তাহাজ্জুদ নামাজের সময় এবং নিয়ম জানতে চাই?
3 Answers
নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়তের সঙ্গে সওয়াবের আশায় মাহে রমজানের রোজা পালন করে, তার বিগত জীবনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। আর যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় মাহে রমজানের রাতে কিয়াম করে, তার বিগত দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে কিয়াম বা রাত জেগে ইবাদত করে, তার বিগত জীবনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি ও মুসলিম) রমজান মাস ও অন্যান্য সময় তাহাজ্জুদ নামাজ রাত দ্বিপ্রহরের পরে পড়তে হয়। মধ্যরাতে যখন লোকেরা গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন, তখন রোজাদার মুমিন বান্দা ঘুম থেকে জেগে ইবাদত-বন্দেগি করেন এবং সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন। সুবহে সাদিক হয়ে গেলে এ নামাজ আর পড়া যায় না। যদি রাত দ্বিপ্রহরের পর নিদ্রা থেকে জাগ্রত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে এশার নামাজের পর এবং বিতরের আগে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতে হয়। অবশ্য তাহাজ্জুদ নামাজ রাত দ্বিপ্রহরের আগে পড়লে সওয়াব কম পাওয়া যায়। রাতের শেষাংশে পড়লে সওয়াব বেশি পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাহাজ্জুদ নামাজ কখনো ৪ রাকাত, কখনো ৮ রাকাত এবং কখনো ১২ রাকাত পড়েছিলেন। তাই রোজাদার ব্যক্তির তাহাজ্জুদ নামাজ কমপক্ষে ৪ রাকাত আদায় করা উচিত। কিন্তু যদি কেউ এ নামাজ ২ রাকাত আদায় করেন, তাহলেও তাঁর তাহাজ্জুদ আদায় হবে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এশার পর দুই বা ততোধিক রাকাত নামাজ পড়ে নেয়, সে হবে তাহাজ্জুদের ফজিলতের অধিকারী।’ রমজান মাসে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়কালে পবিত্র কোরআনের আয়াত খুব বেশি তিলাওয়াত করা উত্তম। যদি দীর্ঘ সূরা মুখস্থ থাকে, তাহলে তাহাজ্জুদ নামাজে দীর্ঘ সূরা তিলাওয়াত করা উত্তম। ১২ রাকাত তাহাজ্জুদ নামাজের প্রথম রাকাতে সূরা আল-ইখলাস ১২ বার, দ্বিতীয় রাকাতে ১১ বার, তৃতীয় রাকাতে ১০ বার, চতুর্থ রাকাতে ৯ বার অনুসারে দ্বাদশ রাকাতে একবার পড়তে হয়। আবার প্রত্যেক রাকাতে সূরা আল-ইখলাস ৩ বার অথবা ১ বার হিসেবেও পড়া যায়। আবার সূরা আল-মুয্যাম্মিল, আয়াতুল কুরসি এবং সূরা আল-ইনশিরাহও পড়া যায়। মাহে রমজানে দিবাভাগে পানাহার বর্জন করে রোজা পালনের পর গভীর রাতে নিদ্রাসুখ ত্যাগ করে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে। তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত সব নফল ইবাদত অপেক্ষা অধিক এবং এটি আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। এ জন্য আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর এ নামাজ ফরজ করে দিয়েছিলেন। রোজাদার ব্যক্তি যদি তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, আল্লাহ তার পাপরাশি মার্জনা করে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার প্রভু প্রত্যেক রাতের শেষাংশে নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, যে কেউ আমার কাছে প্রার্থনা করবে, আমি তা কবুল করব, যে কেউ কিছু প্রার্থনা করবে, আমি তা প্রদান করব, যে কেউ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করব।’ (বুখারি ও মুসলিম)
তাহাজ্জুদ মানে নিদ্রা ত্যাগ করা। নিদ্রা ত্যাগ করে এই নামায পড়া হয় বিধায় এই নামাযকে তাহাজ্জুদ নামকরণ করা হয়েছে। মধ্যরাত (এশার ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পর) থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত (ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত) তাহাজ্জুদ নামায পড়ার সময়। ২ রাকাত করে, ৪ থেকে ১২ রাকাত নামায পড়া উত্তম। ২ রাকাত নামায পড়লেও তাহাজ্জুদ নামায আদায় হয়ে যাবে। এই নামাযে সূরা মিলানো বিষয়ে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে সূরা ইয়াসিন, সূরা মুযাম্মিল ও সূরা ইখলাস ৩ বার করে পড়া উত্তম।
