কোরবানি কোথায় থেকে শুরু?

ইদুল আযহার কোরবানি শুরু কোথায়? ইসমাইল(আ:)থেকে নাকি হাবিল কাবিল থেকে। ইসমাইল(আ:)এবং হাবিল কাবিল সর্ম্পকে জানতে চাই কেহ বলে ইসমাইল থেকে কোরবানি শুরু আবার কেহ বলে হাবিল কাবিল থেকে। কোনটা সত্যি?ভাল উত্তর পাওয়ার আশা করছি।আর এখান থেকে মনে হয় ভাল উত্তর পাব।
2918 views

4 Answers

হযরত ঈসমাইল (আঃ) থেকে শুরু হয়। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) বৃদ্ধাবস্থায় সন্তান লাভ করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি আপন সন্তানকে কুরবানির জন্য প্রস্তুত হন। কুরবানি করার সময় সে স্থলে আল্লাহর ইচ্ছায় দুম্বা কুরবানি হয়। তখন থেকেই কুরবানির প্রচলন।

2918 views Answered

আল্লাহর নির্দেশে নবী ইবরাহীম (আঃ) কর্তৃক তার প্রিয়পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে কুরবানী করার মাধ্যমে। যদিও তাকে কুরবানি করা হয়নি। কুরবানী মানে- স্বত্ত্বত্যাগ করে কোন প্রিয় বস্তু ছেড়ে দেয়া।

2918 views Answered

কোরবানি : কোরবানি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই (হে নবী!) আমি আপনাকে (নিয়ামত পূর্ণ) কাওসার দান করেছি, অতএব, আপনি আপনার ‘রব’ এর সন্তুষ্টির জন্যে সালাত কায়েম করুন ও তাঁর নামে কোরবানি করুন’ (সূরা আল কাওসার-১০৮/১-২)। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করবে না সে যেন ঈদগাহের নিকটে না আসে’ (আহমদ ও ইবনে মাজাহ)। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, কোরবানির দিনে মানবসন্তানের কোনো নেক আমলই আল্লাহ তায়ালার নিকট তত প্রিয় নয়, যত প্রিয় কোরবানি করা। কোরবানির পশুর শিং, পশম ও খুর কিয়ামতের দিন (মানুষের নেক আমলনামায়) এনে দেয়া হবে। কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। সুতরাং তোমরা আনন্দচিত্তে কোরবানি করো’ (তিরমিজি)। কোরবানির অর্থ : আমাদের সমাজে বাংলায় প্রচলিত কোরবানি শব্দের অর্থ হচ্ছে, নিকটবর্তী হওয়া বা সান্নিধ্য লাভ করা। আল কুরআনে সূরা আল মায়েদার ২৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে, ‘ইজ ক্কাররাবা- ক্কুরবা-নান’ অর্থাৎ যখন তার দু‘জনে কোরবানি পেশ করলো বা পশু জবাই করলো, বা জবাই করে ফেলে আসল। সূরা আল কাওসারে বলা হয়েছে, ‘ফাছল্লি লিরাববিকা ওয়ানহার’ অর্থাৎ অতএব, (হে নবী!) আপনার ‘রব’ এর স্মরণে সালাত আদায় করুন ও তাঁর সন্তুষ্টির জন্যে কোরবানি করুন’। এখানে ‘নাহার’ বলতে কোরবানি বোঝানো হয়েছে। আসলে ‘নাহার’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, নহর, বিশেষ নিয়মে জবাই বা জবাই করা, জবাই করে হত্যা করা বা প্রিয় বস্তু জবাই করে হত্যা করা বা ত্যাগ করা। কোরবানির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস : দুনিয়ায় মানব বসতির শুরুতেই কোরবানির প্রচলন শুরু হয়েছে। পৃথিবীর প্রথম মানুষ আমাদের আদি পিতা ও নবী হজরত আদম (আ.) এর প্রথম সন্তান কাবিল ছিল আল্লাহ তায়ালা ও