লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়া দীন।উচ্চারণ
তোমাদের দ্বীন তোমাদের জন্য এবং আমার দ্বীন আমার জন্য। ৫ তাফহীমুল কুরআন
তোমাদের জন্য তোমাদের দীন এবং আমার জন্য আমার দীন। মুফতী তাকী উসমানী
তোমাদের জন্য তোমাদের কর্মফল এবং আমার জন্য আমার কর্মফল।মুজিবুর রহমান
তোমাদের কর্ম ও কর্মফল তোমাদের জন্যে এবং আমার কর্ম ও কর্মফল আমার জন্যে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
‘তোমাদের দীন তোমাদের, আমার দীন আমার।’ইসলামিক ফাউন্ডেশন
‘তোমাদের জন্য তোমাদের দীন আর আমার জন্য আমার দীন।’আল-বায়ান
তোমাদের পথ ও পন্থা তোমাদের জন্য (সে পথে চলার পরিণতি তোমাদেরকেই ভোগ করতে হবে) আর আমার জন্য আমার পথ (যে সত্য পথে চলার জন্য আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, এ পথ ছেড়ে আমি অন্য কোন পথ গ্রহণ করতে মোটেই প্রস্তুত নই)।তাইসিরুল
তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মমত এবং আমার জন্য আমার ধর্মমত।মাওলানা জহুরুল হক
৫
অর্থাৎ আমার দ্বীন আলাদা এবং তোমাদের দ্বীন আলাদা। আমি তোমাদের মাবুদদের পূজা-উপাসনা-বন্দেগী করি না এবং তোমরাও আমার মাবুদের পূজা-উপাসনা করো না। আমি তোমাদের মাবুদদের বন্দেগী করতে পারি না এবং তোমরা আমার মাবুদের বন্দেগী করতে প্রস্তুত নও। তাই আমার ও তোমার পথ কখনো এক হতে পারে না। এটা কাফেরদের প্রতি উদারনীতি নয় বরং তারা কাফের থাকা অবস্থায় চিরকালের জন্য তাদের ব্যাপারে দায়মুক্তি, সম্পর্কহীনতা ও অসন্তোষের ঘোষণাবাণী। আর আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি যারা ঈমান এনেছে তারা দ্বীনের ব্যাপারে কখনো তাদের সাথে সমঝোতা করবে না--- এ ব্যাপারে তাদেরকে সর্বশেষ ও চূড়ান্তভাবে নিরাশ করে দেয়াই এর উদ্দেশ্য। এ সূরার পরে নাযিল হওয়া কয়েকটি মক্কী সূরাতে পর পর এ দায়মুক্তি, সম্পর্কহীনতা ও অসন্তোষ প্রকাশের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সূরা ইউনুসে বলা হয়েছেঃ “এরা যদি তোমাকে মিথ্যা বলে তাহলে বলে দাও, আমার কাজ আমার জন্য এবং তোমাদের কাজ তোমাদের জন্য। আমি যা কিছু করি তার দায়-দায়িত্ব থেকে তোমরা মুক্ত।” (৪১ আয়াত) এ সূরাতেই তারপর সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলা হয়েছেঃ “হে নবী! বলে দাও, হে লোকেরা, যদি তোমরা আমার দ্বীনের ব্যাপারে (এখানে) কোন রকম সন্দেহের মধ্যে থাকো তাহলে (শুনে রাখো), আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের বন্দেগী করছো আমি তাদের বন্দেগী করি না বরং আমি শুধুমাত্র সেই আল্লাহর বন্দেগী করি যার কর্তৃত্বাধীনে রয়েছে তোমাদের মৃত্যু।” (১০৪ আয়াত) সূরা আশ শু’আরায় বলেছেনঃ “হে নবী! যদি এরা এখন তোমার কথা না মানে তাহলে বলে দাও, তোমরা যা কিছু করছো তা থেকে আমি দায়মুক্ত।” (২১৬ আয়াত) সূরা সাবায় বলেছেনঃ এদেরকে বলো, আমাদের ত্রুটির জন্য তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না এবং তোমরা যা কিছু করে যাচ্ছো সেজন্য আমাদের জবাবদিহি করতে হবে না। বলো, আমাদের রব একই সময় আমাদের ও তোমাদের একত্র করবেন এবং আমাদের মধ্যে ঠিকমতো ফায়সালা করবেন।” (২৫-২৬ আয়াত) সূরা যুমার-এ বলেছেনঃ “এদেরকে বলো, হে আমার জাতির লোকেরা! তোমরা নিজেদের জায়গায় কাজ করে যাও। আমি আমার কাজ করে যেতে থাকবো। