আমাদের কলেজে রচনা প্রতিযোগিতা। রচনার নাম হলো তরুনদের চেতনায় স্বাধীনতা রচনাটা যে কেউ আমাকে পাঠাবেন। প্লিজ
2924 views

1 Answers

অমর একুশের সুদৃঢ় প্রগতিশীল চেতনা তথা বায়ান্ন’র মহান ভাষা আন্দোলন ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের, একুশ বাঙালি জাতীয় জীবনের অঘোষিত বিপ্লব; মুক্তিযুদ্ধের মহৎ প্রেরণা উৎস।

কিন্তু, ’৭১ –এর পরে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তানকামী রাজাকার ও এদের দোসরদের হাতে। সেই বিরাট ইতিহাস বর্ণনাতীত। তারপর দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর পর স্বাধীন-মুক্ত চেতনা মস্তিষ্কে ধারণ করে তা বহিঃপ্রকাশে চারপাশে ইথারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে স্বাধীনতার কলংকিত অধ্যায় চিরতরে মোচনের অজর-অমর মুক্ত চেতনার দৃপ্ত জয়োল্লাস তথা ‘শাহবাগ স্কয়ার’ বিপ্লবী চেতনার সংগ্রামমুখর গণজাগরণের চেতনার স্ফূরণের আন্দোলন।

অমর একুশের একষট্টি বছর অর্জনের এই দিনে এইটুকুই কামনা-বাসনা হৃদয়ে উদ্বেলিত হোক ষোল কোটি বাঙালির অন্তরের গভীরে যাতে বাংলাদেশের নতুন স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ সফল করবার অবিনাশী চেষ্টা অব্যাহত থাকে সম্পূর্ণ অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত।

একটাই স্লোগান দ্বিগ্বিদিক মুখরিত করুক-“ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই/ সব রাজাকারের ফাঁসি চাই/ নতুন যুদ্ধের বিজয়ের আলোয় আলোকিত হোক বাংলাদেশ/ তাই; প্রহর গুনছি আমরা সবাই সেই মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হবার প্রতীক্ষায়।।”

তরুণ প্রজন্মের জন্যে সংক্ষিপ্তাকারে হলেও ইতিহাসের দিকে একবার ফিরে তাকানো উচিত অমর একুশের চেতনা ও স্বাধিকার আদায়ের ইতিহাস হৃদয়ের গহীনে প্রবেশ করানোর জন্যে।
সমগ্র পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের (৫৬%) উপর পাকিস্তানী শাসকদের চাপিয়ে দেয়া উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা করার ভিত্তিহীন দাবী ও সীমাহীন শোষনে অতিষ্ট হয়ে বাঙালি ছাত্র- শিক্ষক- শ্রমিক- কৃষক- বুদ্ধিজীবী এবং মধ্যবিত্তের এক ব্যাপক গণপ্রতিরোধ আন্দোলনে রূপ নিয়ে সমগ্র পূর্ব বাংলায় অদৃষ্টপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীতে, পাকিস্তান বর্বর শাসকগোষ্ঠীর উপর প্রথম স্বাধিকার গণআন্দোলন ১৯৫২ সালে রূপায়িত হয় মহান ভাষা আন্দোলনে যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ভিত রচনা করেছিল। এ আন্দোলন ত্বরান্বিত করতে “সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ” –এর যে প্রগতিশীল ছাত্র সমাজ দৃঢ় ভূমিকা রেখেছিলেন; তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- গাজীউল হক, আব্দুল মতিন, মোহাম্মদ তোহা, সামছুল হক, অলি আহাদ। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রতিবাদমুখর মিছিলে পাকিস্তানী শাসকদের বর্বরোচিত গুলিবর্ষনে প্রাণোৎসর্গ করেছিলেন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা আরো অনেকে। যাঁদের মহান আত্মত্যাগে অর্জিত হয়েছে প্রাণের ভাষা বাংলা, মায়ের মুখের ভাষা বাংলা বলার অবাধ অধিকার।
বাঙালি জাতি; পৃথিবীর একমাত্র জাতি যারা স্বাধীনভাবে মাতৃভাষা বলার অধিকার আদায়ের জন্যে প্রাণ উৎসর্গ করতেও দ্বিধাবোধ করেনি।

ভাষা আন্দোলনের প্রায় ছয় দশক অতিক্রমের পথে; কিন্তু, আমরা কি পেরেছি একুশের চেতনা বাস্তবায়ন করতে যা আমাদের ভাষা আন্দোলন পরবর্তী দীর্ঘ সংগ্রামের পথে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে?

