লাউ শষা করলা জালি কুমরা মিস্টি কুমরা চাষ সম্পর্কে?
1 Answers
শাকসবজি চাষে প্রধান কাজটি হলো জমি নির্বাচন ও জমি তৈরি তা জেনে নিই-
আলো বাতাস চলাচলের সুবিধা, সেচের সুবিধা, অতি বৃষ্টির সময় জমি থেকে পানি বের করার সুবিধে আছে এরকম উর্বর দো-আঁশ মাটি সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত ভালো।
শাকসবজি অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির ফসল। সেজন্য একটু যত্নের সাথে এর চাষ করতে হয়। সবজির জমি খুব মিহি ও ঝুরঝুরেভাবে তৈরি করতে হয়। জমি সমতলভাবে তৈরি করবেন। এজন্য প্রতিটা চাষের পর পরই ভালোভাবে মই দিলে জমিতে বড় কোনো ঢেলা থাকবে না। বড় করে শাকসবজি চাষের ব্যবস্থা নিলে সেচ ও পরিচর্যার সুবিধা হয়, আর ফলনও বেশি হয়। জমি তৈরির সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব বা আবর্জনা পচা সার দিতে হবে। জমিতে রসের অভাব থাকলে সেচ দিয়ে ‘জো’ এলে তারপর চাষ মই দিয়ে জমি তৈরি করে বীজ বুনবেন। আবার অনেক রকমের সবজি মাদাতে লাগাতে হয় যেমন- শসা, লাউ, করলা, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া এসব। এগুলোর প্যাকেটে চারা তৈরি করে নির্দিষ্ট দূরত্বে মাদা তৈরি করে চারা লাগাতে হয়। চারা লাগানোর পর গাছগুলো বড় হতে থাকলে বাউনি বা মাচা তৈরি করে দিতে হয়। আর হ্যাঁ, মাদাতে চারা লাগানোর আগে পরিমাণমতো সুষম হারে রাসায়নিক সারও দিতে হবে।
শাকসবজি চাষে সারের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে আসুন এবার আমরা সার প্রয়োগ সম্বন্ধে জেনে নেই-
পরিমাণমতো গোবর, টিএসপি, এমপি সার শেষ চাষের সময় ভালোভাবে জমিতে মিশিয়ে দিতে হয়। ইউরিয়া সার চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর প্রথম উপরিপ্রয়োগ করতে হয়। দ্বিতীয় বার উপরিপ্রয়োগ করতে হয় আরও ১৫ দিন পর। লাউ বা কুমড়া জাতীয় অন্যান্য সবজির বেলায় মাদা তৈরি করে প্রতি মাদায় গোবর ১৫ কেজি, সরিষার খেল ৫০০ গ্রাম, ইউরিয়া ২৫০ গ্রাম, টিএপি ২৫০ গ্রাম এবং এমপি ২৫০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হয়।
শুধু জৈব সার ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। তবে জৈব সার সঠিকভাবে তৈরি করতে হবে। গোবর বা কম্পোস্ট জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
শাকসবজি চাষে যে বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো বীজ বপন/চারা রোপণ-
আধুনিক জাতের ফসলের ভালো বীজ জমিতে উপযুক্ত ‘জো’ অবস্থায় বপন করতে হয়। বীজ বপন বা চারা রোপনের কাজ বিকালে করা ভালো।
এখন আমরা জানব বীজতলায় কী ধরনের যত্ন নিতে হবে- গাছের গোড়ায় আগাছা হলেই তা সাথে সাথে তুলে পরিষ্কার করে দিতে হবে। রোগ বা পোকার আক্রমণ হলে দমনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বীজ বপনের পর পরই পিঁপড়া বীজ নিয়ে যেতে না পারে সেজন্য সেভিন পাউডার বীজতলার চারদিকে লাইন করে ছিটিয়ে দিতে হয়। সবজি চাষের পর মাঝে মাঝে একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন কোন সবজির কী ধরনের যত্ন পরিচর্যার প্রয়োজন।
ফল জাতীয় সবজি যেমন বেগুন, মিষ্টিকুমড়া এসব গাছে বা থোকায় অতিরিক্ত ফল থাকলে সেগুলো পুষ্টির অভাবে ঠিকমতো বাড়তে পারে না। এতে ফল আকারে ছোট, বিকৃত ও নিম্নমানের হয়। ফল ছোট থাকেই ফল পাতলাকরণের কাজ সম্পন্ন করলে গাছের ফল ধারণ ক্ষমতা বাড়ে।
আমরা জানি বেশিরভাগ সবজির প্রায় ৯০ ভাগই পানি। সেজন্য সবজি ফসলের ভালো বৃদ্ধির জন্যে পানি অপরিহার্য। চারা লাগানোর পর মাঝে মাঝে পানি সেচ দিতে হবে। ফসলে খুব ভোরে অথবা সন্ধ্যায় সেচ দেয়া উচিত। দুপুর বেলা প্রখর রোদে সেচ দিলে গাছ ঝলসে যায়। তাছাড়া এ সময় পানি বাষ্পীয় হয়ে উড়ে যায় বলে পানির অপচয় বেশি হয়। বসতবাড়ির সবজি বাগানে অল্প পরিমাণ পানি ঘন ঘন প্রয়োগ করতে হয় বলে ঝর্ণা দিয়ে পানি সেচ দেয়া ভালো। সবজি ফসল ২-৩ দিনের বেশি সময়ের জন্য জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। সেচ দেয়ার পর জমিতে পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাাখবেন। প্রতিবার বৃষ্টিপাত বা সেচের পর মাটি শুকিয়ে গেলে উপরের মাটিতে আস্তরণ পড়ে। ‘জো’ আসার সাথে সাথে হাত আঁচড়া, কোদাল বা নিড়ানির সাহায্যে ১-২ ইঞ্চি গভীর করে মাটির স্তর ভেঙে দিতে হবে।
ঢলে পড়া ও গোড়া পচা রোগ থেকে চারাকে রক্ষার জন্য আগেই মাটি শোধন করা ভালো। চারা গজানোর পর ‘গোড়া পচা’ রোগ দেখা দিলে বীজতলায় পানির পরিমাণ কমাতে হবে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন করে অথবা শুকনো বালি বা ছাই ছিটিয়ে দিয়ে আর্দ্রতা অর্থাৎ পানির পরিমাণ কমানো যেতে পারে। একই সাথে ডাইথেন এম-৪৫ অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড প্রয়োগ করে রোগের বৃদ্ধি রোধ করা যায়।
তাই আমরা একটু চিন্তা-ভাবনা করে বুদ্ধি খাটিয়ে হরেক রকম সবজি চাষে মনোযোগী হই। নিজে লাভবান হই। সে সাথে দেশের সার্বিক পুষ্টি ঘাটতি পূরণে সহায়তা করি।
মো. সাহারুজ্জামান*
* এআইসিও, কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক অফিস, রাজশাহী