এরকম প্রশ্নের জন্য আপনার সমাদর প্রকাশ করছি। অনেকেই বলে তাহাজ্জুদ নামায গভীর রাতের গাঢ় অন্ধকারে পড়তে হবে,রুমে লাইট জ্বালানো থাকলে নাকি তাহাজ্জুদ হবেনা ইত্যাদি। এটা ভুল ধারনা। তাহাজ্জুদ এর সাথে লাইটের কোন সম্পর্ক নেই। যদি আপনি ভয় পান তাহলে লাইট জ্বালিয়ে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করতে পারবেন। মুহাম্মদ (স) রাতের সালাত আদায় করতেন,ইবনে আব্বাস (রা) তখন ছোট ছিলেন,ইবনে আব্বাস (রা) রাসুল (স) এর পাশে দাড়িয়ে যেতেন। আপনার ভয় লাগলে আপনার ভাইকে ডেকে পাশে নিয়ে লাইট জালিয়ে তাহাজ্জুদ আদায় করতে পারেন।
আবার অনেকে বলে এই নামায একদিন পড়লে প্রত্যেক দিন পড়তেই হবে (বাধ্য) নইলে মারাত্মক গুনাহ হবে ইত্যাদি, ভুল কথা এটা। তাহাজ্জুদ ফরজ নয়, তবে গুরুত্বপূর্ণ আমল। কাজেই এই আমলের সাথে নিজেকে অভ্যস্ত করা জরুরী। এছাড়াও, তাহাজ্জুদ পড়তে গেলে বিড়াল কুকুরের কান্নার সাউন্ড ইত্যাদি অনেক কথা প্রচলিত, এগুলো কে প্রশ্রয় না দিয়ে নিয়মিত আমল করবেন।
অনেকে বলে যে, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে তাহাজ্জুদ আদায় করতে হবে। অর্থাৎ ধরুন,কোন স্টুডেন্ট বই পড়তে পড়তে রাত ৩ টা বাজল আর সে চাইল যে এখন একটু তাহাজ্জুদ পড়বে। এটা নাকি হবেনা। কেন? কারন দেখিয়ে কতেক আলেম বলে যে,তাহাজ্জুদ এর আগে ঘুমাতে হবে,ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ পড়তে হবে, এটা মোটেও সঠিক কথা নয়। বরং, এশা থেকে ফজরের আগ পর্যন্ত যেকোন সময়েই। তবে, উত্তম হলো, রাতের তিন ভাগের দু'ভাগ অতিক্রম করার পরে আদায় করা। (তরীকুল ইসলাম, দ্বিতীয় খন্ড - পৃষ্ঠা নং ১৭৭)।
ধরুন, আপনি জলদি ঘুমালেন,আর ইচ্ছে করলেন যে পরে একসময় উঠে সালাত আদায় করে নিব। কিন্তু টের পেলেন ফজরে। জানেন এই ইচ্ছে করার জন্যই আপনি কত সাওয়াব পাবেন? হযরত আবু দারদা (রাঃ) নবী (সঃ)-এর নিকট হতে বর্ণনা করে বলেন, তিনি বলেছেন, "রাত্রে উঠে তাহাজ্জুদ পড়বে এই সংকল্প/ইচ্ছা করে যে ব্যক্তি নিজ বিছানায় আশ্রয় নেয়, অতঃপর তার চক্ষুদ্বয় তাকে নিদ্রাভিভূত করে ফেলে এবং যদি এই অবস্থাতেই তার ফজর হয়ে যায় তবে তার আমলনামায় তাই লিপিবদ্ধ হয় যার সে সংকল্প/নিয়ত সে করেছিল। আর তার ঐ নিদ্রা তার প্রতিপালকের তরফ হতে সদকাহ্ (দান) রুপে প্রদত্ত হয়।" (নাসাঈ, ইবনে মাজাহ্, ইবনে খুযাইমাহ্, সহীহ তারগীব, হাদীস নং ৫৯৮)।
মহানবী (সঃ)-এর তাহাজ্জুদ ঘুম বা ব্যথা-বেদনার কারণে ছুটে গেলে দিনে ১২ রাকআত কাযা পড়তেন। (মুসলিম, সহীহ)। তাই, আপনার যদি এ নামাজ কাযা হয়, তাহলে যোহরের আগে যেকোন সময় ১২ রাক'য়াত কাযা পড়ে নিবেন। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) প্রমুখাৎ বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার (পূর্ণ) অযীফা (তাহাজ্জুদের নামায, কুরআন ইত্যাদি) অথবা তার কিছু অংশ রেখে ঘুমিয়ে যায়, কিন্তু তা যদি ফজর ও যোহরের নামাযের মধ্যবর্তী সময়ে আদায় করে নেয় তবে তার জন্য পূর্ণ সওয়াবই লিপিবদ্ধ করা হয়, যেন সে ঐ অযীফা রাত্রেই সম্পন্ন করেছে। (মুসলিম, আবূ দাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ্, ইবনে খুযাইমাহ্)।
তাহাজ্জুদের সালাতে লম্বা কিরাত/লম্বা সূরা পড়া উত্তম। তবে যদি লম্বা না পারেন তাহলে শুধু কুল হু ওয়াল্লাহু আহাদ (ইখলাস সূরা) দিয়েও পড়া যায়। "এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমার এক প্রতিবেশী রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে, কিন্তু ‘ক্বুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’ ছাড়া অন্য কিছু পড়ে না। এটাকেই সে বারবার ফিরিয়ে পড়ে এবং এর চাইতে বেশী কিছু পড়ে না। আসলে এ ব্যক্তি তা খুবই কম মনে করল। কিন্তু নবী (সঃ) বললেন, 'সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! ঐ সূরা এক তৃতীয়াংশ কুরআনের সমতুল্য'।" (আহমাদ, মুসনাদ, বুখারী)।
তাহাজ্জুদ নামাজ সর্বমোট ১২ রাক'য়াত। আর সর্বনিম্ন ২ রাক'য়াত। তবে, আপনি চাইলে ২, ৪, ৬, ৮, ১০, ১২ এর মধ্যে বিদ্যমান রেখে পড়তে পারেন। এতে কোনো সমস্যা নেই। (তরীকুল ইসলাম, দ্বিতীয় খন্ড - পৃষ্ঠা নং ১৭৮)।
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy