4 Answers
বিশ্বায়নের এ যুগে প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে উচ্চ ভলিউমে গান শোনা, ফোনে একটানা দীর্ঘ সময় কথা বলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট, হাইড্রোলিক হর্নের ব্যাপকতা, মিছিল- মিটিংয়ের নামে মাইক্রোফোনের যথেচ্ছ ব্যবহার আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; এটি কানে সামান্য কম শোনা থেকে শুরু করে স্থায়ী বধিরতার কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের প্রয় ১১০ কোটি যুবক-যুবতী শ্রবণশক্তি বিনষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সের প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ লোক মারাত্মক বধিরতায় আক্রান্ত। স্বল্পোন্নত ও উন্নত বিশ্বের ১২ থেকে ৩৫ বছর বয়সের জনগণের শতকরা প্রায় ৫০ ভাগই তাদের ব্যক্তিগত গান শোনার যন্ত্রে (এমপিথ্রি প্লেয়ার, স্মার্টফোন) অনিরাপদ মাত্রার শব্দ শুনে থাকে। এই যুবাদের শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ কনসার্ট, খেলার মাঠ, বার, নাইট ক্লাবে ক্ষতিকর মাত্রার উচ্চ শব্দযুক্ত কোলাহলপূর্ণ স্থানে সময় কাটায়। যা কানে কম শোনা বা বধিরতার অন্যতম কারণ। সুতরাং এমন কোনো গান এবং এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা পৃথিবীর যাবতীয় মধুর শব্দ শোনা থেকে আমাদের বঞ্চিত করে। বধিরতা রোধের উপায় উচ্চ ভলিউমে গান শোনা থেকে বিরত থাকা : দীর্ঘ সময় উচ্চ ভলিউমে গান শোনা শ্রবণশক্তি কমিয়ে দেয়। হেডফোনে গান শোনার সময় বিরতি দিয়ে এবং ভলিউম কমিয়ে গান শোনা উচিত। কোলাহলপূর্ণ (উচ্চ শব্দযুক্ত) স্থানে দীর্ঘ সময় না থাকা : এক হাত ব্যবধানে বসা দু’জন ব্যক্তির কথোপকথনের সময় যদি স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চস্বরে বা জোরে কথা বলতে হয় তখনই বুঝতে হবে ওই স্থান কোলাহলপূর্ণ বা শব্দ মাত্রাতিরিক্ত। ওই স্থান ত্যাগ করার পরও যদি আপনার কানে শোঁ শোঁ শব্দ অনুভূত হয় অথবা কানে কম শোনেন তখন বুঝতে হবে ওই স্থানটি মাত্রাতিরিক্ত কোলাহলপূর্ণ। বধিরতার সতর্ক সংকেত সম্পর্কে সচেতন থাকা : বধিরতার সতর্ক সংকেত হল- কোলাহলপূর্ণ স্থান ত্যাগের পর কানে শোঁ শোঁ শব্দ হওয়া, জোরালো শব্দ কম শোনা, ফোনে কথা শুনতে অসুবিধা হওয়া। এর যে কোনোটি থাকলে অতি শিগগির নাক- কান-গলা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সম্পর্কে সচেতন থাকা : নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ কানের জন্য ক্ষতিকর। এই ওষুধ ব্যবহারে অন্তঃকর্ণের কিছু সংবেদনশীল অংশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়। এ ধরনের ওষুধ হল- Gentamycin, Streptomycin, Frusemide, Chloroquine এবং Aspirin। এসব ওষুধ অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত। নিয়মিত শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করা : কেউ যদি নিয়মিত উচ্চ শব্দ বা কোলাহলপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করেন তাহলে অবশ্যই তার কানের বার্ষিক পরীক্ষা করানো উচিত। লেখক : নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ও সার্জন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সুত্র: যুগান্তর
কানে শোনা একটি ইন্দ্রিয় অনুভূতির বিষয়, যা নির্ভর করে কানের সম্পূর্ণ অঙ্গ, শ্রবণ স্নায়ু ও মস্তিষ্কের কার্যকর ও নীরোগ অবস্থার ওপর। কানে কম শোনাকে বলা হয় শ্রুতিক্ষীণতা বা বধিরতা।
শ্রুতিক্ষীণতা বা বধিরতার ধরন
শ্রুতিক্ষীণতাকে চার ভাগে ভাগ করা যায়।
* কনডাকটিভ বা পরিবহনজনিত
* সেনসরিনিউরাল বা স্নায়ুজনিত
* মিশ্র
* সাইকোজেনিক বা মানসিক
কারণ