পিতা-মাতার অবাধ্য বা কাফের। কাবিলের ছোট ভাই হজরত আদম (আ.) এর দ্বিতীয় ছেলে হাবিল ছিল আল্লাহভীরু ও মু’মেন। সে সময় আল্লাহ তায়ালার হুকুমে জোড়া জোড়া সন্তান হতো। একজন পুত্র ও একজন কন্যা সন্তান। আল্লাহ তায়ালার বিধান মতো প্রথম জোড়ার পুত্রের সাথে দ্বিতীয় জোড়ার কন্যার বিয়ে বৈধ ছিল। কাবিল আল্লাহ তায়ালার বিধান মানতে রাজি ছিল না। সে চেয়েছিল তার জোড়ার সুন্দরী বোনকেই বিয়ে করবে। শেষ পর্যন্ত তাদেও দু’জনকে কোরবানি পেশ করার নির্দেশ দেয়া হলো। আর বলা হলো যার কোরবানি কবুল করা হবে সে-ই প্রথম জোরার সুন্দরী বড় বোনকে বিয়ে করবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে,‘(হে নবী!) আপনি এদের কাছে আদমের দুই সন্তানের গল্পটি যথাযথভাবে শুনিয়ে দিন; গল্পটি ছিলো, যখন তারা দু‘জনে আল্লাহর নামে কোরবানি পেশ করলো, তখন তাদের মধ্যে একজনের (হাবিলের) কাছ থেকে কোরবানি কবুল করা হলো, আর একজনের (কাবিলের) কোরবানি কিছুতেই কবুল করা হলো না, (যার কোরবানি কবুল করা হয়নি) সে বললো আমি অবশ্যই তোমাকে (যার কোরবানি কবুল করা হলো তাকে) হত্যা করবো, সে (যার কোরবানি কবুল করা হলো) বললো, আল্লাহ তায়ালা তো শুধু পরহেজগার লোকদের কাছ থেকেই কোরবানি কবুল করে থাকেন’(সূরা আল মায়েদা-৫-২৭)। আল্লাহ তায়ালার আইন অমান্য করার কারণেই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম হত্যাকাণ্ড ঘটায় পিতা- মাতার অবাধ্য সন্তান আল্লাহর দ্বীনের শত্র“, দুনিয়ায় শয়তানের প্রথম শিকার কাফের ‘কাবিল’। পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম আল্লাহর আইন, বিধান বা দ্বীন অমান্য করা আর মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটালো আল্লাহর দ্বীনের শত্র“ কাফের ‘কাবিল’। এটাই হচ্ছে নাস্তিক, কাফের ও শয়তানের কাজ, যা আল-কুরআনের সূরা আল মায়েদাসহ আরো কয়েকটি সূরায় উল্লেখ আছে। পৃথিবীতে কোরবানির ইতিহাস ও হত্যার ঘটনা এখান থেকেই শুরু হয়েছে। আজকে মুসলিম সমাজে কোরবানির যে প্রচলন তা মূলত মুসলিম মিল্লাতের বা জাতির পিতা হজরত ইব্রাহীম (আ.) এর দেখানো পথ বা সুন্নাত। হজরত ইব্রাহীম (আ.) এর শতবর্ষ বয়সের পর আল্লাহ তায়ালা তাঁকে যে সন্তান দান করেছিলেন, তিনি আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে তাঁর সে কলিজার টুকরা হজরত ইসমাইল (আ.) এর কোরবানির সূত্র ধরে আজও কোরবানি প্রচলিত আছে। হজরত ইব্রাহীম (আ.) এর কোরবানির সূত্রপাত : মুসলিম মিল্লাতের বা জাতির পিতা হজরত ইব্রাহীম (আ.) নমরুদ ও তার সাঙ্গো- পাঙ্গের অত্যাচারে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে তাঁর স্ত্রী হজরত সারাকে সাথে নিয়ে শাম দেশে হিজরত করলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানকার বাদশাহ ছিলো জালিম ও ভীষণ বদলোক। বাদশাহর লোকেরা হজরত ইব্রাহীম (আ.) ও তাঁর সুন্দরী স্ত্রী হজরত সারার আগমনের সংবাদ বাদশাহর দরবারে পৌঁছে দিলে বাদশাহ তাদেরকে ধরে নিয়ে আসতে বলে। বাদশাহর লোকেরা