স্ত্রীদের ক্ষেত্রে তালাকের বিধান এবং তিন মাস পর্যন্ত বিয়ে না করা এ ক্ষেত্রে মন্তব্য কি?
1 Answers
কেউ যদি জেনে-শুনে বিয়ে বা তালাকের ক্ষেত্রে ভূল পন্থা অবলম্বন করে তাহলে সেই বিয়ে বা তালাক কোনটাই বৈধ হবে না তাই এসকল ক্ষেত্রে পরিপুর্ণ তথ্য জেনে নিয়ম মেনে অগ্রসর হওয়া উচিৎ।
“তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে। {সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ২২৯-২৩০}
তালাক যে পক্ষ দিক না কেন তালাকপ্রাপ্ত নারী দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে হলে তিন মাস বা তিন হায়েজ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
ইসলামে স্ত্রী কতৃক তালাক প্রদানের নিয়ম নেই কিন্তু আমাদের আইনে সেই সুযোগ রয়েছে। নীচে আইন আনুসারে তালাকের বিস্তারিত নিয়মগুলো জেনে নিন।
অনেকেই মনে করেন তিনবার 'তালাক' উচ্চারণ করলেই তালাক কার্যকর হয়ে যায়। তবে বাস্তব অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেউ যদি তার স্ত্রীকে ডিভোর্স বা তালাক দিতে চায় তবে মুখে 'তালাক' বলার পর এই সংক্রান্ত লিখিত নোটিশও দিতে হবে। তালাক কার্যকর করার ক্ষেত্রে মুখে উচ্চারণের পাশাপাশি চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত নোটিশ পাঠাতে হয়।
চেয়ারম্যান বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে— ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার চেয়ারম্যান, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বা প্রশাসক, সেনানিবাস এলাকায় এই অধ্যাদেশের অধীনে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের জন্য সরকারের নিয়োগ করা
ব্যক্তি, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা অথবা সিটি কর্পোরেশনের স্থগিত (suspended) থাকলে অধ্যাদেশের অধীনে চেয়ারম্যানের কাজ সম্পাদনকারী সরকারের নিয়োগ করা ব্যক্তি।
চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো তালাক নোটিশের একটি অনুলিপি তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে পাঠাতে হবে। তারপর এই নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে দুই পক্ষের পুনঃমিলনের উদ্দেশ্যে চেয়ারম্যান সালিশি কাউন্সিল তৈরি করে দুই পক্ষের পুনঃমিলনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
যদি দুই পক্ষের মধ্যে কোনোভাবেই পুনঃমিলন সম্ভব না হয় তবে তালাক নোটিশ প্রদানের তারিখ হতে ৯০ দিনের মধ্যে তালাক কার্যকর হয়ে যাবে।
এই ৯০ দিন পর্যন্ত স্ত্রীর ভরণপোষণ ও অন্যান্য খরচাপাতি বহন করবেন স্বামী।
তালাকের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে, যদি তালাক দেওয়ার সময় স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে থাকে তবে তার গর্ভাবস্থার পরিসমাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ সন্তান ভূমিষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, মুসলিম আইনে স্ত্রীর তালাক দেওয়ার কোনও ক্ষমতা নেই, যদি না কাবিননামার ১৮তম কলামে স্ত্রীর তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া থাকে।
তবে মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯ অনুযায়ী মুসলিম আইনে বিবাহিত কোনও মহিলা নিচের এক বা একাধিক কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবেন।
১. চার বছর পর্যন্ত স্বামীর কোনও খোঁজখবর পাওয়া না গেলে।
২. দুই বছর যাবত স্বামী কর্তৃক অবহেলিত এবং স্বামী ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হলে।
৩. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১'র বিধান লঙ্ঘন করে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করলে।
৪. স্বামী ৭ বছর বা তার বেশি মেয়াদের জন্য কারাদণ্ড প্রাপ্ত হলে।
৫. স্বামী কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া তিন বছর ধরে বিবাহিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে।
৬. বিয়ে করার সময় স্বামী পুরুষত্বহীন হলে এবং এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে।
৭. দুই বছর ধরে স্বামী অপ্রকৃতিস্থ থাকলে বা, কুষ্ঠ রোগ বা, সংক্রামক যৌন ব্যাধিতে ভুগলে।
৮. ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই যদি অভিভাবকের মাধ্যমে বিয়ে দেওয়া হয় এবং স্বামী-স্ত্রী সহবাস বা, বসবাস না করে তাহলে ১৯ বছর বয়স হওয়ার আগেই এই বিয়ে প্রত্যাখ্যান করলে।
৯. স্ত্রীর প্রতি স্বামী নিষ্ঠুর আচারণ করলে।
এক্ষেত্রে নিষ্ঠুর আচরণগুলো হল:
ক) স্বভাবগতভাবে তাকে মারপিট বা, শারীরিক নির্যাতন ছাড়াও নিষ্ঠুর আচরণ করে স্ত্রীর জীবন দুর্বিষহ করে তুললে।
খ) খারাপ চরিত্রের মহিলাদের সঙ্গে মেলামেশা করলে বা অনৈতিক জীবনযাপন করলে।
গ) স্ত্রীকে অনৈতিক জীবনযাপানে বাধ্য করার চেষ্টা করলে।
ঘ) স্ত্রীর সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করলে বা, তার স্ত্রীর সম্পত্তির অধিকারে বাধা প্রদান করলে।
ঙ) স্ত্রীর ধর্মকর্ম পালনে বাধা দিলে।
চ) একাধীক স্ত্রী থাকলে পবিত্র কোরআনেরর বিধান মোতাবেক সমভাবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হলে।
এসব নিষ্ঠুর আচরণের জন্য কাবিননামায় তালাকের ক্ষমতা না থাকা সত্বেও স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক প্রদান করতে পারবেন।
অন্য যে কোনও সংগত কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে, উল্লেখিত যে কোনও একটি কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে হলে স্ত্রীকে আদালতের মাধ্যমে যেতে হবে।
তালাক স্বামী বা, স্ত্রী যেই দিক না কেন, স্ত্রী তার প্রাপ্য মোহরানা যে কোনও সময় দাবী করতে পারবেন।
মনে রাখতে হবে যে, তালাক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক আর তাই যে এলাকায় তালাক কার্যকর করা হয়েছে সেই এলাকার নিকাহ রেজিস্ট্রার দিয়ে তালাক নিবন্ধন করাতে হবে।
রুমিন ফারহানা
অ্যাডভোকেট, ব্যারিস্টার অ্যাট ল'
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy