1 Answers

হিন্দু ‘ধর্ম’ আসলে কোনো একটা সুনির্দিষ্ট ধর্ম না। কনফুসীয় ‘ধর্ম’ বা লাও ‘ধর্ম’ বা শিন্টো ‘ধর্ম’ -এর মতোই একগুচ্ছ আচার-আচরণ, দর্শণ, সংস্কৃতির একটা মিশ্রণ। এই ধরণের ‘ধর্ম’ এর সাথে খ্রীশ্চান, ইসলাম, ইহুদী বা বৌদ্ধ ধর্মের প্রকৃতিগত তফাৎ রয়েছে। এই কারণে হিন্দু ধর্মের ‘এইটা করতে হবে’, বা ‘ওইটা করতে হবে না’ এই ধরণের বিধানে নানা গ্রন্থ ও রীতির ঐক্যমত দেখা যায় না। সুতরাং গরুকে মায়ের সাথে তুলনা ও পুজো করা, হিন্দু ধর্ম শাস্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ না। বিশেষ আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে এর সূচনা হয়েছে। ‘ঋগ্বেদ’ - এ পাই অগ্নির খাদ্য - ‘বলদ ও গাভী’, রাজসূয়, বাজপেয় ও অগ্নিষ্টোম যজ্ঞের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ‘গোসব’ বা গো বলি, ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’-এ ছিট-ছিট দাগের একটি গরুকে মরুৎদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে, ‘তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ’ অনুসারে পঞ্চশারদীয়াসব (দর্শপূর্ণমাস) যজ্ঞের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল তিন বছরের কম বয়সী সতেরোটি গাভীকে অগ্নিদগ্ধ করা। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে ‘অথো অন্নং বৈ গৌঃ’ অর্থাৎ ‘ গরু অন্ন ন্যায়, অতএব খাদ্যই বটে’। ঋগ্বেদ (দশম, ৬৮.৩) এ অতিথির আগমনে গো হত্যার পরিষ্কার বর্ণনা আছে। ‘ধর্মসূত্র’ অনুসারে মহাঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের প্রিয় খাদ্য ছিল গোমাংস। অবশ্য বৈদিক যুগে দুগ্ধবতী গাভীর হত্যার ক্ষেত্রে এবং গর্ভবতী গাভী হত্যার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু গরুকে ‘পবিত্র’ মনে করা হত না বা গোমাংসকে নিষিদ্ধ। কৃষি ব্যবস্থার বিস্তারের সাথে সাথে গবাদী পশু ক্রমশ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ‘বৈদিক যুগ’ এর ‘শিকারী-সংগ্রাহক’ জীবনের যে শেষ ছোঁয়া ছিল, তপোবন কেন্দ্রিক জীবন ছিল, ষোড়শ মহাজনপদের উত্থানের পর তা একেবারে মুছে যায়। এই সময় বৈদিক ধর্মের স্থানে আচার সর্বস্ব ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ক্রমে জাঁকিয়ে বসে। বলি, যজ্ঞ ক্রমশ বেড়ে যায়। নতুন স্থায়ী কৃষি সমাজ এটা মানতে রাজি ছিল না। তাঁদের আর প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলনের চাপে গো-হত্যা, বলদ হত্যার উপর নানা নিষেধাজ্ঞা চাপে। কিন্তু তখনও লোকদর্শনে গরুর পুজো হিন্দু ধর্মের অপরিহার্য বা প্রধাণ অংশ হয়ে ওঠেনি। সে হতে আরও হাজার বছর লাগবে, ‘মনু সংহিতা’ অবধি। যাই হোক, আসল কথা হল, অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃষি ব্যবস্থার বিস্তার আর ক্রমবর্ধমান গবাদী পশুর প্রয়োজন গরুকে ক্রমে সম্মানের আসনে বসিয়েছে, তাকে মায়ের সাথে তুলনা করেছে। কৃষি ভিত্তিক ভারতীয় সমাজে বলদের জন্মদান থেকে দৈনিক দুগ্ধ যা দুর্ভিক্ষের সময়ও প্রাণ রক্ষা করত, তার অবলম্বণ ছিল গরুই। মাতারূপে গরুর উপাসনার কারণ মূলতঃ এটাই। (বাংলা কোরা থেকে সংগৃহীত )

10187 views

Related Questions