হজরত ইব্রাহীম (আ.) ও তাঁর স্ত্রী সারাকে বাদশাহর দরবারে হাজির করে। বাদশাহ হজরত ইব্রাহীম (আ.) এর কাছে জানতে চায় তার সাথে স্ত্রী লোকটি কে? ইব্রাহীম (আ.) চিন্তা করলেন, স্ত্রী বললে হয়তো বা তাঁকে মেরে ফেলতে পারে, তাই তিনি বলেন, সে আমার দ্বীনি বোন। বাদশাহ হজরত ইব্রাহীম (আ.) কে বন্দী করে, আর হজরত সারাকে বাদশাহর বদস্বভাব চরিতার্থ করার জন্যে রেখে দেয়। বাদশাহর কু-প্রস্তাবে হজরত সারা রাজি নাহলে বাদশাহ তাঁকে হত্যার হুমকি দেয়। অতঃপর হজরত সারা দু’রাকা’আত সালাত আদায় করার অনুমতি চাইলে বাদশাহ তাঁকে সালাত আদায়ের ব্যবস্থা করতে দেয়। হজরত সারা সালাত শেষে আল্লাহ দরবারে ফরিয়াদ করেনÑ যেন আল্লাহ তায়ালা তাঁর সতীত্ব রক্ষা করেন। এরই মধ্যে বাদশাহ অত্যন্ত অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়ে। অবস্থা খারাপ দেখে আর বাদশাহর মৃত্যুর জন্য তার লোকেরা হজরত সারাকে দায়ী করবে ভেবে হজরত সারা বাদশাহর সুস্থতার জন্য দোয়া করেন। একে একে তিন বার একই ঘটনা ঘটলে বাদশাহ হজরত সারার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। হজরত সারার সতীত্ব দেখে আর এক সতী নারী হজরত হাজেরাকে তাঁর দাসী হিসেবে দিয়ে তাঁদেরকে বিদায় করে দেয়। হজরত সারা ও হজরত ইব্রাহীম (আ.) মুক্ত হয়ে সে দেশে বসবাস শুরু করেন। হজরত সারা তাঁর দাসী হজরত হাজেরাকে হজরত ইব্রাহীম (আ.) এর সাথে বিয়ে দেন। কারণ হজরত সারার বয়স তখন ৯০ বছর আর হজরত ইব্রাহীম (আ.) এর বয়স তখন ১০০ বছর। তাদের বিয়ের দীর্ঘ সময় পার হলেও তখনো হজরত সারা মা হতে পারেননি। তিনি ভাবলেন শেষ বয়সে যদি আল্লাহ তায়ালা মেহেরবানি করে তাঁর স্বামী হজরত ইব্রাহীম (আ.) কে কোনো সন্তান দান করেন। আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানিতে এই হজরত হাজেরার গর্ভেই হজরত ইসমাইল (আ.)-এর জন্ম হয়। হজরত ইসমাইল (আ.) এর জন্মের পর হজরত ইব্রাহীম (আ.) তাঁর স্ত্রী হজরত হাজেরা ও কলিজার টুকরা ছেলেকে আল্লাহতায়ালা নির্দেশে কাবা ঘরের নিকটবর্তী সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের পাদদেশে নির্জন স্থানে সামান্য খেজুর ও এক মসক পানিসহ রেখে আসেন। হজরত ইব্রাহীম (আ.) যখন তাঁদের এ অবস্থায় রেখে স্থান ত্যাগ করছিলেন, তখন হজরত হাজেরা প্রশ্ন করছিলেন, আপনি আমাদের এ নির্জন স্থানে রেখে চলে যাচ্ছেন ? হজরত ইব্রাহীম (আ.) ক্ষীণকন্ঠে জবাব দিয়েছিলেন, হ্যাঁ। আবারো হজরত হাজেরা প্রশ্ন করলেন এটা কি আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ ? হজরত ইব্রাহীম (আ.) আবারও জবাব দিয়েছিলেন, হ্যাঁ। হজরত হাজেরা আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করে তাঁর শিশু সন্তানকে নিয়ে সেখানে অবস্থান করলেন। সে সময় কা’বা ঘরের তেমন কোনো চিহ্ন ছিলো না। কা’বা ঘরের ভিটিটি জমিন থেকে বেশ উঁচু ছিল। বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট বন্যায় চার পাশ ভেঙে গিয়েছিল। হজরত হাজেরা ও তাঁর সন্তানের খাদ্য