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে কার ওপর আসছে লাঞ্ছনাকর আযাব এবং কে এমন শাস্তি লাভ করছে যা অটল।” (৩৯-৪০ আয়াত) আবার মদীনা তাইয়েবার সমস্ত মুসলমানকেও এই একই শিক্ষা দেয়া হয়। তাদেরকে বলা হয়ঃ তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাঁর সাথীদের মধ্যে রয়েছে একটি ভালো আদর্শ। (সেটি হচ্ছেঃ ) তারা নিজেদের জাতিকে পরিষ্কার বলে দিয়েছে, আমরা তোমাদের থেকে ও তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব মাবুদদের পূজা করো তাদের থেকে পুরোপুরি সম্পর্কহীন। আমরা তোমাদের কুফরী করি ও অস্বীকৃতি জানাই এবং যতক্ষণ তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনো ততক্ষণ আমাদের ও তোমাদের মধ্যে চিরকালীন শত্রুতা সৃষ্টি হয়ে গেছে।” (আল মুমতাহিনা ৪ আয়াত) কুরআন মজীদের একের পর এক এসব সুস্পষ্ট বক্তব্যের পর তোমরা তোমাদের ধর্ম মেনে চলো এবং আমাকে আমার ধর্ম মেনে চলতে দাও- “লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন” -এর এ ধরনের কোন অর্থের অবকাশই থাকে না। বরং সূরা যুমার-এ যে কথা বলা হয়েছে, একে ঠিক সেই পর্যায়ে রাখা যায় যেখানে বলা হয়েছেঃ “হে নবী! এদেরকে বলে দাও, আমি তো আমার দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করে তাঁরই ইবাদাত করবো, তোমরা তাঁকে বাদ দিয়ে যার যার বন্দেগী করতে চাও করতে থাক না কেন।” (১৪ আয়াত)
এ আয়াতের ভিত্তিতে ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম শাফেয়ী এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, কাফেরদের ধর্ম পরস্পর যতই বিভিন্ন হোক না কেন সামগ্রিকভাবে সমস্ত কাফেররা মূলত একই গোষ্ঠীভুক্ত। কাজেই তাদের মধ্যে যদি বংশ বা বিবাহের ভিত্তিতে অথবা অন্য কোন কারণে এমন কোন সম্পর্ক থাকে যা একের সম্পত্তিতে অন্যের উত্তরাধিকারী স্বত্ব দাবী করে তাহলে একজন খৃস্টান একজন ইহুদীর, একজন ইহুদী একজন খৃস্টানের এক ধর্মের কাফের অন্য ধর্মের কাফেরের উত্তরাধিকারী হতে পারে। বিপরীতপক্ষে ইমাম মালিক, ইমাম আওযায়ী ও ইমাম আহমাদের মতে এক ধর্মের লোকেরা অন্য ধর্মের লোকদের উত্তরাধিকারী হতে পারে না। তারা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) বর্ণিত হাদীসের ভিত্তিতে এমত পোষণ করেন। এ হাদীসের রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ لاَ يَتَوَارَثُ أَهْلُ مِلَّتَيْنِ شَتَّى “দুই ভিন্ন ধর্মের লোক পরস্পরের ওয়ারিশ হতে পারে না।” (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, দারে কুতনী)। প্রায় একই ধরনের বিষয়বস্তু সম্বলিত একটি হাদীস ইমাম তিরমিযী হযরত জাবের (রা.) থেকে, ইবনে হিব্বান হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে এবং বাযযার আবু হুরাইরা (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেছেন। এ বিষয়টি আলোচনা প্রসঙ্গে হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত ইমাম শাসসুল আয়েম্মা সারাখসী লিখেছেনঃ যে সমস্ত কারণে মুসলমানরা পরস্পরের ওয়ারিশ হয় সে সমস্ত কারণে কাফেররাও পরস্পরের ওয়ারিশ হতে পারে। আবার তাদের মধ্যে এমন কোন কোন অবস্থায়ও উত্তরাধিকার স্বত্ব জারী হতে পারে যে অবস্থায় মুসলমানদের মধ্যে হয় না। ........................ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে দ্বীন হচ্ছে দু’টি, একটি সত্য দ্বীন এবং অন্যটি মিথ্যা দ্বীন। তাই তিনি বলেছেনঃ لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ এই সাথে তিনি মানুষদের দু’দলে বিভক্ত করেছেন। একদল জান্নাতী এবং তারা হচ্ছে মু’মিন। একদল জাহান্নামী এবং সামগ্রিকভাবে তারা হচ্ছে কাফের সমাজ। এ দু’দলকে তিনি পরস্পরের বিরোধী গণ্য করেছেন তাই তিনি বলেছেনঃ هَذَانِ خَصْمَانِ اخْتَصَمُوا فِي رَبِّهِمْ (এই দু’টি পরস্পর বিরোধীদল। এদের মধ্যে রয়েছে নিজেদের রবের ব্যাপারে বিরোধ।-----আল হজ্জ ১৯ আয়াত) অর্থাৎ সমস্ত কাফেররা মিলে একটি দল। তাদের বিরোধ ঈমানদার বা মু’মিনদের সাথে।--------------তাদের নিজেদের আকীদা-বিশ্বাসের দিক দিয়ে আলাদা আলাদা মিল্লাতে তথা মানব গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে আমরা মনে করি না। বরং মুসলমানদের মোকাবিলায় তারা সবাই একটি মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ মুসলমানরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাত ও কুরআনকে আল্লাহর কিতাব বলে স্বীকার করে। অন্যদিকে তারা এসব অস্বীকার করে। এজন্য তাদেরকে কাফের বলা হয়। মুসলমানদের মোকাবিলায় তারা একই গোষ্ঠীভুক্ত হয় لَا يَتَوَارَثُ أَهْلُ مِلَّتَيْنِ হাদীসটি আমি ইতিপূর্বে যে কথার উল্লেখ করেছি সেদিকেই ইঙ্গিত করে। কারণ, “মিল্লাতাইন” (দুই মিল্লাত তথা দুই গোষ্ঠী) শব্দের ব্যাখ্যা রসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর নিম্নোক্ত হাদীসের মাধ্যমে করে দিয়েছেনঃ لاَ يَرِثُ الْمُسْلِمُ الْكَافِرَ وَلاَ الْكَافِرُ الْمُسْلِمَ অর্থাৎ “মুসলমান কাফেরের ওয়ারিশ হতে পারে না এবং কাফের হতে পারে না মুসলমানের ওয়ারিশ।” [আল মাবসূত ৩ খণ্ড, ৩০-৩২পৃষ্ঠা। ইমাম সারাখসী এখানে যে হাদীসটির বরাত দিয়েছেন সেটি বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী, আহমাদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও আবু দাউদ হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) থেকে রেওয়ায়াত করেছেন।]
এ সূরাটি নাযিল হওয়ার পটভূমি এই যে, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা, আস ইবনে ওয়াইল প্রমূখ মক্কার কাফের নেতৃবৃন্দ একবার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এই সমঝোতা প্রস্তাব পেশ করল যে, এক বছর আপনি আমাদের উপাস্যদের ইবাদত করুন, পরের বছর আমরা আপনার মাবুদের ইবাদত করব। অন্য কিছু লোকও এ জাতীয় আরও কিছু প্রস্তাব রেখেছিল, সবগুলো প্রস্তাবের সারকথা ছিল এটাই যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে-কোনভাবে কাফেরদের রীতি অনুযায়ী ইবাদত করতে রাজি হলে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হতে পারে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এ সূরাটি নাযিল হয় এবং এতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দেওয়া হয় যে, কুফর ও ঈমান সম্পূর্ণ আলাদা দুটো জিনিস। তার মধ্যে এ রকম কোন মীমাংসা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়, যা দ্বারা সত্য-মিথ্যার প্রভেদ ঘুচে যাবে এবং সত্য দীনের সাথে কুফর ও শিরকের মিশ্রণ ঘটে যাবে। হ্যাঁ, তোমরা যদি সত্য কবুল করতে প্রস্তুত না হও, তবে ঠিক আছে, নিজেদের ভ্রান্ত ধর্ম মতে কাজ করতে থাক। যার পরিণাম একদিন তোমাদেরকে ভোগ করতে হবে। আর আমিও আমার নিজ দীনের অনুসরণ করে যাব, যার দায়-দায়িত্ব আমার নিজের। এর দ্বারা বোঝা গেল, অমুসলিমদের সাথে এমন কোন চুক্তি জায়েয নয়, যার ফলে তাদের ধর্মীয় কোন রীতি-রেওয়াজ গ্রহণ করতে হয়। হ্যাঁ নিজ দীনের উপর পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত থেকে তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি হতে পারে, যেমন সূরা আনফালে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে (৮ : ৬১)। [‘তোমাদের জন্য তোমাদের দীন এবং আমার জন্য আমার দীন’ একথার দ্বারা কুফরের অনুমোদন দেওয়া হয়নি এবং দাওয়াত ও জিহাদকেও নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং তারা যে সমঝোতার প্রস্তাব করেছিল সেটাকেই সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, তোমাদের দীন কুফর ও শিরকের আর আমার দীন তাওহীদের। এ দুয়ের মধ্যে সমঝোতা সম্ভব নয়। বরং তোমাদের কর্তব্য ওই ভ্রান্ত ধর্ম ত্যাগ করে সত্যের ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করা। তা করতে যদি প্রস্তুত না হও, তবে থাক তোমাদের ধর্ম নিয়ে, কিন্তু মনে রেখ সেজন্য তোমাদেরকে খেসারতও দিতে হবে। কেননা আমি তো আমার সত্য ধর্ম নিয়েই থাকব। আর এটা যেহেতু সার্বজনীন দীন, তাই আমার ও এর অনুসারীদের কর্তব্য বিশ্বব্যাপী এর প্রচার করা এবং যারা তাতে বাধা দেবে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা। তাতে আল্লাহ তাঁর দীনকে জয়যুক্ত করবেন এবং বিরুদ্ধবাদীদেরকে করবেন পর্যুদস্ত। সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াত ও জিহাদী কার্যক্রম চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত মক্কা বিজয় হয় এবং যারা বিরুদ্ধাচরণে জিদ ধরে থাকে তারা ধ্বংস হয়। পরবর্তীকালে সাহাবায়ে কিরামও বিশ্বব্যাপী এ দীনের দাওয়াত ও জিহাদী কার্যক্রম পরিচালনা করেন। আয়াতের আরেক অর্থ হতে পারে তোমাদের কর্মফল তোমাদের ভোগ করতে হবে এবং আমার কর্মফল আমি ভোগ করব। কাজেই যদি আমার দাওয়াতে ইসলাম গ্রহণ না কর তবে তার অশুভ পরিণামের জন্য তোমরা প্রস্তুত থাক। তা দুনিয়ায়ও ভোগ করতে হতে পারে আর আখিরাতে তো অবশ্যই। সুতরাং ‘যার ধর্ম তার’ বা ‘ধর্ম প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ব্যাপার, এ নিয়ে দাওয়াতদাতা, আলেম-উলামা বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কোনো দায়-দায়িত্ব নেই’ এ জাতীয় বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য প্রসঙ্গে এ আয়াতকে টেনে আনলে নিঃসন্দেহে তা হবে আয়াতটির স্স্পুষ্ট অপব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ। আল্লাহ তাআলা হেফাজত করুন। -অনুবাদক]
৬. তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আর আমার দ্বীন আমার।(১)
(১) এর তাফসীর প্রসঙ্গে ইবনে-কাসীর বলেন, এ বাক্যটি তেমনি যেমন অন্য আয়াতে আছে, (وَإِنْ كَذَّبُوكَ فَقُلْ لِي عَمَلِي وَلَكُمْ عَمَلُكُمْ) “আর তারা যদি আপনার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে তবে আপনি বলবেন, আমার কাজের দায়িত্ব আমার এবং তোমাদের কাজের দায়িত্ব তোমাদের।” (সূরা ইউনুস: ৪১) অন্য আয়াতে এসেছে, (لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ) “আমাদের কাজের ফল আমাদের জন্য এবং তোমাদের কাজের ফল তোমাদের জন্য”। (সূরা আল-কাসাস: ৫৫, আশ-শুরা: ১৫)। এর সারমর্ম এই যে, ইবনে-কাসীর دين শব্দকে দ্বীনী ক্রিয়াকর্মের অর্থে নিয়েছেন। যার অর্থ, প্রত্যেককে নিজ নিজ কর্মের প্রতিদান ও শাস্তি ভোগ করতে হবে। অর্থাৎ আমার দ্বীন আলাদা এবং তোমাদের দ্বীন আলাদা। আমি তোমাদের মাবুদদের পূজা-উপাসনা-বন্দেগী করি না এবং তোমরাও আমার মাবুদের পূজা-উপাসনা করো না। আমি তোমাদের মাবুদদের বন্দেগী করতে পারি না এবং তোমরা আমার মাবুদের বন্দেগী করতে প্ৰস্তুত নও। তাই আমার ও তোমাদের পথ কখনো এক হতে পারে না।
