قُتِلَ أَصۡحَٰبُ ٱلۡأُخۡدُودِ

কুতিলা আসহা-বুল উখদূদ ।উচ্চারণ

মারা পড়েছে গর্তওয়ালারা যে গর্তে দাউ দাউ করে জ্বলা জ্বালানীর আগুন ছিল, তাফহীমুল কুরআন

ধ্বংস করা হয়েছিল গর্ত-ওয়ালাদেরকে মুফতী তাকী উসমানী

ধ্বংস হয়েছিল কুন্ডের অধিপতিরা –মুজিবুর রহমান

অভিশপ্ত হয়েছে গর্ত ওয়ালারা অর্থাৎ,মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

ধ্বংস হয়েছিল কুণ্ডের অধিপতিরা- ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ধ্বংস হয়েছে গর্তের অধিপতিরা,আল-বায়ান

ধ্বংস হয়েছে গর্ত ওয়ালারাতাইসিরুল

খন্দকগুলোর মালিকদের নিপাত করা হয়েছে,-মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা অনুযায়ী এ আয়াতসমূহে বিশেষ একটি ঘটনার দিকে ইশারা করা হয়েছে, যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে। ঘটনাটি এরূপ, পূর্বকালে কোন এক জাতির রাজার একজন বিশেষ যাদুকর ছিল। রাজা তার কাজ-কর্মে সেই যাদুকরের সাহায্য গ্রহণ করত। সেই যাদুকর যখন বৃদ্ধ হয়ে গেল, তখন রাজাকে বলল, আমার কাছে কোন এক বালককে পাঠিয়ে দিন। আমি তাকে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিয়ে যাব, যাতে আমার মৃত্যুর পর সে আপনার কাজে আসে। রাজা একটি বালক নির্বাচন করল এবং তাকে যাদুকরের কাছে পাঠিয়ে দিল। বালকটি তার কাছে আসা-যাওয়া শুরু করে দিল। তার যাতায়াত পথে একটি আশ্রম ছিল। তাতে ছিল এক আবেদ, যে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের ধর্মের অনুসারী ও তাওহীদে বিশ্বাসী ছিল। এই আবেদ ছিলেন সংসার-জীবন থেকে বিমুখ, যাদেরকে ‘রাহিব’ বলা হয়ে থাকে। বালকটি যাতায়াত পথে তার কাছে বসত ও তার কথাবার্তা মনোযোগ দিয়ে শুনত। সে সব কথা বালকটিকে বড় আকর্ষণ করত। একদিন সে যথারীতি সেই পথে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখল একটি হিংস্র পশু পথ বন্ধ করে রেখেছে। লোকজন চলাচল করতে পারছে না। কোন কোন বর্ণনায় আছে, সেটি ছিল একটি সিংহ। বালকটি একটি পাথর তুলে নিল এবং আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করল, হে আল্লাহ! তোমার কাছে যদি যাদুকর অপেক্ষা রাহিবের কথা বেশি পছন্দ হয়, তবে এই পাথরটি দ্বারা সিংহটির মৃত্যু ঘটাও। এই বলে যেই না সে পাথরটি ছুড়ে মারল, সঙ্গে সঙ্গে সিংহটি মারা গেল। ফলে রাস্তা উম্মুক্ত হয়ে গেল। এ ঘটনায় মানুষের অন্তরে বালকটির প্রতি ভক্তি-বিশ্বাস জন্মাল। তারা মনে করল তার বিশেষ কোন বিদ্যা জানা আছে, যার বলে এটা করতে পেরেছে। অতঃপর এক অন্ধ ব্যক্তি তাকে অনুরোধ করল যেন তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। বালকটি বলল, রোগ-বালাই আল্লাহ তাআলাই দেন এবং ভালোও তিনিই করেন। কাজেই তুমি যদি ওয়াদা কর আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনবে ও তাঁকে এক বলে বিশ্বাস করবে, তবে আমি তোমার জন্য তাঁর কাছে দুআ করব। লোকটি শর্ত মেনে নিল। ফলে বালকটির দুআয় আল্লাহ তাআলা তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। লোকটি তার কথা মত ঈমান আনল। এসব ঘটনার খবর যখন রাজার কানে পৌঁছল, রাজা ভীষণ ক্ষিপ্ত হল। তার নির্দেশে সেই অন্ধ, রাহিব ও বালকটিকে বন্দী করা হল। রাজা তাদেরকে তাওহীদ ও ঈমান পরিত্যাগ করার জন্য চাপ দিল। কিন্তু তারা তা গ্রাহ্য করল না। ফলে রাজার নির্দেশে অন্ধ ও রাহিবকে শূলে চড়ানো হল। রাজা বালকটির ব্যাপারে কর্মচারীদেরকে হুকুম দিল, তারা যেন তাকে কোন উঁচু পাহাড়ে নিয়ে যায় এবং তার চুড়া থেকে নিচে নিক্ষেপ করে। সেমতে তারা বালকটিকে এক উঁচু পাহাড়ে নিয়ে গেল। বালকটি আল্লাহ তাআলার কাছে ফরিয়াদ করল। ফলে পাহাড়ে প্রচণ্ড কম্পন শুরু হল এবং তাতে রাজার কর্মচারীদের মৃত্যু ঘটল, কিন্তু বালকটিকে আল্লাহ তাআলা রক্ষা করলেন। রাজা দ্বিতীয়বার হুকুম দিল তাকে নৌকায় চড়িয়ে সাগরে নিয়ে যাওয়া হোক এবং তাকে গভীর সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হোক। রাজ-কর্মচারীরা তাকে সাগরে নিয়ে গেল। বালকটি আবার আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করল। ফলে নৌকা উল্টে গেল এবং কর্মচারীরা সকলে ডুবে মরল। এবারও বালকটি নিরাপদ থাকল। রাজা যখন কোনভাবেই তাকে মারতে সক্ষম হল না, শেষে বালকটি তাকে বলল, আপনি যদি আমাকে মারতে চান তবে আমার পরামর্শ মত কাজ করুন। আপনি এক উম্মুক্ত ময়দানে জনসাধারণকে সমবেত হতে বলুন এবং তাদের সামনে আমাকে শূলে চড়ান। তারপর ধনুকে তীর যোজনা করুন ও ‘এই বালকটির প্রতিপালক আল্লাহর নামে’ এই বলে আমার প্রতি নিক্ষেপ করুন। রাজা তাই করল। তীর বালকটির কান ও মাথার মাঝখানে বিদ্ধ হল এবং তাতে সে শহীদ হয়ে গেল। এ দৃশ্য উপস্থিত দর্শকদের অন্তরে প্রবল ঝাঁকুনি দিল। তখনই তাদের অনেকে আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনল। তাতে রাজা আরও বেশি ক্ষিপ্ত হল। কাজেই তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার জন্য সড়কের পাশে পাশে গর্ত খুড়ে তাতে আগুন জ্বালানো হল এবং ঘোষণা করে দেওয়া হল, যারা ঈমান পরিত্যাগ করবে না তাদেরকে আগুনের এ গর্তসমূহে নিক্ষেপ করা হবে। কিন্তু মুমিনগণ তাতে একটুও পিছপা হল না। ফলে তাদের বহু সংখ্যককে সেই সব অগ্নিকু-ে ফেলে জ্যান্ত পুঁড়ে ফেলা হল। মুসলিম শরীফের যে বর্ণনায় এ ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে বলা হয়নি যে, সূরা বুরূজে যে গর্তওয়ালাদের কথা বলা হয়েছে তার ইশারা এ ঘটনারই দিকে। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রহ.) এরই কাছাকাছি একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন এবং তাকে সূরা বুরূজের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। এস্থলে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়। হযরত মাওলানা হিফজুর রহমান সীওহারূবী (রহ.) ‘কিসাসুল কুরআন’ গ্রন্থে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিদগ্ধ পাঠক তা দেখে নিতে পারেন।

তাফসীরে জাকারিয়া

৪. অভিশপ্ত হয়েছিল(১) কুণ্ডের অধিপতিরা—(২)