বহিঃকর্ণ ও মধ্যকর্ণের অসুখ সাধারণত কনডাকটিভ ডেফনেস বা পরিবহনজনিত শ্রুতিক্ষীণতা সৃষ্টি করে। অন্তঃকর্ণ, অডিটরি নার্ভ বা শ্রবণ স্নায়ু ও মস্তিষ্কের অসুখ সেনসরিনিউরাল বা স্নায়ুজনিত শ্রুতিক্ষীণতা সৃষ্টি করে। এই দুই ধরনের মিশ্রণের ফলে যে শ্রুতিক্ষীণতা হয়, তাকে মিশ্র শ্রুতিক্ষীণতা বলে। আর সাইকোজেনিক না মনোরোগজনিত বধিরতায় কান, শ্রবণ স্নায়ু ও মস্তিষ্কের কোনো আঙ্গিক ত্রুটি থাকে না।
পরিবহনজনিত শ্রুতিক্ষীণতা
* জন্মগত কারণে বহিঃকর্ণের শ্রবণ পথ না থাকা বা খুব চিকন থাকা বা মধ্যকর্ণের অস্থি স্বাভাবিক না থাকা।
* কানে ময়লা জমা ও বহিঃকর্ণে কোনো বস্তু আটকে যাওয়া।
* বহিঃকর্ণের প্রদাহ।
* অটোমাইকোসিস (ফাংগাল প্রদাহ)।
* বহিঃকর্ণের শ্রবণপথ আঘাতজনিত, বহিঃকর্ণের টিউমার, কানের হাড়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে সরু হলে।
* মধ্যকর্ণের প্রদাহ ও মধ্যকর্ণে পানি বা রক্ত জমা হওয়া।
* কানের পর্দা কোনো কারণে ফেটে গেলে।
* মধ্যকর্ণের অস্থিগুলোর মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে বা নড়ে গেলে।
* মধ্যকর্ণের অস্থির নড়াচড়া কোনো কারণে কমে গেলে
* মধ্যকর্ণের টিউমার।
স্নায়ুজনিত শ্রুতিক্ষীণতা
চিকিৎসাঃ
বধিরতার লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু করা দরকার।
প্রথমত যে কারণে বধিরতা সৃষ্টি হয়েছে, সেই রোগের চিকিৎসা করা বা কারণ দূর করা। যেমন :
* ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে বধিরতা হলে ওষুধ বদলে বা বন্ধ করে দিতে হবে।
* শব্দদূষণের জন্য বধিরতা হলে তীব্র শব্দ থেকে দূরে থাকতে হবে।
* কানে ময়লা জমার কারণে বধিরতা হলে কান পরিষ্কার করে নিতে হবে।
* মধ্যকর্ণে আঠালো পদার্থ জমলে মাইরিংগোটমি ও গ্রোমেট টিউব লাগাতে হবে।
* অটোস্ক্লোরোসিস হলে স্টেপিডেক্টমি নামের শল্যচিকিৎসা করা যেতে পারে।
* কিছু ক্ষেত্রে টিম্প্যানোপ্লাস্টি করতে হতে পারে।
অনেক বধিরতাই চিকিৎসা করে ভালো করা যায় না, বিশেষ করে জন্মগত কারণে যেসব বধিরতা হয়। সাধারণভাবে যখন কোনো বধিরতা ওষুধে চিকিৎসা বা শল্য চিকিৎসায় ভালো হওয়ার সুযোগ থাকে না, তখন হিয়ারিং এইড ব্যবহার করা যেতে পারে।
মারাত্মক বা সম্পূর্ণ বধির যাদের হিয়ারিং এইড দিয়েও কানে শোনানো যায় না, তাদের 'ককলিয়ার ইমপ্লান্ট' সার্জারি করা যেতে পারে।
সুত্রঃ কানে কম শোনেন? | ডাক্তার আছেন | কালের কণ্ঠ | kalerkantho
কারণঃ ভেতরের দিকে একটিকানের পর্দার মতো থাকে, যা টিমপ্যানিক মেমব্রেন নামে পরিচিত। মধ্যকর্ণ থেকে অন্তঃকর্ণের মাঝখানে এটি পর্দার হিসেবে থাকে। এটি খুবই স্পর্শকাতর, শব্দতরঙ্গ কানের পর্দায় কম্পন তৈরি করে। এই কম্পন মধ্যকর্ণের ছোট ছোট হাড়ের মাধ্যমে অন্তঃকর্ণে পৌঁছায়। অতঃপর অন্তঃকর্ণ থেকে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। এভাবে আমরা শুনতে পাই। কিন্তু বহু কারণে এই পর্দা ফেটে যেতে পারে, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ছিঁড়ে যেতে পারে। এতে শুনতে অসুবিধা হয়, কখনো কখনো শ্রবণশক্তি পুরোপুরি লোপ পায়। কানের পর্দা ফেটে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মধ্যকর্ণে ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। পর্দা ফাটার কারণ কানের পর্দা বিভিন্ন কারণে ফাটতে পারে বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যেমন- * কানের কোনো অসুখ যেমন- মধ্যকর্ণে ক্রনিক সাপোরেটিভ অটাইটিস মিডিয়া হলে * কোনো কিছু দিয়ে কান খোঁচালে। যেমন-কটক বাড * কানে কোনো কিছু প্রবেশ করলে এবং অদক্ষ হাতে তা বের করার চেষ্টা করলে * দুর্ঘটনা বা আঘাতে কান ক্ষতিগ্রস্ত হলে * হঠাৎ কানে বাতাসের চাপ বেড়ে গেলে। যেমন-থাপ্পড় মারা, বোমা বিস্ফোরণ, অতি উচ্চ শব্দের শব্দ ইত্যাদি কারণে * পানিতে ডাইভিং বা সাঁতার কাটার সময় হঠাৎ পানির বাড়তি চাপের কারণে পর্দায় চাপ পড়লে * কানের অন্য