1 Answers
মৃত্যু সকলের জন্যই অবধারিত। এতে কোনরূপ সন্দেহের অবকাশ নেই। পবিত্র কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। (সূরা আল ইমরান, ৩ : ১৮৫) এছাড়া আরো ইরশাদ হয়েছে, তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদেরকে নাগালে পাবেই; এমনকি সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করলেও। (সূরা নিসা, ৪ : ৭৮) রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইরশাদ করেন, সকল প্রকার স্বাদ বিনষ্টকারী মৃত্যুকে তোমরা স্মরণ করো। [মিশকাত শরিফ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৫৭] হজরত বারা ইবনে আযিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইরশাদ করেন, (কবরে মুমিন) বান্দার কাছে দুইজন ফেরেশতা আসেন এবং তাকে বসান। তারপর জিজ্ঞাসা করেন, তোমার রব কে? সে বলে, আমার রব আল্লাহ্। তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার দ্বীন কী? সে বলে, আমার দ্বীন ইসলাম? এরপর প্রশ্ন করেন, এই ব্যক্তি যাঁকে তোমাদের কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল, তিনি কে? উত্তরে সে বলবে, তিনি আল্লাহর রাসূল (সা.)। তখন ফেরেশতা বলেন, তুমি তা কীভাবে বুঝতে পারলে? সে বলে, আমি আল্লাহর কিতাব (কুরআন) পড়েছি, তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাঁকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছি। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, এটাই হলো আল্লাহর কালাম- যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্ তাদেরকে ‘শাশ্বত বাণী’ (কালেমা তায়্যিবা) -এর উপর অবিচল রাখবেন। (সূরা ইবরাহিম, ১৪ : ২৭) নবী করীম (সা.) বলেন, এরপর আসমান থেকে এক ঘোষণাকারী এ মর্মে ঘোষণা করবে যে, আমার বান্দা সত্য বলেছে। তাই তার জন্য কবরেই জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও। তাকে জান্নাতের পোশাক পরিয়ে দাও এবং তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দাও। সুতরাং তার জন্য জান্নাতের দিকে দরজা খুলে দেওয়া হয়। ফলে তার দিকে জান্নাতের স্নিগ্ধ হাওয়া এবং সুবাস বইতে থাকে। তারপর তার কবরকে তার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত করে দেওয়া হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা.) কাফিরের মৃত্যু প্রসঙ্গে উল্লেখ করে বলেন, কবরে শোয়ানোর পর তার শরীরে রূহকে ফিরিয়ে আনা হয়। তারপর দুই জন ফেরেশতা তার কাছে এসে তার পাশে বসেন এবং জিজ্ঞাসা করেন, তোমার রব কে? সে উত্তরে বলে, হায়। আমি কিছুই জানি না। এরপর তাঁরা জিজ্ঞাসা করেন, তোমার দ্বীন কি? সে বলে, হায় হায়! আমি কিছুই জানি না। তাঁরা পুনরায় জিজ্ঞাসা করেন, এই লোক যাকে তোমার নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল, তিনি কে? এবারও সে বলে, হায় হায়! আমি তো কিছুই জানি না। এ অবস্থায় আসমান থেকে এক ঘোষণাকারী এ মর্মে ঘোষণা করেন যে, সে মিথ্যা বলেছে, তার জন্য কবরে জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও। তাকে জাহান্নামের পোশাক পরিয়ে দাও এবং তার জন্য জাহান্নামের উত্তাপ ও লু-হাওয়া আসার জন্য জাহান্নামের দিকে একটি দরজা খুলে দাও। নবী (সা.) বলেন, এরপর তার কবরকে এমন সংকীর্ণ করে দেওয়া হয় যে, তার এদিকের পাজঁরের হাড় অপর দিকের পাঁজরের হাড়ের মধ্যে ঢুকে যায়। এরপর তার কবরে একজন ফেরেশতা মোতায়েন করা হয়; যার কাছে লোহার একটি হাতুড়ি থাকে। যদি এ হাতুড়ি দ্বারা কোনো পাহাড়ের উপর আঘাত করা হয়, তবে নিশ্চয়ই পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। এ হাতুড়ি দ্বারা ঐ ফেরেশতা তাকে সজোরে আঘাত করতে থাকেন, ঐ আঘাতের আওয়াজ মানুষ ও জিন ছাড়া পূর্ব হতে পশ্চিমের সমস্ত মাখলূক শুনতে পায়। সে আঘাতে ঐ ব্যক্তি ধূলিতে পরিণত হয়ে যায়। তারপর তার মধ্যে পুনরায় রূহ ফেরত দেওয়া হয়। (এভাবে আজাব চলতে থাকে) [মিশকাত শরিফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৫] উপরোক্ত হাদিস থেকে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, পুণ্যবানদের রূহ্সমূহ দেহ হতে পৃথক হওয়ার পর তাদের জন্য জান্নাতের সুখ শান্তির সৌন্দর্য ও অবস্থান প্রদর্শন করা হয়। অনুরূপভাবে অপরাধী ব্যক্তিদেরকে আজাবের কিছু না কিছু স্বাদ গ্রহণ করানো হয়। এটাই আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা। শায়খ উমর ইব্ন মুহাম্মদ নাসাফী (রহ.) তার রচিত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, কবরে কাফির ও কোনো কোনো অবাধ্য মুমিনদেরকে শাস্তি প্রদান করা এবং অনুগত দীনদার বান্দাদেরকে নিয়ামত দান করার বিষয়টি কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে উপস্থিত করা হয় আগুনের সামনে। (সূরা মুমিন, ৪০ : ৪৬) আল্লামা তাফতাজানী (রহ.) -এর মতে আয়াতটি কবরের আজাবের সাথে সম্পর্কিত। পার্থিব জগতে অবস্থান করে আমলে বরজখের বিষয় সম্যক ধারণা হাসিল করা দুষ্কর। সে জগতের অনেক কথা মানুষের ধারণার অতীত। কাজেই মৃত ব্যক্তিকে কেমন করে বসানো হয়, কেমন করে ফেরেশতা তাকে শাস্তি প্রদান করে এবং কিভাবে কবর সংকীর্ণ বা প্রশস্ত করা হয়- এ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা অর্থহীন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, মানুষ ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের অবস্থায় অনেক কিছু দেখে এবং সুখ বা দুঃখ অনুভব করে। কিন্তু তার পার্শ্ববর্তী ব্যক্তি কিছুই অনুভব করতে পারে না। তাই বলে স্বপ্ন অবাস্তব এ কথা বলা যায় না। কবরের আজাবের বিষয়টিও ঠিক অনুরূপই। এতে সন্দেহ এবং সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। [শরহুল আকাইদিন নাসাফিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-৯৪]