হঠাৎ সৌদিতে এত পরিবর্তন?

বিন সালমান ভাবছেন, সৌদি আরবকে এমন একটি দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে, যা তেল ছাড়াও তার বর্তমান প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে টিকে থাকতে পারবে। তিনি আরও চাইলেন, সৌদি আরবে নারীরা যাতে গাড়ি চালাতে পারে, এমনকি দাঁড়াতে পারে নির্বাচনেও। তিনি চাইলেন পররাষ্ট্রনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে। এভাবে তিনি নতুন এক সৌদি আরবের প্রতিশ্রুতি দিতে থাকলেন

সৌদি আরবে গত কয়েক দশকে ধীরগতিতে সামান্য কিছু পরিবর্তন ঘটলেও দেশটি এখন নাটকীয় কিছু ঘটনাপ্রবাহের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। আধুনিকায়ন, নারীদের অধিকার এবং ইরানের বিরুদ্ধে দল পাকানোÑ এর সবই আছে দেশটির কার্যতালিকায়। আর এ সবকিছুর কেন্দ্রে আছেন একজন ব্যক্তি, নতুন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তার নেতৃত্বে চলছে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। সমালোচকদের অনেকে বলছেন, নিজের ক্ষমতা আরও কুক্ষিগত করতে বিরোধীদের তিনি নির্মূল করার চেষ্টা করছেন এ অভিযানের মাধ্যমে। দেশের ভেতরে তো বটেই, যুবরাজ বিন সালমান এখন চেষ্টা করছেন নিজেকে আরববিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেÑ হঠাৎ এখন কেন তেলসমৃদ্ধ এ দেশটিতে এত কিছু ঘটতে শুরু করেছে? সৌদি আরবের নাগরিকরাও গভীর আগ্রহের সঙ্গে এসব পরিবর্তনের দিকে লক্ষ রাখছেন। নজর রাখছেন মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরাও।

পরিবর্তনের হাওয়া

গত কয়েক দিনে নাটকীয় কিছু ঘটনা ঘটে গেল সৌদি আরবে। এসব কারও কল্পনায়ও ছিল না। যেমন বিলাসবহুল হোটেল রাতারাতি পরিণত হলো কারাগারে। আর ধনকুবের রাজকুমাররা হয়ে গেলেন কারাবন্দি। এতে দেশটিতে বাড়তে লাগল উত্তেজনা, দেশটি জড়িয়ে পড়ছে প্রক্সি যুদ্ধে এবং এত দ্রুত একের পর এক এসব ঘটনা ঘটে চলেছে যে, এসব খবরাখবরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাও খুব কঠিন হয়ে পড়ছে। সৌদি আরবে এত পরিবর্তনের কারণ ও ধরন বুঝতে হলে এর সামান্য পেছনের কিছু ইতিহাসের দিকে ঘুরে তাকাতে হবে। আজিজ আল সউদ ১৯০২ সাল থেকে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেন তৃতীয় সৌদি রাজত্ব। ১৯৫৩ সালে তার মৃত্যুর আগে এ রাজত্ব তিনি সম্প্রসারিত করেন পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর এবং ইরাক থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত। এ সৌদি বাদশাহর ছিল কয়েক ডজন ছেলেসন্তান। তিনি চাইছিলেন ক্ষমতা একজনের হাত থেকে আরেকজনের হাতে ঘুরতে থাকবে। তখন তারা একেকজন একেক গোষ্ঠীর নেতা হয়ে উঠলেন। তাদের ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখারও ব্যবস্থা ছিল তখন। এ কারণে বিভিন্ন বিষয়ে ক্ষমতা তাদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল।

এভাবেই চলে আসছিল দশকের পর দশক। খুব ধীরগতিতে কিছু পরিবর্তনও ঘটছিল। এসবের বেশিরভাগই ছিল স্থিতিশীল এবং কী ঘটতে যাচ্ছে, সেটা আগে থেকেই মোটামুটি অনুমান করা যেত। অর্থাৎ নাটকীয় কিছু তেমন একটা ঘটত না।

ক্ষমতার খেলা

সৌদি আরবের এখনকার বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ। তার ভাইদের বেশিরভাগই এরই মধ্যে মারা গেছেন। ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে, রাজত্ব এখন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরের সময় চলে এসেছে। বাদশাহর ভাতিজা মোহাম্মদ বিন নায়েফ ২০১৫ সালে হলেন নতুন যুবরাজ। ফলে এটা নিশ্চিত হয়ে যায় যে সিংহাসন আল সউদ রাজপরিবারের ভিন্ন শাখার দিকে প্রবাহিত হতে চলেছে। অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধ বাদশাহ সালমান তখন তার উচ্চাকাক্সক্ষী পুত্রসন্তান সালমানকে তড়িঘড়ি করে ডেপুটি যুবরাজ হিসেবে ঘোষণা করেন। এর ২ বছরের মধ্যেই মোহাম্মদ বিন নায়েফকে উৎখাত করেন বাদশাহ সালমান। এর পর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠেন তারই ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমান। ফলে এ রাজপরিবারে যেভাবে সিংহাসনের উত্তরাধিকারের পরিবর্তন হয়ে আসছিল, সে প্রথা ভেঙে যায়।

নতুন সৌদি আরবের প্রতিশ্রুতি

তারপরই বদলে যেতে শুরু করে সবকিছু। নতুন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান রাতারাতি তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের আটক করে জেলে ভরতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন অত্যন্ত বিত্তশালী ব্যবসায়ীরা। এমনকি ন্যাশনাল গার্ডের প্রধানও। সব ক্ষমতা চলে এলো এক ব্যক্তির হাতের মুঠোয়, যা সৌদি রাজপরিবারে কখনও ছিল না। বিন সালমান ভাবছেন, সৌদি আরবকে এমন একটি দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে, যা তেল ছাড়াও তার বর্তমান প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে টিকে থাকতে পারবে। তিনি আরও চাইলেন, সৌদি আরবে নারীরা যাতে গাড়ি চালাতে পারে, এমনকি দাঁড়াতে পারে নির্বাচনেও। তিনি চাইলেন পররাষ্ট্রনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে। এভাবে তিনি নতুন এক সৌদি আরবের প্রতিশ্রুতি দিতে থাকলেন। রূপকথার গল্পের মতো এখানেই কি এর একটি সুন্দর সমাপ্তি হতে পারে না? না, পারে না। কারণ বাস্তব পরিস্থিতি আসলে সে রকম কিছু নয়। যুবরাজ বিন সালমানের এতসব উদ্যোগের পেছনে রয়েছে বড় ধরনের সব চ্যালেঞ্জ। তার এ ক্ষমতার খেলা দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করে দিতে পারে, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়তে পারেন বিনিয়োগকারীরাও। মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে তার যে নীতি, সেখানেও রয়েছে সংঘাতের আশঙ্কা। এরই মধ্যে সৌদি আরব বাগযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে ইরানের সঙ্গে। আর দেশটি তো এরই মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ করছে ইয়েমেনে। এ অবস্থা থেকে সৌদি আরব এ

সৌদি আরব এখন কোন দিকে যেতে পারে এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের এতসব পরিকল্পনার পরিণতি কী হয়, সেসব দেখার জন্য হয়তো আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে নাটকীয় কিছু যে ঘটবে, সেটা নিয়ে হয়তো কারও সন্দেহ নেই।

বিবিসি 

1742 views

0 Answers

Related Questions

Next steps