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেমন- জাপান, চীন, জার্মানী, সুইডেন, নরওয়ে ইত্যাদি দেশের সরকারী ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার প্রধান মাধ্যম পরিচালিত হচ্ছে সেইসব দেশের মাতৃভাষা অনুযায়ী। কিন্তু, তথাকথিত বিশ্বায়নের নামে তথা সাম্রাজ্যবাদে পিষ্ঠ হয়ে আমাদের দেশে প্রচলিত জরাগ্রস্থ শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলার চেয়ে ইংরেজি ভাষাকেই বরাবর প্রাধান্য দিয়ে আসছে ব্যাপকাকারে। ইংরেজিতে দখল থাকার প্রয়োজন রয়েছে; তার অর্থ এই নয় যে মাতৃভাষাকে সঠিকভাবে আয়ত্ত না করে অবজ্ঞা ও অবহেলায় ফেলে রেখে ভিনদেশী ভাষার চর্চা করতে হবে! আর তাই, এখনো আমাদের চারপাশ বাংলা ভাষার ভুল বানান-উপমা-উচ্চারণ -এ ভরপুর!

বর্তমান সময়ে শিক্ষা সচেতন বিত্তশালী পরিবারের পিতা-মাতা বিপুলভাবে আগ্রহী ও উৎসাহী তাদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর জন্যে যাতে ভবিষ্যতে তাদেরকে উচ্চশিক্ষার জন্যে বিদেশে পাঠাতে পারে। যে কারনে সেইসব কোমলমতি প্রাণে বাংলা ভাষা শেখার আগ্রহ জাগে না বললেই চলে! শৈশবকাল থেকেই তাদের ইংরেজি ভাষার প্রতি প্রীতিবোধ জাগতে থাকে। ফলে, তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহজ বাংলা বলতেও বাধাপ্রাপ্ত হয়!

তৎকালীন  ছাত্র রাজনীতি আবর্তিত হত গণমানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে; আর এখন অধিকাংশ ছাত্ররা রাজনীতির কথা শুনলেও পিছিয়ে যায় কয়েকশ’ গজ! কেননা, বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থা কলুষিত হয়ে গেছে স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ভিড়ে। আর ছাত্র রাজনীতি রূপ নিয়েছে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ভর্তি বাণিজ্য, সংঘ-হল দখল ইত্যাদি বীভৎস কার্যকলাপে।

প্রচলিত প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থার শিকার বর্তমান তরুন প্রজন্মের ভেতরে গভীরভাবে প্রবেশ করেনি ভাষা-শিক্ষা-ইতিহাস-সংস্কৃতিবোধ-স্বদেশপ্রেম-বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত চিন্তা-চেতনা। তাহলে, জ্ঞান আহরনে তাদের মধ্যে কিভাবে চেতনা প্রতিফলিত করে ‘প্রশ্ন জ্ঞিজ্ঞাসু’ মানসিকতা তৈরি হবে? পাশ্চাত্যের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের পোশাকের আতিশয্যে পরিবর্তন এসেছে; কিন্তু সেই তুলনায় চেতনায় এখনো প্রগতি অভিমুখি জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন -এর ঠাঁই বোধ করি ততটা হয়নি!  তাহলে, কি আমরা এই ধরনের পশ্চাদগামী অবস্থার শিকার হবার জন্যে রক্তের বিনিময়ে অর্জন করেছিলাম মায়ের ভাষা বাংলা? তবুও একটাই সত্তা সকলের মাঝে থাকা দরকার তা হলো বাঙালি জাতীয়তাবোধে দেশকে আকূণ্ঠ ভালোবাসা তথা দেশপ্রেম।

তরুণ প্রজন্মের কাছে শাহবাগ স্বাধীনতা প্রজন্ম’৭১ চত্বর থেকে বাংলাদেশের আপামর স্বাধীনচেতা গণমানুষ সঠিক শিক্ষা অর্জন করুক ও সোচ্চার হোক নিজেদের মৌলিক অধিকার আদায়ে। সর্বত্র ঠাই হোক বিশুদ্ধ বাঙলা ভাষার ব্যবহার। আজ স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পর এবং মহান ভাষা আন্দোলনের একষট্টি বছর পর এই সময়ের প্রজন্ম আমরা ন্যায্য অধিকার আদায়ে যেভাবে একাত্মতা ঘোষণা করে সোচ্চার হয়েছি তেমনি বাঙালি জাতি তাঁদের প্রতিটি আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রাপ্য দাবি আদায় করতে সচেষ্ট হয়েছে। তাই, এই গণজাগরণের মঞ্চের আন্দোলন ছাপান্নো হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ কাঁপিয়ে পৌঁছাবে সঠিক লক্ষ্যে স্লোগানে, সংগ্রামে, বিপ্লবী গান-কবিতায় কাঙ্ক্ষিত নতুন সূর্যের আলোয় আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে অমর একুশের চেতনা ও স্বাধীনতার চেতনাকে সমন্বিত করে।
2924 views

Related Questions