ও পানীয় যখন শেষ হয়ে গেলো হাজেরা তখন খাদ্য ও পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। যখন নিরাশ হয়ে ফিরছিলেন তখন একটি আওয়াজ শুনতে পান। হাজেরা বলেন, কে আছো আমি তোমার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি সম্ভব হলে তুমি আমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে একটু সাহায্য করো। হঠাৎ তিনি তাঁর শিশু পুত্র ইসমাইল (আ.) এর কাছে একজন লোক (ফেরেশতা) দেখতে পেলেন। সে (ফেরেশতা) তাঁর পায়ের গোড়ালি অথবা ডানা দ্বারা জমিনে আঘাত করলে অথবা হজরত ইসমাইল (আ.) এর কান্নাজনিত পায়ের গোড়ালির ঘর্ষণে নিচ থেকে পানির ফোয়ারা প্রবাহিত হতে লাগল। এ সেই ফোয়ারা বা কূপ যা বর্তমানে জমজম নামে বিশ্ব মুসলিমের কাছে পরিচিত। সুপেয় পানীয় হিসেবে পান করে পরিতৃপ্ত হন মুসলমানরা। তাও কা‘বাকে কেন্দ্র করে ও হজরত ইসমাইল (আ.) এর উছিলায় আল্লাহ তায়ালার করুণায় সৃষ্টি হয়েছে। হাজেরা তাঁর মসক পূর্ণ করে নিলেন আর নিজেও তৃপ্তির সাথে পানি পান করলেন। এতে হজরত হাজেরার ক্ষুধা নিবারণ হল ও তাঁর শিশু পুত্রের জন্যে প্রয়োজনীয় দুধেরও ব্যবস্থা হলো। হজরত হাজেরার সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ক্রমাগত ৭ বার দৌড়াদৌড়ি করার কারণে সে ঘটনাকে কেন্দ্র করে আল্লাহ সোবহানাহু ওয়া তায়ালা হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের জন্যে সাফা মারওয়া পাহাড়ে ৭ বার দৌড়াদৌড়ি করার বিধান জারি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অবশ্যই ‘সাফা ও মারওয়া’ পাহাড় দুটো আল্লাহ তায়ালার নিদর্শন সমূহের অন্যতম, অতএব, যদি তোমাদের মধ্যে কোনো লোক হজ বা ওমরা আদায় করার এরাদা করে তার জন্যে এই উভয় পাহাড়ের মাঝে তাওয়াফ করা বা দৌড়ানো দোষের কিছু নেই, কেননা যদি কোনো ব্যক্তি অন্তরে নিষ্ঠার সাথে কোনো ভালো কাজ করে তাহলে তারা যেন জেনে রাখে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা কৃতজ্ঞতাপরায়ণ ও প্রভূত জ্ঞানের অধিকারী”(সূরা বাকারা-২-১৫৮)। হজরত ইসমাইল (আ.) এর যখন হাঁটা-চলা ও খেলাধুলা করার বয়স তখন হজরত ইব্রাহীম (আ.) কে স্বপ্নে আদেশ করা হলো, তুমি তোমার প্রিয় বস্তু আল্লাহর নামে কোরবানি করো। ইব্রাহীম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে ১০টি উট কোরবানি করলেন। পুনরায় তিনি আবারো একই স্বপ্ন দেখলেন। অতঃপর ইব্রাহীম (আ.) আবারো ১০০টি উট কোরবানি করলেন। আবারো তিনি একই স্বপ্ন দেখে ভাবলেন, আমার কাছেতো এ মুহূর্তে আমার কলিজার টুকরা প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.) ছাড়া আর তেমন কোনো প্রিয় বস্তু নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতঃপর আমি তাকে (হজরত ইব্রাহীম আ. কে) একজন ধৈর্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দান করলাম। সে যখন পিতার সাথে হাঁটা-চলার উপযোগী হলো, তিনি (ইব্রাহীম আ.) বললেন, হে আমার পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে কোরবানি করছি। সুতরাং তোমার মতামত কি? সে (হজরত ইসমাইল আ.) বললেন, হে আমার পিতা! আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা পালন করুন। আপনি আমাকে আল্লাহর মেহেরবানিতে ধৈর্যশীলদের একজন পাবেন। অতঃপর যখন তাঁরা দু‘জন একমত হলো আর আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার সামনে আত্মসমর্পণ করল এবং ইব্রাহীম (আ.) ইসমাইল (আ.) কে জবাই করার জন্যে কাত করে শুইয়ে দিলো; তখন আমি ইব্রাহীমকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইব্রাহীম, তুমি তোমার স্বপ্নকে সত্যে রূপ দিয়েছো। নিশ্চয়ই এটা ছিল ইব্রাহীম ও ইসমাইলের জন্যে একটা পরীক্ষা। অতঃপর আমি ইব্রাহীমকে দান করলাম একটি মহা কোরবানির পশু। অনাগত মানুষের জন্যে এ (কোরবানির) বিধান চালু রেখে, তাঁর স্মরণ আমি অব্যাহত রেখে দিলাম। শান্তি বর্ষিত হোক ইব্রাহীমের ওপর। আমি এভাবেই সৎপরায়ণ ব্যক্তিদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।’ (সূরা আস সফফাত-১০১-১০৯)। কোরবানির তাৎপর্য ও গুরুত্ব : হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, কতিপয় সাহাবা রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) কোরবানি কী? রাসূল (সা.) বললেন, কোরবানি মুসলিম মিল্লাতের বা জাতির পিতা ইব্রাহীম (আ.) এর সুন্নাত। তারা আবারো প্রশ্ন করলেন, এর মধ্যে আমাদের জন্যে কি আছে? রাসূল (সা.) বললেন, কোরবানির পশুর প্রতিটা পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি আছে। তারা বললেন, ভেড়ারতো অসংখ্য পশম আছে। রাসূল (সা.) বললেন, ভেড়ার প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি দেয়া হবে, যদি তা খালেস নিয়তে কোরবানি করা হয়’(ইবনে মাজাহ)। আবু দাউদ শরীফের এক হাদিসে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে মর্যাদার দিন হচ্ছে কোরবানির দিন। কোরবানির শিক্ষা : কোরবানি কোনো চাপ বা জবরদস্তি বিষয় নয়। মানুষ স্বেচ্চায় তার প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় সবচাইতে প্রিয় বস্তু ত্যাগ করার মানসিকতা সৃষ্টি করে। যেমন হজরত ইব্রাহীম (আ.) শুধু মাত্র স্বপ্নে দেখেছেন, তোমার প্রিয় বস্তু আল্লাহর রাহে কোরবানি করো। আর অমনি তিনি তাঁর আদরের একমাত্র সন্তান হজরত ইসমাইল (আ.)কে কোরবানির জন্যে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত ছিলেন। পৃথিবীতে মানুষের কাছে সবচাইতে আকর্ষণীয় বস্তুর মধ্যে অর্থ-সম্পদ বা টাকা-কড়ি আর সন্তান অন্যতম। এই অর্থ-সম্পদের মোহ ত্যাগের এ মানসিকতা সৃষ্টি করাই হচ্ছে কোরবানির শিক্ষা। কোরবানি আমাদের ঈমান ও তাকওয়া বৃদ্ধি করে ও পরকালের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে। রাসূল (সা.) নির্দেশ করেছেন, হে লোকসকল তোমরা ত্র“টিমুক্ত ও উত্তম প্রাণি কোরবানি করো, কারণ কোরবানির এ পশুগুলো হবে তোমাদের জান্নাতে যাওয়ার বাহন’(বায়হাকি)। কোরবানি সচ্ছল সব মুসলমানের ওপর ওয়াজিব। কোরবানির