(১) এখানে আল্লাহ্ তা'আলা চারটি বস্তুর শপথ করার পর মূল কথা বর্ণনা করেছেন। (এক) বুরুজবিশিষ্ট আকাশের; (দুই) কেয়ামত দিবসের; (তিন) আরাফার দিনের এবং (চার) শুক্রবারের। এসব শপথের সম্পর্ক এই যে, এগুলো আল্লাহ্ তা'আলার পরিপূর্ণ শক্তি, কেয়ামতের হিসাব-নিকাশ এবং শাস্তি ও প্রতিদানের দলীল। শুক্রবার ও আরাফার দিন মুসলিমদের জন্যে আখেরাতের পুঁজি সংগ্রহের পবিত্ৰ দিন।

(২) যারা বড় বড় গর্তের মধ্যে আগুন জ্বলিয়ে ঈমানদারদেরকে তার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল এবং তাদের জ্বলে পুড়ে মরার বীভৎস দৃশ্য নিজেদের চোখে দেখেছিল তাদেরকে এখানে গর্তওয়ালা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, তাদের ওপর আল্লাহর লা'নত পড়েছিল এবং তারা আল্লাহর আযাবের অধিকারী হয়েছিল। (ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর) এর আরেক অর্থ ধ্বংস হয়েছিল। (সা'দী)

গর্তে আগুন জ্বলিয়ে ঈমানদারদেরকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করার ঘটনা সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। সুহাইব রুমী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। এক বাদশার কাছে একজন যাদুকর ছিল। বৃদ্ধ বয়সে সে বাদশাহকে বললো, একটি ছেলেকে আমার কাছে নিযুক্ত করো, সে আমার কাছ থেকে এ জাদু শিখে নেবে। বাদশাহ জাদু শেখার জন্য জাদুকরের কাছে একটি ছেলেকে নিযুক্ত করলো। কিন্তু সেই ছেলেটি জাদুকরের কাছে আসা যাওয়ার পথে একজন রাহেবের (যিনি সম্ভবত ঈসা আলাইহিস সালামের দ্বীনের অনুসারী একজন সাধক ছিলেন) সাক্ষাত গুণে সে অলৌকিক শক্তির অধিকারীও হয়ে গেলো। সে অন্ধদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে এবং কুষ্ঠরোগ নিরাময় করতে লাগলো। ছেলেটি তাওহীদের প্রতি ঈমান এনেছে, একথা জানতে পেরে বাদশাহ প্ৰথমে রাহেবকে হত্যা করলো তারপর ছেলেটিকে হত্যা করতে চাইলো।

কিন্তু কোন অস্ত্ৰ দিয়েই এবং কোনভাবেই তাকে হত্যা করতে পারলো না। শেষে ছেলেটি বললো, যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে চাও তাহলে প্রকাশ্য জনসমাবেশে “বিসমি রাব্বিল গুলাম” (অর্থাৎ এই ছেলেটির রবের নামে) বাক্য উচ্চারণ করে আমাকে তীর মারো, তাতেই আমি মারা যাবো। বাদশাহ তাই করলো। ফলে ছেলেটি মারা গেলো। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে লোকেরা চিৎকার করে উঠলো, আমরা এই ছেলেটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। বাদশাহর সভাসদরা তাকে বললো, এখন তো তাই হয়ে গেলো যা থেকে আপনি বাঁচতে চাচ্ছিলেন। লোকেরা আপনার ধর্ম ত্যাগ করে এ ছেলেটির ধর্মগ্রহণ করেছে। এ অবস্থা দেখে বাদশাহ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলো। সে রাস্তার পাশে গর্ত খনন করালো। তাতে আগুন জ্বালালো। যারা ঈমান ত্যাগ করতে রাজী হলো না তাদের সবাইকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করলো। (মুসলিম: ৩০০৫ তিরমিযী: ৩৩৪০)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

৪। ধ্বংস হয়েছে কুন্ডের অধিপতিরা। (1)

(1) অর্থাৎ, যারা খন্দক (কুন্ড) খনন করে আল্লাহর অনুগত বান্দাদেরকে ধ্বংস ও হত্যা করেছিল তাদের জন্যও ধ্বংস ও সর্বনাশ রয়েছে। قُتِلَ শব্দটি এখানে لُعِنَ এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে।