তোমরা চাদ দেখে রোজা রাখ এবং চাদ দেখে তা ভঙ্গ কর। (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/১৯৭০)
আর সারা বিশ্বে একই সময়ে চাদ দেখা যাওয়া অসম্ভব।
বর্তমানে বেশকিছু এলাকা ছিয়াম পালন করে সঊদী আরবে উদিত চাঁদের অনুসরণে। আমাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলেও অনেক আগে থেকে কিছু কিছু গ্রামে সঊদী আরবকে অনুসরণ করা হচ্ছে!
এখন প্রশ্ন হ’ল, শরীআতে এমন কোন ইঙ্গিত কি রয়েছে যে, সঊদী আরবের চাঁদই সারাবিশ্বের জন্য মানদন্ড হবে? তাহলে কিসের ভিত্তিতে সঊদী আরবকে মানদন্ড হিসাবে গ্রহণ করা হল?
‘চাঁদ দেখে ছিয়াম রাখ, চাঁদ দেখে ছিয়াম ছাড়’ হাদীছটির দূরবর্তী ব্যাখ্যা দাঁড় করালেও তো সঊদী আরব নয়; বরং সর্বপশ্চিমের ভূখন্ড আমেরিকার আলাস্কা প্রদেশকে অনুসরণ করতে হয়।
সর্বোপরি ইসলাম একটি সহজ-সরল এবং মধ্যপন্থি ধর্ম। সর্বযুগে সর্বাবস্থায় এর বিধান সমানভাবে কার্যকর। বর্তমানে স্যাটেলাইটের যুগ আসার কারণে একই দিনে একই সময়ে ছিয়াম ও ঈদ পালনের কথাটি জোরেশোরে উঠছে। কিন্তু একশত বছর পূর্বেও যখন স্যাটেলাইট ছিল না, তখনকার অনারব মুসলিম সমাজ কি তাহ’লে ছিয়াম নিষিদ্ধের দিন তথা ঈদের দিনে ছিয়াম রাখতে বাধ্য হয়েছিল কেবলমাত্র প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবে? স্বাভাবিক যুক্তিবোধ কি এটা কোনক্রমে সায় দেয়? এমনকি আধুনিক স্যাটেলাইটের যুগেও কি সর্বত্র সঠিক সময়ে সংবাদ পাওয়া সম্ভব? এর সাথে জড়িত সমস্যাগুলো চিন্তা করলে আদৌ সম্ভব নয়। যেমন-
আমেরিকায় [GMT -6] চাঁদ উঠেছে কি না তা জানতে কোরিয়ার [GMT +9] মুসলমানদের অপেক্ষা করতে হবে অন্ততঃ ১৫ ঘণ্টা। অর্থাৎ আমেরিকায় সন্ধ্যা ৬-টায় উদিত হওয়া চাঁদের সংবাদ কোরিয়ার মুসলমানরা পাবে স্থানীয় সময় পরদিন দুপুর ১১টায়। এমতাবস্থায় তারা ‘একই দিনে ছিয়াম ও ঈদ’ উদযাপনের মূলনীতি অনুসারে উক্ত ছিয়ামটি আদায় করবে কিভাবে, আর কিভাবেই বা সেদিনের তারাবীহ পড়বে?
আরও পূর্বের দেশ নিউজিল্যান্ডের সাথে আমেরিকার সর্বপশ্চিম তথা আলাস্কার সময়ের পার্থক্য প্রায় ২৪ ঘণ্টা। তাহ’লে আমেরিকার চাঁদ ওঠার খবর নিউজিল্যান্ডবাসী পাবে পরদিন রাতে। তাহলে তাদের উপায় কি হবে? তারাকি প্রতি বছর একটি সিয়াম রাখা হতে বঞ্চিত হবে না?
এমনকি বাংলাদেশেও আমেরিকার চাঁদ উঠার সংবাদ জানতে অপেক্ষা করতে হবে পরদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত। অর্থাৎ সেই একই ঘটনা! অর্থাৎ আমরা বাংলাবাসীরাও সেদিনের ছিয়ামও পাবে না, তারাবীহও পাবে না!
আবার, ধরা যাক বাংলাদেশের চট্টগ্রামে সাহারীর ৫ মিনিট পূর্বে খবর আসল যে, আমেরিকায় চাঁদ উঠেছে। এমতাবস্থায় চট্টগ্রামবাসী কোনক্রমে হয়ত সাহারী সম্পন্ন করল, কিন্তু রাজশাহীবাসী যাদের ব্যবধান চট্টগ্রাম থেকে ১৩ মিনিট তারা কি করবে?
একই দেশে অবস্থান করেও তারা আর ছিয়াম রাখতে পারবে না, কেননা ততক্ষণে সাহরির সময় শেষ সেখানে! তাহলে একই দেশে কিছু লোক ছিয়াম রাখবে, কিছু লোক রাখবে না-ভাবুন তো কেমন বিদঘুটে অবস্থা তৈরী হবে?
আর যুক্তিভিত্তিক কথা হলো, আমরা জানি যে ভূপৃষ্ঠের পশ্চিম প্রান্তের আগে পূর্ব প্রান্তে প্রভাতরেখা উদিত হয়। সুতরাং প্রাচ্যের আকাশে প্রভাতরেখা উদিত হলেই কি আমরা পশ্চিম প্রান্তের মানুষ সাহারী ছেড়ে দেব, অথচ পশ্চিমে এখনও রাত অবশিষ্ট আছে? এর উত্তর হ’ল, না।
তেমনিভাবে প্রাচ্যের আকাশে যখন সূর্য অস্তগামী হয়, তখন কি আমরা ইফতার করা শুরু করব, অথচ আমরা তখনও দিবাভাগেই রয়েছি? এর উত্তর হ’ল, না। সুতরাং হুকুমের ক্ষেত্রে চাঁদ ও সূর্য সম্পূর্ণ একই। চন্দ্রের হিসাব হয় মাসিক, আর সূর্যের হিসাব হয় দৈনিক।
অতএব যুক্তি ও দলীলের নিরীখে ছিয়াম ও ইফতারের ক্ষেত্রে প্রত্যেক স্থানের জন্য আলাদা বিধান হবে। যার সম্পর্ক হবে বাহ্যিক আলামত বা চিহ্ন দ্বারা, যা আল্লাহ্ তা‘আলা কুরআনে এবং নবী (ছাঃ) তাঁর সুন্নাতে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর তা হচ্ছে চাঁদ প্রত্যক্ষ করে রমাদ্বান শুরু এবং শেষ করা এবং সূর্য বা ফজর প্রত্যক্ষ করে সেহরি এবং ইফতার করা।
মানুষ যে এলাকায় থাকবে সে এলাকায় চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করে ছিয়াম ভঙ্গ করবে। (মুত্তাফাক আলাইহ, মিশকাত হা/১৯৬৯)
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে ছিয়াম রাখ এবং চাঁদ দেখে ছিয়াম ভঙ্গ কর’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৯৭০); উক্ত হাদিস থেকেই বুঝা যায় যে, নিজ এলাকায় চাঁদ দেখতে পেলেই ছিয়াম শুরু এবং ছিয়াম শেষ করে ঈদ উদযাপন করবে।
মহান আল্লাহ বলেন- “(মোহাম্মদ স) তোমার নিকট তারা জিজ্ঞেস করে নতুন চাঁদের বিষয়ে। বলে দাও যে এটি মানুষের জন্য সময় নির্ধারণ এবং হজ্বের সময় ঠিক করার মাধ্যম” (সূরা বাকারা: ১৮৯)
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন- "হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য এই চাঁদকে সৌভাগ্য ও ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে উদিত করুন। আল্লাহই আমার ও তোমার রব।" (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৫১)
তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস (রামাযান) পাবে, সে যেন ছিয়াম রাখে’ (বাকারাহ ১৮৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, “তোমরা (রমাদ্বানের) চাঁদ দেখে সিয়াম শুরু করবে এবং (ঈদের) চাঁদ দেখেই সিয়াম ছাড়বে। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয় (এবং চাঁদ দেখা না যায়) তাহলে মাসের ৩০ দিন পূর্ণ করবে।” (সহিহ বুখারি তা. ১৯০৬, ১৯০৭-১৯১১)
তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময় এবং চন্দ্রকে আলোকময় এবং তার জন্য নির্ধারণ করেছেন বিভিন্ন মনযিল, যাতে তোমরা জানতে পার বছরের গণনা এবং (সময়ের) হিসাব। আল্লাহ এগুলো অবশ্যই যথার্থভাবে সৃষ্টি করেছেন। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন’ (ইউনুস ৫)।
কুরাইব তাবেঈ বলেছেন, যে হারিসের কন্যা (লুবা-বা) তাকে শাম প্রদেশে সম্রাট মুআবিয়ার নিকট পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর আমি শামে এসে তাঁর প্রয়োজন সমাপন করলাম এবং আমার শামে থাকা অবস্থায় রামাযানের নতুন চাঁদ উদয় হল এবং আমি বৃহস্পতিবারের দিবাগত সন্ধ্যায় চাঁদ দেখলাম, তারপর মদীনা আসলাম; অতঃপর আমাকে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) জিজ্ঞেসা করলেন যে, তোমরা (রামাযানের) চাঁদ কবে দেখেছ? আমি বললাম, জুমুআ রাত্রিতে; পুনরায় বললেন যে, তুমি নিজে দেখেছ? আমি বললাম, জি হ্যাঁ এবং অন্যান্য লোকেও দেখেছে এবং মুআবিয়া ও শামবাসীরা রোযা রেখেছেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন, আমরা কিন্তু শুক্রবারের দিবাগত সন্ধ্যায় চাঁদ দেখেছি, অতএব আমরা রোযা রাখতেই থাকব। ৩০-এ পর্যন্ত কিংবা ৩০শের পূর্বে ২৯শে চাঁদ দেখা পর্যন্ত। আমি বললাম, আপনি কি মুআবিয়ার চাঁদ দেখা ও তাঁর রোযা রাখার উপর নির্ভর করে রোযা ও ঈদ করবেন না? ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন, না; এটাই আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আদেশ দিয়েছেন যে আমরা আপন দেশের লোকের চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করব; অন্যান্য দূর দেশবাসীদের চাঁদ দেখাকে আমরা যথেষ্ট মান্য করব না।”(সহিহ মুসলিম)
আশা করি উক্ত আলোচনায় আমরা সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারবো যে, বিশ্বের সকল দেশে একই সময়ে যেমন সেহরি এবং ইফতার করা সম্ভব নয় ঠিক তেমনি বিশ্বের সকল দেশে একই দিনে ঈদ উদযাপনও সম্ভব নয় এবং একই দিনে ঈদ উদযাপন ইসলামি শরীয়ত সম্মতও নয়।