গোশতের ওপর আত্মীয়-স্বজন, পাড়া- প্রতিবেশী, গরিব-মিসকিন ও মুসাফিরের হক আছে। খেয়াল রাখতে হবে সমাজের কোনো একজন ব্যক্তিও যেন কোরবানির গোশত থেকে বঞ্চিত না হয়। কিন্ত কোরবানির চামড়া শুধু মাত্র জাকাতের হকদারদেরই হক। কোরবানির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ : আমাদের সমাজে উট, গরু, মহিষ এ ধরনের পশু ৭ ভাগে কোরবানি করা হয়। এক্ষেত্রে সমমনা ও সম- আর্থিক সঙ্গতি সম্পন্ন লোকদেরই একত্রে কোরবানি করা উচিত। অনেকেই আবার কোরবানির পশুতে আকিকার জন্যে এক ভাগ বা দুই ভাগ রাখেন। এতে আকিকা সহিহ হবে না। আকিকার জন্যে ছেলে হলে দু‘টি ভেড়া বা বকরি আর মেয়ে হলে একটি ভেড়া বা বকরি নির্ধারণ করতে হবে। আর মনে রাখতে হবে কোরবানির সাথে আকিকার কোনো সম্পর্ক নেই। কোরবানি ঈদুল আজহার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও ধনীর জন্যে এটা আনন্দ আর গরিবের জন্য স্বস্তির।

2918 views Answered

কোরবানীর শুরু ইতিহাস: যখন আদম ও হাওয়া পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন এবং তাদের সন্তান প্রজনন ও বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়েছিল, তখন মা হাওয়া এর প্রতি গর্ভ থেকে জোড়া জোড়া (জময) অর্থাৎ একসাথে একটি পুত্র ও একটি কন্যা এরূপ জময সন্তান জন্মগ্রহণ করত। কেবল শীস আ. ব্যতীত। কারণ, তিঁনি একা ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। তখন ভাই-বোন ছাড়া আদম এর আর কোন সন্তান ছিল না। অথচ ভাই-বোন পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। তাই আল্লা সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা উপস্থিত প্রয়োজনের খাতিরে আদম এর শরীয়তে বিশেষভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হবে। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্মগ্রহনকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারীনি কন্যা সহোদর বোন হিসেবে গণ্য হবে না। তাদের মধ্যে পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ। সুতরাং সে সময় আদম একটি জোড়ার মেয়ের সাথে অন্য জোড়ার ছেলের বিয়ে দিতেন। ঘটনাক্রমে কাবীলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিল সে ছিল পরমা সুন্দরী। তার নাম ছিল আকলিমা। কিন্তু হাবিলের সাথে যে সহোদরা জন্ম নিয়েছিল সে দেখতে অতটা সুন্দরী ছিল না। সে ছিল কুতসিত ও কদাকার। তার নাম ছিল লিওযা। বিবাহের সময় হলে শরিয়তের নিয়মানুযায়ী হাবীলের সহোদরা কুশ্রী বোন কাবীলের ভাগে পড়ল। ফলে আদম তৎকালীন শরীয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবীলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন এবং তাকে তার নির্দেশ মানতে বললেন। কিন্তু সে মানল না। এবার তিনি তাকে বকাঝকা করলেন। তবুও সে ঐ বকাঝকায় কান দিল না। অবশেষে আদম তার এ দুই সন্তান হাবীল ও কাবীলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমরা উভয়ে আল্লার উদ্দেশ্যে কুরবানী পেশ কর, যার কুরবানী গৃহীত হবে, তার সাথেই আকলিমার বিয়ে দেয়া হবে।” সে সময় কুরবানী গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা (বর্জপাত) এসে সে কুরবানীকে ভষ্মীভূত করে ফেলত। আর যার কুরবানী কবূল হতো না তারটা পড়ে থকত। যাহোক, তাদের কুরবানীর পদ্ধতি সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো- কাবীল ছিল চাষী। তাই তিনি গমের শীষ থেকে ভাল ভাল মালগুলো বের করে নিয়ে খারাপ মালগুলোর একটি আটি কুরবানীর জন্য পেশ করল। আর হাবীল ছিল পশুপালনকারী। তাই সে তার জন্তুর মধ্যে থেকে সবচেয়ে সেরা একটি দুম্বা কুরবানীর জন্য পেশ করল। এরপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হাবীলের কুরবানীটি ভষ্মীভুত করে দিল। {ফতহুল ক্বাদীরের বর্ণনায় পাওয়া যায়।} আর কাবীলের কুরবানী যথাস্থানেই পড়ে থাকল। অর্থাৎ হাবীলেরটি গৃহীত হলো আর কাবীলেরটি হলো না। কিন্তু কাবীল এ আসমানী সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারল না। এ অকৃতকার্যতায় কাবীলের দুঃখ ও ক্ষোভ আরো বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না এবং প্রকাশ্যে তার ভাইকে বলল, ‘আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। হাবিল তখন ক্রোধের জবাবে ক্রোধ প্রদর্শন না করে একটি মার্জিত ও নীতিগত বাক্য উচ্চারণ করল, এতে কাবীলের প্রতি তার সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা ফুটে উঠেছিল। হাবীল বলেছিল, ‘তিনি মুত্তাক্বীর কর্মই গ্রহণ করেন। সুতরাং তুমি তাক্বওয়ার কর্মই গ্রহণ করো। তুমি তাক্বওয়া অবলম্বন করলে তোমার কুরবানীও গৃহীত হতো। তুমি তা করোনি, তাই তোমার কুরবানী প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এতে আমার দোষ কোথায়? তবুও এক পর্যায়ে কাবীল হাবীল কে হত্যা করে ফেলল। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হাবীল ও কাবীল কর্তৃক সম্পাদিত কোরবানীর এ ঘটনা থেকেই মূলত কোরবানীর ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে। আমাদের মধ্যে অনেকেই জানিনা কোরবানির শুরুর আসল রহস্য। আমরা শুধু ইব্রাহিম আ. এর কোরবানিকেই অনুসরণ করে চলছি। কিন্তু ইব্রাহিম আ. এর পুত্র স্থলে দুম্বা কেন কোরবানী হলো এটাও বিশাল রহস্য। এই গুপ্ত রহস্যের ভেদ জানাও প্রতিটি মুসলমানেরই কর্তব্য। কোরবানী (ত্যাগ) বলতে যে শুধু পশু কোরবানীর মধ্যেই সিমীত নয় উক্ত ঘটনাটি পর্যবেক্ষন করলেই বুঝা যায়। কোরবানীর পশুটির সাথে যদি মনের পশুটিকেও জবাই করা হয় তবে কতই না উত্তম হয়। আমি মনে করি আসল কোরবানী নিজের অন্তরের সাথে মিশে থাকা মিথ্যা, কাম, ক্রোধ, লোভ, লালসা যদি ত্যাগ করা যায় সেটাই হবে উত্তম ত্যাগ বা কোরবানী মানব সমাজের জন্য। এই মিথ্যা, কাম, ক্রোধ, লোভ, লালসা কোরবানীকারী (ত্যাগকারী) মানুষটির কাছে অন্য মানুষ নিরাপদ। সমাজ সংসার থেকে হিংসা বিদ্ধেষ শেষ হয়ে যাবে এই সব যদি কোরবানী করা যায়।

2918 views Answered

Related Questions

Next steps