অপারেশনের সময়ও কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হলে * যাদের কানের পর্দা আগে থেকেই দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের ক্ষেত্রে নাক চেপে কানে বাতাস দিয়ে চাপ দিলে। চিকিৎসাঃ অনেকেই কানে কোনো সমস্যা হলে নিজেরাই কানের ড্রপ ব্যবহার করে, যা উচিত নয়। কানের পর্দা ফেটে গেলে অবশ্যই একজন নাক-কান-গলা রোগ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরামর্শ নেওয়া উচিত। যাদের কানে আগে থেকেই কোনো সমস্যা আছে বা কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার ইতিহাস আছে, তাদের নিচের পরামর্শগুলো মেনে চলা উচিত। * কানে কোনোভাবেই যেন পানি প্রবেশ না করে এ জন্য গোসলের সময় কানে তুলা বা ইয়ার প্লাগ ব্যবহার করা * সাঁতার না কাটা * উড়োজাহাজে ভ্রমণ এড়িয়ে চলা * উচ্চ শব্দে গান না শোনা, হেড ফোন ব্যবহার না করা * কানে যাতে কোনো ইনফেকশন না হয়, এ জন্য কানো কোনো অসুবিধা হওয়ামাত্র ডাক্তার দেখিয়ে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা * কান না খোঁচানো * নিজে নিজে কোনো ওষুধ দেওয়া থেকে বিরত থাকা * কানে কোনো কিছু গেলে বা আটকে থাকলে নিজে তা বের করার চেষ্টা না করা। কানের পর্দার ছিদ্র যদি ছোট হয় বা অল্প একটু ফেটে যায়, তাহলে কয়েক সপ্তাহ পর আপনা আপনি তা ঠিক হয়ে যায়। অনেক সময় কানে ইনফেকশন সন্দেহ করা হলে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হয়, কানে অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ দিতে হয়। যদি তিন মাসের মধ্যেও ক্ষতিগ্রস্ত পর্দা ঠিক না হয়, সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনে অপারেশনের মাধ্যমে কানের পর্দা ঠিক করা যায়।
বধিরতার লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু করা দরকার। প্রথমত যে কারণে বধিরতা সৃষ্টি হয়েছে, সেই রোগের চিকিৎসা করা বা কারণ দূর করা। যেমন : * ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে বধিরতা হলে ওষুধ বদলে বা বন্ধ করে দিতে হবে। * শব্দদূষণের জন্য বধিরতা হলে তীব্র শব্দ থেকে দূরে থাকতে হবে। * কানে ময়লা জমার কারণে বধিরতা হলে কান পরিষ্কার করে নিতে হবে। * মধ্যকর্ণে আঠালো পদার্থ জমলে মাইরিংগোটমি ও গ্রোমেট টিউব লাগাতে হবে। * অটোস্ক্লোরোসিস হলে স্টেপিডেক্টমি নামের শল্যচিকিৎসা করা যেতে পারে। * কিছু ক্ষেত্রে টিম্প্যানোপ্লাস্টি করতে হতে পারে। অনেক বধিরতাই চিকিৎসা করে ভালো করা যায় না, বিশেষ করে জন্মগত কারণে যেসব বধিরতা হয়। সাধারণভাবে যখন কোনো বধিরতা ওষুধে চিকিৎসা বা শল্য চিকিৎসায় ভালো হওয়ার সুযোগ থাকে না, তখন হিয়ারিং এইড ব্যবহার করা যেতে পারে। মারাত্মক বা সম্পূর্ণ বধির যাদের হিয়ারিং এইড দিয়েও কানে শোনানো যায় না, তাদের 'ককলিয়ার ইমপ্লান্ট' সার্জারি করা যেতে পারে। যদি শিশুদের শ্রবণশক্তি হারানোর কারণ নির্ণয়ে দেরি হয় এবং যথাসময়ে চিকিৎসা করা না হয়, তাহলে শিশুর কথা বলার ক্ষমতা, জানার ক্ষমতা, ভাষার দক্ষতা ও মানসিক বিকাশের ক্ষমতা অনেক কমে যায়। ফলে স্কুলে, সামাজিক জীবনে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্ব পেয়ে বসে। সে জন্য জন্মের পরপরই শ্রুতিজনিত ত্রুটি নির্ণয় এবং এর প্রতিকার ও চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের জন্মের পর শোনার ক্ষমতা নির্ণয় করার জন্য প্রত্যেক শিশুকেই প্রাথমিকভাবে কিছু কিছু পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে দেখা উচিত। যেসব শিশু জন্ম থেকে শ্রবণ সমস্যায় ভোগে, তাদের কথা শেখার আগেই অর্থাৎ জন্মের ছয় মাসের মধ্যে তা নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারলে এরা অন্য স্বাভাবিক শিশুর মতোই বেড়ে উঠবে। এড়ানো যাবে অনেক জটিলতা।