বর্তমান কালের কোন কোন জ্ঞানপাপী মনে করে থাকে যে, এখানে কাফেরদেরকে তাদের দ্বীনের উপর থাকার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তারা এটাকে ইসলামের উদারনীতির প্রমাণ হিসেবে পেশ করে থাকেন। নিঃসন্দেহে ইসলাম উদার। ইসলাম কাউকে অযথা হত্যা বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে অনুমতি দেয় না। কিন্তু তাই বলে তাদেরকে কুফরী থেকে মুক্তি দিতে তাদের মধ্যে দাওয়াত ও দ্বীনের প্রচার প্রসার ঘটানো থেকে বিরত থাকতে বলেনি। ইসলাম চায় প্রত্যেকটি কাফের ও মুশরিক ইসলামের ছায়াতলে এসে শান্তির বার্তা গ্ৰহণ করুক। আর এ জন্য ইসলাম প্রজ্ঞা, উত্তম উপদেশবাণী, উত্তম পদ্ধতিতে তর্ক-বিতর্ক ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহর পথে আহবান করাকে প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্য করণীয় বিষয় হিসেবে ঘোষণা করেছে। (দেখুন, সূরা আন-নাহল: ১২৫) মূলত: এ সমস্ত জ্ঞানপাপীরা এ বিষয়টিকেই সহ্য করতে চায় না। তারা এখানে আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য করে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নামক কুফরী মতবাদকে জায়েয প্রমাণ করা। এটা নিঃসন্দেহে ঈমান আনার পরে কুফরী করার শামিল, যা মূলত কাফেরদের প্রতি উদারনীতি নয়। বরং তারা কাফের থাকা অবস্থায় চিরকালের জন্য তাদের ব্যাপারে দায়মুক্তি, সম্পর্কহীনতা ও অসন্তোষের ঘোষণাবাণী।
আর এ সূরায় কাফেরদের দ্বীনের কোন প্রকার স্বীকৃতিও দেয়া হয়নি। মূলত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি যারা ঈমান এনেছে তারা দ্বীনের ব্যাপারে কখনো তাদের সাথে সমঝোতা করবে না- এ ব্যাপারে তাদেরকে সর্বশেষ ও চূড়ান্তভাবে নিরাশ করে দেয়া; আর তাদের সাথে সম্পর্কহীনতার ঘোষণাই এ সূরার উদ্দেশ্য। এ সূরার পরে নাযিল হওয়া কয়েকটি মক্কী সূরাতে কাফেরদের সাথে এ দায়মুক্তি, সম্পর্কহীনতা ও অসন্তোষ প্রকাশের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, “হে নবী! বলে দিন হে লোকেরা, যদি তোমরা আমার দ্বীনের ব্যাপারে (এখানে) কোন রকম সন্দেহের মধ্যে থাকো তাহলে (শুনে রাখো), আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের বন্দেগী করছে। আমি তাদের বন্দেগী করি না। বরং আমি শুধুমাত্র সেই আল্লাহর বন্দেগী করি যার কর্তৃত্বাধীনে রয়েছে তোমাদের মৃত্যু।” (সূরা ইউনুস: ১০৪) অন্য সূরায় আল্লাহ আরও বলেন, “হে নবী! যদি এরা এখন আপনার কথা না মানে তাহলে বলে দিন, তোমরা যা কিছু করছে তা থেকে আমি দায়মুক্ত”। (সূরা আশ-শু'আরা: ২১৬)
অন্যত্র বলা হয়েছে, “এদেরকে বলুন, আমাদের ত্রুটির জন্য তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না এবং তোমরা যা কিছু করে যাচ্ছে সে জন্য আমাদের জবাবদিহি করতে হবে না। বলুন, আমাদের রব একই সময় আমাদের ও তোমাদের একত্র করবেন এবং আমাদের মধ্যে ঠিকমতো ফায়সালা করবেন।” (সূরা সাবা: ২৫–২৬) অন্য সূরায় এসেছে, “এদেরকে বলুন হে আমার জাতির লোকেরা তোমরা নিজেদের জায়গায় কাজ করে যাও। আমি আমার কাজ করে যেতে থাকবো। শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে কার ওপর আসছে লাঞ্ছনাকর আযাব এবং কে এমন শাস্তি লাভ করছে যা অটল।" (সূরা আয-যুমার: ৩৯–৪০)। আবার মদীনা তাইয়েবার সমস্ত মুসলিমকেও এই একই শিক্ষা দেয়া হয়। তাদেরকে বলা হয়েছে, “তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার সাথীদের মধ্যে রয়েছে একটি উত্তম আদর্শ। (সেটি হচ্ছে) তারা নিজেদের জাতিকে পরিষ্কার বলে দিয়েছে, আমরা তোমাদের থেকে ও তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব মাবুদদের পূজা করো তাদের থেকে পুরোপুরি সম্পর্কহীন। আমরা তোমাদের কুফরী করি ও অস্বীকৃতি জানাই এবং যতক্ষণ তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনো ততক্ষণ আমাদের ও তোমাদের মধ্যে চিরকালীন শক্ৰতা সৃষ্টি হয়ে গেছে।” (সূরা আল-মুমতাহিনাহঃ ৪)
কুরআন মজীদের একের পর এক এসব সুস্পষ্ট বক্তব্যের পর তোমরা তোমাদের ধর্ম মেনে চলো এবং আমাকে আমার ধর্ম মেনে চলতে দাও- “লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়াদীন” এর এ ধরনের কোন অর্থের অবকাশই থাকে না। বরং সূরা আয-যুমার এ যে কথা বলা হয়েছে, একে ঠিক সেই পর্যায়ে রাখা যায় যেখানে বলা হয়েছেঃ “হে নবী! এদেরকে বলে দিন, আমি তো আমার দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করে তারই ইবাদাত করবো। তোমরা তাকে বাদ দিয়ে যার যার বন্দেগী করতে চাও করতে থাক না কেন।”(১৪)। সুতরাং এটাই এ আয়াতের মূল ভাষ্য যে, এখানে কাফেরদের সাথে সম্পর্কচ্যুতি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এটাও লক্ষণীয় যে, পবিত্র কুরআনে একথাও আছে, “কাফেররা সন্ধি করতে চাইলে তোমরাও সন্ধি করা।” (সূরা আল আনফাল: ৬১)
তাছাড়া মদীনায় হিজরত করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- তার ও ইয়াহুদীদের সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। তাই সম্পর্কচ্যুতির অর্থ এ নয় যে, তাদের সাথে প্রয়োজনে সন্ধিচুক্তি করা যাবে না। মূলত সন্ধির বৈধতা ও অবৈধতার আসল কারণ হচ্ছে স্থান-কাল-পাত্র এবং সন্ধির শর্তাবলি। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ফয়সালা দিতে গিয়ে বলেছেন- “সে সন্ধি অবৈধ, যা কোন হারামকে হালাল কিংবা হালালকে হারাম করে।” (আবু দাউদ: ৩৫৯৪, তিরমিযী: ১৩৫২, ইবনে মাজহ: ২৫৫৩) ইয়াহুদীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিতে ইসলামের মূলনীতিবিরুদ্ধ কোন বিষয় ছিল না। উদারতা, সদ্ব্যবহার ও শান্তি অন্বেষায় ইসলামের সাথে কোন ধর্মের তুলনা হয় না। কিন্তু এরূপ শান্তিচুক্তি মানবিক অধিকারের ব্যাপারে হয়ে থাকে- আল্লাহ তা'আলার আইন ও দ্বীনের মূলনীতিতে কোন প্রকার দরকষাকষির অবকাশ নেই। (দেখুন: ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-জাওয়াবুস সহীহ, ৩/৫৯-৬২; ইবনুল কাইয়্যিম, বাদায়ি’উল ফাওয়ায়িদ, ১/২৪৬–২৪৭)
৬। তোমাদের দ্বীন (শিরক) তোমাদের জন্য এবং আমার দ্বীন (ইসলাম) আমার জন্য। (1)
(1) অর্থাৎ, যদি তোমরা তোমাদের দ্বীন নিয়ে সন্তুষ্ট থাক এবং তা ত্যাগ করতে রাজী না হও, তাহলে আমিও নিজের দ্বীন নিয়ে সন্তুষ্ট, তা কেন ত্যাগ করব? (لَناَ أَعْمَالُناَ وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ) অর্থাৎ, আমাদের কর্ম আমাদের এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্য। (আল ক্বাস্বাস ৫৫ আয়াত) (তাছাড়া তোমাদের কর্ম ভ্রষ্ট এবং আমার কর্ম শ্রেষ্ঠ। আর অন্যায়ের সাথে কোন আপোস নেই।)