মুক্তিযোদ্ধা কোটা গুলি সম্পর্কে আপনি ঠিক কতটা জানেন....?
আমার দাদা মুক্তিযোদ্ধা...
আমি এবার ভার্সিটি পরীক্ষা দিব...
আমার এই কোটা টা কতটা উপকারে আসবে এবং কিভাবে তা ব্যবহার করতে হবে...???
আমার কাছে প্রমান সরুপ কি কি রাখতে হবে...???
আরও অনেক প্রশ্ন আছে....
আপনি যদি খুব ভালো জেনে থাকেন এই বিষয়ে তাহলে প্লিজ আপনার নাম্বারটা দিবেন...
আমি আপনার সাথে কথা বলে সব প্রশ্ন গুলোর উত্তর নিয়ে নেব।
1 Answers
কোটা নিয়ে প্রথম আলোয় আমি লিখি ২০১০ সালে। লেখার শিরোনাম ছিল কোটা (৫৫) বনাম মেধা (৪৫)। এই লেখার আগে আমার শ্রদ্ধেয় একজন আইনজীবীর সঙ্গে এ বিষয়ে ছোটখাটো একটা মতৈক্য হয়। কোটা নিয়ে আমি লিখব, এরপর বিদ্যমান কোটাব্যবস্থার কিছু অংশ সংবিধানবিরোধী—এই যুক্তিতে তিনি তা বাতিলের জন্য হাইকোর্টে মামলা করবেন, মোটামুটি এই স্থির করি আমরা।
আমার লেখা ছাপা হলো, প্রথম আলোর অনলাইনে বিপুলসংখ্যক পাঠকের সমর্থনও পাওয়া গেল। কিন্তু এরপর আর আমার শ্রদ্ধেয় আইনজীবী মামলা করতে রাজি না। তিনি সমাজে খুবই প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিত। তার পরও মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংবিধানবিরোধী, এটি বললে তাঁকে জামায়াত-শিবির ভাবা হতে পারে, এই ভয় গ্রাস করে তাঁকে। তখন ততটা বুঝিনি। এখন মনে হচ্ছে, তাঁর ভয় ভুল ছিল না। কোটা বাতিলের সাম্প্রতিক আন্দোলনকারীদের আসলেও ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছে জামায়াত-শিবির হিসেবে।
কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন তাই বলে অযৌক্তিক হয়ে যায়নি। কোটাধারীদের সুবিধার জন্য এবার চরম বৈষম্যমূলকভাবে দেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষাতেই গণহারে বাতিল করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে সংগত কারণে ফুঁসে উঠেছে সাধারণ ছাত্ররা। শাহবাগে তাদের জমায়েত দেশের বহু মানুষের সহানুভূতি অর্জন করেছে। এই আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্তভাবে চলতে থাকলে সারা দেশে তা ছড়িয়ে পড়ত, পড়তে শুরুও করেছিল। সিটি করপোরেশনগুলোতে শোচনীয় পরাজয়ের পর সরকারের জন্য তাতে নতুন বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারত। আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনেই পুলিশ আর ছাত্রলীগ একসঙ্গে লাঠিপেটা করে আন্দোলনকারীদের শায়েস্তা করেছে। আগের রাতে হলে হলে গিয়ে সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলনে অংশ নিলে পিটিয়ে হলছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সরকারের দমননীতির অনিবার্য হাতিয়ার হিসেবে অবশেষে এই আন্দোলনের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন মেধাবী ছাত্র।
সরকারের দমননীতি ও কোটাকেন্দ্রিক বৈষম্যকে যৌক্তিকতা প্রদানের জন্য কোটা বাতিলের আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইতিপূর্বে শেয়ারবাজারের লুটপাট, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি কিংবা ভারতের প্রতি নতজানুমূলক আচরণসহ সরকারের বিভিন্ন অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদেরও একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার অপচেষ্টা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এমন সুবিধাবাদী ব্যাখ্যা বহু বছর ধরে চলছে সমাজে। অথচ নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদই বরং মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা। ঢালাও কোটার নামে অনাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ।
দুই
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান চেতনা ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য ও অবিচার মেনে না নেওয়া। ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বৈষম্যের অনেকটা ফয়সালা আমরা অর্জন করতে পেরেছিলাম পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যে। কিন্তু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য এর পরও বেড়েছে দিন দিন। এই বৈষম্যের সবচেয়ে উৎকট প্রকাশ ঘটত উন্নয়ন বাজেট ও সরকারি চাকরিতে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্যে। বাঙালিদের মেধা থাকা সত্ত্বেও সরকারি চাকরিতে অধিকাংশ নিয়োগ দেওয়া হতো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। ছয় দফার আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি স্তরে এসব তথ্য-উপাত্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ক্ষোভকে সংগঠিত করতে বিরাট ভূমিকা রেখেছে।
বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে প্রণীত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে আমরা তাই বৈষম্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান লক্ষ করি। ১৯৭২ সালের সংবিধানে অন্তত ছয়টি বিধানে সমতা ও বৈষম্যহীনতা প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা আছে। সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা, ২৮ অনুচ্ছেদে বৈষম্যহীনতা এবং ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে সব নাগরিকের সুযোগের সমতার কথা বলা আছে। অবশ্য ২৮ অনুচ্ছেদে নারী, শিশু ও ‘নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির’ জন্য এবং ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে ‘নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর’ অংশের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন করার কথা বলা হয়েছে।
১৯৭২ সালের সংবিধান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সবচেয়ে অকাট্য দলিল। এই দলিল অনুসারে নারী কিংবা সমাজের অনগ্রসর শ্রেণী হিসেবে ‘উপজাতিদের’ জন্য একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় কোটা থাকতে পারে। কিন্তু সেটি তত দিনই থাকা সংগত, যত দিন সরকারি চাকরিতে তাঁদের ‘উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব’ নিশ্চিত না হয়। আবার সংবিধানের ২৯(৩) অনুচ্ছেদ নাগরিকদের ‘অনগ্রসর অংশের’ জন্য চাকরিতে বিশেষ কোটা প্রদান অনুমোদন করেছে, ‘অনগ্রসর অঞ্চলের’ জন্য নয়। ফলে জেলা কোটার সাংবিধানিক ভিত্তি সন্দেহজনক।
১৯৭২ সালের সংবিধানে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা সম্পর্কে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কিছু বলা নেই।