্ঞানের মোকাবিলায় এমন তুলনাও হয় না, যেমনটি এ পাখির চঞ্চর পানির সাথে রয়েছে সমুদ্রের পানি।

অতঃপর তারা নৌকা থেকে নেমে সমুদ্রের তীর ধরে চলতে লাগলেন। হঠাৎ খাদির একটি বালককে অন্যান্য বালকের সাথে খেলা করতে দেখলেন। খাদির স্বহস্তে বালকটির মস্তক তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। বালকটি মারা গেল। মূসা আলাইহিস সালাম বললেনঃ আপনি একটি নিষ্পাপ প্রাণকে বিনা অপরাধে হত্যা করেছেন। এ যে বিরাট গোনাহর কাজ করলেন। খাদির বললেনঃ আমি তো পূর্বেই বলেছিলাম, আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরতে পারবেন না। মূসা 'আলাইহিস সালাম দেখলেন, এ ব্যাপারটি পূর্বের চাইতেও গুরুতর। তাই বললেনঃ এরপর যদি কোন প্রশ্ন করি তবে আপনি আমাকে পৃথক করে দেবেন। আমার ওযর-আপত্তি চূড়ান্ত হয়ে গেছে।

অতঃপর আবার চলতে লাগলেন। এক গ্রামের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় তারা গ্রামবাসীদের কাছে খাবার চাইলেন। ওরা সোজা অস্বীকার করে দিল। খাদির এই গ্রামে একটি প্রাচীরকে পতনোন্মুখ দেখতে পেলেন। তিনি নিজ হাতে প্রাচীরটি সোজা করে দিলেন। মূসা আলাইহিস সালাম বিস্মিত হয়ে বললেনঃ আমরা তাদের কাছে খাবার চাইলে তারা দিতে অস্বীকার করলো। অথচ আপনি তাদের এত বড় কাজ করে দিলেন; ইচ্ছা করলে এর পারিশ্রমিক তাদের কাছ থেকে আদায় করতে পারতেন। খাদির বললেনঃ (هَٰذَا فِرَاقُ بَيْنِي وَبَيْنِكَ) অর্থাৎ এখন শর্ত পূর্ণ হয়ে গেছে। এটাই আমার ও আপনার মধ্যে বিচ্ছেদের সময়।

এরপর খাদির উপরোক্ত ঘটনাত্ৰয়ের স্বরূপ মূসা আলাইহিস সালাম-এর কাছে বর্ণনা করে বললেনঃ (ذَٰلِكَ تَأْوِيلُ مَا لَمْ تَسْطِعْ عَلَيْهِ صَبْرًا) অর্থাৎ এ হচ্ছে সেসব ঘটনার স্বরূপ; যেগুলো আপনি দেখে ধৈর্য ধরতে পারেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করে বললেনঃ মূসা আলাইহিস সালাম যদি আরো কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরতেন, তবে আরো কিছু জানা যেত ৷ (বুখারীঃ ১২২, মুসলিমঃ ২৩৮০) এই দীর্ঘ হাদীসে পরিস্কার উল্লেখ রয়েছে যে, মূসা বলতে বনী-ইসরাঈলের নবী মূসা 'আলাইহিস সালাম ও তার যুবক সঙ্গীর নাম ইউশা ইবন নুন এবং দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে যে বান্দার কাছে মূসা আলাইহিস সালাম-কে প্রেরণ করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন খাদির ‘আলাইহিস সালাম। (ফাতহুল কাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৬০) (স্মরণ কর,) যখন মূসা তার সঙ্গীকে(1) বলেছিল, ‘দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে(2) না পৌঁছে আমি থামব না অথবা আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব।’ (3)

(1) এই যুবক ছিল ইউশা’ বিন নূন (আঃ) যিনি মূসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন।

(2) কোন নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ স্থানকে নির্দিষ্ট করা যায়নি। তবে অনুমান ও লক্ষণাদির দাবী অনুযায়ী এটা হল সিনাই মরুভূমির দক্ষিণ মাথায়, যেখানে উকবাহ উপসাগর ও সুইজ উপসাগর এক সাথে একত্রিত হয়ে লোহিত সাগরে মিশে গেছে। অন্যান্য যেসব স্থানের কথা মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন তাতে مجمع البحرين (দুই সাগরের মিলনস্থল) এর যে ব্যাখ্যা হয়, তার সাথে মোটেই খাপ খায় না।

(3) حُقُبٌ এর একটি অর্থ, ৭০ অথবা ৮০ বছর। দ্বিতীয় অর্থ, অনির্দিষ্ট সময়-কাল। এই দ্বিতীয় অর্থই এখানে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যতক্ষণ না আমি مجمع البحرين (দুই সাগরের মিলনস্থল) পর্যন্ত পৌঁছব, ততক্ষণ পর্যন্ত চলতেই থাকব এবং সফর অব্যাহত রাখব। তাতে যতদিন লাগে লাগবে। মূসা (আঃ)-এর এই সফরের প্রয়োজন এই জন্য দেখা দিয়েছিল যে, তিনি একজন প্রশ্নকারীর উত্তরে বলেছিলেন, বর্তমানে আমার থেকে বড় জ্ঞানী আর কেউ নেই। তাঁর এই (গর্ব) কথা মহান আল্লাহর পছন্দ হল না। সুতরাং অহীর মাধ্যমে তাঁকে অবগত করলেন যে, আমার এক বান্দা (খায্বির) তোমার থেকেও বড় জ্ঞানী। মূসা (আঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আল্লাহ! তাঁর সাথে সাক্ষাৎ কিভাবে হতে পারে? মহান আল্লাহ বললেন, যেখানে উভয় সাগর এক সাথে মিশে গেছে, সেখানেই আমার সেই বান্দা থাকবে। অনুরূপ এ কথাও বললেন যে, সাথে করে একটি মাছ নিও। যখন এ মাছ তোমার থলি থেকে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাবে, তখন বুঝে নিও যে, এটাই তোমার গন্তব্যস্থল। (বুখারী, সূরা কাহ্ফ) এই নির্দেশ অনুযায়ী তিনি একটি মাছ নিয়ে যাত্রা আরম্ভ করে দিলেন।